প্রযুক্তির আড়ালে নজরদারি

একটি ছোট্ট ডিভাইস। আকারে কয়েনের মতো। দামও খুব বেশি নয়, প্রায় ২০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার থেকেই পাওয়া যায়। অথচ এই ছোট যন্ত্রটি কারও অজান্তে তার অবস্থান জানিয়ে দিতে পারে। গাড়ি, ব্যাগ কিংবা ব্যক্তিগত কোনো জিনিসে লুকিয়ে রাখা হলে ভুক্তভোগী হয়তো বুঝতেই পারবেন না, কেউ তাকে অনুসরণ করছে। অন্যদিকে, সাধারণ চশমার মতো দেখতে স্মার্ট গ্লাস। চোখে পরলেই ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ কিংবা অডিও রেকর্ড করা যায়। আশপাশের মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারেন না, তাঁদের ছবি বা কথোপকথন রেকর্ড হচ্ছে। প্রযুক্তির এই দ্রুত পরিবর্তন অস্ট্রেলিয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, স্মার্ট গ্লাস, জিপিএস ট্র্যাকারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি এখন পারিবারিক সহিংসতা, স্টকিং ও গোপন নজরদারির নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা—প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এগোতে পারছে না।

প্রযুক্তিনির্ভর নির্যাতনের ধরন গত কয়েক বছরে দ্রুত বদলেছে। একসময় নির্যাতনকারী ব্যক্তির হাতে ছিল ফোনকল, টেক্সট মেসেজ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে স্মার্ট হোম ডিভাইস, লোকেশন ট্র্যাকার, স্পাই ক্যামেরা এবং স্মার্ট গ্লাস। একটি ছোট ট্র্যাকার গাড়িতে লুকিয়ে রাখা যেতে পারে। ব্যাগের ভেতর রাখা যেতে পারে। এমনকি শিশুর খেলনা বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত জিনিসের সঙ্গেও এটি যুক্ত করা সম্ভব। ভুক্তভোগী কোথায় যাচ্ছেন, কখন বাড়ি থেকে বের হচ্ছেন, কার সঙ্গে দেখা করছেন—এসব তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে অনুসরণ করা সম্ভব হয়ে উঠছে। আর এ কারণেই নারী ও পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কাজ করা সংগঠনগুলো বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।

অস্ট্রেলিয়ার Domestic, Family and Sexual Violence Commissioner Micaela Cronin সতর্ক করে বলেছেন, প্রযুক্তি এখন পারিবারিক ও যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠছে। প্রযুক্তিপণ্য তৈরির সময় থেকেই সম্ভাব্য অপব্যবহারের ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া দরকার। প্রযুক্তিনির্ভর নির্যাতনের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—অনেক সময় ভুক্তভোগী জানতেই পারেন না যে তাঁকে নজরদারি করা হচ্ছে।
একজন নারী হয়তো লক্ষ্য করছেন, তাঁর সাবেক সঙ্গী বারবার জেনে যাচ্ছেন তিনি কোথায় গেছেন। তিনি ভাবতে পারেন, হয়তো কারও কাছ থেকে তথ্য পেয়েছেন। কিন্তু পরে দেখা গেল, তাঁর গাড়ির কোথাও একটি ট্র্যাকিং ডিভাইস লাগানো রয়েছে। এই ধরনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন নয়; এটি একজন মানুষের নিরাপত্তাবোধকেও ভেঙে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক সহিংসতার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই অনেক সময় মূল উদ্দেশ্য। প্রযুক্তি সেই নিয়ন্ত্রণকে আরও সহজ করে দিয়েছে। ভুক্তভোগীকে শারীরিকভাবে অনুসরণ না করেও তাঁর অবস্থান জানা সম্ভব।

স্মার্ট গ্লাস নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো—এগুলো দেখতে অনেকটা সাধারণ চশমার মতো। চশমায় ক্যামেরা থাকলেও আশপাশের মানুষ হয়তো বুঝতে পারবেন না কখন রেকর্ডিং শুরু হয়েছে। ফলে জনসমাগমস্থল, কর্মক্ষেত্র, গণপরিবহন কিংবা ব্যক্তিগত পরিসরে গোপনে ছবি বা ভিডিও ধারণের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাতেও স্মার্ট গ্লাসের মাধ্যমে নারীদের অজান্তে ভিডিও ধারণ এবং সেই ফুটেজ অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো নতুন ধরনের হয়রানির ঝুঁকি তুলে ধরা হয়েছে। প্রযুক্তির এই পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—কোন মুহূর্তে প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সীমা অতিক্রম করে অন্যের গোপনীয়তার ওপর আক্রমণে পরিণত হয়?

প্রযুক্তি বাজারে নতুন পণ্য আসছে খুব দ্রুত। কিন্তু আইন তৈরি, পরিবর্তন কিংবা প্রয়োগের প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে ধীর। এই ব্যবধানই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ডিভাইস বেআইনি কাজে ব্যবহৃত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পণ্যটি বাজারে আসার আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনা করা প্রয়োজন। অস্ট্রেলিয়ার eSafety Commissioner প্রযুক্তি নির্মাতাদের স্মার্ট গ্লাসে আরও শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রেকর্ডিংয়ের সময় স্পষ্ট সংকেত, মানুষের মুখ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্লার করার ব্যবস্থা এবং লাইভস্ট্রিমিংয়ে বিলম্বের মতো প্রযুক্তিগত সুরক্ষা।
অর্থাৎ, শুধু ব্যবহারকারীকে সচেতন করলেই হবে না; ডিভাইস তৈরির পর্যায় থেকেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি উঠছে।

বিষয়টি শুধু সিডনি বা মেলবোর্নের মতো বড় শহরের উদ্বেগ নয়। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়াতেও এমন ঘটনা পুলিশের নজরে এসেছে। অ্যাডিলেডে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পরিচিত এক নারীর গাড়িতে ট্র্যাকিং ডিভাইস লাগানোর অভিযোগে মামলা হয়েছে। ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে, এই প্রযুক্তি এখন অস্ট্রেলিয়ার সাধারণ মানুষের জীবনেও বাস্তব ঝুঁকি তৈরি করছে। পুলিশের পরামর্শ, কেউ যদি সন্দেহ করেন যে তাঁকে গোপনে ট্র্যাক বা রেকর্ড করা হচ্ছে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত। সম্ভাব্য প্রমাণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে—এমন পরিস্থিতিতে নিজে থেকে কোনো ডিভাইস সরিয়ে ফেলার আগে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। সন্তান কোথায় আছে, গাড়ি কোথায় পার্ক করা হয়েছে কিংবা হারিয়ে যাওয়া কোনো জিনিস খুঁজে বের করা—এসব কাজে ট্র্যাকার অত্যন্ত কার্যকর। স্মার্ট গ্লাসও ভবিষ্যতে যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই প্রযুক্তি যেমন নিরাপত্তা দিতে পারে, তেমনি অন্যের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ওপর আঘাতও করতে পারে।
তাই বিশেষজ্ঞদের বার্তা পরিষ্কার—প্রযুক্তি যখন দ্রুত এগোচ্ছে, আইনকেও সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে হবে। শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শাস্তি দিলেই হবে না। প্রযুক্তিপণ্য তৈরির সময় থেকেই গোপনীয়তা ও নিরাপত্তাকে নকশার অংশ করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীদেরও জানতে হবে—কীভাবে তাঁদের ডিভাইস অপব্যবহার হতে পারে এবং সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে কোথায় সাহায্য পাওয়া যাবে।
কারণ আগামী দিনের প্রযুক্তি হয়তো আরও ছোট হবে, আরও শক্তিশালী হবে এবং আরও অদৃশ্যভাবে কাজ করবে। সেই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন প্রযুক্তি কতটা স্মার্ট—তা নয়। প্রশ্ন হলো, মানুষকে নিরাপদ রাখার জন্য আমাদের আইন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা স্মার্ট হতে পারছে?