অস্ট্রেলিয়ায় মূল্যস্ফীতি আবারও বেড়েছে। গত সেপ্টেম্বরে দেশটির বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে, যা আগস্টে ছিল ৪ শতাংশ। নতুন এই পরিসংখ্যানের পর আগামী সপ্তাহে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়া (আরবিএ) সুদের হার বাড়াতে পারে—এমন আশঙ্কা জোরালো হয়েছে। এতে বাড়ির ঋণ নেওয়া পরিবারগুলোর পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে চাপে থাকা সাধারণ মানুষের উদ্বেগও বাড়তে পারে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) প্রকাশিত নতুন মূল্যস্ফীতির তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে এক মাসে সামগ্রিক ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) বেড়েছে ০ দশমিক ৮ শতাংশ। এর ফলে গত ১২ মাসে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে। আগস্টে বার্ষিক এই হার ছিল ৪ শতাংশ।
অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন পরিসংখ্যান প্রকাশের আগেই আর্থিক বাজারে নভেম্বর মাসে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা ৬০ শতাংশের বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছিল। মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হওয়ায় সেই সম্ভাবনা আরও গুরুত্ব পেয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার সুদের হার নির্ধারণকারী আরবিএর মুদ্রানীতিবিষয়ক বোর্ডের বৈঠক শুরু হবে আগামী সোমবার, ২ নভেম্বর। মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর বিকেলে সুদের হারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে। একই দিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক, বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি নিয়ে তাদের হালনাগাদ পূর্বাভাসও প্রকাশ করবে।
এর আগে গত সপ্তাহে আরবিএর ডেপুটি গভর্নর অ্যান্ড্রু হাউজার বলেছিলেন, মূল্যস্ফীতির ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগের পূর্বাভাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয়েছে। তাঁর এই মন্তব্যের পর নভেম্বর মাসে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা আরবিএর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘ মেয়াদে মূল্যস্ফীতি ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে রাখতে চায়। কিন্তু বর্তমান হার সেই লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকলে পণ্য ও পরিষেবার দাম বাড়তে থাকে। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়াতে পারে।
সুদের হার বাড়লে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার খরচ বৃদ্ধি পায়। এতে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় এবং বিনিয়োগের প্রবণতা কমতে পারে। অর্থনীতিতে চাহিদার চাপ কমলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে সব ক্ষেত্রে দেখা যায় না। আবার সুদের হার বাড়লে ঋণগ্রহীতাদের ওপর আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। এ কারণেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে।
এবারের সিদ্ধান্তে আরবিএকে মূল্যস্ফীতির উচ্চ হার এবং পরিবারের ব্যয়সংকট—দুই বিষয়ই বিবেচনায় নিতে হবে।
অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ি কেনার জন্য যাঁরা পরিবর্তনশীল সুদের হারে গৃহঋণ নিয়েছেন, সুদের হার বাড়লে তাঁদের মাসিক কিস্তি বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে পরিবারের বাজেটে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে যেসব পরিবার বাড়ির ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল, বাজার খরচ, যাতায়াত ও সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় সামলাচ্ছে, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও বাড়ি কেনার ঋণ এবং দৈনন্দিন ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত অনেক পরিবারকে নিয়মিত আয়ের একটি বড় অংশ বাসস্থান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করতে হয়। সুদের হার বাড়লে যেসব পরিবারের গৃহঋণ রয়েছে, তাদের হাতে অন্যান্য খাতে ব্যয় করার মতো অর্থ কমে যেতে পারে।
তবে সুদের হার বাড়লেই সব ঋণগ্রহীতার কিস্তি একইভাবে বাড়বে, এমন নয়। ঋণের ধরন, ব্যাংকের শর্ত, ঋণের বাকি পরিমাণ এবং সুদের হার পরিবর্তনের ওপর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে।
মূল্যস্ফীতি বলতে সাধারণভাবে পণ্য ও পরিষেবার সামগ্রিক মূল্যস্তর বৃদ্ধিকে বোঝায়। বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হওয়ার অর্থ, ভোক্তা মূল্যসূচকের হিসাবে এক বছর আগের তুলনায় সামগ্রিক মূল্যস্তর বেড়েছে ওই হারে। এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি পণ্য বা পরিষেবার দাম ঠিক ৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে।
খাদ্যপণ্য, বাসস্থান, পরিবহন, জ্বালানি ও বিভিন্ন পরিষেবার দাম ভিন্ন ভিন্ন হারে পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে একই মূল্যস্ফীতির সময়েও বিভিন্ন পরিবারের ব্যয়ের অভিজ্ঞতা এক রকম হয় না।
যে পরিবারগুলোর আয়ের বড় অংশ খাবার, বাসস্থান ও যাতায়াতে ব্যয় হয়, তাদের কাছে মূল্যস্ফীতির চাপ তুলনামূলক বেশি অনুভূত হতে পারে। অন্যদিকে, আয় একই হারে না বাড়লে দৈনন্দিন খরচ সামলাতে সঞ্চয় ভাঙতে বা অন্য ব্যয় কমাতে হতে পারে।
সুদের হার নিয়ে আরবিএর সিদ্ধান্তের আগে মূল্যস্ফীতির সামগ্রিক হার ছাড়াও অর্থনীতির অন্যান্য সূচক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। মূল্যস্ফীতি কতটা বিস্তৃত এবং দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, পণ্য ও পরিষেবার দাম কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কেমন—এসব বিষয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যায়নে প্রভাব ফেলতে পারে।
বুধবারের তথ্য প্রকাশের আগে বাজারে নভেম্বর মাসে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা ৬০ শতাংশের বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছিল। তবে বাজারের এই হিসাব কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়। শেষ পর্যন্ত সুদের হার বাড়বে, নাকি অপরিবর্তিত থাকবে, তা নির্ধারণ করবে আরবিএর বোর্ড।
আগামী ৩ নভেম্বরের বৈঠক তাই ঋণগ্রহীতা, বাড়ি কেনার পরিকল্পনা করছেন এমন মানুষ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হলে তার প্রভাব পড়তে পারে ঋণগ্রহীতাদের মাসিক বাজেটে। অন্যদিকে, সুদের হার অপরিবর্তিত রাখলেও মূল্যস্ফীতি কত দ্রুত কমবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যেতে পারে।
সূত্র: এবিসি নিউজ, ২৮ অক্টোবর ২০২৬।