আমজাদ হোসেন: “বাবা” শব্দটা শুনলেই সবার আগে মনে পড়ে এক পরম ভালোবাসা, লুকিয়ে থাকা এক গভীর আবেগ, আর পরম শ্রদ্ধার এক নাম। বাবা শুধু একটি শব্দ নয়; এর ভেতরে মিশে থাকে নিরাপত্তা, নির্ভরতা, ভালোবাসা আর না-বলা হাজারো অনুভূতি। অনেক দিন ধরেই ভাবছিলাম, বাবাকে নিয়ে কিছু লিখব। কিন্তু সময় করে আর হয়ে ওঠে না। আসলে লেখালেখি সবার দ্বারা হয় না; এর জন্য আলাদা একটা মনোযোগ, একটা মানসিক প্রস্তুতি লাগে। বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লিখতে বসার মতো করে বাবাকে নিয়ে লেখা যায় না এখানে তো যুক্তির চেয়ে আবেগের ওজন অনেক বেশি। হঠাৎ একদিন মাহবুব ভাই আমাকে বললেন, বাবা দিবস উপলক্ষে কিছু একটা লিখতে। কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই কেন যেন আমার চোখে পানি চলে এলো। বাবা, তোমাকে নিয়ে লিখব কত স্মৃতি, কত আবেগ, কত ভালোবাসা, কত শ্রদ্ধা! এতসব অনুভূতির প্রকাশ আমি কীভাবে করব?
হঠাৎ মনে পড়ে গেল নিউটনের তৃতীয় সূত্রের কথা“ প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।” ভাবলাম, আমার চোখে যখন বাবাকে মনে করে এত জল আসে, তার মানে নিশ্চয়ই আমার বাবা আমার জন্যও জীবনে কত অশ্রু ফেলেছেন হয়তো এখনো ফেলেন। পুরুষ মানুষ হয়তো চোখের জল সহজে প্রকাশ করে না। বাইরে থেকে শক্ত থাকে, কিন্তু ভেতরটা যে কতটা ভেঙে যায়, সেটা কে জানে! বাবার সেই অশ্্রুগুলো হয়তো মেঘনা কিংবা পদ্মার মতো প্রশস্ত নয়; বরং করতোয়া নদীর মতোই আঁকাবাঁকা পথে বয়ে গিয়ে চোখের আড়ালে হৃদয়ের ভেতর ক্ষরণ হয়ে যায়। আজ এই কথাগুলো লিখতে গিয়ে ছোটবেলার হাজারো স্মৃতির ভিড় থেকে একটা স্মৃতি খুব স্পষ্ট হয়ে সামনে ভেসে উঠল।
২০০০ সালের দিকে আমার বড় ভাই প্রথমবারের মতো সৌদি আরব যাচ্ছিল। ভাইয়ের বয়স তখন খুব বেশি নয় সম্ভবত ১৮-২০ বছর। ফ্লাইট ছিল রাতে। যথারীতি সময় হলে ভাই চলে গেল। ভাইকে বিদায় দেওয়ার সময় মা অনেক কান্নাকাটি করেছিলেন, ভাইও কেঁদেছিল। আমি কেঁদেছিলাম কি না, ঠিক মনে নেই। তখন তো ছোট ছিলাম; হয়তো বুঝতেই পারিনি বিচ্ছেদের কষ্ট কতটা। কিন্তু একটা বিষয় আমাকে সেদিন ভীষণ অবাক করেছিল আমি বাবাকে কাঁদতে দেখিনি। মনে হয়েছিল, বাবা বুঝি পাথরের মানুষ! যেন ইস্পাত দিয়ে তৈরি। বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে আমি অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তারপর আমরা বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফিরে এলাম। সবাই যার যার মতো ঘুমিয়ে পড়ল। বাবা ঘুমিয়েছিলেন কি না, আজও জানি না। ফজরের নামাজের পর বাবা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না।
সে কী কান্না! হৃদয়বিদারক, আকাশভাঙা কান্না। মূহুর্মূহু কান্নায় মনে হচ্ছিল, কোনো কোকিল যেন তার প্রিয় সঙ্গীকে হারিয়ে প্রকৃতিকে জানাচ্ছে তার শোকের কথা। সেদিন বাবার কান্নায় আমার মনে হয়েছিল, যেন ভোরের সেই সকালটাও কাঁদছে। পুরো ঘরটা আমার কাছে কেমন ভারী হয়ে গিয়েছিল। সেই ছোট্ট বয়সেও দৃশ্যটা আমার মনে এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে, এত বছর পরও চোখ বন্ধ করলে আমি বাবাকে সেইভাবেই দেখতে পাই। বাবার সেই কান্না আজও আমার চোখের সামনে ভাসে। ২০১৭ সালে যখন প্রথমবার স্কলারশিপ নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া যাই, তখন আমার মনে একটা প্রশ্ন জেগেছিল “বাবা কি আমার জন্যও সেদিনের মতো কেঁদেছিলেন?” হয়তো কেঁদেছিলেন। হয়তো এখনো কাঁদেন।
বাবার সঙ্গে আমার দেখা হয় না প্রায় আট বছর হলো। এত বছর দূরে থেকেও বাবার কাছে আমি এখনো সেই ছোট্ট ছেলেটাই রয়ে গেছি। সেই ছেলেটা, যার জন্য বাবা হয়তো আজও অপেক্ষা করেন “কবে আসবে?” বাবা প্রায়ই একটা কথা বলেন “যেদিন বাবা হবি, সেদিন বুঝবি বাবা কাকে বলে।” আজ আমারও দুই সন্তান। বাবার কথার সেই গভীর অর্থ এখন একটু একটু করে বুঝতে পারি। সন্তানকে ভালোবাসা কতটা গভীর, কতটা নিঃশর্ত নিজে বাবা হওয়ার পরই যেন বাবাকে নতুন করে চিনতে শুরু করেছি। আমরা চার ভাই-বোনের মধ্যে একমাত্র আমিই দেশের বাইরে থাকি। তাই বাবা যে আমাকে কতটা মিস করেন, তার একটা ছোট্ট উদাহরণ আছে। প্রথমদিকে আমি ভাবতাম, মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বললেই তো হলো। মা তো আমার সব খবর বাবাকে দেন। মাঝেমধ্যে বাবার সঙ্গেও কথা হয়। আমরা যারা প্রবাসে থাকি, হয়তো অনেকেই এভাবেই ভাবি।
কিন্তু একদিন বাবা বললেন, “তুমি তো শুধু তোমার মাকে ফোন দাও। আমার ফোনে তো আর ফোন দাও না!” কথাটা শুনে আমি থমকে গেলাম। তারপর বুঝলাম, বাবা আসলে শুধু ফোন চাননি। তিনি হয়তো বলতে চেয়েছিলেন “তুই আমাকে আলাদা করে একবার ফোন দে বাবা। তোর কণ্ঠটা শুনি। বল, কেমন আছিস। আর একবার বল বাবা, কেমন আছো? তুই কবে আসবি?” সেদিন থেকে বাবাকে আমি আলাদা করে ফোন করি। কারণ এখন বুঝি মায়ের কাছে আমার খবর নেওয়া আর বাবার কাছে আমার কণ্ঠ শোনা এক জিনিস নয়। বাবা হয়তো খুব বেশি কিছু চান না। শুধু চান, তার সন্তান তাকে মনে রাখুক। মাঝে মাঝে ফোন করুক। আর দূরদেশ থেকে একবার বলুক “বাবা, আমি ভালো আছি।”
যাদের বাবা নেই, তারা জানেন জীবনের কত বড় একটা বটবৃক্ষ আমরা হারিয়ে ফেলি বাবাকে হারানোর সঙ্গে সঙ্গে। আর যাদের বাবা এখনো আছেন, তারা সত্যিই ভীষণ ভাগ্যবান। আমরা যারা বাবাকে এখনো “বাবা” বলে ডাকতে পারি, আমাদের চেয়ে সৌভাগ্যবান আর কে আছে?
তাই পৃথিবীর সব বাবারা বেঁচে থাকুন সন্তানের অকৃত্রিম ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর সম্মান নিয়ে। আর দিন শেষে আমাদের সবার মুখে যেন উচ্চারিত হয় “রব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা।”
বাবা, তুমি ভালো থেকো। সুস্থ থেকো। অনেক অনেক বছর বেঁচে থেকো। তোমার সেই ছোট্ট ছেলেটা হয়তো আজ অনেক দূরে, কিন্তু তোমার হৃদয়ের খুব কাছেই আছে। ভালবাসি
বাবা দিবসের বিশেষ সংখ্যাটি ডাউনলোড লিংক: Father_AK_small