নাদিরা সুলতানা নদী: চাকরির বয়স প্রায় ছয় বছর হতে চলল। দ্বিতীয় বছর থেকেই অফিসিয়াল ট্যুরে দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ এলেও ‘মা’ হওয়ার জন্য গত প্রায় দেড় বছরের একটা লম্বা বিরতি নিতেই হলো। অফিসে আবার নিয়মিত হওয়ার পর ঠিক এক বছর সাত মাস পর আরও একবার যাচ্ছি দেশের বাইরে। এবারের গন্তব্য ভারতের দিল্লি।
গোটা সাত দিনের ট্যুর। আসা-যাওয়ার সময় বাদ দিলে থাকতে হবে পাঁচ দিন।
আগের ট্যুরগুলোর সঙ্গে এবারেরটা একদমই আলাদা। আমার কন্যা, যার বয়স দুই ছুঁই ছুঁই করছে। পৃথিবীতে এসেই আমার নিজের পৃথিবী অনেকখানিই বদলে দিয়েছে, যার হাসি দেখলে বুকের ভেতর অজানা এক সুখের ঝরনা বয়ে যায়। যাকে বুকের কাছে চেপে ধরলে জীবনকে আরও ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। আমার সেই মেয়ে ‘রেইন’কে রেখে প্রথমবারের মতো এই সময়টুকু থাকছি না।
আমার বুকের ভেতর কী হচ্ছে, সেটা কিছুতেই পরিবারের অন্য সদস্যদের বুঝতে দেওয়া যাবে না। আমি এরই মধ্যে বুঝে গেছি, কে কেমন করে ভাবে বা ভাবতে পারে এই পরিবারে। সবার সব চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে নিজের ভেতরে প্রতি মুহূর্তে ভাঙতে ভাঙতে অনেকটাই অন্য আমি হয়ে গেছি, যাচ্ছি।
তবে দিনের পর দিন সবকিছু সামাল দিয়ে এখন এইটুকু বুঝতে শিখেছি, সবকিছু নিয়ে প্রচুর কথা বলা যায় না, বা প্রয়োজন নেই। দেখছি, শুনছি। আমার এই যাওয়াটা নিয়ে পরিবারের বিরক্তিগুলো চেপে যাচ্ছি।
আমার মেয়ে, তার দাদা-দাদি, বাবা, চাচা, নতুন চাচি এবং আমার নিজের মা, ওর নানু—সবাই মিলেই আগলে রাখবে কটা দিন। অফিসের মূল দায়িত্বের মাঝে আবার ফিরতে না পারলে আমি তো আমিই থাকছি না। থাকতে পারব না। এই ট্যুরটা নিতেই হচ্ছে। নো ওয়ে টু স্কিপ! অন্তত আমি এই মুহূর্তে অজুহাতগুলোকে আমলে নিতে চাইছি না। এক বছর ছয় মাস নিয়েছি।
লাগেজপত্তর নীরবে গুছাতে লাগলাম। ফ্লাই করার দুই দিন আগে কিশোরগঞ্জ থেকে আমার মা চলে এলেন ছোট মামাকে নিয়ে। বাসায় ঢুকেই বুঝলেন, আমার এই যাওয়াটা খুব স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার মতো কিছু নয়। অল্প কথায় তাঁকেও বুঝিয়ে দিলাম, এমন কিছু দেখা বা শোনার অবস্থায় আমি আর নেই। মা যেন আতঙ্কিত না হয়ে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থাকেন এবং সবাই মিলে আমার ‘রেইন’কে নিয়ে ভালো কিছু সময় কাটান। আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে, সেই আশাটুকুই শুধু করছি আমি।
তবে একটা জায়গায় নিজেকে ব্লেসডই বলব। মেয়ে আমার এরই মধ্যে বুঝিয়ে দিয়েছে, ‘শি লাভস পিপল’! ভীষণ মিশুক এবং আদুরে। এই সময়ের মধ্যে তার নিজের মা-বাবাকে নিয়ে যেমন একটা জগৎ হয়েছে, ঠিক ততটাই হয়েছে পরিবারের অন্য সবাইকে নিয়ে। এমনকি গ্রামের বাড়ি থেকে একটা মেয়ে আনা হয়েছে ওর পাশে থাকার জন্য। সেই ঝুমার সঙ্গেও তার দারুণ সখ্য।
হয়তো ঘুমাতে গিয়ে আমাকে খুঁজবে, কিন্তু ওকে খুব ভালোবেসে ওর বাবাও যে সময় দেবে, সে বিশ্বাস আমার আছে। ফ্লাই করার আগের রাতেও রেইনের বাবা যত রকম নেগেটিভ অ্যাপ্রোচ করা যায়, করে যাচ্ছে। আমি মনে মনে বলছি, ওহে দয়াময়, আমাকে ধৈর্য দাও, শক্তি দাও, সাহস দাও…
ছোট্ট এক প্লেন জার্নি খারাপ হলো না। মধ্যদুপুরে পৌঁছে গেলাম ব্যস্ত দিল্লি এয়ারপোর্টে। ওখানকার লিয়াজোঁ অফিস থেকে দুই তরুণ-তরুণী এসেছে আমি এবং অন্যদের রিসিভ করে হোটেলে পৌঁছে দিতে।
বাংলাদেশে ফেলে আসা চাপা টেনশন আপাতত সরিয়ে রেখে মন দিই আমার কাজে। প্রায় ৪৫ মিনিটের ট্যাক্সি রাইডেই ওদের সঙ্গে কথা হয় পরদিন সকাল থেকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ‘এডুকেশন এক্সপো’ নিয়ে। শুনে নিই আরও কিছু খুঁটিনাটি।
হোটেলে ঢুকে লাগেজ রেখে, মোবাইল সচল করে বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ করি। এরপর ফ্রেশ হয়ে বের হই ধারে-কাছে কোথায় একটু সস্তায়, পরিচ্ছন্ন ও পছন্দসই খাবার পাওয়া যাবে, সেই খোঁজে। হোটেলে সকালের নাশতা পাওয়া গেলেও বাকি সময় চড়া দামে কিনে নিতে হবে। তাই কাজের সময়ের বাইরে এই কদিন যখনই খেতে হবে, সেই ব্যবস্থা করে রাখা।
হোটেল লবিতেই দেখছিলাম দু-একটি বাংলাদেশি ছোট-বড় পরিবার। আমার সেই সময়টা নেই যে গিয়ে কথা বলে একটু সময় দেব। নিজের কাজগুলো সেরে দ্রুত হোটেল রুমে ফিরে যাব, সেই তাড়া নিয়েই বের হচ্ছি আসলে।
ট্যাক্সির কাছে পৌঁছানোর আগেই দেখি, লবির অন্য একটা পাশ থেকে আমার কাছাকাছি এক ভারতীয় তরুণীর সঙ্গে একজন বাংলাদেশি তরুণী খুব প্রাণবন্ত ভঙ্গিতে কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছেন। একজনকে বাংলাদেশি বলে অনুমান করে নিলাম বটে, কিন্তু নিশ্চিত হব হব করতেই চোখে চোখ। আমি মুখে ‘হ্যালো’ উচ্চারণ না করেই চোখ দিয়ে যেন বুঝিয়ে বলতে চাইলাম, ‘আপনি কি বাংলাদেশি?’
কী জানি, কেমন করে চোখের ভাষা বুঝতে পেরেই তরুণী তাকালেন আমার দিকে, একটু কাঠিন্য নিয়েই। তবুও আরও কাছে আসতেই আমিও তাকালাম, ‘ আর ইউ বাংলাদেশি?’
আন্তরিক হাসিটাও বিনিময় করলাম, যেটা আমি করি।
‘আমি ঢাকা থেকে এসেছি, আপনি?’
বোঝা গেল, উনি ততটা ইচ্ছুক নন আমার সঙ্গে এই পরিচয় বিনিময়ে। তারপরও বললেন, ‘আমি অস্ট্রেলিয়া থেকে, বেড়াতে এসেছি।’
‘হুম, আমিও হয়তো বাংলাদেশি!’
আমি এবার হাসি আরও বিস্তৃত করি। ‘মানে কী? আপনি নিশ্চিত নন?’
এবার তিনিও হাসেন, তবে নিঃশব্দে। মেপে মেপে।
আমি হাসিখুশি মানুষ। কিন্তু এমন নয় যে কাউকে যেচে ডিস্টার্ব করব। কিন্তু আমি আসলে আমার থেকে একটু সিনিয়রই হবেন, এমন একজন তরুণী অস্ট্রেলিয়া থেকে বেড়াতে এসেছেন শুনেই গল্প করার উৎসাহ কিছুতেই ছাড়তে পারছি না!
‘ফ্যামিলি ট্রিপ?’
‘না, আমি একাই।’
ভদ্রমহিলাকে এক দেখাতেই খুব ইমপ্রেসিভ মনে হলো না। একা বেড়াতে এসেছেন, আর এই মুহূর্তে তাঁর সঙ্গে খুব স্মার্ট এক ভারতীয় তরুণী—আমাকে টানল বিষয়টা।
পরিচয়পর্বকে আরও একটু এগিয়ে নিতেই বলি, ‘আমরা বোধ হয় একই হোটেলে উঠেছি?’
তরুণী বললেন, ‘তাই তো মনে হচ্ছে…’
‘আবার দেখা হবে নিশ্চয়ই। আপনার মনে হয় তাড়া আছে।’ বলে আমি পা বাড়াতে যাই।
উনি বলেন, ‘না, মানে আমি এই হোটেলেই উঠেছি। তবে আজ আমার এই বন্ধু আমাকে নিতে এসেছে, ওর সঙ্গে যাচ্ছি। ওর সঙ্গে হয়তো রাতটা থেকে যেতে পারি। কাল সন্ধ্যায় ফিরব।’
বুঝতে পারি না, উনি আমাকে পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে চাইছেন কি না! আসলে বুঝতে ইচ্ছেও করছে না। চাইছি, দেখা হোক।
আমি ওর বন্ধুর দিকে হাত বাড়াই। ‘হ্যালো, আই অ্যাম সামিরা, ফ্রম বাংলাদেশ।’
‘ও ইয়েস, ইটস মি, জাহ্নবী!’
‘নাইস টু মিট ইউ।’
বাংলাদেশি তরুণী মনে হলো, একটু অনিচ্ছা নিয়ে, তবে স্বাভাবিকভাবেই বললেন, ‘আমি মমতা পারভীন। আমার এখানকার বন্ধুরা আমায় “মম” বলে।’
মম, আমার খুব প্রিয় নাম! ‘দেখা হবে, আপা। বাই দ্য ওয়ে, আপা বললে আপত্তি আছে আপনার?’
মম আপা এবার হাসলেন, মনের ভেতর থেকে হাসি। বললেন, ‘না, সামিরা। ইটস ওকে। দেখা হবে!’
আমি টানা দুই দিন খুব বিজি ছিলাম। পুরো ৪৮ ঘণ্টা আসলে মমকে মনে করার ফুরসতই মেলেনি।
তৃতীয় দিন সকালে হোটেল লবিতে ব্রেকফাস্টে দেখা হয়ে গেল মমর সঙ্গে। আমার আপা বলার কথা, কিন্তু অস্ট্রেলিয়া থেকে বেড়াতে আসা একজন তরুণী, যিনি কি না বাংলাদেশি কি না ঠিকমতো বললেনও না, তাঁকে আপা বলা বোধ হয় সমীচীন হবে না!
‘মম, কেমন আছেন আপনি? খুব বিজি ছিলাম গত দুই দিন। আপনার খোঁজ নেব, সময় করতে পারিনি।’
‘সামিরা, আমিও ছিলাম না। গতকাল লেট নাইটেই ফিরলাম।’
লবির একটু কর্নার টেবিলে একাই বসেছিলেন খাবার নিয়ে।
‘কিছু মনে না করলে আমি কি আমার ব্রেকফাস্ট নিয়ে, জয়েন করতে পারি আপনার সাথে?’
না, মমকে এবার আর আগের মতো আবেগশূন্য বা এক্সপ্রেশনলেস মনে হচ্ছে না। বরং আমি তাঁর চোখে গভীর করে তাকিয়ে অন্যরকম একটা মমকে দেখলাম, যার চোখ উপচে পড়ছে গভীর মায়া এবং আত্মবিশ্বাস।
জুস খেতে খেতে কথা এগোয় আমাদের। আবিষ্কার হলো, বয়সে তিনি আমার আট-দশ বছরের সিনিয়র। বাংলাদেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়া চলে গেছেন এক যুগেরও আগে। কলেজপড়ুয়া মেয়ে আর আইটি ইঞ্জিনিয়ার স্বামীকে রেখে একাই বেড়াতে এসেছেন এবং বছর দুয়েক পরপর এখানেই আসেন, জানালেন।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করে ফেলি, ‘বাংলাদেশে যান না? কেন এখানেই, দিল্লিতে?’
‘সামিরা, আপনি কী লেখেন?’
আমার সরাসরি এমন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমাকে এমন প্রশ্ন! একটু হকচকিয়ে যাই।
অপ্রস্তুত হাসি। ‘হুম, লিখি একটু-আধটু, চেষ্টা করি। সপ্তাহে ছয় দিন চাকরি, বাংলাদেশের ব্যস্ততম শহর ঢাকায় থেকে একটা পরিবার মেইনটেইন করে যেভাবে চাই, সেভাবে পারি না যদিও।’
কথা বলতে খুব ভালো লাগে আমার, কিন্তু হঠাৎই খেয়াল হয়, আমাকে ১০টার মধ্যে আজকের ভেন্যুতে পৌঁছাতে হবে। ঘড়িতে প্রায় সাড়ে আটটা। বাকি আধা ঘণ্টায় রেডি হয়ে বাই নাইন বের হতে হবে। আর তার চেয়ে বড় কথা, ভীষণ কাজপাগল আমার মনে পড়ে যায়, আজকের প্রেজেন্টেশনটা আরও একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিতে হবে, যেটা আমি গত দুই সকালে করেছি। আজ মমকে পেয়ে ছন্দপতন হলো।
অনিচ্ছা নিয়েই উঠলাম।
‘রাতে ডিনার কোথায় করছেন, মম?’
‘আমার জাহ্নবী বন্ধু আসবে একটু পরই। সঙ্গে আমার আরও কয়েকজন বন্ধু। ওদের নিয়ে ঘুরতে বের হব। আমি প্রশ্ন চোখে তাকিয়ে আছি।
সামিরা, আমি এই দিল্লিতেই পড়াশোনা করেছি আসলে। তাই এখানেই ফিরে ফিরে আসি। বুঝতে পারছ, জানতে চেয়েছিলে কেন বাংলাদেশের মেয়ে হয়ে এখানে আসি বারবার। দিল্লি আমাকে দ্বিতীয় জীবন দিয়েছে বলতে পার।’
‘মম, কথা হবে আপনার সাথে, হ্যাভ আ নাইস ডে, বাই ফর নাও।’
কাজকে আমি একটু বেশিই ভালোবাসি। সকালটা অন্য রকম করে কাটল আজ। একটু দুরুদুরু বুকে বের হলেও ভেন্যুতে ঢুকেই নিজেকে ঝাঁকি দিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে এলাম পুরো কনসেন্ট্রেশন নিয়ে। ভালো কাটল। নেপাল, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ অন্য দেশ থেকে আসা মানুষদের সঙ্গে এরই মধ্যে টুকটাক আলাপ হয়ে যাওয়ায় আজ সময়টা আরও ভালো কাটল।
কাজের মাঝে লাঞ্চ ব্রেক, কফি ব্রেক—প্রতিটাই কারও না কারও আরও একটু কাছাকাছি আসার সুযোগ হলো। ওয়েস্টার্ন আউটফিটে আমাকে ৩০ বছরের এক মা মনে হয় না, এমন কমপ্লিমেন্টে আমি অনেকটাই অভ্যস্ত। এখানে এসেও কম্বোডিয়া থেকে আসা লিউক নামের এক তরুণ একটু মজা নেয়।
কথা প্রসঙ্গে যখন জানতে পারে, এই নভেম্বরে আমি ৩০ ছুঁবো এবং এক কন্যা রেইনের মা, আজ কফি ব্রেকে সবার সামনে আমাকে ডেকে দাঁড় করিয়ে বলছে, ‘হ্যালো এভরিওয়ান, এনিওয়ান ক্যান গেস, হাউ ওল্ড সামিরা ইজ? সবার জন্য কুইজ!’
মজাটা কীভাবে নেব, ভেবে উঠতে না উঠতেই দুর্দান্ত সব কমেন্টে হাসতেই বাধ্য হই।
তবে ভালো লাগে, সিনিয়র-জুনিয়র, তরুণ-তরুণীদের মাঝে নিজের শরীর-স্বাস্থ্য, পোশাক-আশাক নিয়ে খুব সচেতন হতে হচ্ছে না বলে।
সেশনের তৃতীয় দিন, কয়েকজন মিলে একটু দূরে একটা জায়গায় ডিনার করবে বলে ঠিক করল। আমার খুব ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও যেতে হলো ভারতীয় আমার বয়সী এক তরুণী রোহিনীর জন্য। এতটা লাইভ মেয়ে আমি অনেক দিন দেখিনি। সবার সঙ্গে থাকার পরও পুরোটা সময় ফোকাস ওর দিকে যেতে বাধ্য। স্পষ্ট ইংরেজিতে কথা বলে, তাই আমাদের কারও বুঝতেও কোনো সমস্যা হয় না।
আমাকে বলে, ‘শোন, স্যামি—সামিরা বাদ দিয়ে তাই বলছে—তুমি তোমার কন্যার খোঁজ এখান থেকেই নাও। আমি জানি, সে ভালো আছে। তারপরও একটু টেনশন ফ্রি হয়ে চলো আমাদের সঙ্গে।’
রাতে ফিরতে ফিরতে নয়টার একটু বেশি। রুমে ঢুকে আরও একবার শাওয়ার নিলাম। রুমে রাখা টি-ব্যাগ গরম পানিতে চুবিয়ে কাপ হাতে নিয়ে ল্যাপটপ খুলে বসলাম একটু সময়ের জন্য।
মমকে মনে পড়ল। রুম নম্বরটা জানলে একটা কল দেওয়া যেত। কেন যে জিজ্ঞেস করলাম না!
ঘুমাতে যাওয়ার আগে আরও একবার মনে পড়ল তাঁর সেই কথাটা—‘দিল্লি আমাকে দ্বিতীয় জীবন দিয়েছে’!
আমি রীতিমতো সকালের অপেক্ষায় রইলাম, কখন মমর সঙ্গে দেখা হবে।
আজ সাতটায় উঠেই ফ্রেশ হয়ে একবারে রেডি হয়েই নামলাম। আজকের শিডিউল একটু রিল্যাক্সড। সঙ্গে আনা দুইটা শাড়ি থেকে ক্রেপ সিল্কের হালকা পেস্ট-সাদা শাড়িটা জড়িয়ে, কানে সাদা-নীল কম্বিনেশনের পাথরের দুল, পিঙ্ক লিপস্টিক আর আইলাইনারে বেশ স্নিগ্ধই লাগছে, বুঝতে পারছি।
সাড়ে সাতটায় লবিতে নেমেই চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছিল মমকে। মম দূর থেকেই আমাকে দেখে উঠে আসছিল, আমাকে দেখে রীতিমতো উচ্ছ্বসিত আজ।
‘আরে, শাড়িতে তোমাকে এত অন্যরকম লাগে, সামিরা!’
আমি হাসি। ‘হুম, একটু পরিপক্ব লাগে আরকি। মাঝে মাঝে যেমন লাগা উচিত।’
মুখোমুখি বসি।
‘মম, আর দুই দিন আছি। আপনার সঙ্গে তো আমার আর দেখা হবে না। ছোট দুইটা বিষয়, যদি খুব পার্সোনাল বা ইমোশনাল না হয়, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে। বাংলাদেশ নিয়ে আপনার মধ্যে একটা ক্ষোভ বা অভিমান, নাকি অন্য কিছু? আসলেই কি কিছু কাজ করে? প্রথম দিনই বলছিলেন, “আমি বোধ হয় বাংলাদেশি!” আমি কাজের মাঝেও আপনাকে নিয়ে কেন যেন ভাবছি।’
মম আমার দিকে খুব গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন।
‘সামিরা, আমার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখেছ আমার গায়ের রং? আমি একটু বেশিই কালো, না? আমার স্কুল-কলেজ কেটেছে যেখানে, অবর্ণনীয় এক কষ্ট নিয়ে আমি শেষ করেছি আমার এই দুই পাঠ। শুধু গায়ের রঙের জন্যই এমন গুটিয়ে থাকতে হতো। ধরো, স্কুলে যাচ্ছি, আড়াল থেকে কোনো ছেলে বলে উঠল, ‘কালিমা, কালিমা! খারাপ লাগত। পাড়ায় কোনো মা হতে যাচ্ছেন, আমি চোখের সামনে পড়ে গেলে তাড়াতাড়ি যেন সরে যেতেন। একদিন আমার সিনিয়র এক বড় আপা আমাকে বললেন, ‘মমতা, গোবর মাখলে মানুষ ফর্সা হয়ে যায়, জানো? তুমি কদিন দিয়ে দেখতে পারো।”’
সামিরা, ‘আমি গোবর মেখে একদিন বাথরুমে বসেছিলাম।’
মম চোখমুখ খুব স্বাভাবিক রেখেই কথা বলছিলেন। আমি একটু বেশিই স্পর্শকাতর মানুষ। আমার চোখ ভিজে গেল। ব্যাপারটা কেমন দেখায়, তারপরও আমি মমর হাতটা ছুঁয়ে থাকি…
‘সামিরা, এটা ছোট একটা অভিজ্ঞতা। এমন আরও অনেক অনেক দিন এসেছে আমার জীবনে। কিছু মানুষ, কিছু সময় আমার জীবনকে করে তুলেছিল শুধুই একটা কালো রঙের মেয়ের শরীরের কালো অধ্যায়ের গল্পের মতো।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব—এমন সিদ্ধান্ত সামনে আসতেই পরিবারকে রাজি করিয়ে পাড়ি দিলাম এই দেশে, দিল্লিতে।
‘সামিরা, জীবনটা আমার মতো করে ছিল না দীর্ঘ সময়, বুঝতেই পারছ। এখানে এসে অল্প কয়েকজন বন্ধু পেলাম। আমি জানি, এই দেশের আনাচে-কানাচেও অসংখ্য মম আছে, গুমরে থাকা কান্না বা কষ্ট আছে। কিন্তু আমি এখানে পড়তে এসেই আমার আমিটাকে খুঁজে পেলাম, যাকে গায়ের এমন কালো রং নিয়ে গুটিয়ে থাকতে হয়নি কখনও।’
‘ওই যে জাহ্নবীকে দেখেছ, আরও কয়েকজন আছে। এখন ওরা অন্য শহরে। ওরা আমার বন্ধু হয়েছে, খুব ভালো বন্ধু। আমি সুযোগ পেলেই তাই আমার দ্বিতীয় জীবনপ্রাপ্তিটা উপভোগ করতে আসি।’
‘তোমার নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে, আমার জীবনসঙ্গী কেমন হয়েছে। সে খুব পড়ূয়া একজন মানুষ। পড়তে গিয়েই পরিচয়। ভীষণ স্কলার, পড়াশোনা নিয়েই থাকে। কিন্তু সে আমাকে পছন্দ করেছে এবং এক দিনের জন্যও এটা অনুভব করতে দেয়নি যে আমাকে ইচ্ছে করলেই ইগনোর করা যায়। আমি সব সময়ই তার চোখে খুব স্পেশাল।’
‘আমরা অস্ট্রেলিয়ার মতো একটা দেশে বাস করছি, মেলবোর্নে। সে একটা ইউনিতে গবেষণায় রত, আমিও একটা চেইন শপে কাস্টমার সার্ভিসে আছি। অনেক বছর ধরে চাকরি করছি। আমাদের ওভাবে কোনো আর্থিক অভাব-অভিযোগ নেই। একটা মেয়ে, খুব ট্যালেন্টেড। সবাই সবার মতো নিজেদের টেক কেয়ার করতে পারি।’
‘আমার হাজব্যান্ড তাঁর কাজে বা অন্য কোনো প্রয়োজনে একাই দেশের বাইরে যান। মেয়েকে নিয়ে দেশে যাই আমিও, কিন্তু খুব বেশি যাওয়া হয় না। আমার আর আমার হাজব্যান্ডের মা-বাবা বেঁচে নেই। ভাইবোনেরা আছে। কিন্তু ওই যে, এত বছর পরও শুনতে হয়, “কিরে মম, বিদেশ গিয়া তো মানুষ ফর্সা হয়া যায়, তুই দেখি আগের মতোই! তোর মাইয়াডাও তো বাপের রঙডা পাইল না!”
‘ও সামিরা, তুমি জানতে চাওনি, তাও বলি। আমি যে অস্ট্রেলিয়ায় আছি, সেই শহরেও অনেক বাংলাদেশি থাকে। আমার বন্ধু বলতে হাতে গোনা কয়েকজন। কেন জানো? এই যে আমি এত কালো দেখতে, আমার হাজব্যান্ডের গায়ের রং আবার একটু বেশিই উজ্জ্বল। তা নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা না হলেও ধরো, কোনো আচার-অনুষ্ঠানে গেছি, কোনো না কোনো মেয়ে বা মহিলা বলবে, “আপা বা ভাবি, আপনার স্বামী মানে ভাইয়ের গায়ের রং তো দেখি আপেলের মতো! আপনি একটু ধার নিতে পারেন না?”
এবার আপা শব্দ করে হেসে উঠলেন আমার করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে।
‘না না, সামিরা, তুমি আবার ভুল বুঝো না। সবখানেই সব রকম মানুষ আছে। এমন বলার মানুষ যেমন দেশে আছে, প্রবাসেও আছে। এমন অনেক মেয়ে-মহিলা আজও আছে, যারা গায়ের রং আর বাহ্যিক সৌন্দর্য নিয়েই মেতে আছে। সংখ্যাটা হয়তো কম, কিন্তু আছে এমন। আমার এখন আর মন খারাপ হয় না। তবে আমি এড়িয়ে চলি।’
‘তুমি লেখ, এটা জানার পরই সেদিন ফেসবুকে তোমাকে খুঁজছিলাম, পেয়েও গেলাম। তোমার বেশ কিছু লেখা পাবলিক করা। পড়ে খুব ভালো লেগেছে। মনে হলো, তোমাকে আমার এই অনুভবটুকু শেয়ার করাই যায়।’
আজ একটু দেরি হয়েই গেল। কিন্তু আমার অন্য রকম ভালো লাগছে। মম হয়তো জানেন না, কী দারুণভাবে আমাকে আরও অনেক বেশি ইন্সপায়ার করে গেলেন। আমি কতটা পারব জানি না, কিন্তু লিখব আপনার এই জীবন অনুভব, লিখতেই হবে।
আজ পঞ্চম দিন। হালকা কলাপাতা-সবুজ আর লাল মিলে জামদানিটা নিয়ে এসেছি শেষ দিনে পরব বলেই। লাল পাথরের মালাটা এবং চোখে মোটা করে কালো কাজল আর লাল বড় টিপে একটু বেশিই সাজগোজ করলাম সকাল সকাল।
শেষ দিনের আগের দিন।
আমি সেই রকম সারপ্রাইজড হলাম। মম আমার জন্য একটা প্লেটে আমি মোটামুটি যা খাই, সুন্দর করে তুলে রেখেছেন। সঙ্গে জুস আর সয়া মিল্কও।
‘সামিরা, তুমি একদিন জুস খেয়েছ, আরেক দিন মিল্ক। নট শিওর আজ কী খাবে। দুইটাই খেতে পার আজ।’
আমি আসলেই খুশি। আমার সময়টা বেঁচে গেল। মমর সঙ্গে বসে আরাম করে নাশতা সারলাম। এদের ম্যাঙ্গো জুস যে এত মজা, জানা ছিল না। গত দুই দিন যথারীতি অরেঞ্জ জুস খেয়েছি আসলে। উফ, মিসই হয়ে গেল!
মমর সঙ্গে সম্পর্কটা বেশ সাবলীল হলো। ফেসবুকে আমার লেখা পড়ে প্রশংসা করলেও ফেসবুক চেক করে দেখলাম, আমাকে অ্যাড করেননি।
আগামীকাল রাতের ফ্লাইটে চলে যাব। কাল সকালের নাশতাটা হয়তো একসঙ্গে বসে শেষবারের মতো করা যেত। কিন্তু উনি আজ আবার দূরে কোথাও যাচ্ছেন, কাল ফিরবেন একসময়। তাই আর দেখা না-ও হতে পারে। মম থাকবেন আরও প্রায় এক সপ্তাহ।
‘আমি কি আপনার সঙ্গে একটা ছবি উঠাতে পারি, মম?’
প্রথমেই একটু মজা করলেন। ‘আমি এমন খাঁটি বাংলাদেশি কোনো অ্যাঞ্জেল কন্যার সঙ্গে ছবি উঠাই না!’ বলে মুখ কঠিন করে তাকালেন। দুই-এক সেকেন্ড মজাটা ধরতে না পেরে দুজনেই হাসলাম।
আমি জানি, আমি চোখধাঁধানো সুন্দর বলতে যা বোঝায়, তা নই। কোনো কালেই ছিলাম না। কিন্তু বিষয় হচ্ছে, কেমন করে যেন এটা আমি কাটিয়ে উঠেছি অনেক আগেই। আমার আত্মবিশ্বাস এবং সামথিং এলস, যেটা আমাকে আলাদা করেই তুলে ধরে। তাই এমন প্রশংসা নতুন নয়।
একজনকে অনুরোধ করি আমাদের দুই-একটা ছবি তুলে দিতে। লবির দুই-একটা সুন্দর কর্নারে দাঁড়িয়ে, বসে বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিই। মম তাঁর সঙ্গে থাকা আইপ্যাডে নেন ছবি।
একটু ইমোশনাল লাগে। দেখা হবে না আর, ভাবতেই পারছি না হঠাৎ কেন যেন। শুধুই মনে হচ্ছে, আমার আরও কিছু জানার ছিল, বলারও।
মম বলেন, ‘সামিরা, তোমার বাই চান্স যদি অস্ট্রেলিয়া ট্যুর হয়, আমার এখানে মোস্ট ওয়েলকাম। এসো। আমি যে শহরে থাকি, একটা নদী আছে ওখানে, ‘ইয়ারা’। তোমাকে নিয়ে তার পাশে বসে না-বলা গল্পগুলো করা যাবে…’
এবার আমার চোখ সত্যিই ভিজে ওঠে। আমাকে একটা টাইট হাগ দিয়ে মম পা বাড়াতে নেন। কেন যেন মনে হলো, তিনিও ভেজা চোখ লুকাচ্ছেন…
এবার আমি মরিয়া হয়ে বলি, ‘মম, আপনি কি আমাকে ফেসবুকে অ্যাড করবেন? না হলে আপনাকে হারিয়ে ফেলব তো! অবশ্য আগামী বছর দুই পর এই দিল্লিতে এসে আপনাকে আবার খুঁজব, বেঁচে থাকলে, ঠিক এই সময়েই। আমার মনে হচ্ছে, আপনি এখানে ফিরে ফিরে আসবেনই…’
মম ছলছল চোখে তাকিয়ে বলেন, ‘ভালো থেকো তুমি, সামিরা। দেখা আমাদের হতেও পারে, না-ও হতে পারে। ভালো থেকো। যদিও দেখো, এই পাঁচ দিনে তোমার কোনো গল্পই শোনা হলো না, শুধু “রেইনের” কথা ছাড়া।’
‘থাক মম, আমার গল্প বলা যাবে “ইয়ারা নদীর” ধারে বসে কোনো একদিন। সে আশা বেঁচে থাক। ভালো থেকো তুমিও!’