হাসান দ্বিতীয় মসজিদ দেখার পর মনে হচ্ছিল, যেন একটি তীর্থযাত্রা শেষ করে ফিরছি। ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে এসে হঠাৎ মনে প্রশ্ন জাগল—এবার কোথায় যাব? Rick’s Café ? কাসাব্লাঙ্কায় এসেছি, আর রিকস ক্যাফে দেখব না, তা কী করে হয়!
হামফ্রি বোগার্ট ও ইনগ্রিড বার্গম্যান অভিনীত ১৯৪২ সালের হলিউড ক্ল্যাসিক ‘কাসাব্লাঙ্কা’-য় রিকস ক্যাফে ছিল সম্পূর্ণ কাল্পনিক, সিনেমার সেটে তৈরি একটি রেস্তোরাঁ ও পিয়ানো বার। সেই কল্পনার রিকস ক্যাফেকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন ক্যাথি ক্রিগার নামের মরক্কোয় মার্কিন দূতাবাসের একজন প্রাক্তন কর্মকর্তা। বাস্তবের রিকস ক্যাফে চালু হয় ২০০৪ সালের ১ মার্চ। কাসাব্লাঙ্কার মদিনার দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা একটি পুরোনো বাড়িকে রূপান্তর করে তৈরি করা হয়েছিল এই বার।
মসজিদের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা একটি লাল পেতি ট্যাক্সি-র চালককে জিজ্ঞেস করলাম, রিকস ক্যাফে যাবে? শিওর, শিওর! সিট ডাউন! বসে প্রথমেই সিটবেল্ট বাঁধতে গেলাম। ‘নো নিড, নো নিড! ইন মরক্কো, নো সিট বেল্ট!’ আমি খানিকটা অবাক। এর মধ্যেই সে ঝটপট ইঞ্জিন চালু করে দিল। আমি বললাম, ‘কম্পটর?’ অর্থাৎ, মিটারটা চালু করবে না? সে আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলল, ‘ইউ আর মুসলিম। ইউ আর মাই ব্রাদার! আই উইল টেক ইউ ফ্রি!’ মাথার টুপিটা খুলে ব্যাগের ভেতর রাখতে রাখতে বললাম, ‘ফ্রি দরকার নেই। ন্যায্য ভাড়া নিলেই খুশি হব।‘
ওর নাম ব্রাহিম। আমাদের দেশের ‘ইব্রাহিম’। আমার নাম শুনে জিজ্ঞেস করল, ‘ইউ আর ফ্রম?’ বললাম, ‘বাংলাদেশি অস্ট্রেলিয়ান।’ সে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘আরে মামু! ভালো আছো?’ কাসাব্লাঙ্কার রাস্তায় এক মরোক্কান ট্যাক্সিচালকের মুখে ‘মামু’ আর ‘ভালো আছো’ শুনে আমার চোখ প্রায় ছানাবড়া। ‘তুমি বাংলা জানো?’ ‘ইয়েস, ইয়েস।’ ব্রাহিম জানাল, সে দশ বছর সৌদি আরবে ছিল। সেখানে অনেক বাংলাদেশির সঙ্গে কাজ করেছে। তাদের কাছ থেকেই বাংলা শেখা। আমি উৎসাহিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর কী কী বাংলা জানো?’ ব্রাহিম অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তার বাংলা শব্দভান্ডারের নমুনা দেওয়া শুরু করল— ‘হালার পুত, তোরে আমি….।’ নাউজুবিল্লাহ! দুই হাত তুলে হাতজোড় করে বললাম, ‘ভাই, এবার থামো! মাফ চাই!’ বোঝা গেল, সৌদি-প্রবাসী আমার স্বদেশি বাঙালি ভাইয়েরা তাকে বেছে বেছে বাংলা ভাষার অশ্লীল শব্দগুলোই শিখিয়েছে!
ওর নাম ব্রাহিম। আমাদের দেশের ‘ইব্রাহিম’। আমার নাম শুনে জিজ্ঞেস করল, ‘ইউ আর ফ্রম?’ বললাম, ‘বাংলাদেশি অস্ট্রেলিয়ান।’ সে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘আরে মামু! ভালো আছো?’ কাসাব্লাঙ্কার রাস্তায় এক মরোক্কান ট্যাক্সিচালকের মুখে ‘মামু’ আর ‘ভালো আছো’ শুনে আমার চোখ প্রায় ছানাবড়া। ‘তুমি বাংলা জানো?’ ‘ইয়েস, ইয়েস।’ ব্রাহিম জানাল, সে দশ বছর সৌদি আরবে ছিল। সেখানে অনেক বাংলাদেশির সঙ্গে কাজ করেছে। তাদের কাছ থেকেই বাংলা শেখা। আমি উৎসাহিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর কী কী বাংলা জানো?’ ব্রাহিম অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তার বাংলা শব্দভান্ডারের নমুনা দেওয়া শুরু করল— ‘হালার পুত, তোরে আমি….।’ নাউজুবিল্লাহ! দুই হাত তুলে হাতজোড় করে বললাম, ‘ভাই, এবার থামো! মাফ চাই!’ বোঝা গেল, সৌদি-প্রবাসী আমার স্বদেশি বাঙালি ভাইয়েরা তাকে বেছে বেছে বাংলা ভাষার অশ্লীল শব্দগুলোই শিখিয়েছে!

কয়েক মিনিটের মধ্যেই রিকস ক্যাফেতে পৌঁছে গেলাম। ব্রাহিম বলল, ‘তুমি আগে ভেতরটা ঘুরে আসো। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব।’ কাসাব্লাঙ্কা সিনেমাটি আমার দেখা। তাই রিকস ক্যাফের সামনে দাঁড়ানোর অনুভূতিটা অন্যরকম ছিল। সাদা রঙের অভিজাত বহির্ভাগ, সামনে দুটো লম্বা পামগাছ, আর বিশাল ভারী কাঠের দরজা। সব মিলিয়ে পুরোনো দিনের এক রাজকীয় আবহ।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ড আমাকে দেখে লম্বা করে সালাম দিয়ে বলল, আহলান! অর্থাৎ, স্বাগতম। ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো, ২০২৬ সাল থেকে হঠাৎ ১৯৪০-এর দশকে চলে এসেছি। বাঁকানো মরোক্কান খিলান, কারুকাজ করা বার কাউন্টার, ওপর তলার বারান্দা ও নকশাদার রেলিং, ছিদ্রকাটা পিতলের ঝুলন্ত বাতি, পুঁতির আলোকসজ্জা, আর সাদা দেয়ালে গাছপালার নরম ছায়া। সব মিলিয়ে আলো-আঁধারির এমন এক আবহ তৈরি হয়েছে, যেন সিনেমার কোনো সেটের ভেতর দিয়ে হাঁটছি।

এমনকি সেখানে ১৯৩০-এর দশকের একটি আসল প্লেয়েল পিয়ানোও আছে। প্রতি রাতে সেই পিয়ানো ঘিরে সুরের আসর বসে। চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকের ক্ল্যাসিক আমেরিকান, ফরাসি, স্প্যানিশ ও ব্রাজিলিয়ান গানের সুরের মূর্ছনায় ভরে ওঠে ক্যাফেটি। আর প্রতি রাতে বেশ কয়েকবার বাজে কাসাব্লাঙ্কা-র সেই অমর গান, “অ্যাজ টাইম গোজ বাই।” সিনেমায় গানটি রিক ব্লেইন (হামফ্রি বোগার্ট) আর ইলসা লুন্ড (ইনগ্রিড বার্গম্যান)-এর অসমাপ্ত প্রেমের স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। পিয়ানোবাদক স্যামকে ইলসার সেই বিখ্যাত অনুরোধ— “প্লে ইট, স্যাম। প্লে ‘অ্যাজ টাইম গোজ বাই।’” তারপর রিকের অভিমানী দাবি, তার জন্যও যেন গানটি আরেকবার বাজানো হয়।
সবে সন্ধ্যা নেমেছে বলে তখনও তেমন লোকজন নেই। পিয়ানোবাদকও আসেননি। তবে বোঝা যাচ্ছিল, রাতের আসরের প্রস্তুতি চলছে। আমার হাতে সময় কম। কয়েকটা ছবি তুলে বেরিয়ে এলাম। যাক, অন্তত গর্ব করে বলতে পারব—কাসাব্লাঙ্কার বিখ্যাত রিকস ক্যাফেতে আমিও পদচিহ্ন রেখে এসেছিলাম!
ক্যাফে থেকে বের হতেই ব্রাহিম রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল, তোমাকে একটা দারুণ জায়গায় নিয়ে যাব। তুমি খুব পছন্দ করবে! বললাম, আচ্ছা, চলো। কিছুক্ষণ পর আমাকে নিয়ে গেল Bar La Théâtre নামের একটা জায়গায়। এলাকাটা কেমন যেন পরিচিত মনে হলো। হোটেল দ্য প্যারিস থেকে খুব বেশি দূরে নয়। নামের মধ্যে ‘Théâtre’ দেখে প্রথমে ভেবেছিলাম, হয়তো কোনো থিয়েটার-জাতীয় জায়গা। দরজা পেরিয়েই বুঝলাম, ‘থিয়েটার’ শব্দটি সম্পর্কে আমার আরও অনেক কিছু জানার বাকি আছে! এটি সব সময় নাটক কিংবা সিনেমার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়!
ভেতরে ঢুকেই চোখে পড়ল বিশাল বার কাউন্টার। লাল-নীল আবছা আলোয় পুরো ঘরটা ডুবে আছে। বাতাসে মদের তীব্র ঝাঁঝের সঙ্গে সিগারেটের ধোঁয়া মিশে আছে। দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। চারদিকে উচ্চস্বরে কথাবার্তা, হাসাহাসি আর সংগীত। সাজগোজ করা কয়েকজন নারী নেশায় বুঁদ হয়ে বসে থাকা ভগ্নহৃদয় অতিথিদের কারও কাঁধে হাত রেখে, কাউকে বুকে জড়িয়ে ধরে জগতের যাবতীয় দুঃখ-বেদনা আর ব্যর্থতা ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
আমাকে দেখেই তাঁদের একজন দুই হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এলেন। কড়া লাল রঙে আঁকা পুরু ঠোঁটে ভুবন-ভোলানো হাসি। পরনে লম্বা সাদা গাউন, তাতে চকচকে জরির কাজ; ক্ল্যাসিক ফ্রেঞ্চ বব কাট চুলে। মুখে ভারী মেকআপ। বয়সের ছাপ স্পষ্ট। সময়ের সঙ্গে তাঁর যে একটা নিরন্তর লড়াই চলছে, তা বোঝা যায়। কিন্তু হাসিটা এমন মিষ্টি, কতকাল ধরে যেন চেনা! আমার জন্যই সারাজীবন ধরে তাঁর অপেক্ষা! “ইয়া হাবিবি…” আরবিতে আরও কী কী বললেন, তার কিছুই বুঝলাম না। নিজের মতো করে অনুবাদ করে নিলাম—‘হে আমার হৃদয় চূর্ণ করা প্রেমিক, আসন গ্রহণ করো। শরাব পান করো। আমি তোমাকে মধুর সঙ্গ দেব। জিন্দেগির সব দুঃখ-বেদনা ভুলে যাবে!’ আমি তখন মনে মনে অস্ট্রেলিয়ায় আমার জীবনসঙ্গিনীর কথা ভাবছি। যদি জানতে পারে, কাসাব্লাঙ্কায় এমন জায়গায় ঢুঁ মেরেছি, আমার জিন্দেগির দুঃখ দূর হওয়ার আগেই নির্ঘাত খতম হয়ে যাব! এমনিতেই প্রায়ই ভর্ৎসনা শুনি, আমি নাকি অতিরিক্ত কৌতূহলী। “অ্যা কিউরিয়াস ক্যাট লুজেস ইটস টেইল।” লেজ হারানোর আগেই মহিলার দিকে কয়েকবার মাথা ঝুঁকিয়ে, “শুকরান, শুকরান” বলতে বলতে একরকম ঊর্ধ্বশ্বাসে বেরিয়ে এলাম।
বাইরে এসে দেখি ব্রাহিম গার্ডের সঙ্গে মহা খোশগল্পে মেতে আছে। বললাম, ইব্রাহিম! তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে এসেছ? সে বিস্মিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ইউ ডিডন্ট লাইক ইট? মামু!’ ‘তোর মামুর নিকুচি করি! অনেক হয়েছে। এবার আমার ভয়ানক খিদে পেয়েছে। এই শহরে সবচেয়ে ভালো তাজিন যেখানে পাওয়া যায়, আমাকে সেখানে নিয়ে চলো।’ ব্রাহিম বলল, ‘চলো, তোমাকে La Sqala নিয়ে যাই।
লা স্কালার অবস্থান কাসাব্লাঙ্কার ফিশিং পোর্টের সামনে ঐতিহাসিক এক দুর্গের ভেতরে, পুরোনো মদিনার একদম প্রাচীর ঘেঁষে। এই জায়গাটির সঙ্গে কাসাব্লাঙ্কার পর্তুগিজ ইতিহাসও জড়িয়ে আছে। পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে পর্তুগিজরা এই অঞ্চলে এসে বসতি গড়ে। তাদের সময়েই শহরটি কাসা ব্রাঙ্কা, পর্তুগিজ ভাষায় ‘সাদা বাড়ি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। ১৭৫৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর পর্তুগিজরা কাসাব্লাঙ্কা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর মরক্কোর সুলতান সিদি মোহাম্মদ বেন আবদাল্লাহ কাসাব্লাঙ্কাকে পুনর্গঠন করেন। তাঁর আমলেই ১৭৬৯ সালে সমুদ্রপথে শহরকে রক্ষার জন্য দুর্গটি নির্মিত হয়। সেই ঐতিহাসিক দুর্গের ভেতরেই এখন মরোক্কান স্থাপত্যের আদলে ক্যাফে-রেস্তোরাঁ, সবুজে ঘেরা আন্দালুসীয় বাগান আর ঐতিহ্যবাহী মরোক্কান খাবারের আয়োজন। প্রাচীরের ওপর আটলান্টিকের দিকে মুখ করে রাখা সারিবদ্ধ পুরোনো কামানগুলো এখনও যেন কাসাব্লাঙ্কাকে পাহারা দিয়ে যাচ্ছে।
দশ মিনিটের মতো চলার পর ব্রাহিম আমাকে লা স্কালার কাছাকাছি এক জায়গায় নামিয়ে দিল। এবার তাকে বিদায় জানাতে হবে। জিজ্ঞেস করলাম, কত দেব? সে বলল, ‘ওয়ান হান্ড্রেড ফিফটি দিরহাম।’ ‘একশ পঞ্চাশ?’ প্রায় আঁতকে উঠলাম। দূরত্ব আর মোটামুটি ঘণ্টা খানেক সময় বিবেচনায় আমার ধারণা ছিল সত্তর-আশি দিরহামের বেশি হওয়ার কথা নয়। কিছু দরকষাকষির পর ১২০ দিরহামে রফা হলো। ব্রাহিমকে বিদায় জানিয়ে কয়েক কদম হাঁটতেই পৌঁছে গেলাম লা স্কালায়। রিসেপশনে যেতেই প্রশ্ন, ‘ডু ইউ হ্যাভ আ বুকিং?’ বললাম, ‘নো।’ ‘সরি, স্যার। ফুলি বুকড। উই আর অলওয়েজ বুকড আউট। ইউ নিড টু বুক ইন অ্যাডভান্স।’ মনটাই খারাপ হয়ে গেল। হায়! মরক্কোয় এসেছি, অথচ এখনও একটা ভালো তাজিন খাওয়া হলো না! মরক্কোর তাজিন যেন আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে।
রাত অনেক হয়েছে। ঠিক করলাম, আর ট্যাক্সি নয়। গুগল ম্যাপে হোটেল দ্য প্যারিস-এর ঠিকানা দিয়ে লোকালয়ের ভেতর দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। রাস্তায় অসংখ্য মানুষ। পুরুষ, নারী, শিশু। মনে হলো, মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ যেন পুরান ঢাকা কিংবা কলকাতার শ্যামবাজারের কোনো গলিতে এসে পড়েছি। চারদিকে কোলাহল। ফুটপাত জুড়ে ছোট ছোট ঠেলাগাড়িতে বিক্রি হচ্ছে ফলমূল, জুস, জলপাই, রুটি, বিস্কুট, অলিভ অয়েল, ভুট্টা। আরও কত কী! ছোট ছোট পার্ক আর খেলার মাঠে শিশুরা ফুটবল খেলছে, ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে। কারও চোখে ঘুম নেই।
ঢাকা-কলকাতার মতোই অসংখ্য ছোট মুদি দোকান। সামনে সারি করে রাখা গোল, চ্যাপ্টা, চাকতির মতো রুটি। দোকানিরা দুই হাতে সেগুলো যেভাবে নেড়েচেড়ে সাজাচ্ছে, দেখে মনে হয় ওগুলো যেন খাবার নয়, কোনো দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিস! মাঝে মাঝে ছোট, সস্তা পাড়ার রেস্তোরাঁ। কাবাবের জিভে জল আনা গন্ধ । ভেতরে বাইরে লোক গিজগিজ করছে। খাবারের চেয়ে কথাই যেন বেশি চলছে।
ঢাকা-কলকাতার মতোই অসংখ্য ছোট মুদি দোকান। সামনে সারি করে রাখা গোল, চ্যাপ্টা, চাকতির মতো রুটি। দোকানিরা দুই হাতে সেগুলো যেভাবে নেড়েচেড়ে সাজাচ্ছে, দেখে মনে হয় ওগুলো যেন খাবার নয়, কোনো দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিস! মাঝে মাঝে ছোট, সস্তা পাড়ার রেস্তোরাঁ। কাবাবের জিভে জল আনা গন্ধ । ভেতরে বাইরে লোক গিজগিজ করছে। খাবারের চেয়ে কথাই যেন বেশি চলছে।
রাত সাড়ে দশটায় চারদিক থেকে এশার আজান ভেসে এলো। এক মসজিদ থেকে শুরু, তারপর অন্য মসজিদ। মনে হলো, ঢাকার মিরপুর এক নম্বরে, আমাদের পাড়া দক্ষিণ বিশিলে হাঁটছি। অনন্তকাল ধরে যেন হেঁটে চলেছি। রাত ক্রমেই গভীর হচ্ছে, অথচ একবারের জন্যও পথ হারানোর ভয় নেই। অদ্ভুত এক ভালো লাগা আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। জীবনানন্দের সেই অনুভূতির মতো— “হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে।”
একটা ছোট মিষ্টির দোকানের সামনে থামলাম। কয়েকজন তরুণ সেখানে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছিল। কাঁচের বাক্সের ভেতর নানারকম মিষ্টি সুন্দর করে সাজানো। চিনির সঙ্গে সম্ভবত মরোক্কানদের গভীর প্রেম। ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ডু ইউ হ্যাভ এনিথিং লেস সুইট?’ তরুণ দোকানি ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘হুইচ ওয়ান ইজ লেস সুইট?’ ‘লে সুইট?’ বলেই দোকানির একগাল হাসি। আশপাশের ছেলেগুলোও হো হো করে হেসে উঠল। আমি একটু বিভ্রান্ত। কী এমন বলে ফেললাম? কী শুনে ওরা এত হাসছে? আমার বলা ‘লেস সুইট’ কি ওদের কানে অদ্ভুত কোনো ফরাসি শব্দের মতো শোনাচ্ছে? সেই রহস্য আজও আমার অজানা। আঙুল দিয়ে ওপরের দিকে তিল ছড়ানো বিস্কুটের মতো একটা জিনিস দেখিয়ে কিনে তড়িঘড়ি কেটে পড়লাম।
কাগজে মোড়ানো সেই বিস্কুট কুটকুট করে খেতে খেতে হাঁটছি। হঠাৎ কোথা থেকে যেন বগুড়া এসে হাজির হলো। বাবার বদলির সূত্রে ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে বগুড়া জিলা স্কুলে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। স্কুল ছুটির পর ক্লান্ত শরীরে শহরের বাদুড়তলার ভেতর দিয়ে বাড়ি ফিরতাম আমরা তিন বন্ধু। আমি, শামীম আর আজাদ। হাতে খবরের কাগজের ঠোঙার ভেতরে মুড়ালি কিংবা কটকটি। খেতে খেতে, গল্প করতে করতে বাড়ি ফেরা। কাসাব্লাঙ্কার অন্ধকার গলিতে হাঁটতে হাঁটতে সেই কত বছরের পুরোনো বিকেলগুলো হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠল। আমার সাথে আজাদ আর শামীমও হাঁটছে। বন্ধু শামীম, বিশিষ্ট অর্থোপেডিক সার্জন ডা. রেজওয়ানুল বারী ২০২০ সালে কোভিডের সময় পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে।

চলতে চলতে একসময় অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ একটা জায়গায় এসে পড়লাম। রাস্তার বাঁ দিকে বহু পুরোনো একটা স্মৃতিস্তম্ভের মতো স্থাপনা চোখে পড়ল। সুন্দর আরবি ক্যালিগ্রাফি আর নকশা করা জেলিজ মোজাইক টাইলসে সাজানো। সামনে পানির ফোয়ারার মতো কিছু একটা। চারপাশের স্থাপত্যও বদলে গেছে। রাস্তার ওপর কাঠের ছাউনি। দুই পাশে বিশাল বিশাল হলুদ কিংবা মেহগনি রঙের ভারী, চকচকে দরজা। সব বন্ধ। কিছুক্ষণ আগের সেই জনারণ্য হঠাৎ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
গা ছমছম করতে শুরু করল। হাঁটার গতি একটু কমিয়ে দিলাম। ভাবলাম, আর দু-একজন মানুষ আসুক, তারপর এগোব। গুগল ম্যাপে দেখছিলাম, মূল রাস্তা খুব বেশি দূরে নয়। মিনিট কয়েকের মধ্যেই উল্টো দিক থেকে কয়েকজন তরুণ উচ্চস্বরে গল্প করতে করতে এগিয়ে এলো। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কুড ইউ টেল মি হোয়াট দিস প্লেস ইজ?’ ওদের একজন বেশ সাবলীল ইংরেজিতে বলল, ‘দিস ইজ দ্য ওল্ড মদিনা।‘ বুঝলাম, আমি তাহলে কাসাব্লাঙ্কার পুরোনো বাজারের ভেতরেই এসে পড়েছি।
রাত তখন ১০টা ২৮ মিনিট। সব দোকান ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের দেশে হাট শেষ হয়ে মানুষজন চলে যাওয়ার পর যে শূন্য, নিস্তব্ধ চেহারা দেখা যায়, তাকে বলে ‘ভাঙা হাট’। জায়গাটাকে দেখে হঠাৎ সেই কথাটাই মনে পড়ল। জীবনটাও অনেকটা ভাঙা হাটের মতো নয়? কত মানুষের আনাগোনা, কত কোলাহল, কত হাসি-কান্না, কত কেনাবেচা! অথচ আমরা কেউ জানি না, কখন হঠাৎ সেই কোলাহল থেমে যাবে । আর আমরা একা হয়ে যাব।
একটু আগেও যে মদিনা মানুষের কোলাহলে মুখর ছিল, রাত বাড়তেই তারও যেন সব লেনদেন ফুরিয়ে এসেছে। পড়ে আছে শুধু বন্ধ দরজাগুলো, নিস্তব্ধ গলি। মাঝখান দিয়ে হেঁটে চলেছি আমি, একা। আবারও জীবনানন্দ—“সব পাখি ঘরে আসে— সব নদী— ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন; থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।”
একটু আগেও যে মদিনা মানুষের কোলাহলে মুখর ছিল, রাত বাড়তেই তারও যেন সব লেনদেন ফুরিয়ে এসেছে। পড়ে আছে শুধু বন্ধ দরজাগুলো, নিস্তব্ধ গলি। মাঝখান দিয়ে হেঁটে চলেছি আমি, একা। আবারও জীবনানন্দ—“সব পাখি ঘরে আসে— সব নদী— ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন; থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।”
মদিনার শেষ মাথায় এসে রাস্তা পার হলাম। জাতিসংঘ স্কয়ারের কাছাকাছি চলে এসেছি। হোটেল দ্য প্যারিস আর খুব দূরে নয়। এক জায়গায় অনেকগুলো খাবারের দোকান পেলাম। রাস্তার ওপর চেয়ার-টেবিল পাতা, প্রচণ্ড ভিড়। একটা শরমা অর্ডার করলাম। বলা হলো, বিশ মিনিটের বেশি অপেক্ষা করতে হবে।

পাশের টেবিলে বসে খাচ্ছিল দুই তরুণ। ওদেরকে পেস্তা রঙের একটা ঘন জুস খেতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হোয়াট ইজ দ্যাট জুস?’ বলল, ‘অ্যাভোকাডো অ্যান্ড ডেটস।’ ভাবলাম, একটা অর্ডার দিই। তারপর ক্যালরির কথা ভাবলাম। না থাক!
ওদের সাথে একটু আলাপ হলো। লতিফ আর মোহাম্মদ; মরক্কোর প্রতিবেশী দেশ মৌরিতানিয়া থেকে কাসাব্লাঙ্কার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে এসেছে বছর তিনেক আগে। দুজনেরই ইংরেজি ভালো। সুন্দরভাবে কথাবার্তা চালিয়ে নেওয়া যায়। অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছি শুনে মোহাম্মদ বলল, ‘অস্ট্রেলিয়া ইজ ভেরি বিউটিফুল। ন্যাচারাল বিউটি!’ তার জীবনের বড় ইচ্ছা, একদিন অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে ক্যাঙ্গারু দেখবে। লতিফ বলল, ‘মৌরিতানিয়াও খুব সুন্দর। মরক্কো থেকে ল্যান্ড বর্ডার দিয়ে যাওয়া যায়। তুমি অবশ্যই যাবে।’ বললাম, ‘ইনশাআল্লাহ।’
ওরা নিজেদের বিল মিটিয়ে বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার পর আমার খাবার এলো। শরমার সঙ্গে একটা বড় গ্লাস ভর্তি সেই পেস্তা রঙের অ্যাভোকাডো-ডেট জুস! আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘আই ডিডন্ট অর্ডার দিস।’ ওয়েটার বলল, ‘নো পেমেন্ট।’ তারপর যা বুঝলাম, লতিফ আর মোহাম্মদ যাওয়ার আগে আমার জন্য জুসটা অর্ডার করে দাম দিয়ে গেছে।
কী বলব, কী করব বুঝতে পারছিলাম না। পৃথিবীর পথে চলতে চলতে কত মানুষের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়। কেউ আসে কয়েক বছরের জন্য, কেউ কয়েক মাস, কেউ কয়েক ঘণ্টার জন্য। আবার কারও সঙ্গে দেখা হয় মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য। লতিফ আর মোহাম্মদের সঙ্গে জীবনে হয়তো আর কোনদিন দেখা হবে না। হয়তো তারা আমাকে ক’দিনের মধ্যেই ভুলে যাবে। কিন্তু সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষের জন্য নিঃশব্দে এক গ্লাস জুস কিনে রেখে যাওয়ার মধ্যে যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা তারা দেখিয়ে গেল, সেটুকু কি আমি কখনো ভুলতে পারব?
আমার বাবা প্রায়ই একটি কবিতা আবৃত্তি করতেন। জানি না কার লেখা।
“এ জীবনে চলার পথে
অগণিত যাত্রী চলে,
বিরাম-বিশ্রামহীন।
কে-বা কারে মনে রাখে;
তবু তারই মাঝে
ক্ষণিক দাঁড়িয়ে
স্মৃতির ফলকে যারা পদচিহ্ন রাখে,
তারা মনে থাকে।”
মাত্র কয়েক মিনিটের পরিচয় হওয়া সেই দুই মৌরিতানীয় যুবককে আমার চিরদিন মনে থাকবে।
খাওয়া শেষ করে হোটেলের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। রাত এগারোটা বেজে গেছে। শরীরে আর শক্তি নেই। প্রায় মাতালের মতো হেলে-দুলে হাঁটতে হাঁটতে হোটেলের কাছাকাছি এসে দেখলাম আশ্চর্য এক দৃশ্য। রাস্তার ওপর অসংখ্য দোকান বসানোর প্রস্তুতি চলছে। মাদুর কিংবা পুরোনো কার্পেটের ওপর নানা ধরনের সস্তা, সাধারণ, পুরোনো জিনিসের পসরা সাজানো হচ্ছে। জামা, টি-শার্ট, প্যান্ট, খেলনা, জুতা, চার্জার, ফ্যান, লাইট, মোবাইল ফোন, টুপি, স্ক্রু-ড্রাইভার, হ্যান্ড ড্রিল, সাইকেলের ঘণ্টা। কী নেই সেখানে?
এ যেন ছোটবেলার ঢাকার মিরপুর এক নম্বর বাজারের দক্ষিণ দিকে, মাজার রোডের পাশ ঘেঁষে প্রতিদিন বিকেলে বসা পুরোনো জিনিসের বাজার। লোকে বলত “চোরা মার্কেট।” আমার আব্বা প্রায়ই সেখান থেকে নিজের জন্য, কখনো আমাদের জন্য কম দামে পুরোনো জুতা কিনতেন। বাড়ি ফিরে গর্ব করে বলতেন, ‘ দেখেছিস কী জিতা জিতেছি! মাত্র বিশ টাকা! খাঁটি চামড়া, অরিজিনাল রাবারের সোল। এই কোয়ালিটির জুতা দোকানে দেড়শ টাকার নিচে পাবি না!’ আমিও সেই জুতা পায়ে স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের কাছে বলতাম, বিদেশি জুতা। এলিফ্যান্ট রোড থেকে কিনেছি!
জানি না, মিরপুরের সেই চোরা মার্কেট এখনও আছে কি না। নাকি ঝকঝকে শপিং মল আর বহুতল ভবনের আড়ালে হারিয়ে গেছে নিম্নবিত্ত মানুষের সেই বাজার। সেখানে তারাও পানির দামে কোনো এক ‘বড়লোকের’ ব্যবহৃত জিনিস কিনে কিছুক্ষণের জন্য বড়লোক হওয়ার আনন্দ পেত।

ঘুমে তখন চোখ জড়িয়ে আসছে। রাস্তার এক পাশে হুইলচেয়ারে বসে ছিলেন একজন শীর্ণকায় বয়স্কা নারী। মাথায় হিজাব। পায়ে সাদা মোজা আর লাল টুকটুকে জুতা। মাথা নিচু করে বসে আছেন। আমি পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ ডান হাতটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। নিঃশব্দ।
পকেটে হাত দিয়ে একমুঠো কয়েন বের করে তাঁর হাতে দিলাম। মাথা না তুলেই তিনি মুঠোর মধ্যে কয়েনগুলো শক্ত করে ধরে ইশারায় আমাকে কাছে ডেকে মাথা নিচু করতে বললেন। আমি বাধ্য ছেলের মতো মাথা ঝোঁকালাম। মুষ্টিবদ্ধ সেই হাতটি ধীরে ধীরে আমার মাথার ওপর, মুখের ওপর বুলিয়ে দিলেন। বরফের মতো ঠান্ডা স্পর্শ। মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের জন্য ভাষাই কি একমাত্র মাধ্যম? কখনো কখনো হয়তো নীরবতা আর একটি স্পর্শ দিয়েই পৃথিবীর গভীরতম যোগাযোগগুলো ঘটে। আমি কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হলো, তিনি আমাকে দোয়া কিংবা আশীর্বাদের চেয়েও মূল্যবান কিছু একটা দিয়ে দিলেন।
পকেটে হাত দিয়ে একমুঠো কয়েন বের করে তাঁর হাতে দিলাম। মাথা না তুলেই তিনি মুঠোর মধ্যে কয়েনগুলো শক্ত করে ধরে ইশারায় আমাকে কাছে ডেকে মাথা নিচু করতে বললেন। আমি বাধ্য ছেলের মতো মাথা ঝোঁকালাম। মুষ্টিবদ্ধ সেই হাতটি ধীরে ধীরে আমার মাথার ওপর, মুখের ওপর বুলিয়ে দিলেন। বরফের মতো ঠান্ডা স্পর্শ। মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের জন্য ভাষাই কি একমাত্র মাধ্যম? কখনো কখনো হয়তো নীরবতা আর একটি স্পর্শ দিয়েই পৃথিবীর গভীরতম যোগাযোগগুলো ঘটে। আমি কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হলো, তিনি আমাকে দোয়া কিংবা আশীর্বাদের চেয়েও মূল্যবান কিছু একটা দিয়ে দিলেন।
আর কয়েক কদম হেঁটেই হোটেল দ্য প্যারিস। রাত প্রায় সোয়া এগারোটা। রিসেপশনে কেউ নেই। লিফটও বন্ধ। ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে চারতলায় উঠলাম। কোনোমতে ফ্রেশ হয়ে এশার নামাজ পড়লাম। তারপর সোজা বিছানায়।
চোখ বন্ধ করলাম। একটা দিনে কত কিছু হলো! একটার পর একটা ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। একটি দিন নয়, যেন কয়েকটি জীবন পার করে এসেছি। বাইরে কাসাব্লাঙ্কা তখনও জেগে। রাতের বাজারের কোলাহল আরও বাড়ছে। জানি না, কখন যে আমি ঘুমের অতল সাগরে তলিয়ে গেলাম।