আপনি যদি না থামেন, তাহলে ‘শেষ’ বলে কিছু নেই’: ধন্যবাদ নাজমুস সোহান

নক্ষত্রদের বোধহয় অন্ধকারের সঙ্গেই সবচেয়ে গভীর সখ্য। গভীর আঁধার না এলে যেমন তারার আলো ফোটে না, তেমনি জীবনের নিকষ অন্ধকার ভেঙে না উঠলে হয়তো জানা যায় না মানুষের ভেতরের রূপকথার মতো শক্তিমত্তা। ডুমুরিয়া হাইস্কুলের ধুলোউড়ানো মাঠে যে ছেলেটি একদিন একলা হেঁটে বেড়াত, তার বুকে ছিল এক পাহাড়সম অবাধ্য স্বপ্ন। আজ সেই নাম কেবল একটি নাম নয়; রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান এয়ার ফোর্সের আকাশে ডানামেলা এক রক্তমাংসের ফিনিক্স পাখি—ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নাজমুস সোহান।

সাতক্ষীরার তালার কাদা-মাটি থেকে রাজকীয় অস্ট্রেলীয় বিমানবাহিনীর আকাশ—নাজমুস সোহানের জীবনের এই দীর্ঘ ক্যানভাস কেবল সাফল্যের গল্প নয়। এটি এক হার না মানা মানুষের জীবনের মহাকাব্য, যা আমাদের কানে কানে বলে যায়: “যদি তুমি থামতে না চাও, তবে নিশ্চিত জেনো—মৃত্যু ছাড়া জীবনের শেষ বলে কিচ্ছু নেই।”

মাত্র ১৩ বছর বয়স। কৈশোরের আনন্দ, মায়ের আদুরে শাসন আর বাবার স্নেহের ছায়া—সবকিছু এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায়। এক নিমিষে কিশোর সোহানের দুই চোখজুড়ে নেমে এসেছিল ঘোর অমা নিশা। মা-বাবার নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থমকে গিয়েছিল, সেই শূন্যতা ভরা সম্ভব ছিল না কোনো কিছুতেই। বছর তিনেক পর বড় ভাই পাড়ি জমান সুদূর অস্ট্রেলিয়ায়। সোহানের ঠাঁই হয় ফুফুর বাড়ি। অভিভাবকহীন জীবনের তীব্র একাকীতায় প্রতিটি দিন কাটানো সহজ ছিল না। কিন্তু সোহান থামেননি। বাবার রেখে যাওয়া নীতি আর ভেতরের এক অদ্ভুত জেদকে আঁকড়ে ধরে ২০১৫ সালে পাড়ি জমান মেলবোর্নের মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

পরবাসের জীবন মানেই তো এক অসম লড়াই। অচেনা দেশ, বরফশীতল একা ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে নিজের ছায়াকেই আপন করে নেওয়া। ২০১৬ সালে জীবনের এই দীর্ঘ মরুযাত্রায় যেন একটুখানি স্নিগ্ধ বৃষ্টি হয়ে এলেন সুরাইয়া মান্নান। ডুমুরিয়ার জমাদ্দার পরিবারের সেই মেয়েটি কেবল সোহানের হাত ধরেননি; ধরেছিলেন এক নিঃশ্বাসের বিশ্বাস। ভেঙে পড়তে যাওয়া একটা মানুষকে নতুন করে বাঁচতে শেখালেন সুরাইয়া। তিনি হলেন সোহানের ঝোড়ো জীবনের সবচেয়ে শান্ত, সুরক্ষিত এক নোঙর।

এরপরের পথটা কেবলই ভাঙাগড়ার। মেলবোর্ন থেকে ব্রিসবেন, সিডনি হয়ে শেষমেশ অ্যাডিলেডে থিতু হওয়া। পড়াশোনার বাঁধাধরা পথ ছেড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেমেছিলেন ব্যবসায়। একটার পর একটা উদ্যোগ ভেস্তে গেছে, রাত জেগে হিসেব মিলিয়েছেন অংক না মেলা জীবনের। কিন্তু হার মানেননি। আজ তিনি বাংলাদেশের তরুণদের প্রিয় ব্র্যান্ড ‘হেভি মেটাল টি-শার্ট’-এর সহ-মালিক, অস্ট্রেলিয়ার একটি কলেজের সহ-মালিক এবং ভাষা স্কুলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা।

ব্যবসায়িক সাফল্যের স্বর্ণশিখরে দাঁড়িয়েও সোহানের ভেতরের সেই অবাধ্য স্বপ্নটা কড়া নাড়ছিল। ২০২৩ সালে নেন এক দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত—রাজকীয় অস্ট্রেলিয়ান বিমানবাহিনীতে (RAAF) যোগ দেওয়ার। কোনো প্রথাগত সামরিক বা উড্ডয়ন ডিগ্রি ছাড়া, কেবল অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর আট বছরের প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে সরাসরি যোগ দেন ‘ফ্লাইং অফিসার’ পদে।

প্রশিক্ষণটা কেবল শারীরিক ছিল না, ছিল নিজেকে প্রতিনিয়ত ভেঙে নতুন করে গড়ার চরম পরীক্ষা। উত্তর কুইন্সল্যান্ডের নিঝুম, আদিম জঙ্গলে ‘কমব্যাট সারভাইভাল’ ট্রেনিংয়ের সেই দিনগুলো—যেখানে একা, হিংস্র বন্যপ্রাণীর গর্জন আর সীমিত রসদ নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করতে হতো। প্রতিটি রাতে নক্ষত্রখচিত আকাশের দিকে তাকিয়ে হয়তো মায়ের মুখটা মনে পড়ত, মনে পড়ত বাবার শেষ কথাগুলো। সেই অদম্য মানসিক শক্তি দিয়েই ২০২৬ সালের ২ জুন তিনি অর্জন করেন মর্যাদাপূর্ণ ‘ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট’ পদ। বর্তমানে তিনি অ্যাডিলেডের এডিনবরা বিমানঘাঁটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের ‘অফিসার-ইন-চার্জ’।

অস্ট্রেলিয়ার রাজকীয় এয়ার ফোর্সে একজন ইমাম ছাড়া আর কোনো বাংলাদেশি অফিসার পদে ছিলেন না। আজ সোহানকে দেখে বহু তরুণ বুক বাঁধছেন, স্বপ্ন দেখছেন নীল আকাশ ছোঁয়ার। সোহান কেবল একটি ইউনিফর্ম পরেন না, তিনি বহন করেন হাজারও প্রবাসী তরুণের স্বপ্ন। কঠিন সামরিক মহড়ার শেষে যখন গোধূলি নেমে আসে, তখন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সোহান বদলে যান এক পরম স্নেহময় বাবায়। এক বছরের ছোট্ট মেয়ে ‘সিজদা’র এক চিলতে হাসির কাছে পৃথিবীর সব পদক যেন মলিন হয়ে যায়। আবার ইউনিফর্মের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক পরম করুণাময় হৃদয়—কাউকে না জানিয়ে নিঃশব্দে গরিবের ঘর তুলে দেওয়া, শীতের রাতে কম্বল পৌঁছে দেওয়া কিংবা মসজিদ নির্মাণের অনুদান পাঠানো। ডান হাত যা দান করে, বাঁ হাত তা টের পায় না।

সাতক্ষীরার তালার কাদা-মাটি থেকে রাজকীয় অস্ট্রেলীয় বিমানবাহিনীর আকাশ—নাজমুস সোহানের জীবনের এই দীর্ঘ ক্যানভাস কেবল সাফল্যের গল্প নয়। এটি এক হার না মানা মানুষের জীবনের মহাকাব্য, যা আমাদের কানে কানে বলে যায়: “যদি তুমি থামতে না চাও, তবে নিশ্চিত জেনো—মৃত্যু ছাড়া জীবনের শেষ বলে কিচ্ছু নেই।”