শাহানাজ বিথী: বাপি মানে আমার কাছে খুব আরামের একটা নিরাপদ ঘর, যে ঘরটাতে চাইলেই যখন-তখন ফেরা যায়; যে ঘরটাতে কেবল ভালোবাসা আর নিরাপত্তার উষ্ণতা। বাইরের পৃথিবীতে যতই ঝড়-ঝঞ্ঝা বয়ে যাক না কেন, এই ঘর থেকে তার কিছুই টের পাওয়া যায় না। একজন সন্তানের জীবনে হয়তো তার বাবাই সবচাইতে বড় নায়ক, আমার কাছে যেমন আমার বাপি।
সেবার বর্ষায় প্রচুর পানি জমে গেল নানাবাড়ির চারপাশে। আমরা কয়েক ভাই-বোন মিলে খুব দুষ্টুমি শুরু করলাম সেই পানিতে। স্কুল ছুটি, তাই বেশ কয়েকজন খালাতো ভাই-বোন একসঙ্গে হয়েছি নানাবাড়িতে। আমি সেদিন বোধহয় একটু বেশিই দুষ্টুমি করেছিলাম, তাই পানিতে পড়ে গিয়ে প্রায় ডুবতেই বসেছিলাম! আমার নানি না দেখলে হয়তো সেদিনই হতো আমার জীবনের শেষ দিন। কিন্তু আমি যে বেঁচে আছি—সেটা যতটা না বিস্ময়ের, তার চেয়েও বড় বিস্ময় হলো সেদিন ঠিক দুপুরবেলাই বাপি নানাবাড়িতে এসে হাজির! কারণ, তিনি গত রাতে স্বপ্নে দেখেছেন আমি নাকি পানিতে পড়ে গেছি! এই হলো আমার বাপি। যত বড় হয়েছি, ততই দেখেছি—কেমন করে যেন তিনি জেনে যান ঠিক যখনই আমি খারাপ থাকি।
খুব মনে পড়ে, আমাদের ছোটবেলায় টেলিভিশনে ভূতের একটা ইংরেজি ধারাবাহিক হতো। সেই ভূতের ধারাবাহিক তো দেখতেই হবে আমাদের তিন ভাই-বোনের! কিন্তু দেখতে ইচ্ছে করলে কী হবে, ভয়ও তো লাগে! তাই আমরা তিনজনই বাপির কোলের মধ্যে ঢুকে গুটিশুটি মেরে সেই ধারাবাহিক দেখতাম। কারণ, ভূতের সাধ্য নেই আমার বাপির সামনে আসার! ঠিক তেমনি করেই জীবনের প্রতিটি ক্ষণে এই মানুষটা আমাদের তিন ভাই-বোনকে আগলে রেখেছেন, এখনো নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছেন।
আরেকদিনের গল্প বলি। শুক্রবার সকালবেলা আমরা সবে নাশতা শেষ করে লিভিং রুমে বসে আড্ডা জমাচ্ছি—আমরা বলতে আমরা দুই বোন আর মামণি। ঠিক সে সময় এক যুবক মিষ্টি নিয়ে হাজির আমাদের বাসায়। যুবক মামণিকে বললেন, “মা, আমি বিসিএস পাস করেছি। বাবা কি বাসায় আছেন?” মামণি আর আমরা দুই বোন একটু অবাক—কে এই যুবক, আর আমাদের বাপিকে ‘বাবা’ বলে ডাকছেই বা কেন? পরে সেই যুবকের মুখেই জানতে পারলাম, দরিদ্র ঘরের এই ছেলেটিকে আমাদের বাপি লেখাপড়ার খরচ দিতেন সেই তার স্কুলজীবন থেকে! আজ সে দেশের প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরিজীবী। অথচ বাপি কোনো দিন আমাদের বলেননি যে তিনি এভাবে কাউকে সাহায্য করেছেন। আজও নীরবে কতজনকে যে সাহায্য করে যান এই মানুষটা! গর্বে আমার বুক ভরে যায়, শ্রদ্ধা বেড়ে যায় বহুগুণ। আমার বাপি এমনই এক মানুষ, কাউকে সাহায্য করার সামান্যতম সুযোগও তিনি হাতছাড়া করেন না। ভালোবাসায় ভরা বিশাল একটা মন আছে তাঁর।
আমরা দুই বোন শাড়ি পরলে বাপি খুব মন খারাপ করতেন। মামণিকে বলতেন, “আমার মেয়েগুলো কেমন বড় হয়ে যাচ্ছে… ওরা তো আমাদের ছেড়ে চলে যাবে।” মামণিকে সব সময় বলতেন, “আমার মেয়েদের বেশি বেশি আদর করবে, সবচেয়ে ভালো খাবারটা ওদের দেবে; কারণ ওরা তো আমাদের কাছে বেশি দিন থাকবে না।”
আমার বিয়ের সময় বাপির মুখের দিকে আমি তাকাতে পারছিলাম না। বাবারা চোখের জল লুকাতে পারলেও বুকের ভেতর জমে থাকা ঝড়টা বোধহয় কোনোভাবেই লুকাতে পারেন না। আমার গায়েহলুদের দিন আমি বারান্দায় পা পিছলে আছাড় খেলাম কাঁচা আলপনায়। তা দেখে আমার বাপির সে কী রাগ! কেন কেউ খেয়াল করল না, আমি কেন পড়ে গেলাম!
আমার বিদায়ের পর ঘরের দরজা বন্ধ করে চিৎকার করে কেঁদেছিলেন আমার বাপি। আমি জানি, সেই কান্না এখনো নীরবে তাঁর বুকের মধ্যে রয়ে গেছে।
বাবার হয়তো কখনো মুখ ফুটে ভালোবাসার কথা বলেন না, কিন্তু তাঁরা ভালোবাসেন তাঁদের সবটুকু দিয়ে। একজন বাবা হয়তো তাঁর সন্তানকে মায়েদের মতো গর্ভে ধারণ করেন না, কিন্তু তিনি ধারণ করেন তাঁর হৃদয়ে। সন্তানের জন্য বাবাদের ত্যাগ, শ্রম আর চেষ্টা—সবই যেন একেকটা অলিখিত মহাকাব্য! আমরা কেউ হয়তো সেই মহাকাব্যগুলো দেখি না, অথবা দেখেও বুঝি না।
পৃথিবীর সকল বাবার জন্য অনেক অনেক ভালোবাসা। ভালো থাকুক পৃথিবীর সব বাবা।
বাবা দিবসের বিশেষ সংখ্যাটি ডাউনলোড লিংক: Father_AK_small