ব্যাংক কর্মকর্তার সতর্কতায় রক্ষা পেলেন ১২ লাখ ডলারেরও বেশি সঞ্চয় অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর পার্থের এক তরুণী মা শেষ মুহূর্তে ভয়াবহ আর্থিক প্রতারণার শিকার হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছেন। একটি ছোট্ট বানান ভুল শনাক্ত করে ওয়েস্টপ্যাক ব্যাংকের এক সতর্ক কর্মকর্তা তাঁর প্রায় ১২ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলার (A$1.2 million) ব্যক্তিগত সঞ্চয় হারানোর হাত থেকে বাঁচান।
ঘটনাটি ঘটে প্রথম বাড়ি কেনার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি (Settlement) সম্পন্ন হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে। ওই নারী A$1.7 মিলিয়ন মূল্যের একটি বাড়ি কেনার জন্য A$500,000 ঋণ এবং নিজের A$1.2 মিলিয়ন সঞ্চয় ব্যবহার করতে যাচ্ছিলেন। সেটেলমেন্টের ঠিক আগে তিনি তাঁর আইনজীবীর (Solicitor) কাছ থেকে এসেছে বলে মনে হওয়া একটি ইমেইল পান। সেখানে জরুরি ভিত্তিতে নির্দিষ্ট একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। সবকিছুই এতটাই বাস্তবসম্মত ছিল যে তিনি বিষয়টি নিয়ে কোনো সন্দেহ করেননি। তবে ওয়েস্টপ্যাকের রিভারটন শাখার পার্সোনাল ব্যাংকার নীত কুকরেজা (Neet Kukreja) বিষয়টি খেয়াল করেন। দীর্ঘদিন ধরে ওই গ্রাহকের বাড়ি কেনার পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকার কারণে তিনি বুঝতে পারেন, ইমেইলের ভাষা ও অস্বাভাবিক তাড়াহুড়োর বিষয়টি আগের যোগাযোগের সঙ্গে মিলছে না। তিনি গ্রাহককে দ্রুত শাখায় আসতে বলেন এবং অর্থ স্থানান্তর না করে পুরো বিষয়টি যাচাই শুরু করেন।
তদন্তে দেখা যায়, ইমেইলে দেওয়া অর্থ প্রদানের নির্দেশনা স্বাভাবিক সেটেলমেন্ট প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আরও যাচাই করতে গিয়ে জানা যায়, যাঁর নামে ইমেইল পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, তিনি সেদিন ছুটিতে ছিলেন এবং ইমেইল পাঠানোর কোনো সুযোগই ছিল না। শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে প্রতারণার মূল সূত্র।
ইমেইল ঠিকানায় “westpac”-এর পরিবর্তে লেখা ছিল “westtpac”—অর্থাৎ একটি অতিরিক্ত “t” অক্ষর যোগ করা হয়েছিল। এতটাই নিখুঁতভাবে প্রতারকরা আসল ইমেইলের স্বাক্ষর, ভাষা ও বিন্যাস নকল করেছিল যে সামান্য এই বানান ভুলই ছিল একমাত্র বড় সূত্র। পরে সেটেলমেন্ট এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হওয়া যায়, কোনো অর্থ স্থানান্তরের অনুরোধই করা হয়নি। বরং তাদের ইমেইল অ্যাকাউন্ট হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল।
ঘটনাটি জানতে পেরে ওই তরুণী মা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন, মাত্র কয়েক মিনিটের অসাবধানতায় তাঁর সারা জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে যেতে পারত। ব্যাংক কর্মকর্তা নীত কুকরেজা বলেন, প্রতারকরা এখন অত্যন্ত কৌশলী। তাই কোনো আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে শুধু ইমেইলের ওপর নির্ভর না করে অবশ্যই ফোন করে বা অন্য নির্ভরযোগ্য উপায়ে তথ্য যাচাই করা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি Business Email Compromise (BEC) নামে পরিচিত এক ধরনের প্রতারণা। এতে অপরাধীরা বৈধ ইমেইল অ্যাকাউন্টে অনুপ্রবেশ করে আসল প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ে ভুয়া অর্থ প্রদানের নির্দেশ পাঠায়। বিশেষ করে বাড়ি কেনাবেচার মতো বড় অঙ্কের লেনদেনে এ ধরনের প্রতারণা দ্রুত বাড়ছে। ওয়েস্টপ্যাকের জালিয়াতি প্রতিরোধ বিভাগের প্রধান বেন ইয়াং বলেন, বাড়ি কেনা একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় আর্থিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি। প্রতারকরা সেই সুযোগই কাজে লাগায়। তাই অর্থ স্থানান্তরের আগে প্রতিটি নির্দেশনা ভালোভাবে যাচাই করা এবং কোনো পরিবর্তন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা অত্যন্ত জরুরি। ন্যাশনাল অ্যান্টি-স্ক্যাম সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে অস্ট্রেলিয়ায় Payment Redirection Scam-এর মাধ্যমে মানুষ প্রায় A$166.8 মিলিয়ন হারিয়েছে।
কমিউনিটির জন্য সতর্কবার্তা:
- শুধুমাত্র ইমেইলের নির্দেশনা দেখে কখনো বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর করবেন না।
- ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা অর্থ প্রদানের নির্দেশ পরিবর্তন হলে অবশ্যই ফোন করে নিশ্চিত করুন।
- ইমেইল ঠিকানার প্রতিটি অক্ষর ভালোভাবে পরীক্ষা করুন।
- প্রতারকরা সাধারণত “জরুরি”, “এখনই”, “শেষ সময়”—এ ধরনের চাপ সৃষ্টি করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে চায়।
- সন্দেহ হলে অর্থ পাঠানোর আগে আপনার ব্যাংক, আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করুন।
একটি অতিরিক্ত অক্ষর, একটি ফোনকল এবং কয়েক মিনিটের সতর্কতা—এই তিনটিই পার্থের ওই মায়ের সারা জীবনের সঞ্চয় রক্ষা করেছে। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, প্রতারণার কৌশলও তত নিখুঁত হচ্ছে। তাই সচেতনতা ও যাচাইই এখন সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।
Source: 7 news