নাজমীন মর্তুজা: “আরে মিয়া, রাখেন তো আপনার নীতিকথা, নীতিকথার ভাত আছে নাকি?”
আমরা কমবেশি সকলেই জানি, এই নীতিকথার কোনো খাওয়া নেই আমাদের মতো গরিব দেশের। আসলে এই “নীতিকথা”গুলো কী? আমরা অনেকেই জানি, আবার অনেকেই জানি না।
নীতিকথা: নীতিকথা বা ফেবল/প্যারাবল লোকসাহিত্যের অন্তর্গত হলেও এর উৎপত্তি তুলনায় অনেক উন্নত সমাজে। আমরা জানি যে প্রাচীন সমাজেও কতগুলো সুনির্দিষ্ট নীতিবোধ থাকে, যা লঙ্ঘন করা অমার্জনীয় অপরাধ বলে পরিগণ্য। তবে আজকাল উন্নততর সমাজে অনেক কিছুই সামাজিক বিধানের জটিলতাকে আশ্রয় করে নীতিবোধের অনুশাসন এড়িয়ে যাওয়া যায়। আমরা চলতে ফিরতে কত কিছুই লক্ষ্য করি বাসে উঠলে নীতিকথা লিখে রেখেছে বাসের গায়ে, যেমন “নবীজির শিক্ষা করো না ভিক্ষা”; চিড়িয়াখানায় গেলে লেখা দেখি, “জীবে দয়া করে যেজন, সেজন সেবিছে ঈশ্বর”। এক অর্থে দেখতে গেলে পশুপাখি সম্পর্কীয় কথা, রূপকথা, ব্রতকথা সবকিছুর মধ্যেই প্রবহমান থাকে একটি করে প্রচ্ছন্ন নীতি উপদেশ।
আমরা চলতে ফিরতে কত কিছুই লক্ষ্য করি বাসে উঠলে নীতিকথা লিখে রেখেছে বাসের গায়ে, যেমন “নবীজির শিক্ষা করো না ভিক্ষা”; চিড়িয়াখানায় গেলে লেখা দেখি, “জীবে দয়া করে যেজন, সেজন সেবিছে ঈশ্বর”। এক অর্থে দেখতে গেলে পশুপাখি সম্পর্কীয় কথা, রূপকথা, ব্রতকথা সবকিছুর মধ্যেই প্রবহমান থাকে একটি করে প্রচ্ছন্ন নীতি উপদেশ।
আর এই নীতিকথাগুলো সরাসরি কোনো পর্দার আড়াল নেই। সোজাসুজি নীতি উপদেশটি উপস্থিত করা হয়। নীতিকথার মধ্যে খুব বিখ্যাত হচ্ছে ঈশপের ফেবলস, হিতোপদেশ, পঞ্চতন্ত্র, জাতক এবং বাইবেল; বাইবেলের কিছু কিছু গল্প (প্যারাবল)। ফেবল হচ্ছে সেগুলো, যেগুলো পশুপাখির রূপকে মানুষের করণীয়-অকরণীয় বর্ণিত হয়। আর প্যারাবলগুলো সচরাচর পশুপাখি সম্পর্কবিহীন এবং এগুলোর মধ্যে সূক্ষ্ম ধর্মসুলভতার স্পর্শ থাকে। জাতক শ্রেণির গল্পগুলো সে অর্থে অনেকাংশে প্যারাবলের সমধর্মী।
আমার তো মনে হয় প্রাচীন গ্রীসের ঈশপের নাম শোনেনি এমন লোকসংখ্যা খুব কম। তাঁর নীতিকথা পড়ুক আর না পড়ুক, নাম শুনে থাকবেন। তাঁর নীতিকথাগুলো প্রচলিত হয়েছিল আঠাশ শতাব্দী আগে। আমার জানা মতে লোককথার তাত্ত্বিকগণ থিয়োডোর বেনফে কাস্ক্যাঁ প্রমাণ করেছেন যে পঞ্চতন্ত্রের কাহিনীগুলো ঈশপের ফেবলসের চেয়ে বেশি প্রাচীন। যদিও অনেক ইতিহাস পড়ে জেনেছি, পঞ্চতন্ত্রের করটক-দমনকের গল্প আরব বণিকদের মাধ্যমে পশ্চিমে যাত্রা করে। খ্রিস্টপূর্ব আমলেই পহলবি ভাষায় ‘কলিলা ওয়া দিমনা’ নামে ঐ গল্পের রূপান্তরিত পাঠ দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। গল্পটা এমন ছিল -এক জঙ্গলে সিংহ ছিল রাজা। তার দরবারে দুই শেয়াল কলিলা ও দিমনা বাস করত। কলিলা ছিল শান্ত ও বিচক্ষণ, আর দিমনা ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও চতুর।
একদিন সিংহের সঙ্গে এক বলদের বন্ধুত্ব হলো। বলদটি শক্তিশালী হলেও শান্ত স্বভাবের ছিল। সিংহ তার সাহচর্যে আনন্দ পেতে লাগল। এই বন্ধুত্ব দেখে দিমনার মনে হিংসা জন্মাল। সে ভাবল, বলদ থাকলে সিংহের কাছে তার গুরুত্ব কমে যাবে। দিমনা ষড়যন্ত্র শুরু করল। সে প্রথমে সিংহের কানে কানে বলল, বলদ নাকি গোপনে রাজত্ব দখলের পরিকল্পনা করছে। আবার বলদের কাছেও গিয়ে বলল, সিংহ নাকি তাকে হত্যা করতে চায়। ধীরে ধীরে সন্দেহের আগুন জ্বলে উঠল দুজনের মনে। একদিন ভয়ে ও রাগে উন্মত্ত হয়ে সিংহ বলদের আক্রমণ করল এবং তাকে হত্যা করল। পরে সত্য বুঝতে পেরে সিংহ গভীর অনুতাপে ভুগতে লাগল। দিমনার কূটচাল তখন প্রকাশ পেল। নীতি: কুচক্রী ও কুপরামর্শদাতার কথা বিশ্বাস করলে বন্ধুত্ব নষ্ট হয় এবং অনুতাপ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
এভাবেই ধীরে ধীরে গ্রীস দেশে আমাদের ভারতীয় পঞ্চতন্ত্রের কাহিনী পরিভ্রমণ করতে গিয়ে স্থিত হয় ঈশপের নামে।
এখানে মেয়ের স্কুলে গিয়ে একদিন এক অভিভাবকের হাতে দেখলাম ঈশপের ফেবলস বই। একটু আগ্রহ হলো কথা বলার। জিজ্ঞেস করলাম, পড়া শেষ? সে খুব সহাস্যে উত্তর করল, “হুম, সেই কবেই পড়া শেষ, তবুও বারবার পড়ি। এখন পড়ছি ছেলের জন্য, ওকে পড়ে শোনাই।” আমি খুব মুগ্ধতা প্রকাশ করলাম। দূর থেকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “ও তোমার ছেলে?” সে বলল, “জ্বি “ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, কেবল স্কুলে পা দিয়েছে, স্যান্ডেল ঠিক করে পড়তে শিখেনি; এই বয়সে নীতিকথার বীজমন্ত্র তার মাথায় পোঁতা হচ্ছে। সে আদর্শবান নীতিবোধে পুষ্ট হবে না তো কে হবে?
তাকে আমার পরিচয় দিয়ে বললাম, আমি একজন লোকগবেষক। সে অবাক হয়ে হাত বাড়িয়ে দিল। বললাম, তুমি কি জাতক-পঞ্চতন্ত্রের নাম শুনেছ? সে তাকিয়েই থাকল আমার দিকে। বুঝলাম শোনেনি । নীতিকথার মধ্যে সবচেয়ে সমৃদ্ধ জাতক। তার কারণ হলো, জাতকের গল্পগুলোর মধ্যে “কথাবত্থু” এবং “সমাধান”দুই ভাগে বিভক্ত। কথাবত্থুর মধ্যে রূপকথা আকারে থাকে, আর সমাধানে রূপক বিমুক্ত। তাই সহজে মৌলিক সত্যটি মানুষের অন্তরে প্রবেশ করে।
আর পঞ্চতন্ত্র, যার মূল উদ্দেশ্যই ছিল লোকশিক্ষা। তাই এর ব্যাপ্তির গণ্ডিটা ছিল অনেক বড়। পৃথিবীর লোককথার সর্বশ্রেষ্ঠ সংকলন হলো পঞ্চতন্ত্র। খ্রিস্টপূর্ব ২০০ অব্দ থেকে এই পঞ্চতন্ত্রগুলো সংগৃহীত হয়েছিল। এগুলো পাঁচটি তন্ত্রে বিভক্ত। ৫০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে জানা মতে। একসময় বলা হতো পঞ্চতন্ত্র হলো বিশ্বের নীতিকথার অন্যতম উৎস পঞ্চতন্ত্রের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো – পঞ্চতন্ত্র প্রাচীন ভারতীয় নীতিকথার এক অনন্য সংকলন। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের দিকে পণ্ডিত বিষ্ণুশর্মা রাজপুত্রদের নীতি, বুদ্ধি, কূটনীতি ও জীবনজ্ঞান শেখানোর জন্য এই গল্পগুলো রচনা করেন। “পঞ্চ” মানে পাঁচ, “তন্ত্র” মানে বিভাগ , বইটি পাঁচটি ভাগে বিভক্ত। প্রতিটি গল্পে পশুপাখির চরিত্রের মাধ্যমে মানুষের আচরণ, বুদ্ধি, বন্ধুত্ব, ষড়যন্ত্র, দূরদর্শিতা ও জীবনের বাস্তব শিক্ষা তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বের বহু ভাষায় অনূদিত হয়ে এটি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী নীতিকথার গ্রন্থ হয়ে উঠেছে।
পঞ্চতন্ত্রের কয়েকটি বিখ্যাত ফেবল আমরা এসব ছোটবেলা থেকেই নানা ভাবে শুনে এসেছি।
১) সিংহ ও খরগোশ
এক জঙ্গলে এক ভয়ংকর সিংহ প্রতিদিন প্রাণীদের হত্যা করত। প্রাণীরা ঠিক করল, প্রতিদিন নিজেরাই একজনকে খাবার হিসেবে পাঠাবে। একদিন খরগোশের পালা এলো। সে ইচ্ছা করে দেরিতে পৌঁছাল। সিংহ রেগে গেলে খরগোশ বলল আরেক সিংহ তাকে আটকে রেখেছিল। খরগোশ সিংহকে একটি কুয়োর কাছে নিয়ে গিয়ে পানিতে তার প্রতিবিম্ব দেখাল। সিংহ ভাবল অন্য সিংহ, ঝাঁপ দিল কুয়োয় আর ডুবে মারা গেল।
নীতি: বুদ্ধি শক্তির চেয়ে বড়।
৩) কচ্ছপ ও দুই রাজহাঁস
এক কচ্ছপের বন্ধু ছিল দুই রাজহাঁস। খরা পড়ায় তারা অন্য জায়গায় যেতে চাইল। কচ্ছপকে নিতে তারা একটি লাঠি ধরতে বলল মুখ দিয়ে ধরে থাকবে, কিন্তু কথা বলা যাবে না। উড়তে উড়তে লোকজন হাসতে লাগল। কচ্ছপ রাগে কথা বলতে গিয়ে মুখ খুলল আর পড়ে গিয়ে মারা গেল।
নীতি: অযথা কথা বিপদ ডেকে আনে।
৩) বানর ও কুমির
এক কুমির বানরের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে প্রতিদিন ফল খেত। কুমিরের স্ত্রী বানরের হৃদপিণ্ড খেতে চাইলে কুমির বানরকে বাড়িতে আমন্ত্রণ জানায়। নদীর মাঝখানে গিয়ে সত্যি বললে বানর বলে হৃদপিণ্ড তো গাছে রেখে এসেছি! কুমির তাকে ফিরিয়ে আনলে বানর গাছে উঠে পালায়।
নীতি: বিপদে উপস্থিত বুদ্ধিই রক্ষা করে।
৪) নীল শেয়াল
এক শেয়াল রঙের পাত্রে পড়ে নীল হয়ে যায়। জঙ্গলে সবাই তাকে অচেনা প্রাণী ভেবে রাজা বানায়। একদিন অন্য শেয়ালের ডাক শুনে সে নিজেও ডাকতে শুরু করে সবাই বুঝে ফেলে আসল পরিচয় এবং তাকে তাড়িয়ে দেয়।
নীতি: ভান বেশিদিন টেকে না।
৫) বোকা ব্রাহ্মণ ও ছাগল
এক ব্রাহ্মণ কাঁধে ছাগল নিয়ে যাচ্ছিল। তিন চোর আলাদা আলাদাভাবে তাকে বলল কাঁধে কুকুর কেন? বারবার শুনে ব্রাহ্মণ বিশ্বাস করে ছাগল ফেলে দিল। চোরেরা ছাগল নিয়ে পালাল।
নীতি: বারবার মিথ্যা শুনলে সত্য মনে হয়।
আমরা এখন নীতিকথা পড়িও না, নীতিকথার ধারও ধারি না। ফেসবুকে একদিন আঙুল উঁচিয়ে রাখা ছবি সহ একটি নীতিকথার পোস্ট পড়তে গেলাম সেখানে লেখা, “ভাই, কিছু মানুষের জন্য যদি কলিজা কেটে পিরিচে এনে দেন, তবুও বলবে কম হয়েছে।” অনেকক্ষণ হাসলাম এমন নীতিকথার চিরকুট দেখে। নীতিকথার ভাত নেই এই কথা সত্য নয়। কথিত আছে, কৃতদাস ঈশপ সম্ভ্রান্ত পুরমহিলাদের গল্প শুনিয়ে জীবিকা অর্জন করতেন। তার মানে নীতিকথার মূল লক্ষ্য হিসেবে জনশিক্ষাকেই দেখি। আমাদের রাজবাড়ির গৃহশিক্ষক বিষ্ণুশর্মার গল্প (পিলপের নীতিকথা) সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। আমাদের রাজবাড়ির গৃহশিক্ষক বিষ্ণুশর্মার গল্প, যা পরে “পিলপের নীতিকথা” নামে পরিচিত হয়, সেই ধারার সঙ্গে একই সূত্রে গাঁথা। কথিত আছে, এক রাজা তাঁর অযোগ্য ও অমনোযোগী রাজপুত্রদের জ্ঞানী ও বিচক্ষণ করে তুলতে পণ্ডিত বিষ্ণুশর্মাকে দায়িত্ব দেন। তিনি সরাসরি কঠিন শাস্ত্র না পড়িয়ে পশুপাখির রূপক গল্পের মাধ্যমে তাদের রাজনীতি, কূটনীতি, দূরদর্শিতা ও জীবনজ্ঞান শেখাতে শুরু করেন। সেই শিক্ষামূলক গল্পগুলোর সংকলনই পরে পঞ্চতন্ত্র নামে খ্যাত হয় এবং বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। “পিলপের নীতিকথা” নামেও এর বহু রূপান্তর প্রচলিত ছিল, যা মূলত জনশিক্ষা ও নৈতিক বোধ জাগ্রত করার উদ্দেশ্যেই রচিত।
বাইবেলের সামারিটানের, বীজবপকের নীতিকথার বই উন্নত বিশ্বের বাচ্চাদের জন্য স্কুল লাইব্রেরিগুলোতে সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে। আমি ভেবে পাই না এমন উন্নত দেশ গুলোতে কি দরকার এসব পশুচারণজীবী, কৃষিজীবী মধ্যবর্তী স্তরের মানুষের কাহিনী পড়ার! কিন্তু এটা সত্যি যে প্যারাবলগুলো আদিতে ধর্মানুষঙ্গবিহীন থাকলেও ঘটনার অনিবার্য পরিণতিতে তারা ধর্মাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে। সামারিটানের বাইবেলের নীতিকথাগুলোর মধ্যে বীজবপকের গল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এগুলো মানুষের নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও বিশ্বাসের শিক্ষা দেয়। একটা সামারিটানের নীতিকথা তুলে ধরলাম। “একজন মানুষ ডাকাতের হাতে আহত হয়ে রাস্তায় পড়ে ছিল। সমাজের সম্মানিত কয়েকজন তাকে উপেক্ষা করে চলে গেলেও এক সামারিটান যাকে তখন তুচ্ছ জাতি বলে ধরা হতো থেমে তাকে সাহায্য করল, সেবা করল এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থা করল।
এই গল্প শেখায়,
নীতিঃ প্রকৃত মানবতা জাতি, ধর্ম বা পরিচয়ের সীমা মানে না বিপদে পাশে দাঁড়ানোই সত্যিকারের নৈতিকতা।”
“বীজবপকের নীতিকথা
একজন বীজ বপনকারী মাঠে বীজ ছড়ালেন। কিছু বীজ পথের ওপর পড়ে নষ্ট হলো, কিছু পাথুরে মাটিতে পড়ে শুকিয়ে গেল, কিছু কাঁটার মধ্যে পড়ে দমবন্ধ হলো, আর কিছু উর্বর মাটিতে পড়ে ভালো ফসল দিল।
এই গল্প বোঝায়,
নীতিঃ মানুষের হৃদয় ও মন ভিন্ন ভিন্ন মাটির মতো শিক্ষা ও সত্য তখনই ফল দেয়, যখন গ্রহণ করার উপযুক্ত মানসিকতা থাকে।
এই নীতিকথাগুলো বাইবেল-এর মাধ্যমে মানুষের সহমর্মিতা, বিশ্বাস ও মানবিক দায়িত্ববোধকে সহজ গল্পের ভেতর দিয়ে তুলে ধরে।
আমাদের দেশে এই সব নীতিকথার রূপক গল্পগুলোর নাম হয়তো ভুলতেই বসেছি আমরা। পরবর্তী প্রজন্মকে কী গল্প শোনাব? মটু পাতলু, ডোরেমন নীতিকথার গল্প বলা মানে ক্ষেত হয়ে যাবে! কিন্তু একসময় আমরা জানি, নীতিকথাগুলোর প্রচার করার দরকার হয়ে পড়েছিল সমাজবিধান গড়ে ওঠার সময় থেকেই। সামাজিক নীতিগুলোর প্রচার করা দরকার হয়েছিল। তাই তো ফেবলস, প্যারাবল, কথাবত্থু, সমাধান, হিতোপদেশ যে ভাবেই কথাগুলো আসুক না কেন, সকল কিছুর আদি উৎস প্রাথমিক সমাজবিধানের সংহতিবিধানের মধ্যে অবলীন।
মানুষ যত আদিম ছিল, ততই তার মধ্যে সামাজিক নীতিবোধগুলো দৃঢ়তর সংস্কাররূপে শিকড় গেড়ে রাখত। তাই উন্নত সমাজে নীতিকথা জাতীয় কাহিনীর প্রয়োজন খুব কম কেননা সেখানে সামাজিক নীতিবোধজাত অনুশাসনগুলো মানুষের মনে সহজাত সংস্কাররূপেই আজন্মকাল সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে। নীতিবোধ যেখানে প্রায় সহজাত বলেই নীতিকথার মাধ্যমে সেগুলো আবার শেখানোর প্রয়োজন ঘটেনি। নীতিকথা লোককথার অন্তর্গত হয়েও সামাজিকভাবে অনেক বেশি পরিমার্জিত।
মানুষ যত আদিম ছিল, ততই তার মধ্যে সামাজিক নীতিবোধগুলো দৃঢ়তর সংস্কাররূপে শিকড় গেড়ে রাখত। তাই উন্নত সমাজে নীতিকথা জাতীয় কাহিনীর প্রয়োজন খুব কম কেননা সেখানে সামাজিক নীতিবোধজাত অনুশাসনগুলো মানুষের মনে সহজাত সংস্কাররূপেই আজন্মকাল সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে। নীতিবোধ যেখানে প্রায় সহজাত বলেই নীতিকথার মাধ্যমে সেগুলো আবার শেখানোর প্রয়োজন ঘটেনি। নীতিকথা লোককথার অন্তর্গত হয়েও সামাজিকভাবে অনেক বেশি পরিমার্জিত।
আমি আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি থেকে বলতে পারি বাংলার রূপকথা পড়ে শিখেছি, বিধিনিষেধ ভঙ্গ করা মানে শাস্তি পাওয়া সেটা আইনত হোক বা প্রকৃতির কাছেই হোক। বিপর্যয়, বিপদ, আপদকে ধৈর্যের সঙ্গে মানিয়ে নিলে সুখশান্তি লাভ হয়। তবে এটাও চরম সত্য যে বলয় ভেদে নীতিকথার মানদণ্ডও বদলে যায় কখনো কখনো। কেন নীতিকথার দরকার সময় অনুযায়ী আমরা যতই প্রো-ম্যাক্স লাইফে লিড করি না কেন, মানুষ হিসেবে আমাদের ভেতরের প্রশ্নগুলো কিন্তু একই থাকে কী ঠিক, কী ভুল, কীভাবে বাঁচা উচিত। প্রযুক্তি বদলায়, জীবনযাত্রা বদলায়, কিন্তু নৈতিকতার প্রয়োজন বদলায় না।
নীতিকথা আসলে মানুষের সহজ ভাষায় জীবন বোঝার স্কুল। বড় বড় তত্ত্ব, দর্শন বা ধর্মগ্রন্থ যেখানে কঠিন হয়ে যায়, সেখানে ছোট গল্প নীরবে হৃদয়ে ঢুকে যায়। শিশুর কাছে যেমন গল্প, বড়দের কাছেও তেমনই আয়না।
কারণ সত্যিটা হলো মানুষ যুক্তি দিয়ে শেখে, কিন্তু গল্প দিয়ে বদলায়। তাই সময় যত আধুনিকই হোক, নীতিকথার প্রয়োজন কখনো পুরোনো হয় না। জীবন যত আধুনিকই হোক, মানুষের ভেতরের সমস্যা, নৈতিকতা, সম্পর্ক, ভয়, লোভ এগুলো কিন্তু আপডেট হয় না। তাই পুরোনো গল্প, নীতিকথা, জীবনবোধ এখনো দরকার।
