অস্ট্রেলিয়ায় বসে হঠাৎ একদিন মনে হলো, আজ একটু কাচ্চি খাওয়া যাক। কিংবা মায়ের হাতের মতো ডাল, ভর্তা, মাছের ঝোল বা গরম পরোটা। বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও এখন এমন ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব। সিডনি, মেলবোর্ন, অ্যাডিলেড, ব্রিসবেন, পার্থ কিংবা ছোট শহর—বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠছে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ।
একসময় অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি খাবার খুঁজে পাওয়া ছিল কঠিন। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। বাংলাদেশি জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে খাবারের চাহিদা। তবে এই ব্যবসার গল্প শুধু সাফল্যের নয়। এর সঙ্গে আছে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, দক্ষ কর্মীর সংকট, বাড়তি পরিচালন ব্যয়, খাবার নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি এবং গ্রাহকসেবা নিয়ে নানা প্রশ্ন।
প্রবাসে বাংলাদেশি খাবারের চাহিদা বাড়ছে। তবে স্বাদের পাশাপাশি কর্মী সংকট, পরিচালন ব্যয়, খাবারের অপচয় ও সেবার মান নিয়ে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ।অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি রেস্তোরাঁশিল্প নিয়ে এসবিএস বাংলার এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই পরিবর্তন ও চ্যালেঞ্জের নানা দিক।
অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি রেস্তোরাঁশিল্পের শুরুর সময়টা ছিল বেশ সীমিত। সাবেক বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেটার সিদ্দিক চৌধুরী বাবলু ১৯৮৬ সালে অস্ট্রেলিয়ায় আসেন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, আশির দশকের শেষভাগ ও নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাংলাদেশি খাবারের আলাদা কোনো শক্তিশালী বাজার ছিল না।
দক্ষিণ এশীয় খাবারের বাজারে তখন ভারতীয় ও পাকিস্তানি খাবারের আধিপত্য ছিল। বাংলাদেশি খাবার খেতে চাইলে অনেক সময় ভারতীয় বা পাকিস্তানি রেস্তোরাঁতেই যেতে হতো।
সিডনিতে ‘টেস্ট অব ইন্ডিয়া’ রেস্তোরাঁয় কাজ করার পর ১৯৯১ সালে সেটি কিনে নেন বাবলু। তাঁর সময়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি খাবারের একটি আলাদা পরিচয় তৈরি করতে উদ্যোক্তাদের শুরু করতে হয়েছে প্রায় শূন্য থেকে।
নব্বইয়ের দশকে ছোট পরিসরে কিছু রেস্তোরাঁ বাংলাদেশি খাবার পরিবেশন শুরু করে। বিরিয়ানি, কাচ্চি, মাছের পদ, পরোটা, মাংসের তরকারির মতো খাবার তখন প্রবাসীদের কাছে শুধু খাবার ছিল না—ছিল দেশে ফিরে যাওয়ার এক ধরনের অনুভূতি।
অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি খাবারের জনপ্রিয়তার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের বিস্তার। নতুন প্রজন্মের অভিবাসী, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে দেশের খাবারের চাহিদা।
সিডনির রকডেলের ‘হাটবাজার’ রেস্তোরাঁর মালিক আজিজ আহমেদ ভূঁইয়া জানান, ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়ায় আসার সময় বাংলাদেশি খাবার পাওয়া বেশ কঠিন ছিল। তখন দেশের খাবারের জন্য তাঁকে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ভারতীয় বা পাকিস্তানি রেস্তোরাঁয় খেতে হতো।
রমজান মাসে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠত। ইফতারের জন্য বাংলাদেশিরা পাকিস্তানি রেস্তোরাঁয় ভিড় করতেন। সেখানে হালিম বা পেঁয়াজুর মতো কয়েকটি খাবার পাওয়া গেলেও বাংলাদেশি খাবারের পূর্ণাঙ্গ বৈচিত্র্য ছিল না।
সময়ের সঙ্গে এই চাহিদাই ব্যবসার সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশিরা শুধু নিজের জন্য খাবার চাননি; তাঁরা চেয়েছেন পরিচিত স্বাদ, পরিচিত পরিবেশ এবং নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকার একটি জায়গা।
বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ ব্যবসার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো—অনেক উদ্যোক্তার শুরুটা হয়েছে ঘরের রান্না থেকে।
মাউন্ট ড্রুইটের ‘শীতলপাটি মাসালা সিক্রেট রেস্টুরেন্ট’-এর উদ্যোক্তা কাজী সানজিদা ফারহানা ২০১০ সালে অস্ট্রেলিয়ায় আসেন। রেস্তোরাঁ ব্যবসায় আসার আগে তিনি রিটেইল ও অপারেশনস ব্যবস্থাপনায় কাজ করেছেন।
সন্তানের যত্ন নেওয়ার কারণে চাকরি ছাড়ার পর তিনি ছোট পরিসরে ক্যাটারিং শুরু করেন। গ্রাহকদের আগ্রহ ও ইতিবাচক সাড়া তাঁকে ধীরে ধীরে রেস্তোরাঁ ব্যবসায় নিয়ে আসে।
এ ধরনের গল্প অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশি রেস্তোরাঁশিল্পে বিরল নয়। কারও রান্নার প্রতি আগ্রহ, কারও পারিবারিক ঐতিহ্য, আবার কারও নিজের কমিউনিটির চাহিদা—বিভিন্ন পথ ধরে উদ্যোক্তারা এই ব্যবসায় এসেছেন।
বাংলাদেশি রেস্তোরাঁগুলোর লক্ষ্য এখন শুধু বাংলাদেশি গ্রাহক নয়। অনেক উদ্যোক্তা চাইছেন, বাংলাদেশি খাবার অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছেও পরিচিত হোক।
মাউন্ট ড্রুইটে রেস্তোরাঁ করার পেছনে ফারহানার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে বাংলাদেশি খাবারের সঙ্গে পরিচয় করানো।
ভারতীয় খাবারের বাটার চিকেন বা নান অস্ট্রেলিয়ায় অনেকের পরিচিত। কিন্তু তেহারি, কোরমা, দেশি মুরগির রোস্ট কিংবা বিভিন্ন ধরনের ভর্তা ও সবজির তরকারির সঙ্গে অনেকেরই পরিচয় কম।
ফারহানার অভিজ্ঞতায়, বাংলাদেশি খাবার প্রথমবার খেয়ে অনেক অ-বাংলাদেশি গ্রাহক পরে আবার রেস্তোরাঁয় ফিরেছেন।
অর্থাৎ বাংলাদেশি খাবারের বাজার শুধু প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রয়োজন নেই। সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারলে এটি বৃহত্তর অস্ট্রেলীয় খাদ্যসংস্কৃতিরও অংশ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশি রেস্তোরাঁর বিস্তার এখন সিডনি বা মেলবোর্নের মতো বড় শহরেই সীমাবদ্ধ নেই। ছোট শহর ও আঞ্চলিক এলাকাতেও উদ্যোক্তারা সম্ভাবনা দেখছেন।তবে সেখানে চ্যালেঞ্জও আলাদা। ডাবোর মতো এলাকায় বাংলাদেশি গ্রাহকের সংখ্যা কম। ফলে শুধু বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা চালানো কঠিন।
তাসমানিয়ার হোবার্টেও একই ধরনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী তুলনামূলক ছোট। পর্যটন মৌসুমে ব্যবসা বাড়লেও অন্য সময়ে স্থানীয় গ্রাহকদের ওপর নির্ভর করতে হয়।
২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত হোবার্টে পরিচালিত ‘দরবার’ রেস্তোরাঁর অভিজ্ঞতায় বেশি ভাড়া, পার্কিং সমস্যা, ঠান্ডা আবহাওয়া এবং সীমিত গ্রাহকসংখ্যার মতো বিষয় ব্যবসাকে টেকসই করা কঠিন করে তুলেছিল।
রেস্তোরাঁ ব্যবসায় খাবারের স্বাদ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই সব নয়। দক্ষ কর্মী পাওয়া এবং ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ।
সিডনির মিন্টো এলাকার ‘নবাব রেস্টুরেন্ট’-এর উদ্যোক্তা মোহাম্মদ লুৎফর রহমান টিপু দক্ষ শেফের গুরুত্বের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, একটি রেস্তোরাঁর খাবারের মান ধরে রাখতে দক্ষ রান্নার কর্মীর বিকল্প নেই।
মেলবোর্নের উদ্যোক্তা তারিকুল ইসলাম আবার খাবারের সতেজতার বিষয়টি সামনে এনেছেন।
বাংলাদেশি অনেক খাবার প্রতিদিন নতুন করে রান্না করতে হয়। আগের দিনের খাবার সহজে পরের দিন বিক্রি করা যায় না। ফলে কোনো দিন প্রত্যাশার তুলনায় কম গ্রাহক এলে খাবার নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে ব্যবসায়িক ক্ষতিও হয়।
খাবারের পাশাপাশি গ্রাহকসেবার মান নিয়েও বাংলাদেশি রেস্তোরাঁগুলোর সামনে রয়েছে চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশি অস্ট্রেলিয়ান কমিউনিটিতে খাবারের মান, পরিচ্ছন্নতা, অপেক্ষার সময়, কর্মীদের আচরণ ও সামগ্রিক সেবা নিয়ে মাঝেমধ্যে সমালোচনা দেখা যায়।
উদ্যোক্তারা মনে করেন, ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য মালিক ও কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান এবং পেশাদার পরিবেশ জরুরি।একই সঙ্গে কর্মীদের ন্যায্য পারিশ্রমিক ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কর্মীদের অসন্তুষ্টি শেষ পর্যন্ত গ্রাহকসেবা এবং ব্যবসার সুনাম—দুটির ওপরই প্রভাব ফেলতে পারে।
জিপি চিকিৎসক ও বাংলাদেশি অস্ট্রেলিয়ান কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত ড. চৌধুরী সাইফুল আলম বেগ মনে করেন, বাংলাদেশি রেস্তোরাঁশিল্পে আরও পেশাদার হওয়ার সুযোগ রয়েছে।তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক মানের খাবার, সেবা, ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহক-অভিজ্ঞতার দিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কারণ বাংলাদেশি খাবারের প্রতি আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেই আগ্রহকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সাফল্যে রূপ দিতে হলে শুধু ভালো রান্না যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসম্মত সেবা, পরিচ্ছন্নতা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ধারাবাহিকতা।
অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি রেস্তোরাঁর গল্প তাই কেবল একটি ব্যবসার গল্প নয়। এটি অভিবাসন, সংস্কৃতি, স্মৃতি এবং পরিচয়েরও গল্প।
একসময় যে দেশে বাংলাদেশি খাবার খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল, সেই দেশেই এখন বিভিন্ন শহরে পাওয়া যাচ্ছে কাচ্চি, বিরিয়ানি, ভর্তা, মাছ, পরোটা, ফুচকা, চটপটি কিংবা মালাই চা।
বাংলাদেশি রেস্তোরাঁগুলো একদিকে প্রবাসীদের দেশের স্বাদ দিচ্ছে, অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক খাদ্যভান্ডারে যুক্ত করছে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বাদ।
তবে সামনে এগোতে হলে এই শিল্পকে শুধু ‘দেশের খাবার’ বিক্রির জায়গা থেকে আরও পেশাদার খাদ্যব্যবসায় রূপ দিতে হবে—যেখানে স্বাদের সঙ্গে থাকবে মান, সেবা, পরিচ্ছন্নতা এবং ব্যবসায়িক স্থায়িত্ব।
প্রবাসে একটি প্লেট কাচ্চি কিংবা এক কাপ মালাই চা হয়তো ক্ষণিকের জন্য বাংলাদেশকে মনে করিয়ে দেয়। আর সেই স্মৃতির স্বাদই হয়তো অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি রেস্তোরাঁশিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি।
Source : SBS Bangla