অস্ট্রেলিয়ায় পড়ার স্বপ্নে বাধা, বাড়ছে শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যান

অস্ট্রেলিয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। দেশটিতে শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়া হিসাবে, অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষার্থী ভিসা আবেদনের ২৪ দশমিক ২ শতাংশ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ২০১৬ সালের জুনে এই হার ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৯ শতাংশ।

অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (Department of Home Affairs) তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদনে কড়াকড়ি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা সত্যিই পড়াশোনার উদ্দেশ্যে অস্ট্রেলিয়ায় আসছেন কি না, তা যাচাইয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

দেশভেদে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হারেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে নেপাল থেকে করা শিক্ষার্থী ভিসা আবেদনের ৫১ শতাংশের বেশি প্রত্যাখ্যান হয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানের হার ৪০ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে চীনা আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানের হার ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

ইন্দোনেশিয়ার শিক্ষার্থী অ্যাঞ্জেলিকা ফেলিনসিয়ার অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার স্বপ্ন ছিল উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই। অস্ট্রেলিয়ার সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতা নিতে এবং প্রাথমিক শৈশব শিক্ষা বিষয়ে পড়তে তিনি দেশটিতে আসতে চেয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার জন্য তিনি ইন্দোনেশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগও ছেড়ে দেন। এরপর অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষার্থী ভিসার জন্য আবেদন করেন। আবেদনের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে চাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে ২৭ পৃষ্ঠার একটি বিবৃতিও জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু আবেদন জমা দেওয়ার মাত্র এক দিনের মধ্যে তাঁর ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হয়। কর্মকর্তার প্রশ্ন ছিল—নিজ দেশেই কেন তিনি একই বিষয়ে পড়াশোনা করতে পারবেন না। ফেলিনসিয়া বলেন, ভিসা প্রত্যাখ্যানের ঘটনায় তিনি অত্যন্ত হতাশ হয়েছেন। তাঁর আবেদনপত্রে দেওয়া ‘জেনুইন স্টুডেন্ট’ (GS) বিবৃতিতে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার যথেষ্ট শক্তিশালী কারণ দেখানো হয়নি বলে জানানো হয়।

নেপালি শিক্ষার্থী আসিফ রহিমও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। মেলবোর্নে অ্যাকাউন্টিং বিষয়ে মাস্টার্স করার জন্য মার্চে ভিসার আবেদন করেছিলেন তিনি। এপ্রিলেই তাঁর আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। রহিম বলেন, একই সময়ে আবেদন করা তাঁর অনেক নেপালি বন্ধুর ভিসাও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনার প্রস্তুতির জন্য ১৫ থেকে ১৬ মাস সময় ও অর্থ ব্যয় করার পর ভিসা প্রত্যাখ্যান হওয়ায় তিনি গভীরভাবে হতাশ হয়েছেন।

অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষার্থী ভিসার জন্য আবেদনকারীদের ‘জেনুইন স্টুডেন্ট’ বা প্রকৃত শিক্ষার্থী হিসেবে নিজেদের উদ্দেশ্য প্রমাণ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে আবেদনকারীর নিজ দেশের পরিস্থিতি, অস্ট্রেলিয়ায় সম্ভাব্য পরিস্থিতি, নির্বাচিত কোর্স ভবিষ্যতে তাঁর জন্য কতটা মূল্যবান, আগের অভিবাসন ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হয়। তবে অভিবাসন এজেন্টদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, এই মূল্যায়ন অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে।

ম্যাগপাই কনসালট্যান্টসের অভিবাসন এজেন্ট উমর আশরাফ বলেন, পড়াশোনায় দীর্ঘ বিরতি, ক্যারিয়ার পরিকল্পনার সঙ্গে কোর্সের অসামঞ্জস্য কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় থাকার সম্ভাবনা থাকলে আবেদন প্রত্যাখ্যানের কারণ বোঝা যায়। কিন্তু বিদেশ থেকে করা অনেক আবেদন প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে তিনি স্পষ্ট কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না।

আরেক অভিবাসন এজেন্ট ফু ভু মিনের অভিযোগ, অনেক প্রত্যাখ্যানপত্রে দেওয়া কারণ অস্পষ্ট এবং একটির সঙ্গে আরেকটির ভাষার মিল রয়েছে। ABC News কিছু প্রত্যাখ্যানপত্র পর্যালোচনা করে প্রায় একই ধরনের অনুচ্ছেদ, সামান্য শব্দ পরিবর্তন এবং একই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি দেখতে পেয়েছে।

ভিসা প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি আবেদনকারীদের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। অভিবাসন আইনজীবী ক্রিস জনস্টন বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত আবেদনকারীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে আপিলের সংখ্যা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে আসার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করেন। শুধু ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রেই খরচ হতে পারে প্রায় ২ হাজার ৫০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার পর্যন্ত। ফলে যথাযথভাবে প্রমাণ ও নথি মূল্যায়ন না করে আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলে তা আবেদনকারীদের জন্য অন্যায্য হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাত ও শিক্ষার্থী ভিসা ব্যবস্থার মান ও স্বচ্ছতা বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে আবেদনের ওপর যাচাই-বাছাই বেড়েছে এবং যারা ভিসার শর্ত পূরণ করতে পারছেন না, তাঁদের আবেদন বেশি হারে প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, প্রতিটি শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন আইনের নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা হয়।

ডিকিন ইউনিভার্সিটির শিক্ষা বিশেষজ্ঞ লি ট্রান বলেন, অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতে নিম্নমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কোর্স পরিবর্তনের প্রবণতা এবং শিক্ষার্থী ভিসার অপব্যবহার ঠেকানোর প্রয়োজন রয়েছে। তবে এ কারণে সব শিক্ষার্থীর ওপর একই ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়। তাঁর মতে, সমস্যাযুক্ত প্রতিষ্ঠান, সমস্যাযুক্ত কোর্স এবং প্রকৃত শিক্ষার্থীদের আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। বারবার কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে অস্ট্রেলিয়া একটি কম স্বাগতপূর্ণ দেশ হিসেবে পরিচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা অস্ট্রেলিয়ার অস্থায়ী অভিবাসনের অন্যতম বড় অংশ হওয়ায় তাঁদের অনেক সময় রাজনৈতিক বিতর্কের ‘সহজ লক্ষ্য’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে Universities Australia-এর প্রধান নির্বাহী লুক শিহি বলেন, বর্তমান শিক্ষার্থী ভিসা প্রক্রিয়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর এর প্রভাব বেশি পড়ছে।

অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য। কিন্তু ভিসা ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক কড়াকড়ি এবং প্রত্যাখ্যানের হার বৃদ্ধির ফলে দেশটির উচ্চশিক্ষা খাতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থী প্রবাহ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

Source: ABCNEWS