বাবা দিবসে আমার বাজান: কিছু স্মৃতি কথা

ডঃ মোঃ ইউনুস: আমি বাবাকে “আব্বা” বললেও উনি আমাকে আদর করে বলতেন বাজান। অর্থ হলো বাবা বা পিতা, এটি স্নেহ প্রকাশে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত আঞ্চলিক বা গ্রামীণ শব্দ। আমিও আমার বাবাকে বাজান বলতাম আদর করে। আমার বাবা ও চাচাও আমাকে আদর করে বাজান বলতেন।

আমার বাবা: ডা: এস, এ, কে ফজলুল হক এর জীবন ছিলো এক বর্ণাঢ্যময় জীবন। বাবার শিক্ষাজীবন শুরু হয় পাবনার সুজানগর উপজেলার খলিলপুর স্কুল থেকে। আমার দাদা ছিলেন গ্রাম্য মাতব্বর, যার সখ্যতা ছিল নোবেল বিজয়ী জমিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারের সাথে। রবীন্দ্রনাথ আমার চাচা: অধ্যাপক মনসুরউদ্দীন ও আমার বাবা ডা: ফজলুল হকের থাকার ও খাওয়ার বন্দোবস্ত করে দিয়ে তাদের পড়াশুনার সুযোগ করে দেন কলকাতাতে। বাবা পড়েছেন ক্যাম্পবেল মেডিকেল স্কুলে আর চাচা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে।


একনজরে আমার বাবা: ডাঃ এস, এ, কে ফজলুল হক
• খলিলপুর স্কুলে শিক্ষা, সুজানগরের সাগরকান্যদি ইউনিয়নে
• ক্যাম্পবেল মেডিকেল স্কুল, শিয়ালদাহ, ডাক্তারি পড়াশুনা
• মিটফোর্ড হাসপাতালে কর্মজীবনের শুরু
• চাকরীস্থান: জাহিদান, ইরান এ্যামব্যাসি ডাক্তার
• মিটফোর্ড হাসপাতালে ডাক্তার
• কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতাল
• ফরিদপুর সদর হাসপাতাল
• পাবনা সদর হাসপাতাল
• পাবনা পুলিশ লাইন হাসপাতাল ও পাবনা জেল ডাক্তার
• স্থায়ীবাস পাবনা সদরে কাছারিপাড়া মহল্লায়
• মৃত্যু ১৯৮৫ ২ রা নভেম্বর, কাছারীপাড়া, পাবনাসদর


চাচার আর বাবার মধ্যে একটি গভীর আত্মিক সংযোগ ছিল, একজন ছিলেন আরেকজনের পরিপূরক। আমার চাচা বাংলাদেশের সব বড় বড় সম্মাননা পেয়েছেন (একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, বাংলা একাডেমি পদক)। বাবা সারাজীবন নিঃস্বার্থ ভাবে ভাইকে সাহায্য করে গেছেন। তার বিখ্যাত বই ‘হারামণি’, ‘ইরানের কবি’ ও ‘বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা’ এই গ্রন্থগুলির প্রধানতম তথ্য/উপাত্তের উৎস ছিলেন আব্বা। বাবা চাচাকে ২২ খণ্ডের শাহনামা উপহার দেন যা ছিল চাচার গবেষণার বিষয়বস্তুর উৎস।

আব্বা পাঁচ বছর বয়সে মাতৃহারা হন। চাচা অভিভাবক হিসেবে বাবা মায়ের স্নেহ দিয়ে রবীন্দ্র পরিবারের সহায়তায় বড় করেন। মেডিকেল কলেজের পড়াশুনাও এভাবে সম্ভব হয়।

আব্বা সারাজীবন ডাক্তার হিসাবে সরকারী চাকরি করেছেন। আর্থিক স্বচ্ছলতা এবং সাধ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি ঢাকাতে স্থায়ী না হয়ে পরিবার নিয়ে পাবনায় স্থায়ী হন। আমার জন্ম কিশোরগঞ্জে যখন আব্বার কর্মক্ষেত্র ছিল কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতাল।

আব্বা ৫০এর দশকে ফরিদপুর জেলের ডাক্তার ছিলেন। সেই জেলে শেখ মুজিব বন্দী ছিলেন। তখন আব্বা তাকে বিশেষ সাহায্য করেছিলেন। জেল হাসপাতালে ভর্তি করা থেকে শুরু করে তার জন্য মশারি, বালিশ ও খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন নিজ দায়িত্বে। শেখ মুজিব তাকে ডাকতেন ‘হক সাহেব’ সম্বোধনে।

পরবর্তীতে শেখ মুজিব ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করলেও আব্বা কখনো কোন দাবী বা চাহিদা নিয়ে তার কাছে হাজির হননি। একইরকম ভাবে তিনি পাবনা জেল ডাক্তার হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে আপগ্রেড করেন বিশেষ বন্দী হিসাবে যাতে তিনি উন্নত চিকিৎসা ও সুযোগ সুবিধা পান। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যখন সবাই নিজের স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত, আব্বা ছিলেন একজন ব্যতিক্রম এবং আত্মসম্মানে বলীয়ান ব্যক্তি। তিনি কখনোই তাঁদের কাছে কোন প্রয়োজনে হাত পাতেননি।

আমরা নয় ভাইবোন। ছোটবেলা থেকেই আব্বার প্রধান উপদেশ ছিলো যে পড়াশুনা ছাড়া আমাদের গতি নাই, পড়াশুনা করে বড় হতে হবে। আমরা ভাইবোনেরা সেই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে তাই করেছি মনোযোগ দিয়ে।
আমার দুই ভাই দুই বোন ডাক্তার, এবং বাকিরা সবাই মাস্টার্স ডিগ্রীধারী, আমি ডক্টরেট সমাপ্ত করতে পেরেছি। মাসের শুরুতে সবার আগে তিনি টিউটরদের বেতন পরিশোধ করতেন। তিনি ছেলেমেয়েদেরকে পুষ্টিকর ও তাজা খাবার খাওয়ানোর ব্যাপারে খুবই উদ্যোগী ছিলেন। বাসায় এক সময় তিনি তিনটি সিন্ধি গরু পালতেন, যাতে আমরা ভাইবোনেরা খাঁটি দুধ আর ঘরে তৈরী ঘি খেতে পারি। শাকসবজী ফলানোর ব্যাপারে ছিলো তার বিশেষ উৎসাহ, নিজ হাতে বাগান করতেন। অবশ্য আব্বা জেল এবং পুলিশের ডাক্তার হওয়ায় কয়েদিরা নিয়ম করে গরু পালনে এবং বাগানের পরিচর্যায় তাঁকে সাহায্য করতেন প্রতিদিন।

পদ্মা নদী অঞ্চলে ছিলো আমাদের বাস। আব্বার যোগাযোগ ছিল জেলেদের সাথে যারা পাবনার বিলের তাজা মাছ আর পদ্মার ইলিশ মাটির হাড়িতে করে নিয়মিত আমাদের পাবনার বাসায় নিয়ে আসতেন।

তখন ফ্রিজ এর চল ছিলোনা, মা জ্বাল দিয়ে দিয়ে সেই মাছ সংরক্ষণ করতেন। আমাদের প্রিয় খাবার ছিলো খিচুরি আর জ্বাল দেয়া ইলিশ মাছ। আব্বার খেলাধুলার ব্যাপারেও ছিলো তার উৎসাহ, বল ও খেলাধুলার সামগ্রী কিনে দিতে কখনো কার্পণ্য করেন নি। আমি জুনিয়র রেড ক্রস ও স্কাউটে খুব সক্রিয় ছিলাম, প্রধানতঃ আব্বার উৎসাহে। আবার স্কুলে ঈদ এ মিলাদুননবীতে রচনা প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করতেও উৎসাহ ও সহযোগিতা দিতেন। মনে পড়ছে আমি টেবিলে বসে লিখছি আর আব্বা বিছানায় বসে প্রচণ্ড গরমে হাতপাখা দিয়ে নিজেকে এবং আমাকেও বাতাস করছেন আর কিভাবে রচনা লিখতে হবে তা বলছেন।

সকালে ফজরের নামাজের জন্য সব ভাইবোনকে ডেকে তুলতেন, নামাজ শেষ হলে মা নিয়ে আসতেন সামোভার এ তৈরী চা সাথে নাড়ু, খই, মুড়ি আর সবরি কলা বা গাছের বিচি কলা। সেই সূত্র ধরে আজও আমার দিন শুরু হয় কাকডাকা ভোরে।

ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় আমি জড়িয়ে পড়ি ছাত্র রাজনীতিতে। বাবা স্বাভাবিক ভাবে খুব উদ্বিগ্ন হন আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে। তিনি আমাকে অনুপ্রাণিত করেন ঢাকায় গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে। আমি যখন কোচিং করার জন্য ঢাকায় ভাইয়ের বাড়িতে যাই, উনি নিজে তদারকি করে তৈরী করা সেগুন কাঠের পড়ার টেবিলটি গাড়িতে তুলে দেন।

এতগুলো ভাইবোনকে বড় করতে যেয়ে আব্বাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। উনি বিশ্বাস করতেন যেহেতু উনি সরকারি চাকরি করেন, প্রাইভেট প্র্যাকটিস করা অনুচিত। আমরা ভাইরা পুলিশদের রেশনে পাওয়া খাঁকি কাপড় (যে আব্বা তাঁর আরদালির মাধ্যমে সংগ্রহ করতেন) দিয়ে তৈরী প্যান্ট আর সস্তা টেট্রন কাপড় (কসকো থেকে কেনা) এর শার্ট পরতাম। খুব ছোটবেলাতেই সততার ও মূল্যবোধের শিক্ষা আব্বার কাছে পেয়েছি যা আমরা ভাইবোনেরা বহন করে চলেছি।

আজ পেছন ফিরে অনুধাবন করি আমার জীবনের সমস্ত প্রাপ্তিই এসেছে আমার বাবার অনুপ্রেরণা থেকে।

*ছবি: আমার বাবা ডা: এস এ কে ফজলুল হক (ডানে), আমার মা জহুরা ফজলুল (বামে), আমার বোন ডা: আফিয়া ফজলুল (বসা)

বাবা দিবসের বিশেষ সংখ্যাটি ডাউনলোড লিংক: Father_AK_small