আফ্রিকার রঙিন দুয়ার: মরক্কোর দিনগুলি- পর্ব ৬

কাসাব্লাঙ্কায় প্রথম রাতের ঘুমটা বেশ গভীরই হয়েছিল। তবে মাঝেমধ্যে ঘুম পাতলা হয়ে এলে কানে আসছিল রাস্তার ওপর বসা রাতের বাজারের প্রায় সারা রাত ধরে চলা কোলাহল। চোখ মেলে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি দশটা বেজে গেছে। সকালটা আশ্চর্য রকম শান্ত। রাতভর কোলাহলের পর হঠাৎ যেন শহরের ওপর নেমে এসেছে এক অচেনা নীরবতা। কিছুক্ষণ বিছানায় অলস ভাবে পড়ে থাকার পর আড়মোড়া ভেঙে এক ঝটকায় উঠে পড়লাম। যত তাড়াতাড়ি পরবর্তী গন্তব্য মরক্কোর রাজধানী রাবাতের উদ্দেশে রওনা দেওয়া যায়, ততই ভালো। চটপট গোসল সেরে স্যুটকেস আর ব্যাগ গোছাতে শুরু করলাম।

হোটেলের জীবনটা যেন আমাদের এই দীর্ঘ জীবনেরই একটি অতি ক্ষুদ্র সংস্করণ। কিন্তু এখানে কোনো বিপুল আয়োজন নেই। কয়েকটি জামাকাপড়, প্রসাধনী, চিরুনি, টুথব্রাশ, পেস্ট, রেজর, পারফিউম, মোবাইলের চার্জার, ল্যাপটপ, তোয়ালে। ব্যস! একটা স্যুটকেস আর একটা ব্যাগে যা ধরে, সেটুকুই যেন গোটা সংসার। এতটুকু নিয়েই দিব্যি দিন চলে যায়। এই সাময়িক, মিনিমালিস্ট জীবনের মধ্যে একটা গভীর দর্শন লুকিয়ে আছে। আমাদের অন্য জীবনে কত কিছুর প্রয়োজন হয়। বাড়ি, আসবাবপত্র, আলমারি ভরা কাপড়চোপড়, জিনিসপত্র, কত শত প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের বস্তু। তারপরও কত অভাব, কত চাওয়া!

আমাদের জীবনটাও একই রকম। কোনো ঘরই চিরস্থায়ী নয়। আমরা সবাই দুদিনের অতিথি। কোনো মানুষও চিরদিন আমাদের সঙ্গে থাকে না। ছাপ্পান্ন বছর বয়সে এসে পেছনে তাকালে দেখি, কত আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, পরিচিত মানুষ এক এক করে চলে গেছেন। আমার আব্বা, বড় বোনের সঙ্গে আর কোনো দিন দেখা হবে না। কত ভালো বন্ধু চিরদিনের জন্য চলে গেছে। এই অল্প সময়ের জীবনে আমরা কত কিছুর লোভ করি, কত প্রতিযোগিতা করি, কত সামান্য কারণে একজন আরেক জনকে আঘাত দিই!

গতকাল রাত পর্যন্ত এই কক্ষটি ছিল ‘আমার ঘর’। এই বিছানা, বাথরুম আপন করে নিয়েছিলাম। আজ সকালে চাবি দিয়ে চলে যাব। হয়তো জীবনে আর কোনো দিন এই ঘরে ফিরে আসব না। কোনো দিনই না। হোটেলের কর্মচারী ইউসুফ আর খালিদের সঙ্গেও হয়তো আর কখনো দেখা হবে না। আমাদের জীবনটাও একই রকম। কোনো ঘরই চিরস্থায়ী নয়। আমরা সবাই দুদিনের অতিথি। কোনো মানুষও চিরদিন আমাদের সঙ্গে থাকে না।
ছাপ্পান্ন বছর বয়সে এসে পেছনে তাকালে দেখি, কত আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, পরিচিত মানুষ এক এক করে চলে গেছেন। আমার আব্বা, বড় বোনের সঙ্গে আর কোনো দিন দেখা হবে না। কত ভালো বন্ধু চিরদিনের জন্য চলে গেছে। এই অল্প সময়ের জীবনে আমরা কত কিছুর লোভ করি, কত প্রতিযোগিতা করি, কত সামান্য কারণে একজন আরেক জনকে আঘাত দিই!

এসব ভাবতে ভাবতেই স্যুটকেস, ব্যাগ নিয়ে লিফটে করে নিচে নেমে এলাম। কাউন্টারে আজ নতুন একজন। ইউসুফ আর খালিদের ডিউটি বিকেলে। চাবি জমা দিয়ে নাশতার ভাউচার নিলাম। রিসেপশনের সামনেই লাগোয়া একটা ছোট্ট ক্যাফে। লোকজন খুব বেশি নেই। ভাউচারটা জমা দিয়ে একটা টেবিলে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম।

একটা চেয়ারের ওপর গুটিসুটি মেরে বসে আছে একটি বিড়াল। তার গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করছে দুই তরুণী। সম্ভবত স্প্যানিশ ভাষায় কথাবার্তা বলছে। বিড়ালটা যেন তাদের কত চেনা! কাসাব্লাঙ্কার রাস্তাঘাটে অনেক বিড়াল দেখা যায়। অধিকাংশই দেখতে রোগা, ছোটখাটো। বারবার আমাদের ভুন্টুর কথা মনে হয়। প্রতিটি বিড়ালের মুখেই যেন ভুন্টুকে দেখতে পাই। পোষা প্রাণী থাকার এই এক সমস্যা। বড় মায়া লাগে ওদের জন্য।
কিছুক্ষণ পর নাশতা এসে হাজির। ওয়েটার ট্রেটা বেশ কায়দা করে টেবিলে নামিয়ে রেখে মাথাটা সামান্য কাত করে, মুখে হালকা হাসি এনে বলল, ‘Bon appétit!’ নাশতার ট্রের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, বাপরে, একজন মানুষ এত কিছু খায় কী করে! একটা অমলেট, সঙ্গে চৌকো পরোটার মতো দেখতে মরক্কোর পরিচিত রুটি মসেমেন, গোলাকার সুজির রুটি হারশা, কয়েক টুকরো বাদামি রুটি, কুচানো বাদাম ছড়ানো একটি পেস্ট্রি, চিজ, জ্যাম আর মধু। আর ঐতিহ্যবাহী ধাতব চায়ের কেটলিতে মরক্কোর বিখ্যাত মিন্ট টি। যতটুকু পারলাম খেলাম। বাকিটুকু টিস্যু পেপারে মুড়ে কাঁধের ব্যাগে নিয়ে উঠে পড়লাম।

মরক্কোর রেল ব্যবস্থা বেশ উন্নত। প্রধান শহরগুলোর মধ্যে নিয়মিত ONCF পরিচালিত আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে। সবচেয়ে পরিচিত হলো দ্রুতগতির আল বোরাক, যা কাসাব্লাঙ্কার প্রধান রেলস্টেশন কাসা ভয়াজ্যুর থেকে রাবাত আগদাল হয়ে তাঞ্জিয়ার পর্যন্ত যায়। হোটেলের ম্যানেজার বলল, কাসা-পোর্ট রেলস্টেশন থেকে প্রতি ঘণ্টায় রাবাতের ট্রেন পাওয়া যায়। দুই শহরের দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার। সাধারণত সোয়া এক ঘণ্টার মতো সময় লাগে। স্টেশনটাও খুব বেশি দূরে নয়। হেঁটে মিনিট বিশেকের পথ।

বাঁ হাতে মোবাইলে গুগল ম্যাপ আর ডান হাতে চাকাওয়ালা স্যুটকেসটা ঠেলতে ঠেলতে রওনা দিলাম স্টেশনের দিকে। বড়সড় স্যুটকেসের ভেতরে আরেকটা স্যুটকেস। অস্ট্রেলিয়ায় ফেরার সময় কেনাকাটা করলে দ্বিতীয়টার প্রয়োজন পড়বে!

হাঁটতে হাঁটতে সেই ১৬ নভেম্বর চত্বর পেরিয়ে চলে এলাম জাতিসংঘ চত্বরে। আর সেখানে পৌঁছাতেই আবার দেখা হয়ে গেল সেই ইতিহাসের শিক্ষক কাশিমের সঙ্গে। আমাকে দেখেই এমন আন্তরিকভাবে হাসলেন, যেন বহুদিনের পরিচিত মানুষ। এখানকার একটা কফিশপে তিনি নিয়মিত আসেন। ‘কফি?’ হাতের ইশারায় সেই ক্যাফেতে বসার প্রস্তাব দিলেন। ইচ্ছা যে একেবারে ছিল না, তা নয়। অচেনা শহরে হঠাৎ পরিচিত হয়ে যাওয়া একজন মানুষের সঙ্গে এক কাপ কফি খেতে বসার মধ্যে আলাদা একটা আনন্দ আছে। কিন্তু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, পৌনে বারোটা বেজে গেছে! হেসে বললাম, ‘আজ আর নয়। আমাকে রাবাত যেতে হবে। আপনার সঙ্গে এখানেই আবার একদিন দেখা হবে, ইনশাআল্লাহ। আপনার সঙ্গে একটা সেলফি নিতে পারি?’ কাশিম সানন্দে রাজি হলেন। একটা ছবির মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে ক্ষণিকের পরিচয়টুকু যেন একটু স্থায়ী রূপ পেল।

কাশিমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আরও কিছুটা হেঁটে পৌঁছে গেলাম কাসা-পোর্ট রেল স্টেশনে। ২০১৪ সালে চালু হওয়া কাসাব্লাঙ্কার নতুন কাসা-পোর্ট স্টেশনটিতে আধুনিক নকশার মধ্যেও রয়েছে মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের ছাপ। বিশাল ছাউনিটা প্রায় ফুটপাত পর্যন্ত চলে এসেছে। কাঁচের দেয়াল, জালিকাটা মাশরাবিয়া-ধাঁচের নকশা, উঁচু খোলা হল আর গাছের ডালের মতো ওপরের দিকে ছড়িয়ে যাওয়া সরু স্তম্ভগুলো স্টেশনটাকে দিয়েছে আলাদা এক সৌন্দর্য।

টিকিট কাউন্টারের লাইনে দাঁড়িয়ে রাবাতের একটা টিকিট হাতে পেলাম। প্রথম শ্রেণির টিকিট ইতিমধ্যেই বিক্রি হয়ে গেছে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে কামরা বরাদ্দ থাকলেও কোনো নির্দিষ্ট আসন বরাদ্দ নেই।
প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দেখি, ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। টিকিট পরীক্ষক ও রেল কর্মীদের মধ্যে নারী-পুরুষ উভয়ই আছে। বেশির ভাগই তরুণ-তরুণী। পরিপাটি পোশাক, স্মার্ট উপস্থিতি। ব্যবহারও বেশ আন্তরিক। নেভি ব্লু প্যান্টের সঙ্গে সাদা হাফশার্ট, মাথার টুপিতে লাল-সবুজের ব্যান্ড। মরক্কোর জাতীয় পতাকার রং। আমাদের বাংলাদেশের পতাকার মতো মরক্কোর পতাকাও লাল-সবুজ। তফাৎ হলো বাংলাদেশের পতাকায় সবুজ জমিনের ওপর লাল বৃত্ত, আর মরক্কোর পতাকায় লাল জমিনের মাঝখানে সবুজ পাঁচ কোণ বিশিষ্ট তারকা।

একজন টিকিট পরীক্ষক ধৈর্য ধরে কোন বগিতে উঠতে হবে, সেটা দেখিয়ে দিলেন। ওই কামরায় আমিই শেষ যাত্রী। ভেতরে ঢুকে দেখি, সব আসনই দখল হয়ে গেছে। গেটের কাছে র্যাকে যাত্রীদের মালপত্র রাখা। বুঝলাম, চুরি যাওয়ার ভয় নিয়ে কেউ বিশেষ চিন্তিত নন। আমিও স্যুটকেস আর ব্যাগটা সেখানে রেখে দুই বগির মাঝখানের জায়গাটায় গিয়ে দাঁড়ালাম। সোয়া এক ঘণ্টার পথ, জানালার বাইরে দেখতে দেখতেই কেটে যাবে।

একদম সময়মতো হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন ছাড়ল। মরক্কোর ট্রেনগুলো বেশ ঘড়ি ধরেই চলে। আর বুলেট ট্রেন আল বোরাক হলে তো কথাই নেই! রেললাইনের দুপাশে ছড়িয়ে থাকা বড় বড় আবাসন প্রকল্প, বহুতল ভবন, শিল্পাঞ্চল, কলকারখানা, উঁচু চিমনি, গুদামঘর আর সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি পণ্যবাহী ট্রাক পেছনে ফেলে ট্রেন ছুটে চলল। কাসাব্লাঙ্কা শহরটা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল। তারপর শুরু হলো শহরতলি। গায়ে গায়ে লাগানো বাড়িঘর। সাদা, ধূসর, মাটির কিংবা হালকা গোলাপি রঙের। বেশির ভাগই নিচু, একতলা-দোতলা, সমতল ছাদ। মাঝে মাঝে দূরে চোখে পড়ছিল আটলান্টিক মহাসাগর। কখনো নীল, কখনো বোতল-সবুজ তার বিশাল জলরাশি। ট্রেনের গতির সঙ্গে কখনো সে চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছিল, আবার একটু পরেই হঠাৎ হাজির পুরো দিগন্ত জুড়ে।

একসময় শুরু হলো মরক্কোর গ্রামাঞ্চল। ছোট ছোট জনপদগুলোকে মনে হচ্ছিল রুক্ষ মাটির ওপর ছড়িয়ে রাখা কয়েকটি বাক্স। কোনো বাড়ির বাইরের দেয়াল অসমাপ্ত, কোথাও ইটের গাঁথুনি বেরিয়ে আছে। প্রতিটি গ্রামেই চারপাশের নিচু বাড়িঘরের ওপর দিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে চৌকো মসজিদের মিনার। একেকটা জনপদ আসে, চোখের পলকে পেছনে হারিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার দেখা দেয় আরেকটি মিনার। মাঝখানে অনেকটা ফাঁকা জায়গা। বেশির ভাগই রুক্ষ, রোদে পোড়া বাদামি জমি। শেষ কবে বৃষ্টি হয়েছে, কে জানে! কোথাও কোথাও ভূগর্ভস্থ পানি তুলে জমিতে একটু-আধটু চাষ হচ্ছে, কোথাও খানিকটা সবুজের ছোঁয়া, কোথাও সদ্য চাষ দেওয়া মাটিতে লম্বা লম্বা রেখা। মাঝে মাঝে বিস্তীর্ণ মাঠের মধ্যে ভেড়ার পাল।

এসব দেখতে দেখতে হঠাৎ বাংলাদেশের কথা মনে পড়ে গেল। আমাদের দেশটা কত ভাগ্যবান। কত সবুজ, শস্যশ্যামল, উর্বর! কবির সেই চিরচেনা আকুতি—”এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।” জীবনানন্দের বাংলায় ফিরে আসার সেই আকুলতা — “আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে/ এই বাংলায় হয়তো মানুষ নয়/হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে..… আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে/ জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ করুণ ডাঙ্গায়।” জীবনানন্দ যদি মরক্কোয় জন্মাতেন, তিনিও কি এমন ব্যাকুল হয়ে আবার এই রুক্ষ মাটিতেই ফিরে আসতে চাইতেন? কে জানে! মরক্কোয়ও হয়তো কোনো কবি জন্মেছিলেন, যিনি তাঁর নিজের দেশের এই বাদামি মাটি, রুক্ষ প্রান্তরে বারবার জন্ম নিতে চেয়েছিলেন।

এসব দেখতে দেখতে হঠাৎ বাংলাদেশের কথা মনে পড়ে গেল। আমাদের দেশটা কত ভাগ্যবান। কত সবুজ, শস্যশ্যামল, উর্বর! কবির সেই চিরচেনা আকুতি—”এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।” জীবনানন্দের বাংলায় ফিরে আসার সেই আকুলতা — “আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে/ এই বাংলায় হয়তো মানুষ নয়/হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে..… আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে/ জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ করুণ ডাঙ্গায়।” জীবনানন্দ যদি মরক্কোয় জন্মাতেন, তিনিও কি এমন ব্যাকুল হয়ে আবার এই রুক্ষ মাটিতেই ফিরে আসতে চাইতেন? কে জানে! মরক্কোয়ও হয়তো কোনো কবি জন্মেছিলেন, যিনি তাঁর নিজের দেশের এই বাদামি মাটি, রুক্ষ প্রান্তরে বারবার জন্ম নিতে চেয়েছিলেন।

দ্রুত ছুটে চলা একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ট্রেনের জানালা দিয়ে দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে অদ্ভুত বৈপরীত্য চোখে পড়ল। কোথাও দু-একজন মানুষ গাধার পিঠে চড়ে চলেছেন আপন গন্তব্যে। একই ফ্রেমে যেন আধুনিকতা আর শত বছরের পুরোনো জীবন পাশাপাশি চলেছে।

এত রুক্ষতার মাঝেও আফ্রিকার এই দূর দেশে রেললাইনের দুপাশে ছোটবেলার গ্রামবাংলার পরিচিত একটা গাছ চোখে পড়ল। নাম ভেরেন্ডা বা ভেন্না। ঔষধি গাছ। চওড়া সবুজ পাতা আর নরম কাঁটায় ঢাকা সবুজ ফল। পাকা বীজগুলো বুলবুলি পাখির ডিমের মতো। মসৃণ, চকচকে, গাঢ় বাদামি রঙের। গায়ে হালকা ছোপছোপ নকশা। ভেরেন্ডার বীজ থেকেই তৈরি হয় ক্যাস্টর অয়েল। রবীন্দ্রনাথ তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ছেলেবেলা-য় লিখেছেন, ছোটবেলায় সামান্য সর্দি-জ্বর কিংবা পেটের অসুখ হলেই ডাক্তাররা প্রথমে ক্যাস্টর অয়েল আর উপোসের নিদান দিতেন। পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের ‘আসমানী’ কবিতায়ও ভেন্না গাছের উল্লেখ আছে।

আরও চোখে পড়ল লম্বা লম্বা নলখাগড়ার মতো একধরনের গাছের ঘন ঝাড়। কৌতূহলবশত একটা ছবি তুলে মোবাইলের প্ল্যান্ট আইডেন্টিফিকেশন অ্যাপে খুঁজে দেখলাম। গাছটির ইংরেজি নাম জায়ান্ট রিড; বাংলা করলে ‘অতিকায় নলখাগড়া’। পৃথিবীর বহু উষ্ণ এলাকায় জন্মায় এই বিশাল ঘাসজাতীয় আগ্রাসী উদ্ভিদটি। এর শক্ত ও ফাঁপা কাণ্ড দিয়ে তৈরি হয় ঘরের ছাউনি, বেড়া, হস্তশিল্প ও বাদ্যযন্ত্র। মাটির ক্ষয় রোধের জন্যও এটি লাগানো হয়।

বসার জায়গা না পেয়ে বোধহয় ভালোই হয়েছে। দুই বগির মাঝখানে দাঁড়িয়ে একাকী কাসাব্লাঙ্কা থেকে রাবাতের পথে মরক্কোর প্রকৃতি আর জনপদ দেখার সুযোগ হয়ে গেল। একে একে মোহাম্মদিয়া, বুজনিকা, স্কিরাত ও তেমারাসহ বেশ কয়েকটি শহর পেরিয়ে ট্রেন ঢুকে পড়ল আমার আজকের গন্তব্য রাবাত আগদাল স্টেশনে। মূল স্টেশনটি ১৯২৫ সালে নির্মিত হলেও উচ্চগতির ট্রেন আল বোরাক চালুর আগে এটিকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দেওয়া হয়। ২০১৮ সালের ১৭ নভেম্বর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ আধুনিক স্টেশনটি উদ্বোধন করেন।

অন্য প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে সেই বিখ্যাত আল বোরাক। নামটাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। দ্রুতগামী বাহন ‘বুরাক’-এর নামানুসারে, যার সঙ্গে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মিরাজের কাহিনি জড়িয়ে আছে। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ প্রায় ৩২০ কিলোমিটার গতিতে ছুটতে পারে আল বোরাক। জীবনে এই প্রথম সামনাসামনি কোনো বুলেট ট্রেন দেখে বেশ পুলকিত বোধ করলাম। আমার পরবর্তী গন্তব্য তাঞ্জিয়ার। ইচ্ছে আছে আল বোরাকে চড়েই সেখানে যাওয়ার।

রাবাত আগদালে নেমে আমার চোখ ছানাবড়া! এত আধুনিক, ঝকঝকে আর বিশাল রেলস্টেশন এর আগে কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ল না। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক কিংবা এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ঘুরেও নয়। উঁচু ছাদ, প্রশস্ত খোলা জায়গা, আলো ঝলমলে পরিবেশ, নানা ব্র্যান্ডের শোরুম আর আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। সব মিলিয়ে যেন কোনো আধুনিক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে চারপাশটা দেখলাম।

হঠাৎ চোখ আটকে গেল একটি পেস্ট্রি শপের কাঁচের শোকেসে সাজানো বাকলাভায়। কাগজের মতো পাতলা একের পর এক সোনালি স্তরের ভেতর সবুজ পেস্তার পুর। গায়ে হালকা মিষ্টি সিরাপের কোমল পরশ। রাবাতের সঙ্গে পরিচয়ের শুরুটা মিষ্টি দিয়েই করা যাক! একটা কিনে মুখে দিতেই মচমচে স্তরগুলো ভেঙে মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। পেস্তা আর মিষ্টি সিরাপের সেই অপূর্ব স্বাদ যেন অমৃতের ছোঁয়া!
স্যুটকেস ঠেলতে ঠেলতে স্টেশন থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম। আরে বাপস! সামনে নীল আকাশের নিচে বিশাল খোলা চত্বর। দুই পাশে সারি সারি পামগাছ। মাঝখানে অসংখ্য ফোয়ারা থেকে ছিটকে পড়া জলে ভিজে চকচক করছে বিশাল এলাকা। মরুর দেশের বুকে এমন দৃশ্য যেন মরীচিকার মতোই চোখে ধাঁধা লাগায়।

রাবাতে আমার বুক করা আস্তানার নাম ‘দার আল ফানুস’। পুরোনো মরক্কান বাড়ি থেকে তৈরি ছোট্ট এক রিয়াদ বা অতিথিশালা। স্টেশন থেকে ট্যাক্সিতে মিনিট বিশেকের পথ। তাড়া তো নেই; তাই ধীর পায়ে চত্বরটা পেরিয়ে রাস্তার ধারে এসে দাঁড়ালাম। এবার একটা ট্যাক্সি ধরতে হবে।