অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ। ২৩ বছর পর আবার টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে কঠিন মঞ্চে মুখোমুখি দুই দল। একদিকে বিশ্ব টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়া, অন্যদিকে ঘরের মাঠে সাম্প্রতিক সাফল্যে আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ। মাঝখানে উত্তর অস্ট্রেলিয়ার গরম ও আর্দ্র ডারউইন, নতুন মৌসুমের প্রথম টেস্ট এবং বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট।বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে শুরু হচ্ছে দুই ম্যাচের সিরিজের প্রথম টেস্ট। দ্বিতীয় টেস্ট ২২ আগস্ট থেকে ম্যাকের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায়। দুই ম্যাচই শুরু হবে স্থানীয় সময় সকাল ১০টায়।
বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু একটি টেস্ট সিরিজ নয়।অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নিজেদের ক্রিকেটীয় সামর্থ্যের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি। আর অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত হাজার হাজার বাংলাদেশির জন্য—নিজেদের দেশের পতাকা নিয়ে মাঠে দাঁড়িয়ে জাতীয় দলের খেলা দেখার এক বিরল সুযোগ।
এক নজরে সিরিজ
সিরিজ: অস্ট্রেলিয়া–বাংলাদেশ টেস্ট সিরিজ ২০২৬
ম্যাচ: ২টি
প্রথম টেস্ট: ১৩–১৭ আগস্ট, মারারা স্টেডিয়াম, দারউইন
দ্বিতীয় টেস্ট: ২২–২৬ আগস্ট, গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনা, ম্যাকে
শুরু: সকাল ১০টা স্থানীয় সময়
দারউইন সময়: সকাল ১০টা ACST
অ্যাডিলেড সময়: সকাল ৯টা ৩০ মিনিট ACST
সিরিজের ধরন: ICC World Test Championship ২০২৫–২৭
বাংলাদেশের অধিনায়ক: নাজমুল হোসেন শান্ত
অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক: প্যাট কামিন্স
সরাসরি সম্প্রচার: Channel Seven, 7plus, Kayo Sports ও Foxtel; ABC Radio-তেও লাইভ কভারেজ।
দুই দল এখন পর্যন্ত টেস্টে মুখোমুখি হয়েছে মাত্র ছয়বার। পরিসংখ্যান বলছে, অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্য একেবারে স্পষ্ট—পাঁচ জয় তাদের, বাংলাদেশের জয় মাত্র একটি। বাংলাদেশের সেই ঐতিহাসিক জয় এসেছিল ২০১৭ সালে ঢাকার মিরপুরে। ২০ রানের সেই জয় এখনো দুই দলের টেস্ট ইতিহাসে বাংলাদেশের একমাত্র সাফল্য। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বিদেশের মাটিতে এখনো টেস্ট জয়ের স্বাদ পায়নি বাংলাদেশ।
এই ইতিহাস অবশ্য বাংলাদেশের জন্য হতাশার হলেও বর্তমান দলকে বিচার করার একমাত্র মানদণ্ড নয়। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের টেস্ট দল বিদেশের মাটিতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সামর্থ্য দেখিয়েছে। গত দুই বছরে একাধিক দ্বিপক্ষীয় টেস্ট সিরিজে সাফল্য এসেছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠে ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ সিরিজ জিতেছে ২–০ ব্যবধানে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া অন্য মাত্রার পরীক্ষা।
সিরিজ শুরুর আগে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা এসেছে প্রস্তুতি ম্যাচে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে দুই দিনের ম্যাচে বাংলাদেশ ইনিংস ও ৩৮ রানে হেরেছে। দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৫৪ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশের ব্যাটিং।
সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে অস্ট্রেলিয়া একাদশের পেসার ক্যাম্পবেল থম্পসনের কাছ থেকে। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার এই পেসার মাত্র ২৫ রানে নিয়েছেন ৮ উইকেট। তবে বাংলাদেশ শিবিরের জন্য স্বস্তির জায়গাও আছে। প্রস্তুতি ম্যাচে মেহেদী হাসান মিরাজ দারুণ ব্যাটিং করে সেঞ্চুরি করেছেন। অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে বাংলাদেশের ব্যাটিং যে একেবারে মানিয়ে নিতে পারেনি, তা বলা কঠিন; বরং মূল প্রশ্ন হলো, অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক মানের পেস আক্রমণের সামনে তারা কতক্ষণ টিকে থাকতে পারে।
ছয় মাসের বেশি সময় পর অস্ট্রেলিয়া টেস্ট ক্রিকেটে ফিরছে। সর্বশেষ টেস্টে তারা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যাশেজ সিরিজ ৪–১ ব্যবধানে জিতেছে। বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজের জন্য তাই প্রায় পূর্ণশক্তির দলই বেছে নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। অধিনায়ক প্যাট কামিন্স ফিরেছেন। ফিরেছেন অভিজ্ঞ পেসার জশ হ্যাজলউড ও অফ স্পিনার নাথান লায়নও। মিচেল স্টার্ককে সঙ্গে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণ আবারও হয়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর। বিশেষ করে হ্যাজলউডের দিকে থাকবে বাড়তি নজর। তাঁর টেস্ট উইকেট এখন ২৯৫। দারউইনে আরও পাঁচটি উইকেট পেলেই ৩০০ টেস্ট উইকেটের মাইলফলক ছুঁবেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়েও বড় পরিবর্তন এসেছে। ট্রাভিস হেডকে আবার ওপেনিংয়ে দেখা যেতে পারে। অ্যাশেজে ওপেনার হিসেবে তাঁর সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালের শুরু থেকে টেস্টে ওপেনার হিসেবে তাঁর স্ট্রাইক রেট ৯১.৭—একাধিক ইনিংসে ওপেন করা ব্যাটারদের মধ্যে যা সেরা। তাঁর সঙ্গে জেক ওয়েদারাল্ড। এরপর মারনাস লাবুশেন, স্টিভ স্মিথ ও ক্যামেরন গ্রিন। উইকেটের পেছনে অ্যালেক্স ক্যারি। সাত নম্বরে অলরাউন্ডার বিউ ওয়েবস্টারকে খেলানোর সম্ভাবনাও প্রবল। অর্থাৎ বাংলাদেশের বোলারদের সামনে শুরু থেকেই অভিজ্ঞতা ও আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের মিশেল।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য একাদশে মেহেদী হাসান মিরাজই হতে পারেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন। ব্যাট হাতে তিনি ইতিমধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে মানিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। বল হাতেও তাঁর অফ স্পিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যদি দারউইনের উইকেট ম্যাচের শেষ দিকে স্পিনারদের সহায়তা করে, মিরাজ ও তাইজুল ইসলাম জুটি অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংকে চাপে ফেলতে পারে। গত দুই বছরে বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে তাইজুল ৭৫ উইকেট নিয়ে সবচেয়ে সফল বোলার। মিরাজ নিয়েছেন ৫৫টি। আরেকটি ব্যক্তিগত মাইলফলকও সামনে। মুশফিকুর রহিম টেস্টে ৭ হাজার রানের মাইলফলক থেকে মাত্র ১৯৪ রান দূরে।
বাংলাদেশের প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে পেস বিভাগে দ্রুতগতির পেসার নাহিদ রানা সাইড ইনজুরির কারণে প্রথম টেস্ট থেকে ছিটকে গেছেন। শরিফুল ইসলামও হ্যামস্ট্রিং চোটে বাইরে। ফলে অস্ট্রেলিয়ার গতি ও বাউন্সের বিপরীতে বাংলাদেশের পেস আক্রমণে অভিজ্ঞতা ও গভীরতা—দুই জায়গাতেই প্রশ্ন রয়েছে। শরিফুল দ্বিতীয় টেস্টে ফিরতে পারেন বলে আশা আছে। এই অবস্থায় তাসকিন আহমেদ, হাসান মাহমুদ, এবাদত হোসেন ও খালেদ আহমেদের ওপর বড় দায়িত্ব।
সম্ভাব্য একাদশ
অস্ট্রেলিয়া
১. জেক ওয়েদারাল্ড
২. ট্রাভিস হেড
৩. মারনাস লাবুশেন
৪. স্টিভ স্মিথ
৫. ক্যামেরন গ্রিন
৬. অ্যালেক্স ক্যারি (উইকেটকিপার)
৭. বিউ ওয়েবস্টার
৮. মিচেল স্টার্ক
৯. প্যাট কামিন্স (অধিনায়ক)
১০. নাথান লায়ন
১১. জশ হ্যাজলউড
এই একাদশটিই ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচ-পূর্ব সম্ভাব্য একাদশে রাখা হয়েছে। তবে স্কট বোল্যান্ডও বোলিং আক্রমণে জায়গা পাওয়ার দাবিদার।
বাংলাদেশ
১. সৌম্য সরকার
২. শাদমান ইসলাম
৩. মুমিনুল হক
৪. নাজমুল হোসেন শান্ত (অধিনায়ক)
৫. লিটন দাস (উইকেটকিপার)
৬. মুশফিকুর রহিম
৭. মেহেদী হাসান মিরাজ
৮. তাইজুল ইসলাম
৯. তাসকিন আহমেদ
১০. এবাদত হোসেন
১১. সৈয়দ খালেদ আহমেদ
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচ-পূর্ব বিশ্লেষণেও এই ১১ জনকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য একাদশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামও এই গল্পের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। এখানে সর্বশেষ টেস্ট হয়েছিল ২০০৪ সালে। এর আগে ২০০৩ সালে বাংলাদেশই এই মাঠে টেস্ট খেলেছিল এবং অস্ট্রেলিয়ার কাছে ইনিংস ও ১৩২ রানে হেরেছিল। এবার সেই মাঠেই ২৩ বছর পর বাংলাদেশ ফিরছে।আর সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচ হবে ম্যাকের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায়। এটি হবে পুরুষদের টেস্ট ক্রিকেটের নতুন ভেন্যু হিসেবে ম্যাকের ঐতিহাসিক অভিষেক। অর্থাৎ বাংলাদেশ শুধু একটি সিরিজ খেলছে না; অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের নতুন একটি অধ্যায়েরও অংশ হয়ে যাচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শহরে বসবাসরত বাংলাদেশিদের কাছে এই সিরিজের আবেগ অন্য রকম। দেশের জাতীয় দল যখন নিজের প্রবাসভূমিতে খেলতে আসে, তখন ক্রিকেট আর কেবল খেলা থাকে না—এটি হয়ে ওঠে পরিচয় ও শিকড়ের সঙ্গে সংযোগের একটি উপলক্ষ।
ডারউইন ও কুইন্সল্যান্ডের বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেকেই মাঠে গিয়ে খেলা দেখার প্রস্তুতি নিয়েছেন। অ্যাডিলেড, সিডনি, মেলবোর্ন, ব্রিসবেন ও পার্থ থেকেও বাংলাদেশি ক্রিকেটপ্রেমীদের অনেকে সিরিজ অনুসরণ করবেন।
কাগজে-কলমে অস্ট্রেলিয়া অনেক এগিয়ে। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চলতি চক্রে তারা সাত জয় ও এক হার নিয়ে শীর্ষে, পয়েন্ট শতাংশ ৮৭.৫০। বাংলাদেশ খেলেছে চারটি ম্যাচ। তবে টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্য এখানেই—পরিসংখ্যান মাঠে নামে না, নামে ১১ জন ক্রিকেটার।
বাংলাদেশের জন্য তাই প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত অস্ট্রেলিয়াকে হারানো নয়; বরং প্রথম সেশনটি জেতা, নতুন বল সামলানো, বড় জুটি গড়া এবং ম্যাচকে চতুর্থ-পঞ্চম দিনে নিয়ে যাওয়া। কারণ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ টেস্টও বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য বড় বার্তা হতে পারে। আর যদি সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ পর্যন্ত জয়ে রূপ নেয়?।তাহলে ২০১৭ সালের মিরপুরের ২০ রানের সেই জয় আর একমাত্র উদাহরণ থাকবে না।
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ—ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি দল। ডারউইনের প্রথম বল থেকেই শুরু হবে সেই নতুন গল্প।
Source: ABC news