কুইন্সল্যান্ডে টানা বৃষ্টি ও বন্যার পর এবার অস্ট্রেলিয়ার অর্ধেকেরও বেশি এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে বৃষ্টি ও বজ্রঝড়। রোববার কয়েকটি রাজ্যে তীব্র ঝড়, ক্ষতিকর দমকা হাওয়া, বড় শিলাবৃষ্টি এবং আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় তীব্র আবহাওয়ার মৌসুম শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপকভাবে বজ্রঝড় দেখা দিয়েছে। চলতি সপ্তাহে দক্ষিণ-পূর্ব কুইন্সল্যান্ডে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি ও ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর সপ্তাহান্তে দেশটির অর্ধেকেরও বেশি এলাকায় বৃষ্টি ও ঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার পূর্বাঞ্চলে দুটি পৃথক আবহাওয়াব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। একাধিক রাজ্যে তীব্র বজ্রঝড়ের পাশাপাশি ঝড়ের সরু শক্তিশালী রেখা এবং ঘূর্ণায়মান বজ্রঝড়—যা ‘সুপারসেল’ নামে পরিচিত—সৃষ্টির আশঙ্কাও রয়েছে।
আবহাওয়াবিদ টম সন্ডার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিনে কোন অঞ্চলে ভারী বৃষ্টি ও তীব্র আবহাওয়া দেখা দিতে পারে, তা দিনভিত্তিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।
শনিবার: দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া থেকে তাসমানিয়া পর্যন্ত বৃষ্টির পূর্বাভাস
শনিবার মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব কুইন্সল্যান্ডে আবারও বৃষ্টি এবং সম্ভাব্য তীব্র বজ্রঝড় হতে পারে। পুরো সপ্তাহের মতো এদিনও প্রধান উদ্বেগ ভারী বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা। ক্ষতিকর দমকা হাওয়া ও শিলাবৃষ্টির ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম হলেও তা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
নিউ সাউথ ওয়েলসের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও বৃষ্টি ও বজ্রঝড় অব্যাহত থাকতে পারে। রাজ্যটির উপকূল ও পার্বত্য এলাকায় দক্ষিণ দিকে বিক্ষিপ্ত ঝড় ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় আবহাওয়ার বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া থেকে একটি শক্তিশালী শীতল বায়ুপ্রবাহ এগিয়ে আসছে। এটি ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে আসা আর্দ্র বাতাসের সঙ্গে মিলিত হয়ে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া, ভিক্টোরিয়া ও তাসমানিয়া পর্যন্ত বৃষ্টির বিস্তৃত বলয় তৈরি করতে পারে।
বৃষ্টির অঞ্চলটির সামনের দিকে, যেখানে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি, সেখানে বজ্রঝড় সৃষ্টি হতে পারে। বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে শক্তিশালী জেট স্ট্রিমের প্রভাবে এসব ঝড় তীব্র হয়ে ভারী বৃষ্টি, ক্ষতিকর বাতাস এবং কোথাও কোথাও শিলাবৃষ্টি ঘটাতে পারে।
রোববার: ঝড়ের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে
রোববার আবহাওয়ার পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। শীতল বায়ুপ্রবাহ পূর্ব উপকূলের উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাসের সঙ্গে মিলিত হলে মধ্য ও পূর্ব ভিক্টোরিয়া এবং নিউ সাউথ ওয়েলসের বিস্তীর্ণ এলাকায় তীব্র বজ্রঝড়ের আশঙ্কা রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান বিপদের কথা বলা হয়েছে—আকস্মিক বন্যা, ক্ষতিকর দমকা হাওয়া এবং বড় আকারের শিলাবৃষ্টি।
বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে শক্তিশালী বাতাস ও জেট স্ট্রিমের উপস্থিতি ঝড়কে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। এর ফলে দুটি বিশেষ ধরনের ঝড় দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রথমটি হলো মাল্টি-সেল বজ্রঝড়। এতে একাধিক বজ্রঝড়ের কোষ একত্র হয়ে একটি দীর্ঘ ঝড়ের রেখা তৈরি করতে পারে। এ ধরনের ঝড় দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় থাকতে পারে এবং ক্রমে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। ঝড়ের এমন দীর্ঘ ও শক্তিশালী রেখাকে ‘স্কোয়াল লাইন’ বলা হয়।
দ্বিতীয়টি হলো সুপারসেল বজ্রঝড়। এটি বজ্রঝড়ের সবচেয়ে তীব্র ধরনগুলোর একটি। এ ধরনের ঝড়ে ঘূর্ণায়মান ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ থাকে, যা ঝড়কে দীর্ঘ সময় শক্তিশালী থাকতে সাহায্য করে।
সুপারসেল থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী বাতাস, বিশাল আকারের শিলাবৃষ্টি এবং আকস্মিক বন্যা হতে পারে।
রোববার এ ধরনের ঝড় তৈরি হলে তা নিউ সাউথ ওয়েলসের মধ্যাঞ্চল, অভ্যন্তরীণ দক্ষিণাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্ব ভিক্টোরিয়ায় হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
অন্যদিকে, পশ্চিম কুইন্সল্যান্ড ও দক্ষিণ নর্দার্ন টেরিটরিতে দমকা হাওয়াসহ তীব্র বজ্রঝড় হতে পারে।
প্রধান শহরগুলোর পূর্বাভাস
- মেলবোর্ন: ভোরের দিকে বজ্রঝড়ের সম্ভাবনা বেশি।
- ক্যানবেরা: বিকেলের দিকে বজ্রঝড় হতে পারে।
- সিডনি: বিকেলের শেষ ভাগ থেকে সন্ধ্যায় ঝড়ের আশঙ্কা রয়েছে।
- ব্রিসবেন: বৃষ্টি ও বজ্রঝড় অব্যাহত থাকতে পারে।
- অ্যাডিলেড: রোববার বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও নতুন করে বজ্রঝড়ের আশঙ্কা নেই।
- হোবার্ট: বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে, তবে নতুন করে বজ্রঝড়ের আশঙ্কা নেই।
সোমবারের মধ্যে শীতল বায়ুপ্রবাহের প্রভাবে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া, ভিক্টোরিয়া ও তাসমানিয়ার আবহাওয়া তুলনামূলক স্থিতিশীল হয়ে আসতে পারে। তবে নিউ সাউথ ওয়েলস ও কুইন্সল্যান্ডে ঝড়বৃষ্টি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
বায়ুমণ্ডলে অস্থিতিশীলতা এবং ওপরের স্তরে শক্তিশালী বাতাসের কারণে এসব অঞ্চলে তীব্র বজ্রঝড় তৈরি হতে পারে। কোথাও কোথাও সুপারসেল ঝড়ও দেখা দিতে পারে।
সোমবার সবচেয়ে তীব্র ঝড়গুলো অভ্যন্তরীণ কুইন্সল্যান্ড ও নিউ সাউথ ওয়েলসের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সৃষ্টি হতে পারে। পরে সেগুলো ব্রিসবেন ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মঙ্গলবার থেকে ঝড়ের প্রভাব মূলত অস্ট্রেলিয়ার ক্রান্তীয় উত্তরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ হয়ে আসতে পারে। তবে সপ্তাহের শেষ ভাগে মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে আবারও বজ্রঝড়ের একটি নতুন পর্ব শুরু হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে।
আবহাওয়ার এই পরিস্থিতির কারণে আগামী সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলে অন্তত মাঝারি পরিমাণ বৃষ্টিপাত হতে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব কুইন্সল্যান্ড ও নিউ সাউথ ওয়েলসের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নতুন করে ৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কুইন্সল্যান্ডের সীমান্তবর্তী নিউ সাউথ ওয়েলসের কফস হারবারে শুক্রবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ৩৩৯ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। শহরটিতে গত ১৬ বছরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল অক্টোবর।
মোরির মতো কিছু এলাকায় চলতি অক্টোবরে ১২০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়েছে। সেখানে এটি গত চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল মাস।
অবশ্য সব অঞ্চলে বৃষ্টির প্রভাব এক রকম নয়। কোথাও কোথাও বন্যা দেখা দিলেও দীর্ঘদিনের খরাপ্রবণ পরিস্থিতির পর অনেক এলাকায় বৃষ্টিকে স্বস্তিদায়ক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় ঝোপঝাড় ও বনাঞ্চলের দাবানলের মৌসুম যখন এগিয়ে আসছে, তখন বৃষ্টির গুরুত্ব আরও বেশি।
সাধারণত এল নিনো পরিস্থিতির সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার শুষ্ক আবহাওয়া ও খরার সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু চলতি বছরের আবহাওয়ায় সেই পরিচিত চিত্র দেখা যাচ্ছে না। শক্তিশালী এল নিনো থাকা সত্ত্বেও দেশের পূর্বাঞ্চলে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হচ্ছে।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে।
প্রথমত, তাসমান সাগরে একটি শক্তিশালী উচ্চচাপ বলয় প্রায় এক সপ্তাহ ধরে একই জায়গায় অবস্থান করছে। বসন্তকালে সাধারণত জেট স্ট্রিমের প্রভাবে উচ্চচাপ ও নিম্নচাপের বলয় দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে। কিন্তু এবার সেই স্বাভাবিক গতিশীলতা ব্যাহত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, উপক্রান্তীয় ও মেরু অঞ্চলের দুটি জেট স্ট্রিম অস্ট্রেলিয়ার আশপাশে আলাদা অবস্থানে থাকায় উচ্চচাপ বলয়টি দীর্ঘ সময় ধরে একই জায়গায় স্থির থাকতে পেরেছে।
দক্ষিণ গোলার্ধে উচ্চচাপ বলয়ের চারপাশে বাতাস ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে প্রবাহিত হয়। ফলে তাসমান সাগরে উচ্চচাপ বলয়টির অবস্থান অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলে তাসমান ও কোরাল সাগর থেকে আর্দ্র বাতাস প্রবাহিত হতে সহায়তা করছে।
এই আর্দ্র বাতাসই পূর্বাঞ্চলের বৃষ্টি ও বজ্রঝড় অব্যাহত রাখতে ভূমিকা রাখছে।
সপ্তাহান্তে ভারী বৃষ্টি ও তীব্র ঝড়ের আশঙ্কা থাকায় সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের স্থানীয় আবহাওয়ার সতর্কতা অনুসরণ করা জরুরি। বিশেষ করে আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকায় নিচু রাস্তা, জলমগ্ন পথ এবং দ্রুত পানি বাড়তে পারে এমন স্থান এড়িয়ে চলা উচিত।
বজ্রঝড়ের সময় ক্ষতিকর দমকা হাওয়া ও শিলাবৃষ্টির আশঙ্কাও মাথায় রাখতে হবে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।