মতিউর রহমান: ২০০৭ সালের কথা, আমি মিরপুর-২ এর একটি আধুনিক ভবনে ৫ম তলার ভাড়াটিয়া। নিচের ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে বৃদ্ধ মালিক এবং ক্ষমতাবান কেয়ারটেকারের বসবাস। এ আবাসিক এলাকায় তখন সপ্তাহে একদিন বাসার গার্বেজ নেওয়ার নিয়ম ছিল। আগের বাসায় আমরা ভাড়াটিয়ারা নির্ধারিত দিনে ড্রাইভওয়ের এক ধারে ময়লার বিন রেখে দিতাম কিন্তু এখানে তা করা যাবে না। ময়লা সংগ্রহকারী নির্ধারিত দিনের কোনো এক সময় ভাড়াটিয়ার দরজা নক করে ময়লা নিয়ে যাবে। ময়লা সংগ্রহের সময় আমরা কেউ-ও বাসায় না থাকতে পারি ভেবে বিন-টা দরজার সামনে রেখে দিতাম। সে রকম এক বিন-ডে-তে আমরা দরজার সামনে বিন রেখে বাসায় নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। হঠাৎ দরজায় বিশাল নক! দরজা খুলতেই দেখি আমার উপরতলার ভাড়াটিয়ার অগ্নিমূর্তি। কেন আমি ময়লার বিন কমন প্যাসেজ সিঁড়ির পাশে রেখেছি। সত্যি তো এটা আমার অন্যায়। কিন্তু উনি এর চেয়ে বেশি অন্যায় আমার উপর করে যাচ্ছিলেন। এ রকম আধুনিক ভবনে আমাদের থাকার যোগ্যতা নাই, ইত্যাদি ইত্যাদি আরও কত কী! আমার অসহায় অবস্থা দেখে আমার মিসেস-ও অসহায় বোধ করছিল এবং সে নাকি খুব চিন্তায় ছিল আমি ভদ্রলোককে শারীরিক আক্রমণ করে বসি কিনা। কিন্তু আমার স্বভাববিরোধী আচরণ আমার মিসেসকে বিস্মিত এবং একই সঙ্গে আশ্বস্ত করল বৈকি।
৫ম তলার অপারেশন শেষে বিজয়ী ভদ্রলোক এবার ৪র্থ তলার দরজায় সজোরে নক করা শুরু করলেন। হঠাৎ একজন মহিলার আক্রমণাত্মক গালিগালাজ কানে এল যা প্রকাশের অযোগ্য। সম্ভবত এটাই কারমা, আমার দাদীমার দর্শন। তিনি বলতেন কেউ যদি অন্য কাউকেও কষ্ট দেয় তবে তার জন্য একই ধরনের কষ্ট অপেক্ষা করতে থাকে। যাক, ভদ্রলোক দেখি অতি দ্রুততার সঙ্গে সিঁড়ির ওপরের দিকে উঠে আসছেন। সম্ভবত মেয়েমানুষের হাতের মার খাওয়া থেকে বাঁচতে তাঁর এই দ্রুততা!
আমার মিসেস সেদিন বিকালেই কলেজ থেকে ফিরে ৪র্থ তলার বাসায় গেলেন মহিলার সঙ্গে দেখা করার জন্য। কারণ তাঁর মনে হয়েছে স্বামীর অপমানের প্রতিশোধ নেওয়া কারীর সঙ্গে কমপক্ষে সৌজন্য সাক্ষাৎ দরকার। রাত ৯টার দিকে বাসায় ফিরে সেই সাক্ষাতের বিস্তারিত শুনলাম। ৪র্থ তলার ভাড়াটিয়া মেয়ে একজন ঢাকা সিনেমার নায়িকা এবং বেশ কয়েকটি ছবি করেছেন। তিনি ছবিগুলোর নাম আমার মিসেসকে বলেছেন কিন্তু আমার মিসেস সেগুলো আমাকে বলার জন্য মনে রাখতে পারে নাই। নায়িকা মেয়েটা এ বাসায় একাই বাস করে এবং উনার গার্মেন্টস ব্যবসায়ী স্বামী এখানে বৃহস্পতিবার রাতে আসেন এবং শনিবার সকালে চলে যান। উনার গার্মেন্টস ব্যবসায়ী স্বামী কোনো একটি দলের কোনো এক ইউনিটের সভাপতি এবং উনি তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। নায়িকা আর বেশি দিন এ বাসায় থাকবেন না কারণ উনার নামে ক্রীত ফ্ল্যাট আর কয়েক মাসের মধ্যেই রেডি হয়ে যাবে এবং তখন তিনি তাঁর মাকে বরিশালের গ্রাম থেকে নিয়ে এসে একসঙ্গে বাস করবেন। আমার মিসেস উনার সঙ্গে দেখা করতে গেছেন তাই উনি খুব খুশি হয়েছেন। পরে জানলাম আমার উপরতলার ভাড়াটিয়া ও বরিশালের লোক। আগে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে কাজ করতেন তবে এখন ফ্যাক্টরীতে এক্সেসরিজ সাপ্লাইয়ের ব্যবসা করেন এবং অনেক পয়সার মালিক। একটা পুরাতন ছোট আকারের গাড়ি কিনেছেন এবং নিজেই চালান।
বেশ কিছুদিন পরের কথা, আমি আমার মেয়েকে মিরপুর-২ এর ই “চেতনা মডেল স্কুলে” ড্রপ করে ফিরتی রিক্সার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম রাস্তার অপর পাশে এক ভদ্রলোক গাড়ির ড্রাইভিং স্যাট থেকে বেরিয়ে এক রিক্সাওয়ালার গালে থাপ্পড় বসালাল কারণ তার রিক্সা ভদ্রলোকের গাড়িতে ধাক্কা মেরেছে।
আরে বাবা একি! সঙ্গে সঙ্গে অপেক্ষমাণ ৩/৪ জন রিক্সাওয়ালা মিলে গাড়িওয়ালা ভদ্রলোককে এলোপাতাড়ি মার শুরু করল এবং আমি নিশ্চিত হলাম গাড়িওয়ালা ভদ্রলোক আমার উপরতলার ভাড়াটিয়া। ঢাকা শহরে রিক্সাওয়ালা-রিক্সাওয়ালার অহেতুক মারামারি অনেক দেখেছি কিন্তু রিক্সাওয়ালাদের জোট হয়ে গাড়িওয়ালা পেটানো এই প্রথম দেখলাম।
আমার দাদীর দর্শন তত্ত্ব কারমার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমি পেয়েছি একদিন এডিলেডের থেবাটনে নাদেরের কার রিপিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভিসিং শপে। এক যুগ আগে অনেক বাংলাদেশি ও ভারতীয়দের সস্তায় গাড়ির সার্ভিসিংয়ের জন্য নাদেরের গ্যারেজ-ই ছিল ভরসা। তবে এটাও সত্য যে কিছু ভালো গাড়ির মালিক কিপ্টামি করে নাদেরের দোকানের সার্ভিস নিয়ে নিজের গাড়ির বারোটা বাজিয়েছেন। নাদেরের দোকানের নিয়ম হলো, “কোনো বুকিং নয়”, গাড়ির ওয়াক-ইন বা ড্রাইভ-ইন-ই হচ্ছে বুকিং সিরিয়াল। আর এই ওয়ার্কশপে একটি মাত্র ওভারহেড স্প্যান (Overhead Span)। একদিন বিকেল ৩/৪ টার দিকে আমি আমার ১৯৯৪ মডেলের নিশান পালসার নিয়ে নাদেরের থেবাটন সার্ভিস সেন্টারে হাজির। ভাগ্য ভালো বলতে হবে কারণ ওভারহেড স্প্যানে একটা গাড়ির সার্ভিসিং চলছে এবং তার পরেই আমার গাড়ির দাঁড়ানোর সিরিয়াল। কিছুক্ষণ পরেই আমার গাড়ি স্প্যানে যাবে এবং ভালো ইন্সপেকশন এবং সার্ভিসিং হবে। হঠাৎ দেখি পাতলা গড়নের এক ভারতীয় স্মার্ট কর্মজীবী মেয়ে বা মহিলা তাঁর গাড়ি আমার গাড়ির পেছনে সিরিয়াল দিলেন এবং নাদেরের ছেলের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলেন। তিনি তাঁর গাড়ির চারটি চাকাই রিপ্লেস করাবেন। ওভারহেড স্প্যানের গাড়ির কাজ শেষ হলে আমাদের গাড়ি দুটো সরিয়ে সেই গাড়ি বের করে দেওয়া হলো এবং স্মার্ট মহিলার গাড়ি আগে এনে ওভারহেড স্প্যানে উঠানো হলো এবং নাদেরের দুই ছেলে অতি দক্ষতার সঙ্গে চাকা পরিবর্তনের কাজ শুরু করল। নাদের তাঁর একজন শিক্ষানবিস হেলপারকে আমার গাড়ির কাজ করতে বলে ভিতরের ব্যাকইয়ার্ডে অন্য গাড়ির দীর্ঘ ও জটিল সার্ভিসিংয়ের কাজে চলে গেলেন। বেচারা হেলপার একাই আমার গাড়ি ম্যানুয়াল লিফট করে অতিকষ্টে শুয়ে তেল পরিবর্তনের কাজ শুরু করল।
মনে মনে অনেক কষ্ট পেলাম তাই দাদীকে ডাকলাম—
“দাদী তোমার দর্শন তত্ত্বের কারমা কোথায়?” স্মার্ট মহিলার গাড়ির চাকা পরিবর্তনের কাজ শেষ হলেও তাঁর গাড়ি বের করা যাচ্ছে না কারণ আমার গাড়ি অসহায় অবস্থায় আছে। এদিকে স্মার্ট মহিলা তাঁর খুব তাড়া আছে বলল এবং আমার গাড়ির তদারকি শুরু করল। নাদেরের ছেলেরা আমার গাড়িটা ইঞ্জিন চালু করার উপযোগী করে সরিয়ে নিয়ে মহিলার গাড়িকে বের করে দিল।
প্রিয় পাঠক, আমি মহিলাকে বারবার স্মার্ট বলছি এটা তাঁকে ছোট করার জন্য নয়। She is really smart. গাড়ি চালিয়েই তাঁর বিগ অ্যাকসিলারেশনের যাওয়ার এতটা দক্ষতা আমি আগে কারোর দেখিনি। যাক, আমার গাড়িটা আবার ভিতর নিয়ে বাকি সার্ভিসিংয়ের কাজ শুরু হলো।
কয়েক মিনিট পরেই দেখি মেয়েটা তার গাড়ি নিয়ে আবার নাদেরের ডেরায় আবার হাজির। কারণ তিনি গাড়ির চাকা থেকে অস্বাভাবিক শব্দ পাচ্ছিলেন। তাদের কথাবার্তায় যতটুকু বুঝতে পারলাম, স্মার্ট মেয়েটির গাড়ির একটা চাকার সাইজ কোড নিয়ে সেই সাইজের চারটি চাকা (পুরাতন) বাছাই করে লাগিয়ে দেয়। কিন্তু যে চাকার নম্বর তারা নিয়েছিল তা ছিল ওভারসাইজড। কিন্তু এটা এতটাই ইরোডেড ছিল যে সেটা অন্য তিন চাকার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে চলাচল করেছিল। নাদের মেয়েটাকে বলল, আজ আর ঠিক করার সময় নাই। সুতরাং মেয়েটা তার গাড়ি নাদেরের গ্যারেজে রেখে দিল এবং ভারাক্রান্ত মন নিয়ে মোবাইলে কাউকে কল করল তাকে পিক করার জন্য।
দাদীকে আবার স্মরণ করলাম, দাদী তোমার দর্শন তত্ত্বের কারমা অন্য কারোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কিনা জানি না তবে আমার ক্ষেত্রে চলমান।