দৈবাৎ নির্বুদ্ধিতা এবং বিচারে যুক্তি ও নৈতিকতা

মতিউর রহমান: সিলেট ভ্রমণের অংশ হিসেবে এক ভোর বেলায় একদল প্রকৌশল পরিবারের সঙ্গে জাফলং এ হাজির হলে মহিলা সদস্যরা মাইক্রোবাস থেকে নেৃমেই পাথরের তৈরী আসল সীল-পাটা কিনার কাজে মনোযোগী হয়ে পড়লো। বহনের অজুহাত দেখিয়েও আমি আমার মিসেসকে অরিজিনাল পাথরের সীল-পাটা কিনা থেকে বিরত করতে পারলাম না। কেও কেও আবার ২/৩ টা করেও কিনলো যাতে তারা ফিরে গিয়ে তাদের পছন্দের অন্য ভাবীকে গিফট দিতে পারে। ভারী জিনিস বহন করতে না চাওয়ার অপরাধে আমি একাই আমার এক বছরের মেয়ে ও কাওসাকি ম্যানুয়াল ক্যামেরা নিয়েই জাফলং এর নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে শুরু করলাম। বরফগলা ঠান্ডা পানির মৃদু স্রোতস্বিনীর মধ্যে বড় বড় পাথর এবং এ পাথরের উপর বসিয়ে আমার ছোট্ট সোনামণির ছবি নেয়ার অপরিণামদর্শী,অবিবেচক ইচ্ছা আমাকে তাড়িত করলো। সুতরাং সোনামণির পায়ের জুতা মোজা খুলে পাথরের উপর বসিয়েই পিছনে গিয়ে ক্লিক এবং এটাই ছিলো আমার জীবনের বড় সবচেয়ে দৈবাৎ নির্বুদ্ধিতা। যা হউক অনেক কষ্টে ভারী সীল-পাটা বহন করে কেপিএম এর বাসায় এসে ব্যাবহারের প্রথম দিনই বালি উঠা শুরু করলো। তাইতো মেঘনাঘাটের যানজটে ভাসমান মাছ বিক্রেতাদের কাছে নদীর বড় রুই মাছ কেনার দৈবাৎ নির্বুদ্ধিতা আমাকে কোন দিন গ্রাস করতে পারিনি।

রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানায় যোগদানের পর পারসোনেল ফাইলে অন্তর্ভুক্তির অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য কেপিএম মেডিকেল সেন্টার ও হসপিটালের এক ডাক্তারের চেম্বারে বসে আছি। একজন অসুস্থ লোক অন্য দুজন লোকের ঘাড়ে ভর দিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকার চেষ্টা করতেই ডাক্তার বললেন -‘ বাইরে বাইরে ‘। আমার চেকলিস্ট তৈরির মাঝেই উনি অসুস্থ লোকটির নাম ও চাকতি নম্বর ( লেবার আইডেনটিটি) জিজ্ঞেস করে ঔষধের প্রেসক্রিপশন তৈরি করে বললেন, ‘ নিয়ে যান’। বেজায় অসুস্থ লোককে প্রায়োরিটি না দেয়াটা মেনে নেয়া যায় কিন্তু রোগীর সঙ্গে কথা না বলেই প্রেসক্রিপশন! বাস্তবতা হচ্ছে, রোগীর হাতে থাকা ফার্মেসী থেকে লিখে দেয়া কাগজ অনুযায়ী তিনি প্রেসক্রিপশন লিখেন নাই অথবা রোগী কি ধরনের ঔষধ চাইবে এটা ডাক্তারের মেমোরিতে ছিলো। সিবিএ মনোনীত ফার্মেসীতে গিয়ে অসুস্থ লোকটি এই প্রেসক্রিপশন টা নগদায়ন করবে অর্থাৎ তিনি টাকা নিবেন এবং ফার্মেসী মালিক এ ধরনের ক্রমসঞ্চিত প্রেসক্রিপশন গুলো বিল আকারে চিপ মেডিক্যাল অফিসারের সিগনেচার নিয়েই একাউন্টস থেকে টাকা উঠিয়ে নিবে। রাষ্ট্রায়ত্ত বা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠান চাকরির ক্ষেত্রে নৈতিক বিবেচনায় বিরামচিহ্ন টেনে বা নিজের যৌক্তিক বিবেচনাকে জলাঞ্জলি দিয়ে পারিপার্শ্বিক গুপ্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নীতিকে মেয়ে নেয়া ছাড়া উপায় থাকে না। সুতরাং চিকিৎসা সেবা প্রদানে সেই ডাক্তারের নৈতিক নিয়ম ও মূলনীতির বরখেলাপ নিয়ে আমার প্রাথমিক ধারনাই ছিলো বরং ক্ষণিকের নির্বুদ্ধিতা।

আমার অধীনস্থ এক কর্মচারী তার পৈতৃক সম্পত্তির কিছু অংশ বিক্রি করে এক শ্রমিক ইউনিয়ন কে ৭০ হাজার টাকা চাঁদা দিলেন পরবর্তী সিবিএ নির্বাচনের জন্য এবং সে আশাবাদী যে তার ইউনিয়ন নির্বাচনে জিতলে সে ” ট্রান্সপোর্ট খাওয়ার ” দায়িত্ব পাবে। নির্বাচনে তার ইউনিয়ন জিতলো ঠিকই কিন্তু সে অধিকতর লাভজনক ও মর্যাদাপূর্ণ ট্রান্সপোর্ট খাওয়ার দায়িত্ব না পেয়ে পেলেন ” ক্যান্টিন খাওয়ার” দায়িত্ব। হসপিটাল খাওয়া, স্টোর খাওয়া, এফ আর এম (ফরেস্ট ম্যাটেরিয়াল) খাওয়া ইত্যাদি এ সব নামেই এখানে নবনির্বাচিত শ্রমিক ইউনিয়ন প্রতিনিধি দের দায়িত্ব বন্টন করা হয়।আমার অধীনস্থ সেই কর্মচারী আমাদের বাই বাই জানাতে এসে বললো, ” ক্যান্টিনোর বাজেট হমি গেই, এহন ইসকুটির গরি মাল ঢোকেদদে, দাউদের আমলত ট্রাকদ গরি মাল আনাম ফইরতু।”

এবার আসি গল্পের শিরোনামের ‘বিচারে যুক্তি ও নৈতিকতা’ বাস্তব উদাহরণে।শিফট শেষের দিকে অফিসে বসে শিফট রিপোর্ট লেখার কাজে ব্যস্ত এমন সময় ফোরম্যান দুজন হেলপারের দাবির কোনো বিচার সুরাহা করতে না পেরে আমার অফিসে নিয়ে হাজির। ১৯৫০ সালের দিকে গড়া মিলের বেশীরভাগ ফিটিংসের আনুষাঙ্গিক অংশগুলো ছিলো কপার বা তামার তৈরী যেগুলো দিনে দিন রিপ্লেস হয়ে গেছে। এক হেলপার ভাগ্যক্রমে একটা তামার এঙ্গেল বার খুঁজে পেয়ে সে এটি মেশিনের পিছনে লুকিয়ে রাখে যাতে অন্য কেউ এটা না দেখতে পায় এবং শিফট শেষে সে এটা নিয়ে যেতে পারে। অন্য এক হেলপার তার ডাবল সৌভাগ্য ক্রমে মেশিনের পিছনে লুকিয়ে রাখা সেই তামার বারটি দেখে এবং কোন রকম রিস্ক ছাড়াই এটা বাইরে নিবে বলে গেটের দারোয়ান কে চা নাসতা খাওয়ে এসেছে। শিফট শেষের দিকে দুজনেই সেই মহামূল্যবান তামার কাছে হাজির এবং মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব। প্রথম জনের যুক্তি হচ্ছে যে সে এটা সংগ্রহ করে লুকিয়ে রেখেছে সুতরাং এটার মালিক সে। আর দ্বিতীয় জনের যুক্তি হচ্ছে সে যেহেতু পয়সা খরচ করেছে সুতরাং এটার মালিক সে। বিচারকের আসনে আমি।

আমার খুব ছোটো বেলার একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেলো। রাজশাহী টু চাঁপাইনবাবগঞ্জ হাইওয়ে সীমান্তের দুটি গ্রাম- একটি বালিয়াঘাঁটা যা রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী থানার অন্তর্ভুক্ত এবং অন্যটি দারিয়াপুর যা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার চাঁপাইনবাবগঞ্জ থানার অন্তর্ভুক্ত। হাইওয়ের সীমান্তে খোদাই করে “স্বাগতম চাঁপাইনবাবগঞ্জ উপজেলা ” এবং “স্বাগতম গোদাগাড়ী উপজেলা “সম্বলিত পিলার দুটির মাঝে ৫/৬ হাতের গাপ বা ফাঁক। সুতরাং দুই পিলারের মধ্যবর্তী এই খালি জায়গা কি দেশের মধ্যেই ” নো মানস জোন”? চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী এক বাস এই নো মানস জোনের কয়েক হাত দূরে গোদাগাড়ী জোনে থাকা অবস্থায় এক পথচারীকে ধাক্কা দিলে মৃত পথচারীর লাশ নো মানস জোনে এসে পড়েছে এবং লাশের মাথা “স্বাগতম চাঁপাইনবাবগঞ্জ উপজেলা” পিলারের কাছাকাছি। বালিয়াঘাঁটা গ্রামের দায়িত্ববান লোকেরা এই দূর্ঘটনার খবর তাদের গোদাগাড়ী থানায় দিয়েছে আবার দারিয়াপুর গ্রামের দায়িত্ববান লোকেরা এই দূর্ঘটনার খবর তাদের থানায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ দিয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থানার দূরত্ব কম বিধায় দুই সিপাহী সহ একজন দারোগা এসে লাশের দখল নিয়েছে কিন্তু বালিয়াঘাঁটা গ্রামের লোকজন তাদের থানা, গোদাগাড়ী থানার পুলিশ না আসা পর্যন্ত এ লাশ সরাতে দিচ্ছে না। কিছুক্ষণ পরেই গোদাগাড়ী থানার পুলিশ হাজির হলে বালিয়াঘাঁটা গ্রামের লোকজনের মনোবল বেড়ে গেলো এবং তারা হৈ হৈ করে লাশের দখল নিয়ে গোদাগাড়ী জোনে নিয়ে আসলো। গোদাগাড়ী থানার দারোগার যুক্তি হচ্ছে, যেহেতু বাস গোদাগাড়ী জোনে ধাক্কা দিয়েছে তাই লাশ গোদাগাড়ী থানার। অন্য দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থানার দারোগার যুক্তি হচ্ছে, যেহেতু লাশের বেশীরভাগ অংশই “স্বাগতম চাঁপাইনবাবগঞ্জ উপজেলা” পিলারের কাছাকাছি সুতরাং এ লাশের জিম্মাদার তারা। লাশের দখল নিতে তাদের দুপক্ষের যুক্তি শুনে মনুষ্যত্ব, মানবতা, জিতেন্দ্রি়তা শব্দ গুলো তখন কান্না করে বাংলা পণ্ডিতদের কাছে আবেদন করছিলো, হে পণ্ডিতগন, তোমরা আমাদেরকে অভিধানের বাইরে নিয়ে যেওনা। এর অনেক দিন পর সানশাইন পরিবহন মালিকের ছেলে বন্ধু দানিউলের কাছে জেনেছিলাম, পরিবহন মালিক সমিতি ও প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দূর্ঘটনার পর যে কোনো ঘাতক বাসের মালিক সংশ্লিষ্ট থানাকে ৩০ হাজার টাকা প্রদান করিলে দূর্ঘটনা সংশ্লিষ্ট কোন জটিলতা থাকবে না। সুতরাং চাঁপাইনবাবগঞ্জ বা রাজশাহী বাস মালিক সমিতিকে মিটিং করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ টু রাজশাহী বাস ধর্মঘট ডাকার দরকার হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *