অ্যাডিলেডে সাবকার চতুর্থ পূজা উৎসব: সংগীত, কবিতা ও নৃত্যে মুখরিত প্রসপেক্ট টাউন হল

অ্যাডিলেড, ২৪ অক্টোবর ২০২৬: সাউথ অস্ট্রেলিয়ান বাংলাদেশি কমিউনিটি অ্যাসোসিয়েশন (SABCA) চতুর্থবারের মতো আয়োজন করল ‘পূজা উৎসব ২০২৬’। অ্যাডিলেডের প্রসপেক্ট টাউন হলের এলাইজা হলে আয়োজিত এবারের উৎসব ছিল দর্শকশ্রোতাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত ও বর্ণাঢ্য। কানায় কানায় পূর্ণ মিলনায়তনে সংগীত, নৃত্য, কবিতা আর দর্শকদের উচ্ছ্বাসে পুরো সন্ধ্যাটি হয়ে ওঠে এক অনন্য সাংস্কৃতিক মিলনমেলা।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রতিমা রানী পাত্র তাঁর সুললিত কণ্ঠের রবীন্দ্রসংগীত, অনবদ্য কবিতা আবৃত্তি এবং হৃদয়স্পর্শী উপস্থাপনার মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। ‘প্রভু আমার, প্রিয় আমার’ ও ‘আমার প্রাণের মানুষ’ গানের পাশাপাশি মল্লিকা সেনগুপ্তের ‘আমার দুর্গা’ কবিতার আবৃত্তি ছিল তাঁর পরিবেশনার অন্যতম আকর্ষণ। দুর্গাপূজার পৌরাণিক ইতিহাস, দেবীর আগমনী, অকালবোধন এবং প্রবাসে বাঙালির উৎসবের আবেগকে তিনি এমনভাবে তুলে ধরেন, যেখানে পূজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং হয়ে ওঠে স্মৃতি, শিকড় ও একসঙ্গে থাকার এক অনন্য অনুভূতি। তাঁর সংগীত, কবিতা ও কথামালায় শুরু থেকেই তৈরি হয় এক আবেগঘন শারদীয় পরিবেশ।

এরপর মঞ্চে আসেন জাফরিন জলিল তিথি, এক বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা নিয়ে। কী ছিল না সেই আয়োজনে! তিথির নিজের গান, সঙ্গে জয়ীতা, নয়ন রায় ও আপন বড়ুয়ার সংগীত পরিবেশনা মিলিয়ে পুরো মিলনায়তনে তৈরি হয় পূজার আবহ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শক্তিমান আবৃত্তিশিল্পী মীর আসলামের কবিতা আবৃত্তি এবং নবাগত মমোর  মনোমুগ্ধকর নৃত্য পরিবেশনা। বাদ্যযন্ত্রে সহযোগিতা করেন বিজু, কিবোর্ডে দেবা এবং গিটারে শুভজ্যোতি হালদার। সংগীত, কবিতা ও নৃত্যের এই সম্মিলিত পরিবেশনা দর্শকদের নিয়ে যায় এক অন্যরকম অনুভূতির জগতে।

এরপর মঞ্চে আসেন অ্যাডিলেডের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের দুই অতি পরিচিত মুখ, জয়ন্ত চক্রবর্তী ও নাজিয়া। তাঁদের অসাধারণ ফিউশন পরিবেশনায় কখনো ধ্বনিত হয়েছে গায়ত্রী মন্ত্র, আবার কখনো দর্শকের মন ছুঁয়ে গেছে Leo Sayer-এর কালজয়ী গান When I Need You। সুরের এই বৈচিত্র্য, দুই শিল্পীর অনবদ্য রসায়ন এবং দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ পুরো মিলনায়তনকে মাতিয়ে রাখে। কখনো গানের সঙ্গে কণ্ঠ মেলানো, কখনো তালে তালে নেচে ওঠা, শিল্পী আর দর্শকের মধ্যকার দূরত্ব যেন একসময় মিলিয়ে যায়।

সন্ধ্যার শেষ পর্বে মঞ্চে আসে নতুন ব্যান্ড ‘অর্ক’। একের পর এক গানে তারা মাতিয়ে তোলে পুরো মিলনায়তন। দর্শকরাও কণ্ঠ মেলান প্রতিটি গানের সঙ্গে। আর শেষ পরিবেশনায় যখন বেজে ওঠে শচীন দেববর্মণের অমর সৃষ্টি ‘নিটোল পায়ে রিনিক ঝিনিক’, তখন মনে হয়, স্বয়ং সুরস্রষ্টাও হয়তো গর্বিত হতেন তাঁর সৃষ্টির এমন প্রাণবন্ত পরিবেশনা শুনে। গানের শেষ সুরে যেন দুর্গাপূজার ঢাকের রেশ মিলিয়ে আগাম শ্যামাপূজার আহ্বানও ধ্বনিত হয়ে ওঠে। এভাবেই এক উৎসবের আবেশ থেকে আরেক উৎসবের প্রতীক্ষা নিয়ে শেষ হয় সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক আয়োজন।

অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন প্রতিমা রানী পাত্র ও সাবকার সাধারণ সম্পাদক শৌভনিক দত্ত। অনুষ্ঠানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন সাবকার চেয়ারপারসন মোহাম্মদ তারিক, কাউন্সিলর ওয়াসিম সাঈদ, বাংলাদেশি কমিউনিটি স্কুলের (BCS) অধ্যক্ষ আজমুল হক পাপ্পু এবং মিডিয়া পার্টনার ‘আমাদের কথা’র প্রধান সম্পাদক মাহবুব সিরাজ তুহিন।

অনুষ্ঠানে দর্শকদের জন্য মুখরোচক বাংলাদেশি খাবারের আয়োজন করেন ‘খাবেন কি?’-এর সুমাইয়া শাফি। এবারের আয়োজনের পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল Aussie Home Loans-এর Abu Tausif এবং মিডিয়া পার্টনার হিসেবে ছিল ‘আমাদের কথা’। আয়োজনটি সফল করে তুলতে সাবকার কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য, স্বেচ্ছাসেবক, শিল্পী ও সহযোগী সকলের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে সাবকার চতুর্থ পূজা উৎসব কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছিল প্রবাসের মাটিতে বাঙালির শিকড়, ঐতিহ্য, সম্প্রীতি ও সম্মিলিত আনন্দের এক উজ্জ্বল উদ্‌যাপন। ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সম্মান জানিয়ে সকলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আবারও প্রমাণ করেছে, হাজার মাইল দূরেও বাঙালির উৎসবের প্রাণস্পন্দন অমলিন।