ভিসা আবেদনকারীর সামাজিকমাধ্যমের বক্তব্যও যাচাই করবে অস্ট্রেলিয়া

অস্ট্রেলিয়ায় ভিসা প্রত্যাখ্যান বা বাতিলের ক্ষেত্রে আবেদনকারী কিংবা ভিসাধারীর চরিত্র যাচাইয়ের নিয়মে পরিবর্তন এনেছে দেশটির সরকার। নতুন নিয়মে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য, ঘৃণা ছড়ানো, উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতা এবং সহিংসতাকে সমর্থনের মতো বিষয়গুলোকে আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে। গত ৩১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হয়েছে দেশটির নতুন মিনিস্টেরিয়াল ডাইরেকশন ১২৩, সংক্ষেপে এমডি ১২৩। এটি আগের মিনিস্টেরিয়াল ডাইরেকশন ১১০-এর (এমডি ১১০) পরিবর্তে কার্যকর হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক গত ১৮ সেপ্টেম্বর নতুন নির্দেশনায় সই করেন। নতুন নির্দেশনার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কোনো ব্যক্তির অতীত ও বর্তমান আচরণের পাশাপাশি প্রকাশ্য বক্তব্যও তার চরিত্র মূল্যায়নের অংশ হতে পারে। বিশেষ করে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত পোস্ট, অন্যের বক্তব্যের প্রকাশ্য সমর্থন কিংবা ঘৃণামূলক মতাদর্শ প্রচারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

অস্ট্রেলিয়ার মাইগ্রেশন অ্যাক্টের ৫০১ ধারায় যুক্ত ঘৃণা ও উগ্রবাদ সংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বর্ণ, গায়ের রং, জাতীয়তা বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে অন্য কোনো জনগোষ্ঠীর প্রতি শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা প্রচার করলে কিংবা তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ালে তা চরিত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিবেচিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ বা দেশটিতে থাকার অনুমতি দেওয়া হলে দেশটির সমাজ কিংবা জনগোষ্ঠীর কোনো অংশ ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়তে পারে কি না, সেটিও বিবেচনা করা হবে। বক্তব্যটি অস্ট্রেলিয়ায় নাকি অন্য কোনো দেশে প্রকাশ করা হয়েছে, তা এখানে মুখ্য নয়। অর্থাৎ, দেশের বাইরে থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যও এই বিধানের আওতায় আসতে পারে। এ ছাড়া, সন্ত্রাসী সংগঠন, নিষিদ্ধ ঘৃণাভিত্তিক সংগঠন কিংবা সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদে সমর্থন জোগানো সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং হেট ক্রাইমে জড়িত থাকার বিষয়ও বিবেচনা করা হবে। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া বা দণ্ডিত হওয়া সবসময় আবশ্যক নয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া সরকারের সমালোচনা, রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ কিংবা যেকোনো বিতর্কিত বক্তব্য দিলেই কারও ভিসা প্রত্যাখ্যান বা বাতিল হবে। আইনে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা ঘৃণা ছড়ানো, জাতিগত বিদ্বেষ এবং সমাজের ক্ষতির ঝুঁকির মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকতে হবে। প্রতিটি সিদ্ধান্ত ব্যক্তির নিজস্ব পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

নতুন নির্দেশনায় পারিবারিক ও গার্হস্থ্য সহিংসতার বিষয়েও গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সহিংসতার সংজ্ঞা ও মূল্যায়নের পরিধি বিস্তৃত করা হয়েছে। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি ছবি বা ব্যক্তিগত উপাদান ব্যবহার করে হয়রানি, অনুসরণ এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার মতো বিষয়ও বিবেচনায় আসবে। বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনায় শিশুদের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়েছে এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে বলা হয়েছে।

নতুন নির্দেশনায় চরিত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আরও কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কোনো ব্যক্তির দীর্ঘদিনের বসবাস, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক যোগাযোগকে চরিত্র মূল্যায়নের পাঁচটি প্রধান বিবেচ্য বিষয়ের একটি হিসেবে দেখা হতো। নতুন নির্দেশনায় এই বিষয়টিকে প্রধান বিবেচনার তালিকা থেকে সরিয়ে অন্যান্য বিবেচনার পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে।

এখন চারটি প্রধান বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে—অস্ট্রেলীয় সমাজকে অপরাধ ও গুরুতর ক্ষতিকর আচরণ থেকে সুরক্ষা, পারিবারিক সহিংসতা, অস্ট্রেলীয় সমাজের প্রত্যাশা এবং দেশটিতে বসবাসরত অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থ। এ ছাড়া, ভিসা বাতিল বা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্তে কোনো ব্যক্তির কারণে অস্ট্রেলিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্য বা কর্মক্ষেত্রে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সেটিও আগের মতো আলাদা বিবেচ্য বিষয় হিসেবে রাখা হয়নি।

নতুন নির্দেশনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাদের জন্য, যাদের ভিসা প্রত্যাখ্যান, বাতিল কিংবা বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার বিষয়টি চরিত্রগত কারণে বিবেচনাধীন। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত ভিসাধারী এবং দেশটিতে প্রবেশের আবেদনকারী—উভয়ই রয়েছেন। তবে নতুন নীতিমালার অর্থ এই নয় যে, সব ধরনের ভিসা আবেদনের নিয়মিত যাচাইপ্রক্রিয়ায় প্রত্যেক আবেদনকারীর ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

মূলত অস্ট্রেলিয়ার মাইগ্রেশন অ্যাক্টের ৫০১ ও ৫০১সিএ ধারার অধীনে চরিত্রগত কারণে ভিসা প্রত্যাখ্যান, বাতিল এবং বাধ্যতামূলক বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কী বিষয় বিবেচনা করতে হবে, নতুন নির্দেশনায় তা নির্ধারণ করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থায় এই পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশটিতে প্রবেশ ও বসবাসের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর আচরণ, প্রকাশ্য বক্তব্য এবং সমাজের নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকিকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। অর্থাৎ, ভিসার কাগজপত্র ও অন্যান্য যোগ্যতার পাশাপাশি আবেদনকারীর চরিত্রগত বিষয়ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।