জাফরীন জলিল তিথি: প্রত্যেক ধর্ম পালনের কিছু নিয়ম-নীতি , রীতি – রেওয়াজ থাকে যা একজন ব্যাক্তি কে একটি সুশৃঙ্খল জীবন যাপনে সাহায্য করে। আমার ভাবনা সব সময় ই খুঁজতে থাকে বুঝতে চায়, এই নিয়ম নীতি কি শেখাতে চায়? কিসের প্রতীক ? যেমন রোজা বা উপবাস, আমি মনে করি সাধারণ ভাবে একটি বিশেষ অভ্যাস যা শারীরিক মানসিক ভাবে উপকার। আমি সব সময় ভাবি এই না খেয়ে থাকা আমাকে শেখাতে চায় খাবার জোগাড়ে সামর্থহীনের কতটা কষ্ট, খাবার অপচয় করবার সময় যেন মনে হয় আহা কত জন অভুক্ত রয়েছে বা নিজের বাড়তি খাবার অন্যকে দেয়া গেলে ভালো হতো। লোভ লালসা থেকে নিজেকে সংবরণ করার শক্তি তৈরী করা। বার বার ভাবি আমাকে কি শেখাতে চায় বা অন্যজন কি শিখছেন ? না কেবল তোতা পাখির মতো জীবনে জপ করছি নিজেকে কতটা বদলাতে পারছি ?। জটিল মন সব সময়ে প্রশ্ন করে ঠিক উত্তর জানতে চায় । কি কি নিয়মে দূর্গা পূজা পালন হচ্ছে কে করছেন আমার এই পরিক্রমার পেছনের ভাবনা কেন মা দূর্গা কে নিয়ে এতো আয়োজন।
কিশোরী বয়সে স্কুল ছুটির পরে, স্কুলেই আমরা অনেকেই কোচিং করতাম। স্কুলের সীমানা যেখানে শুরু সেখানেই দত্ত বাড়ির সীমানা শেষ। মানে ওদের পূর্ব পুরুষের অনুদানের জমির উপরেই স্কুল গড়ে উঠেছে ব্রিটিশ আমলেই। ওই বাড়ির মধ্য বয়সী ছেলে আমরা নবীন কাকু ডাকতাম, কলেজে পড়েছেন কিনা জানিনা তবে এই স্কুলের ছাত্র। উনি ভাত ঘুম বাদ দিয়ে এসে স্যারদের সাথে আমাদের সাথে পড়ার পর নানান কিছু নিয়ে গল্প করতেন। স্কুলের পরেই বড় রাস্তা তার সাথেই ব্রিজ পাড় হয়ে আমরা মেয়েরা ৫/৬ জন হেঁটে হেঁটেই বাড়ি ফিরতাম। ব্রিজ এর রেলিং এ কটা ছেলে আমাদের থেকে বড়, আমাদের উদ্দেশ্য করে গান গাইতো বিভিন্ন কিছু বলতো, সেই বয়সে সব কিছুতেই মূর্ছা যাই আমরা। আবার বাসা থেকে বলে দেয়া হয়েছে পায়ের বুড়ো আঙুলের দিকে তাকিয়ে হাটবে, কারো দিকে তাকবে না ভদ্র ঘরের মেয়েরা এভাবেই হাঁটে।
কাকুকে বললাম আমাদের সাথে হেঁটে ব্রিজ টা পাড় করে দেবেন ? উনি আমার চোখে তাকিয়ে বললেন তোরা এসব বখাটে পোলাপানদের ভয় পাস ? “তোরা তো মা দুর্গার জাত সামনে গিয়ে ওদের চোখের দিকে তাকিয়ে হুঙ্কার দিলে সব ভয়ে পালাবে”। আমি ভাবি কাকু কি পাগল কি বলে বাসায় জানলে কি হবে আর কি ভাবে ওই ছেলেদের কিছু বলবো ! আমরা কিছুই বলিনি কাকু বা শিক্ষকেরা কিছু করেছেন। তখন আসলে বুঝিনি পরে মনে হয়েছে আমাদের বাড়ির লোকেরা কাকুর থেকে অনেক বড় প্রতিষ্ঠানে পড়েছেন তবু কাকু জানতেন প্রতিটি মেয়ের মাথা উঁচু করে স্বাধীন ভাবে বাঁচার অধিকার ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অধিকার আছে বা মেয়েদের কে তাদের সঠিক অবস্থান টা তিনি বুঝতেন। শিক্ষা তো সার্টিফিকেট থেকেই হয় না মননের শিক্ষা টা ই তো চাই।
বড় হয়ে পড়েছি জানা শোনা লোকের মুখে শুনেছি কেন মা দূর্গা হলেন তার এতো শক্তি কেমন করে এলো কিসের আলোতে তিনি অসুর বিনাশিনী ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার চোখে দেবী দূর্গা সমতা,মৈত্রী, সম্মান, শ্রেণী ভেদাভেদের বিপরীতে দাঁড়ানোর শক্তি, সামাজিক ও পেশাজীবী জনতার মূল্যায়ন ও ভারসাম্যের প্রতীক। নারী যে কত রূপে আবির্ভুত হতে পারেন সময়ের আবর্তে তার প্রকাশ ই মা দূর্গা। নারীর মানসিক শক্তি কতটা শক্তিশালী তা তখন দেবতারাই স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তাই মা দূর্গা বা দেবী দূর্গা আমার মনোযোগ সবসময় ই কেড়েছেন।
বড় হয়ে পড়েছি জানা শোনা লোকের মুখে শুনেছি কেন মা দূর্গা হলেন তার এতো শক্তি কেমন করে এলো কিসের আলোতে তিনি অসুর বিনাশিনী ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার চোখে দেবী দূর্গা সমতা,মৈত্রী, সম্মান, শ্রেণী ভেদাভেদের বিপরীতে দাঁড়ানোর শক্তি, সামাজিক ও পেশাজীবী জনতার মূল্যায়ন ও ভারসাম্যের প্রতীক। নারী যে কত রূপে আবির্ভুত হতে পারেন সময়ের আবর্তে তার প্রকাশ ই মা দূর্গা। নারীর মানসিক শক্তি কতটা শক্তিশালী তা তখন দেবতারাই স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তাই মা দূর্গা বা দেবী দূর্গা আমার মনোযোগ সবসময় ই কেড়েছেন।
বিভিন্ন ভাষায় নারীকে যে সকল বিশেষণে অভিবাদন জানানো হয় যেমন ম্যাডাম বা আওরাত তার মধ্যে বাংলায় সব থেকে সন্মান দেয়া হয় যেমন প্রমীলা দেবী কুসুম দেবী। নারী কে দেবীর সাথে তুলনা করা হয়। অন্য দুটি শব্দের উৎপত্তি এতটা সম্মানের নয় যেমন দেবী। এতো আলাপের সারমর্ম হলো আমাদের ভূখণ্ডে বা ভারতবর্ষে দেবী দুর্গাকে উৎকৃষ্ট সমাজ ব্যাবস্থার প্রতীক হিসেবে হাজার বছর আগেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অথচ আমাদের সমাজ ও পারিবারিক ব্যাবস্থায় এর ব্যবহার নাই। কিন্তু এই প্রবাসে অথবা উন্নত দেশ গুলোর আইন ও সামাজিক ব্যাবস্থায় প্রতিদিনের আচরণে এই ভেদাভেদ পরিহার করার চেষ্টা বাধ্যতা মূলক করা হয়েছে তাই নিজের দেশের প্রথম শ্রেণীর নাগরিকত্ব ছেড়ে আমরা দ্বিতীয় তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়েও এসব দেশের ব্যাবহারিক জীবনের জন্য ছুটে এসেছি।
আমাদের জ্ঞান অভিজ্ঞাণের সম্পদ এর অনুধাবন বা ব্যবহার আমরা মূল্যায়ন ই করতে পারলাম না। আসল কথায় আসি ,গত ২৪ অক্টোবর ২০২৬ সাবকা আয়োজন করেছিল দূর্গা পূজা পরবর্তী পুনর্মিলনী গত ৪ বছর ধরেই করছেন। দারুন উদ্যোগ এবং সকল মামুষের মিলনের জয় ডংকার মতো, এবছর আমিও কিছু করার নিমন্ত্রণ পেলাম আমার সাথে এলো সাবেক মনোনীত দুজন শিল্পী মম ও আপন আমি ডাকলাম মীর আসলাম, নয়ন ও পুষ্পিতা কে, যন্ত্রী হিসেবে এলেন দেবানিশান ও বিজু শামস।
আমার স্বাধীনতা নিয়ে সাজালাম ৪০ মিনিটের আনন্দ আয়োজন। মা দূর্গা মনেই নারী শক্তি স্নিগ্ধতা , মমতা, দৃঢ়তা। মা আসেন আশ্বিনের স্নিগ্ধতায় কুসুম কোমল শিশির ভেজা ঘাসে আলতা পায়ে। তাই শুরু হলো কবি নজরুলের সুরে আহির ভায়েরো রাগে শান্তির বার্তা নিয়ে যা নিয়ে গেলো কবি গুরুর সুর ধনীলো রে আহ্বান ভুবন মন্দিরে এক স্বর্গীয় আবহ। এই রাগেই আজান এর সুর। ভাবনা হলো সুর আসলে স্বর্গীয় সেখানে ধর্ম কখনো বাঁধা হয় না, আমরা মানুষরা ই বিভেদ তৈরী করি।

এর পর এলো সেই গাহি সমতার গান যেখানে নারী পুরুষ কোনই ভেদাভেদ নাই একে অপরের পরিপূরক, আবার পুরান ঘাটলে দেখা যাবে দেবতারা অসুর কে বিনাশ করতেই দুর্গাকে তৈরী করেছিলেন। সমাজ ও পৃথিবীতে দুজন কেই প্রয়োজন। তার ই ছবি এঁকেগেলো বাঁশির সুরে ও নাচের মুদ্রায় কবি নজরুলের কবিতায় মীর আসলাম ও মম, সবাই মনোযোগ নিয়ে উপভোগ করলেন।


এবার এলো একটু আনন্দ হালকা পাখার মন , তিন যুগের তিনটি আধুনিক প্রেমের গান মিষ্টি মধুর সুরে তিথি, পুষ্পিতা ও আপন এর পরিবেশনায় , সব শিল্পীরাই ঋতু পরিবর্তনের তাবরে সর্দি কাশি নিয়ে কণ্ঠ স্বরের বিড়ম্বনায় ভুগছিলেন। তিন সময়ের গানের কথায় একই আকুতি, প্রাণের মানুষের অপেক্ষা পেয়ে ও পাওয়া না পাওয়ার মধুর বেদনা।

৪০ মিনিট শেষ হলো আবার বর্তমানের নারী কীর্তন নিয়ে যে রাঁধে সে যে চুল ও বাঁধে, সেই সোহাগ চাঁদ বদনীর নাচের গান সব শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে গাইলেন। মম দর্শক সারি থেকে তার ছোট ছোট বোন দের নিয়ে আনন্দ করে মঞ্চের সামনেই আনন্দ নৃত্য ফুলে ফুলে সেজে নাচে গেলো আয়াত , কৃতিকা, তানিশা আরও কয়েকটা মিষ্টি মুখ নাম জানা নেই , কি যে মিষ্টি লাগছিলো সেই কিশোরী মুখগুলো। সাবকার আয়োজক তারিক ভাই শৌভনিক দা ও পাপ্পু ভাই কে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিথি সবাইকে নিয়ে মঞ্চ তুলে দিলেন সেমিক্লোন দলের কাছে। একটি আনন্দ মুখর সন্ধ্যা কেটেছিল সুরে সুরে সকলে হাসি হাসি মুখ নিয়ে ঘরে ফিরছিলেন টুপ্ টুপ্ ঝরা বৃষ্টিতে।