পিদিম পাঠাগারের আয়োজনে ২৮ নভেম্বর অ্যাডিলেডে ‘বাবা মানে নীরব মহাকাব্য’

কিছু মানুষ তাঁদের জীবনের গল্প কখনো লেখেন না, অথচ তাঁদের প্রতিটি দিনই হয়ে ওঠে এক একটি মহাকাব্য। বাবা তেমনই এক মানুষ—যাঁর ক্লান্ত কাঁধে ভর করে দাঁড়ায় একটি পরিবার, যাঁর অপূর্ণ স্বপ্নের ভেতর জন্ম নেয় সন্তানের স্বপ্ন, আর যাঁর নীরব আত্মত্যাগের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ভালোবাসার এক বিশাল পৃথিবী। জীবিকার তাগিদে বা জীবনের প্রয়োজনে আজ আমরা পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি না কেন, মনের গহীনে বাবার শিক্ষা, ভালোবাসা আর স্মৃতিগুলো চিরকাল অমলিন থেকে যায়। সময় বয়ে যায়, প্রজন্ম বদলায়, জীবনের ক্যানভাসে জমে ওঠে অসংখ্য স্মৃতি। কিন্তু যাঁরা নিজেদের শ্রম, মেধা, সততা ও সংগ্রামে পরিবার, সমাজ এবং নতুন প্রজন্মের জন্য রেখে গেছেন আলোকিত পথের দিশা, তাঁদের অবদান কখনো সময়ের সীমানায় বন্দি থাকে না। আমাদের জীবনে বাবার উপস্থিতি অনেকটা বটবৃক্ষের মতো। তিনি শুধু একজন অভিভাবক নন; তিনি আমাদের পরিচয়, আমাদের শেকড় আর সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা। তাঁর হাত ধরে জীবনের প্রথম পথচলা, আর তাঁর নিঃশব্দ ত্যাগের ওপর ভর করেই বাস্তব হয় আমাদের কতশত স্বপ্ন।

বাবার সেই নীরব ভালোবাসা, সংগ্রাম আর অসামান্য অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে আয়োজিত হতে যাচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠান ‘বাবা মানে নীরব মহাকাব্য’। অ্যাডিলেডের বাংলাদেশি সমাজে অবদান রাখা শ্রদ্ধেয় সিনিয়র বাবাদের জীবনসংগ্রাম, কর্মময় স্মৃতি ও অনন্য অবদানকে সম্মান জানাতে পিদিম পাঠাগার আয়োজন করতে যাচ্ছে এই আবেগঘন সংবর্ধনা ও সম্মাননা অনুষ্ঠান। এ আয়োজন কেবল আনুষ্ঠানিক সম্মাননা নয়; এটি শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া, ইতিহাসের কাছে ঋণ স্বীকার করা, আর পরবর্তী প্রজন্মের হাতে অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধের মশাল তুলে দেওয়ার এক আন্তরিক প্রয়াস।

একজন বাবা হয়তো সচরাচর মুখে ভালোবাসার কথা বলেন না। কিন্তু তাঁর জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে লেখা থাকে সন্তানের জন্য অজস্র ত্যাগের গল্প। সেই নীরব মহাকাব্যকে শ্রদ্ধা জানাতেই আয়োজকদের এই বিশেষ উদ্যোগ। এটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর পারিবারিক বন্ধনকে নতুন করে অনুভূতির আঙিনায় মিলিয়ে নেওয়ার এক সুন্দর উপলক্ষ। আগামী ২৮ নভেম্বর, শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় অ্যাডিলেডের ব্রাইটন পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে (৩০৫ ব্রাইটন রোড) এ অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হবে। আয়োজনে থাকছে বাবাদের বিশেষ সংবর্ধনা ও সম্মাননা। সেই সঙ্গে থাকবে পুরোনো দিনের স্মৃতিজাগানিয়া বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ‘বাবাদের সোনালি দিনের গান’।

আমাদের বহুসাংস্কৃতিক ও অভিবাসী কমিউনিটির কাছে বাবা দিবসের এই আবেগ যেন আরও অনেক বেশি গভীর। প্রথম প্রজন্মের প্রবাসী হিসেবে আমাদের অনেকেই আজ জন্মভূমি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে। এখানে নতুন জীবন গড়ে উঠছে, নতুন প্রজন্মে বড় হচ্ছে আমাদের সন্তানেরা; কিন্তু শৈশব আর কৈশোরের স্মৃতিঘেরা দূর দেশের পুরোনো ভিটেতে হয়তো রয়ে গেছেন সেই বৃদ্ধ বাবা। দেশ থেকে দূরে এসে কেউ প্রতিদিন বাবাকে অভাব অনুভব করেন, আবার কেউ সন্তান লালন-পালন করতে গিয়ে নিজের বাবার ত্যাগের কথা নতুন করে উপলব্ধি করেন। সময়ের আবর্তে বাবা-সন্তানের সম্পর্কের ভাষা হয়তো বদলায়, কিন্তু অনুভূতির সেই আবেগটি থেকে যায় একই রকম।

‘বাবা মানে নীরব মহাকাব্য’, সংগঠকদের রাখা এই নামের ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে সব প্রবাসীর মনের অনুভূতি। একটি পরিবারকে ছায়া দিয়ে আগলে রাখতে বাবার বছরের পর বছর ধরে করা পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ ও ত্যাগের গল্পগুলোকে সম্মান জানানোই এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।

সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ‘বাবাদের সোনালি দিনের গান’-এ ভেসে উঠবে স্মৃতির নানা পথ। পাশাপাশি, অনুষ্ঠানের সবচেয়ে মানবিক দিকটি হলো জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা বাবাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও সংবর্ধনা প্রদান। হয়তো সামনাসামনি দাঁড়িয়ে কখনো বাবাকে বলা হয়ে ওঠেনি, “বাবা, তোমাকে খুব ভালোবাসি।” কিংবা মনের গভীরে জমা হয়ে আছে এমন বহু না-বলা গল্প, যা হয়তো কখনো প্রকাশ পায়নি।  এই আয়োজন সেই না-বলা অনুভূতিগুলো প্রকাশের এক আবেগঘন সুযোগ করে দেবে। গান, স্মৃতি ও সম্মানের মেলবন্ধনে অনুষ্ঠানটি হয়ে উঠবে এক অনন্য প্রবাস-মিলনমেলা। বাবাদের প্রতি ভালবাসার এই আলো ছড়িয়ে যাক সবখানে আর সেই আলোতেই আলোকিত হোক প্রতিটি পরিবার।