অবৈধ সিগারেট ঠেকাতে ৮০% কর কমানোর প্রস্তাব, স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ

অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে আবারও সামনে এসেছে তামাক কোম্পানিগুলোর প্রভাব ও লবিং। অবৈধ সিগারেটের বাজার দ্রুত বাড়তে থাকায় তামাকের ওপর আরোপিত আবগারি শুল্ক বা এক্সসাইজ কমানোর দাবি জোরালো হয়েছে। এর মধ্যেই বিরোধী জোট (Coalition) সিগারেটের শুল্ক ৮০ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এর কয়েক সপ্তাহ আগে One Nation-এর নেতা Pauline Hanson তামাক শুল্ক ৭৫ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। একদিকে অবৈধ তামাকের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সংগঠিত অপরাধ দমনের যুক্তি; অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা—সিগারেটের দাম কমলে ধূমপানের হার আবার বাড়তে পারে এবং কয়েক দশকের তামাক নিয়ন্ত্রণের অগ্রগতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ায় বহু বছর ধরেই তামাক কোম্পানিগুলো সিগারেটের ওপর উচ্চ কর কমানোর দাবি করে আসছে। উচ্চ করকে ধূমপান কমানোর অন্যতম কার্যকর নীতি হিসেবে দেখা হয়। ফলে গত এক দশকে তামাক কোম্পানিগুলো নীতিনির্ধারণী আলোচনায় অনেকটাই কোণঠাসা ছিল। কিন্তু অবৈধ সিগারেটের বাজারের দ্রুত বিস্তার তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। সম্প্রতি পার্লামেন্টারি তদন্তে অবৈধ তামাকের ব্যবসা নিয়ে শুনানি চলাকালে Philip Morris-এর কর্মকর্তাদের একটি বন্ধ দরজার শুনানিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। জনস্বাস্থ্যকর্মীদের সামনে এমন একটি বন্ধ বৈঠককে অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘদিনের নীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ Becky Freeman-এর মতে, তামাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অনুদান, প্রভাবশালী লবিস্ট এবং বিভিন্ন তৃতীয় পক্ষের সংগঠনের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে আসছে।

বিরোধী দলের নেতা Angus Taylor সম্প্রতি তামাকের আবগারি শুল্ক ৮০ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। Coalition-এর পরিকল্পনায় অবৈধ তামাকের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ আরও কঠোর করতে ২০০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার বরাদ্দের কথাও বলা হয়েছে। তাদের যুক্তি, বৈধ সিগারেটের দাম অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় মানুষ অবৈধ সিগারেটের দিকে ঝুঁকছে। তাই কর কমিয়ে বৈধ সিগারেটের দাম কমানো গেলে অবৈধ বাজারের আকর্ষণ কমতে পারে।Coalition একই সঙ্গে ভেপ ও কিছু নিকোটিন পণ্যকে বৈধ ও নিয়ন্ত্রিত করার প্রস্তাবও দিয়েছে। তবে এই যুক্তি নিয়ে তীব্র আপত্তি রয়েছে জনস্বাস্থ্য মহলে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সিগারেটের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমলে বিশেষ করে তরুণ ও নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা বাড়তে পারে। গত কয়েক দশকে অস্ট্রেলিয়া উচ্চ তামাক কর, plain packaging, বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ এবং ধূমপানবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ধূমপানের হার কমাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিগারেটের দাম বাড়িয়ে রাখা ধূমপান কমানোর সবচেয়ে কার্যকর নীতিগুলোর একটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও তামাকের ওপর উচ্চ কর বজায় রাখা বা বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, কর কমানোর ফলে একদিকে তামাক কোম্পানিগুলো আর্থিকভাবে লাভবান হবে, অন্যদিকে ধূমপানজনিত রোগ ও স্বাস্থ্যব্যয়ের বোঝা বাড়তে পারে।

তামাকশিল্পের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। The Guardian-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে Nationals-ই একমাত্র বড় রাজনৈতিক দল যারা তামাক কোম্পানির কাছ থেকে রাজনৈতিক অনুদান গ্রহণ করে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দুটি বড় তামাক কোম্পানি Nationals-কে মোট ২ লাখ ২৫ হাজার ৫০০ ডলার দিয়েছে। তবে Nationals-এর নেতারা দাবি করেছেন, এসব অনুদানের সঙ্গে তাদের নীতিগত অবস্থানের কোনো সম্পর্ক নেই। দলটির বক্তব্য, তামাক কোম্পানিগুলো বৈধ ব্যবসা পরিচালনা করে এবং তারা যেকোনো রাজনৈতিক দলকে অনুদান দেওয়ার অধিকার রাখে।

অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য গবেষকদের প্রশ্ন—যে শিল্পের পণ্যের কারণে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, সেই শিল্পের কাছ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থ নেওয়া কতটা গ্রহণযোগ্য? তামাক কোম্পানিগুলোর প্রভাব বিস্তারের কৌশল শুধু সরাসরি রাজনৈতিক অনুদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন খুচরা ব্যবসায়ী ও শিল্প সংগঠনও তামাক ও ভেপ-সংক্রান্ত নীতিতে সক্রিয়ভাবে মতামত দিয়ে থাকে। কিছু সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে তামাক কোম্পানিও রয়েছে।

২০২৩ সালে একটি একাডেমিক গবেষণায় দেখা যায়, তামাক কোম্পানির লবিস্টদের প্রায় অর্ধেকেরই সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা ছিল, তাঁরা তামাকশিল্পে যোগ দেওয়ার আগে অথবা পরে রাজ্য, টেরিটরি কিংবা ফেডারেল সরকারের বিভিন্ন পদে কাজ করেছেন। এ কারণেই সমালোচকেরা মনে করছেন, তামাকশিল্পের রাজনৈতিক যোগাযোগ ও নীতিনির্ধারণে প্রভাবের বিষয়টি আরও স্বচ্ছভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

অবৈধ তামাকের বিস্তার এখন অস্ট্রেলিয়ার জন্য বাস্তব সমস্যা। সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সংগঠিত অপরাধচক্রের সঙ্গে অবৈধ তামাক ব্যবসার সম্পর্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন। Coalition-এর যুক্তি হলো, বৈধ সিগারেটের দাম কমিয়ে এবং আইন প্রয়োগ আরও শক্তিশালী করে এই অবৈধ বাজারকে সংকুচিত করা সম্ভব। কিন্তু সমালোচকদের মতে, অবৈধ বাজারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য কর কমানোই একমাত্র সমাধান নয়। বরং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, আইন প্রয়োগ, সরবরাহব্যবস্থার ওপর নজরদারি এবং সংগঠিত অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াই বেশি কার্যকর হতে পারে।

তামাকের কর এখন শুধু স্বাস্থ্যনীতি নয়, নির্বাচনী রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠছে। One Nation-এর ৭৫ শতাংশ কর কমানোর প্রস্তাবের পর Coalition-এর ৮০ শতাংশ কমানোর ঘোষণা বিষয়টিকে আরও রাজনৈতিক গুরুত্ব দিয়েছে। Labor এই পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করছে এবং সতর্ক করেছে—সিগারেট সস্তা হলে এর মূল্য দিতে হবে মানুষের স্বাস্থ্য দিয়ে। অন্যদিকে Coalition বলছে, তাদের পরিকল্পনার লক্ষ্য ধূমপান উৎসাহিত করা নয়; বরং অবৈধ তামাকের বাজার ও সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলা করা।

তবে বিতর্কের কেন্দ্রে থেকে যাচ্ছে একটি প্রশ্ন—অবৈধ সিগারেটের বাজার ঠেকাতে বৈধ সিগারেটকে সস্তা করা কি সত্যিই কার্যকর সমাধান, নাকি এতে তামাক কোম্পানিগুলোই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে? অস্ট্রেলিয়ার পরবর্তী নির্বাচনের আগে এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কারণ সিগারেটের দাম নিয়ে এই লড়াই শুধু অর্থনীতি বা করনীতির লড়াই নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জনস্বাস্থ্য, তরুণ প্রজন্ম, সংগঠিত অপরাধ এবং বহু বছরের তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতির ভবিষ্যৎ।

সূত্র: The Guardian

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *