চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে অ্যাডিলেডের দূরত্ব হাজার হাজার কিলোমিটার। মাঝখানে মহাসাগর, বদলে গেছে জীবনযাপন, পেশা ও ব্যস্ততার ধরন। তবু সময় আর দূরত্বের এই হিসাব যেন এক বিকেলে অর্থহীন হয়ে গেল। অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে একত্র হয়েছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা। কেউ এসেছেন নব্বইয়ের দশকের স্মৃতি নিয়ে, কেউবা অপেক্ষাকৃত নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি। কিন্তু সবার গল্পের কেন্দ্রে ছিল একই জায়গা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, পাহাড়-অরণ্যে ঘেরা সেই ক্যাম্পাস এবং শাটল ট্রেন।
দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার অ্যাসকট পার্কের ২৭এ চার্লস স্ট্রিটে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘শাটল ট্রেন অ্যাডিলেড চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন’ (STACUAASA)-এর ২০২৬–২০২৮ মেয়াদের নতুন কমিটির অভিষেক ও পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাবেক শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি ও বন্ধুত্বের এক মিলনমেলায়। অনুষ্ঠানস্থলে পা রাখার পর অনেকের কাছেই মনে হয়েছে, অ্যাডিলেডের পরিচিত পরিবেশের মধ্যে যেন কোথাও লুকিয়ে আছে হাটহাজারীর সেই চেনা পাহাড়ি আবহ। পরিচিত মুখের দেখা, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে কুশল বিনিময় আর ক্যাম্পাসের গল্পে ধীরে ধীরে জমে ওঠে আড্ডা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে শাটল ট্রেন শুধু যাতায়াতের বাহন নয়। এটি বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ট্রেনের বগিতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, গান, হাসি-ঠাট্টা, পরীক্ষার প্রস্তুতি, নতুন বন্ধুত্ব কিংবা জীবনের নানা পরিকল্পনা সবকিছুরই সাক্ষী এই শাটল। অ্যাডিলেডের পুনর্মিলনীতে সেই স্মৃতিই যেন আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে।
দুই-তিন দশক আগে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আসা সাবেক শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ ফিরে যান তাঁদের তারুণ্যের দিনগুলোতে। সহপাঠীদের সঙ্গে আড্ডা, ঝুপড়িতে বসে গল্প আর পাহাড়ঘেরা ক্যাম্পাসের দিনগুলোর কথা উঠে আসে আলোচনায়। বয়সের ব্যবধানও যেন তখন আর কোনো বিষয় ছিল না। নবীন ও প্রবীণ সবাই একই স্মৃতির ভেতর দাঁড়িয়ে নিজেদের ছাত্রজীবনের গল্প খুঁজে নেন।একসময় যে শিক্ষার্থীরা ২১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে যেতেন, তাঁদের অনেকেই আজ পৃথিবীর অন্য প্রান্তে নিজেদের জীবন গড়ে তুলেছেন। কেউ পেশাগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত, কেউ ব্যবসায়, কেউ বিভিন্ন পেশায় ব্যস্ত। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতির জায়গাটি তাঁদের কাছে এখনো একই রকম উজ্জ্বল।
পুনর্মিলনীর অন্যতম আবেগঘন পর্ব ছিল সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে অ্যাডিলেডে আসা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের বরণ করে নেওয়া।প্রবীণ সদস্যদের কাছ থেকে ফুল গ্রহণের মধ্য দিয়ে নবীনদের স্বাগত জানানো হয়। প্রবাসজীবনের শুরুতে নতুন শহর, নতুন কর্মক্ষেত্র ও নতুন সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া অনেকের জন্যই সহজ নয়। সেখানে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত মানুষদের পাশে পাওয়া অনেকটা নিজের পরিবারের কাউকে কাছে পাওয়ার মতো।অনুষ্ঠানে প্রবীণদের আন্তরিকতা এবং নবীনদের উচ্ছ্বাস মিলিয়ে তৈরি হয় ভিন্ন এক আবহ।
STACUAASA-এর নতুন কমিটি প্রবাসে নতুন আসা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নতুন সদস্যদের সামাজিক ও পেশাগত যোগাযোগ তৈরিতে সহযোগিতা করা এবং প্রয়োজনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহায়তার সুযোগ তৈরি করা হবে। অনুষ্ঠানের শুরুতে ২০২৬–২০২৮ মেয়াদের নতুন কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
নতুন কমিটিতে সভাপতি হয়েছেন মো. মজিবুর রহমান। প্রথম সহসভাপতি মাকশুমুল হক, দ্বিতীয় সহসভাপতি সাবিনা ইয়াসমিন এবং সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন জাফর চৌধুরী। সহসাধারণ সম্পাদক রুবিনা আমীন, কোষাধ্যক্ষ আসাদ উজ জামান ভূঁইয়া এবং সহকারী কোষাধ্যক্ষ কামরুল হাসান নাঈম দায়িত্ব পেয়েছেন। সাংস্কৃতিক সম্পাদক ড. রায়হান মাহবুব, সহকারী সাংস্কৃতিক সম্পাদক চন্দ্রিকা বড়ুয়া, গণমাধ্যম সম্পাদক দীপক কুমার রায় এবং সহকারী গণমাধ্যম সম্পাদক জয়িতা শর্মা নতুন কমিটিতে দায়িত্ব পালন করবেন।এ ছাড়া অনুষ্ঠান সম্পাদক হিসেবে মুশরান সাজিদ চৌধুরী, সহকারী অনুষ্ঠান সম্পাদক আরিফ উদ্দিন আহমেদ, শিক্ষার্থী কল্যাণ সম্পাদক হুমায়রা তাসনীম এবং সহকারী শিক্ষার্থী কল্যাণ সম্পাদক সাবরিনা আক্তার জেডনী দায়িত্ব পেয়েছেন।
উপদেষ্টা পরিষদে রয়েছেন ড. ওয়াহিদ মুরাদ ও আবদুল্লাহ আল মাসুম খান।

নবনির্বাচিত সভাপতি মো. মজিবুর রহমান বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাইয়ের দায়িত্ব শুধু একটি পদ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক মানুষের স্মৃতি ও আবেগ।তাঁর ভাষায়, “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাইয়ের দায়িত্ব পাওয়াটা কেবল কোনো পদবি নয়, এটি হাজারো স্মৃতির আমানত রক্ষা করা। আমাদের এই পরিবার পারস্পরিক ভালোবাসা আর শেকড়ের টানে একসূত্রে বাঁধা। প্রবাসে আমরা এমন একটি ছাদ তৈরি করতে চাই, যেখানে এসে দাঁড়ালেই মনে হবে আমরা নিজের ঘরেই আছি।”
সাধারণ সম্পাদক জাফর চৌধুরীও সংগঠনের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “দূর প্রবাসে এসে যেন কেউ নিজেকে একা না ভাবেন, সেটাই আমাদের মূল লক্ষ্য। আমাদের স্মৃতি, আমাদের গৌরব আর আমাদের ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে আমরা একসঙ্গে এক পরম মমতার বন্ধনে এগিয়ে যেতে চাই।”
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে অ্যালামনাইয়ের সকল সদস্যকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান আবদুল্লাহ আল মাসুম খান। তিনি বলেন, সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে সবার সহযোগিতা ও ভালোবাসা পাওয়াটা তাঁর জন্য অত্যন্ত আনন্দের এবং সম্মানের।চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাইয়ের বিগত কার্যনির্বাহী কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। দায়িত্ব পালনকালে সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রম, সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সম্মিলিতভাবে নানা উদ্যোগ বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতাকে তিনি অত্যন্ত সুন্দর ও মূল্যবান বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, সেই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে সংগঠনকে আরও শক্তিশালীভাবে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।তিনি আরো বলেন, অ্যালামনাইয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা কেবল একটি সাংগঠনিক দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি ভালোবাসা, সহপাঠীদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রবাসে নিজেদের শেকড় ধরে রাখার দায়বদ্ধতা।
আগামী দিনে সংগঠনকে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় করে অ্যালামনাইয়ের ভিশন ও নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে কাজ করতে চান। সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের চবিয়ানদের সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করা এবং প্রবাসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার কথাও। তিনি মনে করেন, সংগঠনের লক্ষ্য ও ভিশন বাস্তবায়নে কোনো একক ব্যক্তি নয়, বরং সব সদস্যের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতাই সবচেয়ে বড় শক্তি। বিগত কমিটির অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে নতুন কমিটির সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করে সংগঠনকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
মাসুম খানের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে নেতৃত্বের পরিবর্তন হলেও সংগঠনের মূল লক্ষ্য ও চবিয়ানদের পারস্পরিক বন্ধন অটুট থাকবে। অতীতের অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে নতুন নেতৃত্বের হাত ধরে অ্যালামনাই আরও দূর এগিয়ে যাবে এমন প্রত্যাশাই ছিল তাঁর বক্তব্যের মূল সুর।
আনুষ্ঠানিকতা ও প্রীতিভোজের পর শুরু হয় সাংস্কৃতিক পর্ব। অ্যাডিলেডের জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘অগ্নিবীণা–ফায়ার ল্যুট’ গান পরিবেশন করে।সাংস্কৃতিক আয়োজনটি শুধু বিনোদনের অংশ ছিল না; বরং এটি ছিল প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতি ও নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের স্মৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি মাধ্যম।
প্রবাসজীবনে মানুষ নতুন শহর, নতুন সংস্কৃতি ও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়। সময়ের সঙ্গে বদলে যায় দৈনন্দিন জীবন। বদলে যায় কর্মক্ষেত্র, সামাজিক পরিসর এবং পরিচিতির জগৎ। কিন্তু কিছু স্মৃতি থেকে যায় আগের জায়গাতেই।অ্যাডিলেডের পুনর্মিলনীতে সেই স্মৃতি আবার সামনে এসেছে। কয়েক দশক আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে তরুণ-তরুণীরা শাটল ট্রেনে চড়ে ক্যাম্পাসে যেতেন, তাঁদের অনেকেই এখন পরিবার, পেশা ও প্রবাসজীবনের নানা দায়িত্বে ব্যস্ত। তারপরও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম তাঁদের আবার একই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে।এই মিলনমেলার সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই এখানে সবাই শুধু প্রাক্তন শিক্ষার্থী নন; সবাই একই গল্পের অংশ।অ্যাডিলেডের আকাশের নিচে সেদিন তাই চট্টগ্রামের পাহাড়, ক্যাম্পাসের পথ আর শাটল ট্রেনের হুইসেল যেন দূরত্ব পেরিয়ে ফিরে এসেছিল।
শাটল ট্রেন হয়তো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই ছুটছে। কিন্তু এর স্মৃতি ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। অ্যাডিলেডের এই আয়োজন আবারও মনে করিয়ে দিল, মানুষের ঠিকানা বদলাতে পারে, দেশ বদলাতে পারে, জীবন বদলে যেতে পারে কিন্তু শেকড়ের টান বদলায় না।আর তাই অ্যাডিলেডের মাটিতে একদল চবিয়ান যখন পুরোনো দিনের গান ধরেন, তখন সেই সুরে শুধু নস্টালজিয়া থাকে না; থাকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আজীবন জড়িয়ে থাকার গল্প।