আফ্রিকার রঙিন দুয়ার: মরক্কোর দিনগুলি- পর্ব ২

অবশেষে এলো ২৫ জুন, ২০২৬। সত্যি বলতে, সেদিন আমি বেশ নার্ভাস ছিলাম। অ্যাডিলেডে আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু শামীম ভাই অনেক আপত্তি সত্ত্বেও আমাকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিলেন। আমি বারবার বলেছিলাম, শুধু বিমানবন্দরের সামনে নামিয়ে দিলেই হবে। তিনি সম্ভবত বুঝতে পারছিলেন, আমার ভেতরে উদ্বেগ কাজ করছে, তাই অ্যাডিলেড বিমানবন্দরের বহুতল পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে তিনি আমার সঙ্গে ভেতরে এলেন। চেক-ইন কাউন্টারে পাশে থাকলেন, নিরাপত্তা পরীক্ষার সময়ও সঙ্গ দিলেন, মাঝেমধ্যে নানা কথা বলে সাহস জোগাচ্ছিলেন। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে আমরা কিছুক্ষণ একসঙ্গে বসলাম। শামীম ভাই আমার জন্য ডিক্যাফ কফি কিনলেন, আমি তাঁর জন্য একটি স্মুদি কিনলাম। দুজনে একটি সেলফিও তুললাম। কথা বলতে বলতে ফিরে গেলাম ২০১০–২০১১ সালের অস্ট্রেলিয়ায় আমাদের জীবনের শুরুর দিনগুলোতে, যখন আমরা একে অপরের সুখ-দুঃখের সঙ্গী ছিলাম। নতুন দেশ, নতুন বাস্তবতা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, কত সংগ্রাম, কত দুশ্চিন্তা।

ধীরে ধীরে ফ্লাইটের সময় ঘনিয়ে এলো। এবার আমাকে আন্তর্জাতিক প্রস্থান ও ইমিগ্রেশনের দিকে এগোতে হবে। আবার নিরাপত্তা পরীক্ষা, তারপর ইমিগ্রেশন পার হয়ে বোর্ডিং লাউঞ্জ। শামীম ভাইকে কয়েকবার বললাম, “আপনি এবার চলে যান, অনেকক্ষণ হয়ে গেছে।” কিন্তু তিনি শুনলেন না। আমি নিচতলায় নেমে ইমিগ্রেশনে প্রবেশের লাইনে দাঁড়ালাম। মাঝেমধ্যে পেছনে তাকাচ্ছিলাম, আর দেখছিলাম; শামীম ভাই তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন। যতক্ষণ আমাকে দেখা যাচ্ছিল, ততক্ষণ তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। ভাবলাম, আমি কতটা সৌভাগ্যবান! শামীম ভাই শুধু একজন দীর্ঘদিনের বন্ধু নন; পরম আত্মীয়ের মতো, সহোদর ভাইয়ের মতো একজন মানুষ। বিদেশ বিভুঁইয়ে রক্তের সম্পর্কের বাইরে কিছু মানুষ কখন যে পরম আত্মীয় হয়ে ওঠেন, তা হয়তো আলাদা করে বোঝা যায় না। জীবনের দীর্ঘ পথ চলতে চলতে কোনো একসময় হঠাৎ উপলব্ধি হয়, এই মানুষগুলোই তো আমাদের প্রবাস জীবনের পরিবার।

বিদেশ বিভুঁইয়ে রক্তের সম্পর্কের বাইরে কিছু মানুষ কখন যে পরম আত্মীয় হয়ে ওঠেন, তা হয়তো আলাদা করে বোঝা যায় না। জীবনের দীর্ঘ পথ চলতে চলতে কোনো একসময় হঠাৎ উপলব্ধি হয়, এই মানুষগুলোই তো আমাদের প্রবাস জীবনের পরিবার।

রাত দশটায় দোহাগামী বিমান আকাশে উড়ল। সামনে প্রায় সাড়ে তেরো ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা। ভাগ্য ভালো, আমার পাশের আসনটি খালি ছিল। ফলে দীর্ঘ পথ হলেও মোটামুটি আরামেই কেটে গেল। তবে খাবারের অভিজ্ঞতাটা শুরুতে মোটেই ভালো হলো না। টিকিট বুক করার সময় কী মনে করে যেন ‘লো-ফ্যাট মিল’ বেছে নিয়েছিলাম। খাবার সামনে আসার পর মনে হলো, আমাকে বুঝি কোনো হাসপাতালের রোগীর পথ্য দেওয়া হয়েছে! অনিচ্ছা নিয়েই খাবারের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমার মুখের অভিব্যক্তি সম্ভবত কেবিন ক্রুর একজনের চোখ এড়াল না। তিনি এসে বললেন, “If you don’t like the food, I can offer you something else.” রাতের ফ্লাইট হওয়ায় অনেক যাত্রী তখন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন; সম্ভবত খাবারও কিছু বাড়তি ছিল। আমি তাঁর প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করলাম। আর মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম—আর কোনো দিন ‘লো-ফ্যাট মিল’ নয়!

সাড়ে তেরো ঘণ্টা পর দোহার স্থানীয় সময় ভোর পাঁচটার দিকে হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামলাম। কাসাব্লাঙ্কাগামী পরবর্তী ফ্লাইট সকাল আটটার দিকে। পরবর্তী বোর্ডিং গেটে পৌঁছাতে বেশ খানিকটা হাঁটতে হলো। ঘুমঘুম চোখে হাঁটতে হাঁটতেই আবারও হামাদ বিমানবন্দরের বিশালতা অনুভব করলাম। দোহা বিমানবন্দরে যতবার এসেছি, এর আন্তর্জাতিক চরিত্র আমাকে মুগ্ধ করেছে। যাত্রী, বিমানবন্দরের কর্মী, ভাষা, পোশাক, গায়ের রং, জাতীয়তা সব মিলিয়ে যেন ছোট্ট একটি পৃথিবী। একটি দেশকে অনেক সময় তার বিমানবন্দর দিয়েই খানিকটা চেনা যায়। বিদেশি একজন যাত্রী প্রথম কয়েক ঘণ্টায় যে দেশকে দেখেন, তার অনেকটাই তো বিমানবন্দরের মধ্য দিয়েই।পরিচ্ছন্ন টয়লেট, ঝকঝকে টার্মিনাল, দক্ষ যাত্রী ব্যবস্থাপনা, বিশাল শপিং এলাকা—সবকিছুর মধ্যেই একটি ইতিবাচক ধারণা তৈরি করার সচেতন চেষ্টা চোখে পড়ে। কাতার শুধু একটি বিশ্বমানের এয়ারলাইন তৈরি করেই থামেনি; দোহাকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর হিসেবেও গড়ে তুলেছে। ২০২৫ সালে হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ৫ কোটি ৪৩ লাখ যাত্রী চলাচল করেছেন; সম্প্রসারণের পর বিমানবন্দরটির বার্ষিক ধারণক্ষমতা এখন সাড়ে ৬ কোটিরও বেশি। তুলনার জন্য একই বছরে দিল্লি বিমানবন্দর প্রায় ২ কোটি ১৬ লাখ এবং মুম্বাই প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখ আন্তর্জাতিক যাত্রী সামলেছে; ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক যাত্রী ছিল প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ।

আরেকটি বিষয়ও চোখে পড়ল। বিভিন্ন ডেস্ক ও যাত্রীসেবার কাজে আফ্রিকার নানা দেশের পাশাপাশি ভারত ও নেপাল থেকে আসা অনেক কর্মীকে দেখলাম। অন্যদিকে পরিচ্ছন্নতার কাজে যাঁদের দেখলাম, তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলেন বাংলাদেশি। বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীদের দেখলে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে, তাঁদের সুখ-দুঃখের কথা জানতে ইচ্ছে করে; কিন্তু এই যাত্রায় সময় ছিল না। ফেরার পথের জন্য সেই আলাপ রেখে দিলাম।

অনেকটা পথ হেঁটে অবশেষে কাসাব্লাঙ্কাগামী বিমানের বোর্ডিং গেটে পৌঁছালাম। সেখানে পৌঁছেই যেন মরক্কোর প্রথম ছোঁয়া পেলাম। পাসপোর্ট ও বোর্ডিং কার্ড পরীক্ষা করে বোর্ডিং লাউঞ্জে ঢোকার পর দেখলাম, অধিকাংশ যাত্রীই মরক্কান। তাঁদের চেহারাতে উত্তর আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় ছাপ। কারও গায়ের রং জলপাই, কারও হালকা বাদামি; অনেকের ঘন কালো বা গাঢ় বাদামি কোঁকড়ানো চুল। কথা বলছেন মরক্কোর নিজস্ব আরবিতে, স্থানীয়ভাবে যার নাম দারিজা। কয়েকজনের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপও হলো। ইংরেজিতে সবাই খুব সাবলীল নন, কিন্তু আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি ছিল না। আমার ভেতরে তখন অদ্ভুত এক অনুভূতি; এখনো মরক্কোয় পৌঁছাইনি, অথচ চারপাশের মানুষ, ভাষা আর কথাবার্তা আমাকে যেন ধীরে ধীরে সেই দেশের ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে।

দোহা থেকে কাসাব্লাঙ্কা, আরও প্রায় সাত ঘণ্টার যাত্রা। বিমানে উঠে পাশের আসনে পরিচয় হলো ২৬ বছরের এক মরক্কান যুবকের সঙ্গে। নাম আদিল। বাড়ি ফেজে, তবে থাকে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে। অনলাইনে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ট্রেডিং করে। আদিল বলল, পৃথিবীর নানা দেশের অনেক মানুষ এখন সেখানে বসে অনলাইনে কাজ করে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ভালো ইন্টারনেট সুবিধা, অসংখ্য co-working space এবং অনেক পশ্চিমা দেশের তুলনায় জীবনযাত্রার কম খরচ বালিকে remote worker ও digital nomad-দের জনপ্রিয় গন্তব্যে পরিণত করেছে।

আদিল কথা বলছিল আর কিছুক্ষণ পরপর মোবাইলের পর্দায় চোখ রাখছিল। সেখানে নানা রঙের রেখা, সংখ্যা আর জটিল গ্রাফ ওঠানামা করছে—মুদ্রাবাজারের মূল্য পরিবর্তন। কৌতূহলী হয়ে তার পড়াশোনার কথা জিজ্ঞেস করলাম। সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “আমি শুধু হাইস্কুল শেষ করেছি।” তারপর যোগ করল, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার ওপর তার খুব একটা আস্থা নেই। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশির ভাগ সময় তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা হয়, বাস্তব জীবনে প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই সেখানে শেখানো হয় না; উপরন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় উদ্দেশ্য অর্থ উপার্জন করা। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে কথাটা শুনে আমি একটু চমকে গেলাম!

আদিল বলল, সে যা শিখেছে, প্রায় সবই নিজে নিজে কাজ করতে করতে শিখেছে (“Whatever I learned, I learned myself by doing”). নিজের সাফল্য নিয়ে তার মধ্যে বেশ আত্মবিশ্বাস ছিল। জানাল, এই বয়সেই বাবা-মায়ের জন্য একটি বাড়ি এবং গাড়ি কিনে দিয়েছে। আদিল বলল, ট্রেডিংয়ের সময় সে কখনো শুধু লাভের দিকে মনোযোগ দেয় না; তার আসল মনোযোগ শেখার দিকে। তার ভাষায়, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর অনেকটাই সে পেয়েছে লোকসান থেকে। যখনই কোনো ভুল সিদ্ধান্তে টাকা হারিয়েছে, তখন সেই ক্ষতি নিয়ে শুধু আফসোস করেনি। বরং ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দিয়েছে বোঝার জন্য — ভুলটা কোথায় হয়েছিল? কোন তথ্য সে উপেক্ষা করেছিল? সিদ্ধান্তের কোন জায়গায় আবেগ কাজ করেছিল? ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতিতে কী করা উচিত নয়? তার বক্তব্যের সারকথা ছিল, মানুষ অনেক সময় ক্ষতি এড়াতে এত বেশি শক্তি ব্যয় করে যে, ক্ষতি থেকে শেখার সুযোগটাই হারিয়ে ফেলে। ভুল বা ব্যর্থতাকে শুধু ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে যদি বিশ্লেষণ করা যায়, তবে সেটিই পরবর্তী সাফল্যের সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষক হয়ে উঠতে পারে। ২৬ বছরের এক যুবকের কাছ থেকে এমন কথা শুনব, আশা করিনি।বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে তার ধারণার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত নই, কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে শেখার গুরুত্ব নিয়ে তার এই দর্শন আমাকে মুগ্ধ করেছিল।

তার বক্তব্যের সারকথা ছিল, মানুষ অনেক সময় ক্ষতি এড়াতে এত বেশি শক্তি ব্যয় করে যে, ক্ষতি থেকে শেখার সুযোগটাই হারিয়ে ফেলে। ভুল বা ব্যর্থতাকে শুধু ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে যদি বিশ্লেষণ করা যায়, তবে সেটিই পরবর্তী সাফল্যের সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষক হয়ে উঠতে পারে।

আদিলের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি আমার চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল সামনের পর্দায় ফ্লাইট ম্যাপের দিকে। এটিও আমার এক পুরোনো অভ্যাস। দীর্ঘ ফ্লাইটে অন্যরা যখন সিনেমা দেখেন বা ঘুমান, আমি প্রায়ই বিমানের মানচিত্র দেখি।কোন দেশের ওপর দিয়ে উড়ছি, নিচে কোন শহর, কোন নদী, কোন মরুভূমি বা সমুদ্র।এবার সেই আগ্রহ যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছিল। দোহা ছাড়ার পর বিমান সৌদি আরবের ওপর দিয়ে এগিয়ে চলল পশ্চিমে। তারপর ইসরায়েল-সংলগ্ন অঞ্চল পেরিয়ে মিশরের দিকে। একসময় মানচিত্রে দেখতে পেলাম সুয়েজ খাল। তারপর আমরা প্রবেশ করলাম ভূমধ্যসাগরের আকাশে। পর্দার মানচিত্রটা তখন আমার কাছে যেন জীবন্ত ইতিহাসের বই।একদিকে মিশর ও লিবিয়ার উত্তর উপকূল, অন্যদিকে দূরে ক্রিট (গ্রিসের দ্বীপ)। সামনে কোথাও মাল্টা, আরও উত্তরে সিসিলি ও ইতালি। অসম্ভব রোমাঞ্চ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল—আহা, যদি বিমানটাকে একটু থামানো যেত! কয়েক ঘণ্টার জন্য নেমে সুয়েজ খালটা দেখে আসতাম, ক্রিটে একটু হাঁটতাম, মাল্টায় এক কাপ কফি খেয়ে আবার বিমানে উঠে বসতাম!

কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেই ভূমধ্যসাগরের নীল বিস্তারের দিকে তাকিয়ে অন্য এক বাস্তবতার কথা মনে হলো। এই একই সমুদ্র কত মানুষের কাছে সৌন্দর্য বা অবকাশের প্রতীক নয়, জীবন-মৃত্যুর সীমারেখা। লিবিয়া ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন উপকূল থেকে ছোট ও অনিরাপদ নৌকায় ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে বাংলাদেশি সহ বিশ্বের নানা দেশের অসংখ্য মানুষ এই সমুদ্রে প্রাণ হারিয়েছেন। International Organization for Migration-এর হিসাবে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথটি বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী পরিচিত অভিবাসনপথ; ২০১৪ সালের পর থেকে এই পথে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। বিমানের নিরাপদ আসনে বসে সেই সমুদ্রের ওপর দিয়ে উড়তে উড়তে নিজের জীবন নিয়েও ভাবলাম।কতটা সৌভাগ্যবান আমি! বাংলাদেশে জন্মেছি, জীবনের একটি পর্যায়ে অস্ট্রেলিয়ায় এসেছি, আর এখন এমন একটি দেশের নাগরিক হিসেবে বাস করি যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাওয়া আমার জন্য তুলনামূলক ভাবে সহজ। যে ইউরোপে পৌঁছাতে গিয়ে কেউ কেউ জীবনের সমস্ত সঞ্চয় তুলে দেন দালালের হাতে, মরুভূমি পাড়ি দেন, অনিশ্চিত নৌকায় প্রাণের ঝুঁকি নেন, সেই ইউরোপেই আমি চাইলে যে কোনো দিন বিমানের টিকিট কেটে যেতে পারি। একই পৃথিবী, একই আকাশ, একই সমুদ্র, অথচ মানুষের যাত্রাপথ কত অসম!

বিমান এগিয়ে চলল পশ্চিমে। তিউনিসিয়া ও আলজেরিয়া পার হয়ে ধীরে ধীরে মরক্কোর দিকে এগোচ্ছি। উত্তরে স্পেনও আর খুব দূরে নয়। মাঝখানে জিব্রাল্টার প্রণালী, ইউরোপ আর আফ্রিকার মধ্যকার সেই সরু জলপথ, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক অসাধারণ অধ্যায়। ৭১১ খ্রিস্টাব্দে উত্তর আফ্রিকা থেকে তারিক ইবনে জিয়াদের নেতৃত্বে একটি মুসলিম বাহিনী এই প্রণালী অতিক্রম করে আইবেরীয় উপদ্বীপে প্রবেশ করেছিল। তাঁর নাম থেকেই আরবি জাবাল তারিক—‘তারিকের পাহাড়’—পরবর্তীতে হয়ে যায় ‘Gibraltar’। এরপর আইবেরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে গড়ে ওঠে আল-আন্দালুস; বিভিন্ন মুসলিম রাজবংশের অধীনে সেই ইতিহাস ১৪৯২ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। পরবর্তী সময়ে বর্তমান মরক্কোভিত্তিক আলমোরাভিদ ও আলমোহাদ রাজবংশও আল-আন্দালুসের বড় অংশ শাসন করেছে।

মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে ইতিহাসের আরও স্তর খুলে যাচ্ছিল। উত্তর আফ্রিকার এই অঞ্চলটির পশ্চিমাংশকে বলা হয় মাগরেব। মূলত মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া এবং আরও পশ্চিমের মৌরিতানিয়া। মিশর উত্তর আফ্রিকার অংশ হলেও সাধারণত মাগরেবের অন্তর্ভুক্ত নয়। এই অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে আছে রোমান সভ্যতার অসাধারণ নিদর্শন—মরক্কোর ভলুবিলিস থেকে শুরু করে আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া ও লিবিয়ার বিভিন্ন প্রত্নস্থল পর্যন্ত। আবার আধুনিক ইতিহাসে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার অভিজ্ঞতাও দেশভেদে ভিন্ন—আলজেরিয়া দীর্ঘদিন ফরাসি শাসনে ছিল, তিউনিসিয়া ও মরক্কো ছিল ফরাসি protectorate, আর লিবিয়া ছিল ইতালীয় ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে। এসব ইতিহাস আগে পড়েছি। কিন্তু ৩৫ হাজার ফুট ওপর থেকে সেই দেশগুলোর নাম একে একে ফ্লাইট ম্যাপে ভেসে উঠতে দেখে ইতিহাসটা যেন আর বইয়ের তথ্য থাকছিল না। আর মজার ব্যাপার হলো, বিমানে ইন্টারনেট ছিল। ফলে কোনো দেশের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় কৌতূহল জাগলেই Google খুলে পড়তে শুরু করছিলাম; এই দেশের ইতিহাস কী, রোমানরা এখানে কোথায় ছিল, ফরাসিরা কখন এসেছিল, কোন রাজবংশ কোথায় শাসন করেছে, ইত্যাদি।

এভাবে পড়তে পড়তে, মানচিত্র দেখতে দেখতে এবং আদিলের সঙ্গে কথা বলতে বলতে একসময় অবশ্য ক্লান্তিও এসে গেল। এতক্ষণে দীর্ঘ যাত্রার ধকল শরীর জানান দিতে শুরু করেছিল। হঠাৎ ফ্লাইট ম্যাপে দেখলাম, আমরা মরক্কোর আকাশসীমায় ঢুকে পড়েছি। ওউজদা, ফেজ, মেকনেস, রাবাত হয়ে একসময় কাসাব্লাঙ্কার আকাশে ঢুকে বিমানটি ধীরে ধীরে নিচে নামতে শুরু করল। ক্যাপ্টেন ঘোষণা করলেন, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা কাসাব্লাঙ্কার মোহাম্মদ পঞ্চম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে যাচ্ছি। চুপচাপ বসে দোয়া-দরুদ পড়তে শুরু করলাম, নিরাপদে যেন অবতরণ করতে পারি।

অবশেষে বিমানের চাকা রানওয়ে ছুঁল।তবে অবতরণটা একেবারে মসৃণ হলো না। প্রথমবার রানওয়ে ছোঁয়ার পর বিমানটি যেন খানিকটা আবার ওপরে উঠে গিয়ে তারপর দ্বিতীয়বার মাটি স্পর্শ করল। আমি তখন বেশ গম্ভীর মুডে ছিলাম। কিন্তু মুহূর্তেই বহু বছরের পুরোনো একটি স্মৃতি মাথায় এসে গেল। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে আমার জিডি(পি) ক্যাডেট জীবনের কথা। প্রশিক্ষণের একেবারে শুরুর দিকে প্রপেলার চালিত পিটি-৬ বিমান নিয়ে আমরা যখন ল্যান্ডিং শেখার চেষ্টা করতাম, মাঝে মাঝে ঠিক এমন হতো। চাকা রানওয়ে ছুঁয়েই বিমান আবার একটু লাফিয়ে উঠত। আমাদের নিজেদের ভাষায় সেই অবতরণের একটা নামও ছিল।“মুরগি ল্যান্ডিং!” এত বছরের ব্যবধানে কাসাব্লাঙ্কায় বসে শব্দটা মনে পড়তেই নিজের অজান্তেই হেসে ফেললাম।

বিমান রানওয়ে ছেড়ে ট্যাক্সিওয়েতে ঢুকেছে মাত্র, এর মধ্যেই কয়েকজন যাত্রী সিট বেল্ট খুলে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি শুরু করে দিলেন। কেবিন ক্রু আবার বসে থাকার অনুরোধ করলেন। পৃথিবীর নানা জায়গায় এই দৃশ্য দেখেছি। বিমান পুরোপুরি থামার আগেই যেন সবার একটি অদ্ভুত তাড়া শুরু হয়ে যায়। নিরাপত্তা নির্দেশনা মানার এই অধৈর্যতার সঙ্গে সংস্কৃতি, অভ্যাস বা সচেতনতার কী সম্পর্ক, জানি না; তবে দৃশ্যটি আমার কাছে বেশ পরিচিত। আমি অবশ্য বসেই রইলাম। আমার তাড়া নেই। এত বছরের অপেক্ষার পর মরক্কোয় পৌঁছেছি—আর দু-চার মিনিটে কী আসে যায়!

কয়েক মিনিট পর বিমান থামল। সিট বেল্টের আলো নিভল। সবাই একে একে উঠে দাঁড়াল। আমি ব্যাগটা হাতে নিলাম। সামনে এখন আর কোনো ফ্লাইট ম্যাপ নেই, কোনো ইউটিউব ভিডিও নেই, কোনো ভ্রমণবিষয়ক বইও নেই। এবার আমি সত্যিই মরক্কোয়। আর কয়েক মিনিট পরই জীবনে প্রথমবারের মতো পা রাখব আফ্রিকার মাটিতে!