মতিউর রহমান: ঐতিহ্যবাহী এক কলেজের নামকরা অধ্যাপকের একমাত্র ছেলে সাদমান সাকিব তার বাবা মায়ের কাছে থেকেই ইন্জিনিয়ারিং পাস করলো। পৌরাণিক কাহিনির এক লাল নাকি সাত রাজার ধন তাই বড় তিন বোন সাকিবকে লাল বলেই ডাকত। অধ্যাপক বাবার ইচ্ছা ছেলে আরও বড় ডিগ্রি নিবে তাই উনি ছেলেকে এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির এমএসসি ইন্জিনিয়ারিং কোর্সে ভর্তির ব্যবস্থা করলেন। চোখে মুখে অনেক আশা নিয়ে সাকিব থাইল্যান্ডে হাজির কিন্তু দুই তিন দিন পার না হতেই সাকিবের চোখে মুখে নিরাশার ছাপ। কারণ সে দেশে থাকতে জানতো থাইল্যান্ডের হোস্টেলে ছেলে মেয়ে এক রুমে থাকে বা রাতেরবেলা মেয়েরা এসে দরজায় নক করে। কিন্তু এখানে এসবের বিন্দুমাএ না দেখে সাকিব হতাশ। যা হউক হতাশা কাটিয়ে সাকিব পড়াশোনায় মন দিলো কারন একটু হলেও তার মাথায় আছে যে তার আদর্শবান বাবা প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে তার টিউশন ফি পে করেছেন আর আসার সময় তিন মাসের খরচ ডলার করে দিয়েছেন এবং পরবর্তীতে ৩/৪ মাসের খরচ হিসাব করে বাংলাদেশ বাংকের মাধ্যমে পাঠাবেন। সাকিব পড়াশোনার পাশাপাশি বান্ধবী খোঁজার চেষ্টা করতে থাকলো এবং কম্পিউটার ল্যাবে বসেই বেশিরভাগ সময় অন লাইন চ্যাট ‘ বাংকক চ্যাট’ এ ইন্জিনিয়ার সাদমান নামে চ্যাট করতো। একদিন সাকিবের ঠিক পিছনের ডেস্কে খুলনা ইউনিভার্সিটির এক ভাই চ্যাট করছিল আর তার মাথায় কুবুদ্ধি চাপাতে সে ‘লামাই’ নাম দিয়ে ইন্জিনিয়ার সাদমানের সাথে চ্যাট শুরু করলো। অনেকক্ষণ কথোপকথনের পর লামাই ও ইন্জিনিয়ার সাদমান সিদ্ধান্ত নিলো তারা পরের দিন সকাল দশটায় বিখ্যাত শপিং মল ফিউচার পার্কের মেইন এনট্রেনসে দেখা করবে। পরের দিন সাকিব ক্লাস বাং মেরে সকল দশটার আগেই ফিউচার পার্কের মেইন এনট্রেনসে হাজির কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও লামাই এর দেখা মিললো না। ডেটিং এ যাওয়ার আগে সাকিব তার এক বিশ্বস্ত বন্ধুকে ব্যাপারটা জানিয়ে গিয়েছিল এবং বন্ধুটি ডেটিং এর অগ্রগতির কথা জানতে চাইলে সাকিব বললো যে বুড়ী মহিলা, তাই ডেটিং না করেই সে ফিরে এসেছে।
এদিকে সাকিবের ভিলামেট এরফান এক প্লাস সাইজ থাই তরুণী কে বাগিয়ে ফেলেছে এবং সে ভিলায় এসে কমন ওয়াশরুমের বধনা ইউজ করে। এতে সাকিবের বিরাট আপত্তি কারন একই বধনা সে ওজু করার কাজে বাবহার করে। কিন্তু তার আপত্তির কথা বাংলা কমুনিটিতে জানিয়েও কোনো লাভ হলো না। একদিন সাকিব বেজায় খুশি কারন তার ভিলামেট এরফান মোটু বান্ধবীকে নিয়ে বিপদে পড়েছে যা অ্যাম্বুলেন্স হসপিটাল পরযন্ত গড়িয়েছে। সেদিন সকালে এরফানের মোটু বান্ধবী এরফানকে না জানিয়ে ভিলায় হাজির এবং এরফানের রুমে আরেক স্লিম থাই তরুণীকে দেখে সংগে সংগেই সেন্সলেস।
স্টুডেন্ট ইউনিয়ন আয়োজিত জানুয়ারী টার্মে আগত ছাত্র-ছাত্রীদের সম্বরণ শেষে ক্যাফে ক্লাবে বিশাল জাঁকজমকপূর্ণ ডিজে পার্টির আয়োজন। হঠাৎ দেখি স্টুডেন্ট ইউনিয়নের জিএস নাদিরা ( শ্রীলঙ্কান বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক) একজন সিকিউরিটি গার্ড এর সহায়তা নিয়ে সাকিবকে বের করে দেয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু সে বের হবে না। অগত্যা জিএস তার পরিচিত এক বাংলাদেশী ভাই এর হেল্প চাইলো এবং ভাই টি সাকিব কে জোর করে ধাক্কাতে ধাক্কাতে বাইরে নিয়ে আসলো। সাকিবের এ অস্বাভাবিক আচরণ আমাকে বিস্মিত করলো সে শুধু বলছে ” ওকে সবাই খেয়ে ফেলবে! ওকে বাঁচা! ” পরে জানতে পারলাম নতুন টার্মে আসা এনএসইউ এর এক বেশ স্মার্ট বোনের সবার সঙ্গে নাচাটা সাকিব মেনে নিতে পারেনি। তাহলে কেউ বলতে পারে যে সেদিন আমরা সাকিবের তীব্র বাংগালী ভাবাবেগ বা অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলাম না। এ ঘটনা থেকে শিক্ষা না নেয়ার শান্তি আমাকে পরবর্তীতে পেতে হয়েছিল।
যাক ফিরে আসি সাকিবের চলমান এআইটি জীবনের গল্পে। এনএসইউএর সে স্মার্ট বোনটি টার্ম ব্রেকে দেশে থাকাকালীন সাকিবের ই মেইল পেয়ে অনেক গুলো কেয়া কসমেটিকসের হালাল সাবান নিয়ে এসে আমাকে বললো, মতি ভাই সাকিব কে? এদিকে বাংলাদেশী ছাএীদের কমন অভিযোগ, ভাই রাতে লান্ড ফোনের বিকট শব্দে ঘুম ভাংগে কিন্তু রিসিভ করার পর কথা বলে না। তবে সাকিবের সঙ্গে ফোনে আমাদের এক স্মার্ট ভাবী- আফরোজা ভাবীর রীতিমতো কথা হতো। সাকিব ভাবীর কাঁচা বাজার করে দিতে চাই আর ভাবী উত্তরে বলে, ভাই আমরা রান্নাবাড়ি করি না। একদিন এক অনুষ্ঠানে সাকিব আফরোজা ভাবীর পাশে বসে কোন এক বিশেষ কায়দায় চোখ ও ঘাড় ঘুরিয়ে ভাবীর পেট দেখা শুরু করলো। এটা আবার পিছনে বসা অন্য এক ভাবি দেখে কৌশল টা রপ্ত করে পরবর্তী এক অভিনয় প্রতিযোগিতায় ১ম স্থানের অধিকারিনী হলেন।
২০০৩ সালের মার্চ বা এপ্রিল মাসের দিকে বাংলাদেশ থেকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় এক হাই প্রোফাইল কালচারাল টিম থাইল্যান্ডে এলো। টিমে ছিলো জিনাত বরকত উল্লাহ, বেবি নাজনীন, মেহেরিন, পলাশ ও আরো অনেকে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অফিসিয়াল
অনুষ্ঠানের আগে একটা পূর্ণাংগ রিহার্সালের জন্য এআইটি অডিটোরিয়াম এবং কালচারাল টিমের জন্য অডিটোরিয়ামের উপরেই ফোর স্টার হোটেল সিলেক্ট করা হলো। কালচারাল অনুষ্ঠান রাত ৭ টায় শুরু এবং প্রধান অতিথি ততকালীন এআইটি প্রেসিডেন্ট মারকিন নাগরিক প্রফেসর লুইস আরমানড। দুপুরের দিকে সাউণ্ড লাইট টিউনিং এর সঙ্গে সঙ্গে প্রাক রিহার্সালের কাজ চলছে। প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ গানের শেষে দন্ডায়মান পোজের মধ্যমণি বেবী নাজনীন যার হাতে বিশাল পতাকা থাকবে। জিনাত তাই বার বার বলছে, বেবী কই? বেবী কই? খবর এলো বেবী ঘুমাচ্ছে এবং সে আসবে না। জিনাতের আার কি করার, মধ্যখান ফাঁকা রেখেই দন্ডায়মান পোজ শেষ করলো।বিনা পয়সায় এত নামীদামি শিল্পীদের শো উপভোগ করা আমাদের সৌভাগ্য ছিলো বৈকি। এদিকে বেবীর কন্ঠ আর গ্ল্যামারের সম্মিলিত আকর্ষণে মোহিত হয়ে প্রফেসর লুইস আরমানড চেয়ার ছেড়ে উঠে হাততালি দেয়া শুরু করলেন। অনুষ্ঠান শেষে ডিনারের পালা এবং কেন্দ্রীয় ক্যানটিনে ডিনারের আয়োজন যা অডিটোরিয়াম থেকে দুই মিনিটের হাঁটা পথ। আমার বন্ধু ডক্টর রেজা রংপুরের ছেলে হওয়ার সুবাদে বেবীকে বললো, আপা অনান্য স্টেজ পারফরম্যান্স এর চেয়ে একটু কম করলেন না। উত্তরে বেবী জানালো, রাষ্ট্রীয় কালচারাল সফরে আমাদের কিছু গাইডলাইন থাকে বা আপনি এটাকে রেসটিকশন ও বলতে পারেন। যাক বাংলাদেশ সরকারের রেসটিকশন আমাদের প্রেসিডেন্ট লুইস আারমানডকে অন্তত লুইচ আরমানড হওয়া থেকে বিরত রেখেছে। আমি আমার স্বকীয় কায়দায় কেন্দ্রীয় ক্যানটিনে পোঁহচার আগেই কেটে পড়লাম। পরের দিন ডক্টর রেজা মন খারাপ করে, মতিভাই আপনি থাকতে থাকতে কখন উধাও হয়ে গেলেন! এদিকে আপনার বিখ্যাত সাকিব তো আমাদের মান সম্মান ডুবিয়ে দিয়েছে। রেজার বর্ননা অনুযায়ী -বেবী প্লেটে খাবার নিয়ে পিছনের কর্নারের এক টেবিল একাই বসে খাচ্ছিলেন, এসময় সাকিব হঠাত বেবীর সামনের চেয়ারে বসে ” আমি আপনার অনেক বড় ফ্যান, কাল সারা রাত—-, ” বেবী সঙ্গে সঙ্গে ” উঠেন এখান থেকে! ” সাকিব চোখ মুখ লাল করে পালাতে পালাতে ” শালী কালনীও পাত্তা দেয় না।”
যা হউক বান্ধবী খোঁজার কাজে সাকিব রবার্ট ব্রুসের অনুসারী এবং শেষ পরযন্ত সে কৃতকার্যও হলো বটে।
কত সাধনার বান্ধবী এমা, আমস্টারডাম বিশব্বিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত ইন্দোনেশীয় বংশোদ্ভূত ডাচ নাগরিক। এমা তার পরের টার্ম ব্রেকটা বন্ধু সাকিবের সাথে থাইল্যান্ডে এসে কাটাতে চাই। সাকিব এমার জন্য আমস্টারডাম টু ব্যাংকক ফিরতি টিকিট করে পাঠালো এবং স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার অফিস থেকে তার রুমে বান্ধবী এমাকে রাখার অনুমতি নিয়ে নিলো। বেশ চটপটে ও ডিটারমাইনডিড এমা বাইসাইকেলে সারা ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়ায় আর এদিকে সাকিবের বদন থেকে হাসি বা হাঁপিনেস উধাও! কারণ জানা গেলো, সাকিবের বাবার পাঠানো তিন মাসের খরচের টাকা এমা নিজের কাছে নিয়ে নিয়েছে এবং তার ইচ্ছার বাইরে কোনো খরচ নয়, এমনকি সাকিব তার মানিব্যাগও বহন করতে পারে না। মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে কারো বুঝার উপায় নেই যে, সে কাওকে এরকম অলিখিত ডিটেনশন দিয়ে দিতে পারে। সাকিবের এই ডিটেনশন আমাকে অনেক কষ্ট দিলো। এর চেয়ে বরং একদিন গৌরী বৌদি কে দেখে ভয় পাওয়া টা ছিলো আমার জন্য অনেক সাভাবিক। কলকাতার মেয়ে গৌরী বৌদি কে দেখে আমি এতটাই ভয় পেয়েছিলাম যে, সঙ্গে সঙ্গে ডক্টর রেজার বাসায় ঢুকে ভাবীকে বললাম ” এক গ্লাস পানি দেন”। ধারণা করি সেদিন গৌরী বৌদি দাদার উপর রাগ শেষ না করেই বাহির হয় এবং তার চোখের অগ্নি বর্ষনের শিকার ছিলাম আমি।
শুক্রবার রাতে ক্যাফে ক্লাবে হালকা পান বা হালকা নাচ এআইটি জীবনের খুব সাধারণ ব্যাপার। আর বিশেষ যে কোন উপলক্ষে কুরি হাউজ নামে খ্যাত পার্টিহাউজের মিউজিকের বিট ছিলো রক্তে নাচন ধরানোর উত্তম জায়গা। প্রায় সময় আমি আমার সেই স্মার্ট ভাবী- আফরোজা ভাবীকে বলতাম, “সবাই নাচে, আপনি ছাড়া “। ভাবী বলতো ” ভাই, আমি একদিনই নাচবো সেটা আপনার সঙ্গে আপনাদের বিদায় পার্টিতে।সেদিন আমি শাড়ি পরে খ্যামটা নাচ দিবো। এটা যে ভাবীর কথার কথা ছিলো না তার নজির পেলাম আমাদের বিদায় পার্টিতে কুরি হাউজে বাংলা গানে নাচানাচি। হঠাৎ দেখি ভাবী নাই। পরের দিন ক্যানটিনে ভাবীর সাথে দেখা। ভাবী বললো, ভাই গতকাল সাঙ্ঘাতিক ভুল হয়ে গেছে। আপনার সঙ্গে নাচা টা আমার ছোট ছেলে মেনে নিতে পারিনি। তাই কাওকে না জানিয়ে চলে এসেছিলাম। ছোট ছেলের অভিযোগ ছিলো ” তুমি আংকেলের সাথে নাচলে ভালো কথা কিন্তু সিগারেট কেনো খেলে!” ভাবী তার জীবনে প্রথম আমার কাছ থেকে একটা সিগারেট নিয়ে মুখে দিয়েছেলো মাএ। বাচ্চাকে কাউন্সিলিং করতে উনাকে খুব বেগ পেতে হয়েছে এমনকি বাসায় গিয়ে বাচ্চা বমি করে দিয়েছিলো। সেদিন সাকিবের বাংগালী ভাবাবেগের মূল্য আমি বুঝি নাই বলে আজ অপরাধ বোধের কঠিন শাস্তি আমাকে পেতে হলো।
এদিকে সাকিবের ডাচ বান্ধবী এমা তার থাইল্যান্ড ভ্রমণ শেষ করে আমস্টারডামে ফিরে গেছে আর বেচারা সাকিব অর্থকষ্টে ও মনোকষ্টে চল্লিশ দিনের তাবলীগ মিশনে থাইল্যান্ডের ডিপ সাউথের কোনো এক প্রদেশে।