আজমুল হক পাপ্পু: আমরা ছিলাম ছয় ভাইবোন। চার ভাই, দুই বোন। আমি সবার ছোট। বাবা কোনোদিন আমাদের গায়ে হাত তোলেননি, একটা থাপ্পড়ও না। অথচ আমরা সবাই তাকে ভীষণ ভয় পেতাম। এই ভয়ের নাম বোধহয় সম্মান। আমাদের বাড়িতে তিনটা গেট ছিল। প্রথমে লোহার গেট, তারপর দুই পাল্লার কাঠের দরজা, শেষে ঘরে ঢোকার দরজা। বাবা যখন বাইরে থেকে ফিরতেন, লোহার গেটটা ধাক্কা দিয়ে একটা শব্দ করতেন ঠিক যেন সংকেত। আমরা তখন যে যা করছি, টিভি ফেলে, খেলা ফেলে, দৌড়ে গিয়ে পড়ার টেবিলে বসে পড়তাম। ওই শব্দটা এখনো কানে বাজে।
মাগরিবের পর বাইরে থাকার নিয়ম ছিল না আমাদের। ব্যতিক্রম ছিল শুধু একটা রাত যে রাতে মসজিদে সারারাত এবাদতের অনুষ্ঠান হতো। ওই একটা রাতেই বাবা বাইরে থাকার অনুমতি দিতেন। ছোট্ট একটা নামাজ শেষ করেই আমরা বন্ধুরা মিলে গল্প, খেলা, আড্ডায় মেতে উঠতাম। মনে হতো যেন বছরের সবচেয়ে স্বাধীন রাত।
বাবা একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। একা হাতে ছয়টা সন্তানকে মানুষ করেছেন, আমরা সবাই আজ যার যার জায়গায় ভালো করছি। বাবা-মা যেন গুড কপ-ব্যাড কপ খেলতেন। বাবা ছিলেন ব্যাড কপ। তাই কোনোদিন সাহস করে বাবাকে বলতে পারিনি বাবা, তোমাকে আমি অনেক ভালোবাসি।
বাবাকে কোনোদিন কাঁদতে দেখিনি। একবারও না। যেদিন প্রথম অস্ট্রেলিয়া আসার জন্য বাড়ি থেকে বের হই, বাবা আমাকে বিদায় জানালেন। অনেক অনুপ্রেরণার কথা বললেন। আমি গাড়িতে উঠলাম, গাড়ি ছাড়ল। কয়েক সেকেন্ড পর পেছন ফিরে তাকালাম, দেখি বাবা চোখ মুছছেন। সেই প্রথম, এবং সম্ভবত একমাত্র বার, আমি বাবাকে কাঁদতে দেখেছিলাম। এতগুলো বছরের কঠোর মানুষটা, যার একটা ধমকে আমরা বই খুলে বসে যেতাম, তিনিও যে ভেতরে ভেতরে এতটা কোমল ছিলেন তা বুঝেছিলাম শুধু ওই একটা মুহূর্তে।
তারপর একদিন খবর এল, বাবার লিভার ক্যান্সার ধরা পড়েছে। চিকিৎসার জন্য আম্মা, ভাই আর চাচা তাকে নিয়ে গেলেন ইন্ডিয়া। আমিও অস্ট্রেলিয়া থেকে রওনা দিলাম। চিকিৎসার প্রথম ধাপ শেষে বাবা বাংলাদেশে ফিরে এলেন, আমি এয়ারপোর্ট থেকে তাকে নিয়ে এলাম বড় বোনের বাসায়, মহাখালীতে। এখনো চোখে ভাসে বাবা হেঁটে হেঁটে বেরিয়ে আসছেন এয়ারপোর্ট থেকে, দেখে মনেই হয়নি তিনি এত অসুস্থ।
কিছুদিন পর সিডনি ফিরে গেলাম। মাস কয়েক পর বাবার অবস্থা খারাপ হতে শুরু করল। আমার সাথে বাবার শেষ যে কথাগুলো হয়েছিল, তা এখনো স্পষ্ট মনে আছে। কোনো দ্বিধা ছাড়াই বাবা বললেন “তাড়াতাড়ি দেশে চলে আসো।” কথাগুলো এত স্পষ্ট, এত দৃঢ় ছিল যে আমি কল্পনাও করতে পারিনি এর মানে কী। সেদিন ছিল উইকএন্ড। ভাবলাম সোমবারে টিকেটের খোঁজ নেব। ঐদিন রাতেই আমার এক ফ্লাট মেট ছোট ভাই বলল “ভাইয়া, আপনার মনে হয় দেশে যাওয়া উচিত।” আমি কিছু না ভেবেই সকালে সোজা এয়ারপোর্টে চলে গেলাম। কেন জানি সেদিন কান্না থামিয়ে রাখতে পারছিলাম না। কাউন্টারে গিয়ে শুনলাম টিকেট নেই। একটু দূরে দাঁড়িয়ে চোখ দিয়ে অবিরাম পানি পড়ছিল। আধা ঘণ্টা পর ডাক এল, একটা টিকেট ম্যানেজ করা গেছে। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সে রওনা দিলাম। কল্পনাও করতে পারিনি বাবা মারা গেছেন কিন্তু প্লেনে বসে কান্না থামাতে পারছিলাম না।
সিঙ্গাপুর গিয়ে বাসায় ফোন দিলাম, বললাম দেশে আসছি। আমার কষ্ট হবে ভেবে পরিবারের কেউ আমাকে বাবার মৃত্যুর কথা বলল না। এয়ারপোর্ট থেকে দুই বন্ধু আমাকে নিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ দেখি ওরা আমাকে গোরস্থানে নিয়ে যাচ্ছে। আমি আসার খবর পাওয়ার আগেই, মাগরিবের পর, বাবাকে কবর দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। আমিও সেদিনই বাংলাদেশে পৌঁছেছিলাম রাত ১১ টাই, কিন্তু বাবার কবরে মাটি দিতে পারিনি।
এই কষ্টটা আজও আমাকে বয়ে বেড়ায়। যখনই অন্য যে কোনো কারণে কষ্ট পাই, বাবার কবরে মাটি দিতে না পারার কথাটা মনে চলে আসে।
বিদেশে থাকা মানুষদের একটা আলাদা যন্ত্রণা থাকে, যা দেশে থাকা মানুষ কোনোদিন বুঝবে না। প্রতিটা মিসড কল, প্রতিটা রাতের অচেনা নম্বর, বুকের ভেতর একটা ছোট্ট কম্পন তুলে দেয়। ফোনটা হাতে নেওয়ার আগের ওই কয়েক সেকেন্ড মনে মনে হাজারটা দোয়া পড়ে ফেলি। দূরে থেকে ভালোবাসা যায়, কিন্তু পাশে থেকে ভালোবাসা যায় না। আপনজনের অসুস্থতার খবর শুনেও ছুটে যাওয়া যায় না সাথে সাথে, একটা ফ্লাইটের অপেক্ষা করতে হয়, আর সেই অপেক্ষার মধ্যেই কখনো কখনো সময় ফুরিয়ে যায়। এই ভয়টা, এই অপরাধবোধটা, প্রবাসে থাকা প্রতিটা মানুষ নিঃশব্দে বয়ে বেড়ায় দেশের প্রিয়জনদের কাছ থেকে অনেক দূরে থেকেও তাদের নিয়ে দুশ্চিন্তা কখনো কমে না।
বাবা, তুমি হয়তো কোনোদিন মুখ ফুটে বলোনি ভালোবাসার কথা, আমিও বলার সাহস পাইনি তোমাকে। কিন্তু আজ বুঝি, ভালোবাসা সবসময় শব্দে বাঁধা থাকে না। তোমার লোহার গেটের ওই একটা শব্দ, মাগরিবের পর বাড়ি ফেরার কড়া নিয়ম, বিদায়বেলার লুকিয়ে রাখা চোখের জল, আর জীবনের শেষ মুহূর্তে বলা ওই একটা ডাক “তাড়াতাড়ি চলে আসো” এসবই ছিল তোমার ভাষা। তুমি বলে গেছ সব, শুধু অন্যভাবে।
বাবা, তুমি হয়তো কোনোদিন মুখ ফুটে বলোনি ভালোবাসার কথা, আমিও বলার সাহস পাইনি তোমাকে। কিন্তু আজ বুঝি, ভালোবাসা সবসময় শব্দে বাঁধা থাকে না। তোমার লোহার গেটের ওই একটা শব্দ, মাগরিবের পর বাড়ি ফেরার কড়া নিয়ম, বিদায়বেলার লুকিয়ে রাখা চোখের জল, আর জীবনের শেষ মুহূর্তে বলা ওই একটা ডাক “তাড়াতাড়ি চলে আসো” এসবই ছিল তোমার ভাষা। তুমি বলে গেছ সব, শুধু অন্যভাবে।
আমি শুধু তোমার কবরে এক মুঠো মাটি দিতে পারিনি, বাবা। এই একটা অপূর্ণতা আজীবন বয়ে বেড়াব। কিন্তু বাকি সবকিছুতে আমি তোমার কাছে ঋণী তোমার নীরব শাসনে, তোমার নিঃশব্দ ত্যাগে, তোমার কঠিন হাতের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোমল একটা মনে।
আজ আমি নিজেও দুই মেয়ের বাবা। তুমি যা বলতে পারোনি, আমি তা প্রতিদিন বলি। যখনই সুযোগ পাই, মেয়েদের বুকে জড়িয়ে বলি “মা রে, তোদের আমি অনেক ভালোবাসি।” ওরাও বলে, “আমরাও তোমাকে অনেক ভালোবাসি, বাবা।” এই কথাগুলো বলার মধ্য দিয়ে হয়তো আমি তোমাকেই একটু একটু করে ফিরে পাই, বাবা। তোমার কাছ থেকে শেখা নীরব ভালোবাসাকে আমি শব্দ দিয়েছি, যাতে আমার মেয়েদের কোনোদিন এই আক্ষেপ বয়ে বেড়াতে না হয়, যা আমি সারাজীবন বয়ে বেড়াই।
তুমি নেই, বাবা। তোমাকে বিদায় জানানো হয়নি আমার। তাই আজও, প্রতিবার মেয়েদের ভালোবাসার কথা বলার সময়, মনে হয় এই কথাগুলো তোমার উদ্দেশ্যেও বলা।
বাবা দিবসের বিশেষ সংখ্যাটি ডাউনলোড লিংক: Father_AK_small