অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসনমন্ত্রী টনি বার্ক দীর্ঘ প্রতীক্ষিত অভিবাসনসংক্রান্ত পরিবর্তন ঘোষণা করেছেন। নতুন ব্যবস্থায় পর্যটক, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও ওয়ার্কিং হলিডে ভিসাধারীদের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের এক ভিসা থেকে অন্য ভিসায় যাওয়ার প্রবণতা এবং পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে আসার সুযোগ সীমিত করা হবে। বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থায় বহুল প্রতীক্ষিত এসব পরিবর্তনের ঘোষণা দেন টনি বার্ক। কয়েক সপ্তাহ ধরে এ নিয়ে আলোচনা ও জল্পনা চলছিল।
নতুন পরিবর্তনগুলোর জন্য নতুন কোনো আইন করা হচ্ছে না। বিরোধী জোটের সঙ্গে আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর সরকার বিদ্যমান ব্যবস্থার আওতায় পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়ন করবে। একই সঙ্গে বৈধ ভিসা ছাড়া অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানকারীদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করার ক্ষেত্রে নিয়মকানুন আরও কঠোর করা হবে।
অভিবাসন কমানোর লক্ষ্য
সরকারের নতুন পদক্ষেপের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার নিট বিদেশি অভিবাসন বা Net Overseas Migration (NOM) কমিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
টনি বার্কের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে নিট বিদেশি অভিবাসনের সংখ্যা ২ লাখ ৯২ হাজার ১০০। ২০২৬–২৭ অর্থবছরে এটি বাজেটের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২ লাখ ৪৫ হাজারে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর প্রতি বছর এই সংখ্যা ২ লাখ ২৫ হাজারে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকার বলেছে, যারা অস্ট্রেলিয়ায় সত্যিকার অর্থে অবদান রাখেন, তাদের দেশ স্বাগত জানায়। তবে অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার বা প্রতারণা ঠেকাতে সরকার আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়—কে অস্ট্রেলিয়ায় আসবেন, কে থাকবেন এবং কে দেশ ছাড়বেন।
তবে সরকারের ঘোষণায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ‘ভিসা হপিং’ বন্ধে সুনির্দিষ্ট কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা বিস্তারিত জানানো হয়নি। একইভাবে, যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ভিসা আবেদনে সহযোগিতা করা অসাধু মাইগ্রেশন এজেন্টদের বিরুদ্ধে কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটিও স্পষ্ট করা হয়নি।
দক্ষ অভিবাসনে অগ্রাধিকার
দক্ষ অভিবাসন কর্মসূচিতে কিছু পরিবর্তন আনা হবে। নতুন ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, প্রতিরক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি, অ্যাকুয়াকালচার এবং মৎস্য খাতের আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
পর্যটকদের জন্যও নতুন নিয়ম
অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানের মেয়াদ বাড়ানোর ক্ষেত্রে পর্যটকদের ওপরও নতুন বিধিনিষেধ আসছে।
সরকার ভিজিটর ভিসায় ‘No Further Stay’ শর্ত চালু করবে। এর ফলে নির্দিষ্ট ভিসা শর্তের অধীনে থাকা পর্যটকদের অস্ট্রেলিয়ায় থেকেই অবস্থানের মেয়াদ বাড়ানো বা অন্য ভিসায় যাওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে।
ওয়ার্কিং হলিডে ভিসায় পরিবর্তন
কৃষি ও পর্যটন খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ Working Holiday Maker ভিসাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
নতুন ব্যবস্থায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরের ওয়ার্কিং হলিডে ভিসার জন্য ব্যালট বা লটারিভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করা হবে। পাশাপাশি আঞ্চলিক এলাকায় কাজ করার অতিরিক্ত শর্তও যুক্ত করা হবে।
বর্তমানে ওয়ার্কিং হলিডে ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াকরণে যে স্থগিতাবস্থা রয়েছে, সেটিও শেষ করা হবে। সরকার আশা করছে, ভবিষ্যতে এসব আবেদনের প্রক্রিয়াকরণের সময় প্রায় তিন মাসের মধ্যে স্থিতিশীল রাখা যাবে।
অপরাধে জড়িত অভিবাসীদের ভিসা বাতিলের ক্ষমতা বাড়বে
শিশুদের লক্ষ্য করে সংঘটিত অপরাধ, পারিবারিক সহিংসতা এবং হেট ক্রাইম বা বিদ্বেষমূলক অপরাধে জড়িত অভিবাসীদের ভিসা বাতিলের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে আরও ক্ষমতা দেওয়া হবে।
টনি বার্ক বলেন, সরকার অভিবাসনকে সমর্থন করে। তবে কেউ যেন অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে চায়।
তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় আসা প্রায় সবাই দেশটির জন্য ভালো অতিথি। নতুন সংস্কারের লক্ষ্য হলো অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান প্রয়োজন অনুযায়ী অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে পরিচালনা করা।
রাজনৈতিক চাপের মধ্যেই ঘোষণা
অভিবাসনমন্ত্রী টনি বার্কের জন্য এটি অভিবাসন পরিবর্তনের দ্বিতীয় দফা ঘোষণা। এর প্রায় ছয় সপ্তাহ আগে মন্ত্রিসভার মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে তিনি প্রথম ঘোষণাটি বাতিল করেছিলেন।
এদিকে ওয়ান নেশন সোমবার তাদের অভিবাসন পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। দলটি তিন বছরে ৭ লাখ ৫০ হাজার অভিবাসী কমানোর পরিকল্পনা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও পারিবারিক ভিসার ক্ষেত্রেও আরও কঠোর বিধিনিষেধ এবং ব্যাপক বহিষ্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
অন্যদিকে কোয়ালিশন নতুন আবাসন নির্মাণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিট বিদেশি অভিবাসন কমানোর পক্ষে। তবে অভিবাসন নিয়ে বৃহত্তর আইনগত সংস্কারের বিষয়ে সরকার ও কোয়ালিশনের আলোচনা ভেঙে গেছে।
বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেলর বলেছেন, কোয়ালিশনের অভিবাসন নীতি যথাসময়ে প্রকাশ করা হবে। একই সঙ্গে তিনি অভিবাসনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন।
অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নিট বিদেশি অভিবাসন প্রায় ২ লাখ ৯৯ হাজার থেকে কমে মার্চ পর্যন্ত ১২ মাসে ২ লাখ ৯২ হাজার ১০০ হয়েছে। একই সময়ে অস্ট্রেলিয়ার মোট জনসংখ্যা ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ২ কোটি ৭৯ লাখে পৌঁছেছে।
সূত্র: 7NEWS Australia