ক্ষতিকর কনটেন্ট ঠেকাতে বড় পদক্ষেপ, সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির ওপর নতুন দায়িত্ব

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারী কোন পোস্ট দেখবেন, কোন ভিডিও সামনে আসবে কিংবা কোন ধরনের কনটেন্ট বারবার তাঁর ফিডে হাজির হবে—সেই সিদ্ধান্তে এত দিন বড় ভূমিকা রেখেছে প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম। এবার সেই ব্যবস্থায় ব্যবহারকারীদের আরও নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। নতুন আইনের খসড়া অনুযায়ী, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহারকারীদের অ্যালগরিদমভিত্তিক ফিড থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বা ‘অপ্ট-আউট’ করার সুযোগ দিতে হবে। এ জন্য নিয়মিত পপ-আপ বার্তার মাধ্যমে ব্যবহারকারীকে জিজ্ঞাসা করতে হবে—তিনি অ্যালগরিদমের সুপারিশ করা কনটেন্ট দেখতে চান, নাকি শুধু যাঁদের অনুসরণ করেন তাঁদের পোস্ট দেখতে চান। ফেডারেল সরকার চলতি সপ্তাহেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত Digital Duty of Care-এর খসড়া আইন পার্লামেন্টে উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রস্তাবিত আইনে শুধু অ্যালগরিদম নয়, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ক্ষতিকর কনটেন্ট ঠেকানোর জন্য কোম্পানিগুলোর ওপর সরাসরি দায়িত্বও দেওয়া হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর আচরণ বিশ্লেষণ করে। তিনি কী দেখছেন, কোন পোস্টে কতক্ষণ থাকছেন, কী পছন্দ করছেন, কোথায় থাকেন এবং তাঁর সম্ভাব্য আগ্রহ কী—এসব তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী কনটেন্ট নির্বাচন করা হয়। ফলে দুজন মানুষ একই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করলেও তাঁদের ফিড সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। এই প্রযুক্তি ব্যবহারকারীর জন্য প্রাসঙ্গিক কনটেন্ট খুঁজে দিতে যেমন সাহায্য করে, তেমনি সমালোচকেরা বলছেন, এটি চটকদার, উসকানিমূলক বা চরমপন্থী কনটেন্টকেও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। কারণ ব্যবহারকারী যে ধরনের কনটেন্টে বেশি সময় ব্যয় করেন, অ্যালগরিদম অনেক সময় সেই ধরনের আরও কনটেন্ট সামনে নিয়ে আসে। এর ফলে তৈরি হতে পারে তথাকথিত ‘echo chamber’—যেখানে একজন ব্যবহারকারী বারবার একই ধরনের মতামত ও তথ্য দেখতে থাকেন।

প্রস্তাবিত Digital Duty of Care আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—অনলাইন ক্ষতির দায় শুধু ব্যবহারকারীর ওপর থাকবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোকেও তাদের প্ল্যাটফর্মে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত ও কমানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারের খসড়া পরিকল্পনায় বেআইনি কনটেন্টের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অবৈধ পর্নোগ্রাফি সহজলভ্য হওয়া ঠেকানোর কথাও রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য আরও কয়েক ধরনের ‘psycho-social harm’ বা মানসিক-সামাজিক ক্ষতির বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে। এর মধ্যে শরীর নিয়ে নেতিবাচক ধারণা বা body image এবং bullying বা অনলাইন হয়রানির মতো বিষয় রয়েছে। আইন ভাঙলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোকে ১০ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বেশি জরিমানা গুনতে হতে পারে।

নতুন ব্যবস্থায় অস্ট্রেলিয়ার eSafety Commissioner এবং অনুমোদিত স্বাধীন গবেষকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম পর্যবেক্ষণের আরও ক্ষমতা দেওয়া হবে। এর অংশ হিসেবে গবেষকেরা ‘sock puppet’ পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারবেন। অর্থাৎ, শিশুর পরিচয় ধারণ করে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করে দেখা হবে—একজন শিশু কী ধরনের কনটেন্ট পাচ্ছে এবং অ্যালগরিদম তাকে কোন দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে রক্ষা করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

অস্ট্রেলিয়ার সরকার মনে করছে, অনলাইনে তৈরি হওয়া ক্ষতি আর শুধু ভার্চুয়াল জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব বাস্তব জীবনেও পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম নিয়ে উদ্বেগ এর আগেও প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী Anthony Albanese। তিনি বলেছেন, অ্যালগরিদম মানুষকে ধীরে ধীরে আরও চরম মতাদর্শের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে তরুণদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি নির্দিষ্ট ধরনের কনটেন্ট দিয়ে শুরু হলেও অ্যালগরিদমের ধারাবাহিক সুপারিশের মাধ্যমে ব্যবহারকারী আরও চরম ও ক্ষতিকর কনটেন্টের মুখোমুখি হতে পারেন।

সরকারের পরিকল্পনাকে ঘিরে অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এক নয়। বিরোধী দলের Shadow Communications Minister Sarah Henderson অতীতে শিশুদের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘insidious psychological manipulation’ বা ক্ষতিকর মানসিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তবে Shadow Treasurer Tim Wilson-এর বক্তব্য ভিন্ন। তাঁর মতে, অ্যালগরিদম অনেক সময় মানুষ যে ধরনের কনটেন্ট দেখতে চান, সেটিই সামনে নিয়ে আসে। তাই অ্যালগরিদম নিয়ন্ত্রণের নামে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
বিরোধীদলীয় নেতা Angus Taylor বলেছেন, সরকার কী প্রস্তাব করছে, সেটি দেখে তারা সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, নতুন আইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারি সেন্সরশিপের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
গ্রিনস পার্টি সরকারের প্রস্তাবের চেয়েও কঠোর ব্যবস্থা চায়। তাদের দাবি, ব্যবহারকারীদের প্রথমে অ্যালগরিদমভিত্তিক ফিড ব্যবহারের জন্য সম্মতি দিতে হবে—অর্থাৎ ‘opt-out’ নয়, ‘opt-in’ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
যৌন সম্মতি নিয়ে কাজ করা সংগঠন Teach Us Consent-এর প্রধান Chanel Contos-ও এমন অবস্থানের পক্ষে। তাঁর মতে, শুধু opt-out ব্যবস্থা একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারে; কিন্তু opt-in ব্যবস্থা চালু হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের প্রবেশ আরও নিরাপদ করা সম্ভব হবে।

অ্যালগরিদম নিয়ন্ত্রণের এই উদ্যোগ এসেছে এমন এক সময়ে, যখন অস্ট্রেলিয়া ইতিমধ্যে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ কার্যকর করেছে। সরকার পরে সেই আইন আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে এবং নিয়ম না মানলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য বড় ধরনের জরিমানার ব্যবস্থাও করেছে। অর্থাৎ, শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা এখন অস্ট্রেলিয়ার ডিজিটাল নীতির অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।

সরকারের নতুন খসড়া আইন পার্লামেন্টে উঠলে অ্যালগরিদমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার, শিশুদের নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তি কোম্পানির দায়িত্ব—সবকিছু নিয়েই বড় ধরনের বিতর্ক শুরু হতে পারে। একদিকে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর যুক্তি থাকবে—অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত ও প্রাসঙ্গিক করে। অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, মানুষের মনোযোগ ধরে রাখতে তৈরি করা এই ব্যবস্থা ক্ষতিকর কনটেন্টকেও জনপ্রিয় করে তুলতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার সরকারের প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো তাই শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের আইন নয়; এটি একটি বড় প্রশ্নের মুখোমুখি করছে পুরো সমাজকে আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছি, নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম আমাদের ব্যবহার করছে? নতুন আইন সেই নিয়ন্ত্রণের কিছুটা অংশ আবার ব্যবহারকারীর হাতে ফিরিয়ে দিতে পারে।

সূত্র: ABC News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *