অস্ট্রেলিয়ায় অবৈধ সিগারেট ও তামাকের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদারের মধ্যেই এবার আলোচনায় এসেছে ক্রেতাদের শাস্তির বিষয়টি। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া (এসএ) পুলিশের কমিশনার গ্র্যান্ট স্টিভেনস বলেছেন, অবৈধ সিগারেট ও তামাকজাত পণ্য যারা কিনছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত কি না, তা বিবেচনা করার সময় এসেছে। তাঁর এই মন্তব্য অস্ট্রেলিয়ায় অবৈধ তামাকের ক্রমবর্ধমান বাজার, সংগঠিত অপরাধ এবং তামাকের ওপর উচ্চ কর এই তিনটি বিষয়কে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। বর্তমান আইনে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় অনুমোদনহীন তামাকজাত পণ্য বিক্রি বা আমদানি করা বেআইনি। কিন্তু এসব পণ্য কেনা বা ব্যবহার করা বর্তমানে অপরাধ নয়। অর্থাৎ অবৈধ সিগারেট বিক্রি করলে শাস্তি হতে পারে, কিন্তু সেই সিগারেট কিনলে সাধারণ ক্রেতার বিরুদ্ধে একই ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।
পুলিশ কমিশনার গ্র্যান্ট স্টিভেনস মনে করেন, এই আইনি ব্যবধান নিয়েই নতুন করে ভাবা দরকার। এবিসি অ্যাডিলেডকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, অবৈধ তামাকের বাজার টিকে থাকার পেছনে ক্রেতাদের চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কম দামে সিগারেট পাওয়ার সুযোগ থাকায় অনেকে বৈধ বাজারের পরিবর্তে অবৈধ পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। এতে লাভবান হচ্ছে অপরাধী চক্র। স্টিভেনসের বক্তব্য, শুধু অবৈধ তামাক বিক্রেতা ও আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে বাজার পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। কারণ, যতক্ষণ ক্রেতাদের কাছ থেকে চাহিদা থাকবে, ততক্ষণ সরবরাহের পথও খুঁজে নেবে অপরাধী চক্র।
অস্ট্রেলিয়ায় বৈধ সিগারেটের দাম বিশ্বের অন্যতম বেশি। তামাকের ওপর উচ্চ মাত্রার কর আরোপের ফলে বৈধ বাজারে একটি সিগারেটের প্যাকেট কিনতে ক্রেতাদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। বিপরীতে অবৈধ সিগারেট অনেক কম দামে পাওয়া যায়। এই দামের পার্থক্যই অবৈধ বাজারের অন্যতম বড় আকর্ষণ বলে মনে করছেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা।
পুলিশের আশঙ্কা, অবৈধ তামাক বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ শুধু তামাক ব্যবসায়ীদের কাছেই যাচ্ছে না। এর সঙ্গে সংগঠিত অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর আর্থিক কর্মকাণ্ডও যুক্ত হয়ে পড়ছে। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় অবৈধ তামাকের বাজার পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর তুলনায় ছোট হলেও এর সঙ্গে গুরুতর অপরাধের যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার। অবৈধ তামাক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দোকানে অগ্নিসংযোগ, গাড়ি থেকে গুলি চালানো এবং হামলার মতো ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার তদন্তে পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্সও কাজ করছে। ফলে বিষয়টি এখন শুধু ‘সস্তায় সিগারেট কেনা’র মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এটি ক্রমেই সংগঠিত অপরাধ দমনের একটি অংশ হয়ে উঠছে।
অবৈধ তামাকের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন রাজ্যে অভিযানও জোরদার করা হয়েছে। সম্প্রতি পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া ও নর্দার্ন টেরিটরিতে বড় ধরনের অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সিগারেট, খোলা তামাক, ভেপ ও নিকোটিনজাত পণ্য জব্দ করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান বর্ডার ফোর্স ও অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানে ১৭ লাখের বেশি অবৈধ সিগারেট জব্দ করা হয়। পাশাপাশি শত শত কেজি খোলা তামাক, হাজার হাজার ভেপ এবং নিকোটিন পাউচও উদ্ধার করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের হিসাবে, জব্দ করা পণ্যের আনুমানিক মূল্য ৮ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বেশি। এসব পণ্যের বৈধভাবে বিক্রি হলে সরকারকে যে পরিমাণ কর দিতে হতো, তার পরিমাণ কয়েক মিলিয়ন ডলার হতে পারত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বলছে, এ ধরনের অভিযান শুধু অবৈধ পণ্য জব্দ করার জন্য নয়; এর মাধ্যমে অবৈধ তামাক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অর্থের প্রবাহ এবং সংগঠিত অপরাধী নেটওয়ার্কও চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অবৈধ তামাকের ব্যবসা এখন শুধু ছোট দোকান বা নির্দিষ্ট খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেও এসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে বলে কর্তৃপক্ষের অভিযোগ। এ নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো, অনলাইন বিক্রির মাধ্যমে তরুণদের কাছে ভেপ ও নিকোটিনজাত পণ্য পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, অবৈধ তামাক বা ভেপ কিনলে সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত সংগঠিত অপরাধী চক্রের হাতে যেতে পারে। ফলে একজন ক্রেতা হয়তো কম দামে সিগারেট কিনছেন, কিন্তু তাঁর দেওয়া অর্থ বৃহত্তর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অবৈধ তামাকের বাজার নিয়ন্ত্রণের উপায় নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হচ্ছে। ফেডারেল বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে তামাকের ওপর আরোপিত এক্সাইজ কর ব্যাপকভাবে কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদের যুক্তি, বৈধ সিগারেটের দাম অতিরিক্ত বেশি হওয়ায় মানুষ অবৈধ বাজারের দিকে ঝুঁকছে। বৈধ সিগারেটের দাম কমানো হলে অবৈধ বাজারের আকর্ষণ কমবে এবং সরকারের কর-রাজস্বও বাড়তে পারে। তবে সরকার ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ এই যুক্তির সঙ্গে একমত নয়। তাঁদের আশঙ্কা, সিগারেটের দাম কমিয়ে দিলে ধূমপানের হার আবার বাড়তে পারে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ধূমপান শুরু করার প্রবণতা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। অর্থাৎ একদিকে অবৈধ তামাকের বাজার কমানোর চাপ, অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য রক্ষার লক্ষ্য—দুটি বিষয়কে একই সঙ্গে বিবেচনা করতে হচ্ছে সরকারকে।
অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিভিন্ন কমিউনিটিতে পরিচিতজন বা অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে তুলনামূলক কম দামে সিগারেট পাওয়ার সুযোগের কথা শোনা যায়। তবে কোনো পণ্য সস্তা হলেই সেটি বৈধ—এমন ধারণা বিপজ্জনক। অনুমোদনহীন তামাকজাত পণ্যের উৎস, উপাদান, কর প্রদান এবং সরবরাহব্যবস্থা সম্পর্কে ক্রেতার কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নাও থাকতে পারে।
আর পুলিশ কমিশনারের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে অবৈধ সিগারেটের ক্রেতারাও আইনি ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন। বর্তমানে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় শুধু অবৈধ সিগারেট কেনার কারণে সাধারণ ক্রেতাকে শাস্তি দেওয়ার আইন কার্যকর হয়নি। তবে এ বিষয়ে নীতিগত আলোচনা শুরু হয়েছে।
গ্র্যান্ট স্টিভেনসের মন্তব্যের পর এখন মূল প্রশ্ন—অস্ট্রেলিয়ার রাজ্য ও ফেডারেল সরকার কি অবৈধ তামাকের ক্রেতাদেরও শাস্তির আওতায় আনবে? এ ধরনের আইন হলে সেটি বাস্তবায়ন করা কতটা সহজ হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন। একজন ক্রেতা কোথা থেকে সিগারেট কিনেছেন, সেটি বৈধ না অবৈধ—এসব প্রমাণের বিষয় সামনে আসবে। একই সঙ্গে পুলিশি নজরদারি ও প্রয়োগের খরচও বাড়তে পারে। অন্যদিকে পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর যুক্তি, অবৈধ তামাকের বাজারের চাহিদা কমাতে হলে শুধু সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।
তাই অস্ট্রেলিয়ায় এখন আলোচনার কেন্দ্রে একটি সরল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—অবৈধ সিগারেট বিক্রি করা যদি অপরাধ হয়, তাহলে সেই বাজারকে টিকিয়ে রাখা ক্রেতাদের দায় কতটা?
দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ কমিশনারের মন্তব্য সেই প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এনেছে। তবে ক্রেতাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে কি না, তা এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে অবৈধ তামাক নিয়ন্ত্রণে অস্ট্রেলিয়ার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
Source: ABC NEWS