দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী অ্যাডিলেডে স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যদের সঙ্গে এক প্রাণবন্ত মতবিনিময় সভা ও নৈশভোজে অংশ নিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের মান্যবর হাইকমিশনার এইচ ই এফ এম বোরহান উদ্দিন। ‘সাউথ অস্ট্রেলিয়ান বাংলাদেশ কমিউনিটি অ্যাসোসিয়েশন’ (সাবকা)-র সার্বিক ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শহরের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, নতুন অভিবাসী এবং বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আজমুল হক পাপ্পু। ৯ আগস্ট ২০২৬ (রবিবার) দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার প্রস্পেক্টে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘এলিজা হল’ (Eliza Hall, 128 Prospect Road, Prospect, SA 5082) প্রাঙ্গণে সন্ধ্যা ৬:০০টা থেকে রাত ৮:০০টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টাব্যাপী এ আয়োজন চলে। হাইকমিশনারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় উপস্থাপন, প্রবাসী সমাজের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা পর্যালোচনা এবং শিক্ষা, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টির পথ উন্মোচন করাই ছিল এই সভার মূল লক্ষ্য।

বক্তারা উল্লেখ করেন, অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার সমাজে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবস্থান দিন দিন সুসংহত ও শক্তিশালী হচ্ছে। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে বাংলাদেশিরা অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় অগ্রগতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন। এছাড়া বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা ও স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখছেন। নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা ও পারিবারিক ঐতিহ্য ধারণের মাধ্যমে তাঁরা অস্ট্রেলিয়ার বহুমাত্রিক সমাজকে আরও সমৃদ্ধ করছেন।

অনুষ্ঠানের অন্যতম মূল আকর্ষণ ছিল উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব। প্রবাস জীবনের বিভিন্ন বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কমিউনিটির সদস্যরা ২০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেন। মান্যবর হাইকমিশনার অত্যন্ত ধৈর্য ও আন্তরিকতার সঙ্গে প্রতিটি প্রশ্নের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও সমাধানমূলক দিকনির্দেশনা দেন:
কনস্যুলার সেবা ও পাসপোর্ট সহজীকরণ: অ্যাডিলেডে স্থায়ী কনস্যুলার সেবা না থাকায় ই-পাসপোর্ট নবায়ন, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সত্যায়ন এবং ‘নো ভিসা রিকোয়ার্ড’ (NVR) সিল সংক্রান্ত ভোগান্তি দূর করতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়। হাইকমিশনার নিয়মিত বিরতিতে মোবাইল কনস্যুলার ক্যাম্প পরিচালনা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল সেবার পরিধি আরও বিস্তৃত করার সুস্পষ্ট আশ্বাস দেন।
শিক্ষার্থী কল্যাণ, ইন্টার্নশিপ ও ক্যারিয়ার: দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান, শিক্ষা-পরবর্তী ওয়ার্ক ভিসা (Post-Study Work Visa) জটিলতা নিরসন এবং স্থানীয় করপোরেট ও টেক ইন্ডাস্ট্রির সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়।
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ: অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, বিশেষ করে তৈরি পোশাক, পাটজাত পণ্য, সামুদ্রিক খাদ্য (সিফুড) ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রপ্তানি সম্ভাবনার ওপর জোর দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রবাসীদের বাংলাদেশে সহজে ও নিরাপদে বিনিয়োগের অনুকূল নীতি ও সুযোগ-সুবিধা তুলে ধরা হয়।
জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ও বৈধ রেমিট্যান্স: বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) সেবা প্রদানের অগ্রগতি এবং বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণে সরকারের বর্তমান প্রণোদনা ও অন্যান্য সুবিধা সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করা হয়।
হাইকমিশনার তাঁর বক্তব্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন দূরদর্শী পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ কৌশল বিস্তারিত তুলে ধরেন। সেবামূলক কার্যক্রমে দূতাবাসের কিছু সীমাবদ্ধতা খোলাখুলি স্বীকার করে তিনি তা আধুনিকায়নের মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।

উপস্থিত প্রবাসীদের উদ্দেশে হাইকমিশনার বলেন: “বিদেশে বসবাসরত প্রতিটি বাংলাদেশিই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের এক একজন জীবন্ত রাষ্ট্রদূত (Living Ambassador)। আপনাদের মেধা, সততা, ইতিবাচক কর্মপ্রয়াস এবং অস্ট্রেলীয় সমাজের মূলধারায় সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হবে।”
অ্যাডিলেডের প্রবাসী কমিউনিটির পক্ষ থেকে হাইকমিশনার ও দূতাবাসের প্রতিনিধি দলকে সার্বিক সহযোগিতা ও সরাসরি উপস্থিতির জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। এদিকে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী অ্যাডিলেডে স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যদের সুবিধার্থে ক্যানবেরাস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন ৮ ও ৯ আগস্ট ২০২৬ দুই দিনব্যাপী এই কনসুলার ক্যাম্প পরিচালিত হয়। ই-পাসপোর্ট (E-Passport) আবেদন গ্রহণ ও নবায়ন, নো ভিসা রিকোয়ার্ড (NVR) সত্যায়ন, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (POA) প্রসেসিং, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট সংক্রান্ত সেবা সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় কনসুলার ও প্রশাসনিক সহায়তামূলক সেবা প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় সাবকার নির্বাহী পরিষদের সকল সদস্য, স্বেচ্ছাসেবক এবং অংশগ্রহণকারী সুধীজনকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সংগঠনটির চেয়ারপারসন মোহাম্মদ তারিক।
ক্যানবেরা থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসের সর্বোচ্চ প্রতিনিধির সরাসরি অ্যাডিলেডে এসে প্রবাসীদের সুখ-দুঃখের কথা ও মতামত শোনার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগকে স্থানীয় বাংলাদেশিরা অত্যন্ত ইতিবাচক, ফলপ্রসূ ও অনুপ্রেরণাদায়ক এক মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।
