শিক্ষাবিদ, ভাষাবিদ ও সংগীতানুরাগী: এক অনন্য ব্যক্তিত্বের গল্প

রায়হান সাদ ফেরদৌসী: বিশ্বের সকল বাবাকে আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত ভালবাসা। প্রত্যেক বাবাই তার পরিবারের জন্য একটি বটবৃক্ষ। এই বটবৃক্ষের শাখা প্রশাখাই মা, ভাই, বোন, পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও আত্মীয়স্বজন। বাবার নিজের জীবনের চাহিদা সামান্য, কিন্তু অন্য সবার জন্য উদার। বাবা নিঃস্বার্থ ভাবে সকলের প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

আজ এই বাবা দিবসে আমি আমার বাবা সম্পর্কে কিছু বলব। আমরা ভাই-বোনরা বাবাকে ‘আব্বা’ বলে ডাকতাম। আমার আব্বার নাম মোহাম্মদ আব্দুর রহিম। একজন শিক্ষক। তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে এইচ. এস.সি এবং বি. এ. পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এড এবং এম.এ. ডিগ্রী লাভ করেন। আব্বা শিক্ষকতার পেশা শুরু করেন জামালপুর জেলার বকসিগঞ্জ হাই স্কুল থেকে। পরবর্তীতে তিনি শ্রীবর্দী হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা হেডমাস্টার হিসেবে কাজ করেন। তিনি ঢাকায় তেজগাঁও পলিটেকনিক্যাল গার্লস হাই স্কুলের সহকারী হেডমাস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারপর তিনি সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে স্বার্থকতার সাথে কাজ করেন। সর্বশেষ তিনি ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলে শিক্ষকতা করেন।

আব্বা একজন দক্ষ ভাষাবিদ ছিলেন। তিনি বাংলা, ইংরেজি ও আরবী ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। উনি বাংলা একাডেমী থেকে নিয়মিত লেখালেখি করতেন। বাংলা, ইংরেজি এবং আরবী ভাষায় লেখা বই এনে বাংলা, ইংরেজি এবং আরবী ভাষায় অনুবাদ করতেন। আরবীতে লেখা ‘মেরাতুল উরুস’ নামে একটি আরবী উপন্যাস তিনি বাংলা ও ইংরেজীতে অনুবাদ করার জন্য বাংলা একাডেমী থেকে পুরস্কৃত হয়েছিলান। আব্বা নিয়মিত রেডিও টক শো তে অংশগ্রহণ করতেন। তিনি ঢাকা বোর্ড অফিসের টেবুলেটর হিসেবে কাজ করতেন।

আব্বা একজন সংস্কৃতিমনস্ক, একাধারে সংগীত অনুরাগী, শিক্ষানুরাগী ও স্বাস্থ্য সচেতন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। বাসায় মাঝে মাঝে গানের আসর বসলে সেই সমস্ত আসরে খ্যাতনামা শিল্পী যেমন ওস্তাদ ফজলুল হক ও বেদাড়উদ্দিন, আরও অনেকে আসতেন। বাসায় গানের অনেক সরঞ্জাম ব্যবহৃত হতো যেমন হারমোনিয়াম, তবলা, তানপুরা।

আব্বা একজন সংস্কৃতিমনস্ক, একাধারে সংগীত অনুরাগী, শিক্ষানুরাগী ও স্বাস্থ্য সচেতন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। বাসায় মাঝে মাঝে গানের আসর বসলে সেই সমস্ত আসরে খ্যাতনামা শিল্পী যেমন ওস্তাদ ফজলুল হক ও বেদাড়উদ্দিন, আরও অনেকে আসতেন। বাসায় গানের অনেক সরঞ্জাম ব্যবহৃত হতো যেমন হারমোনিয়াম, তবলা, তানপুরা।

আব্বা ছিলেন ৮ সন্তানের জনক। আমাদের সবার ছোট ভাইকে জন্ম দিয়ে আমাদের মা না ফেরার দেশে চলে যান। আব্বা আমাদের সকল ভাই-বোনকে সুশিক্ষিত করেন। আমাদের তিন বোনকে ভারতেশ্বরী হোমসে ভর্তি করিয়ে দিলেন। প্রতি মাসের শেষ রবিবার ভিসিটিং ডে তে আব্বা আমাদের হোমসে দেখতে আসতেন। সাথে করে ফল-মূল ও নিত্য-জিনিসপত্র আনতেন। মাঝে মধ্যে আব্বা আমাদের জন্য বাটা জুতোর বাক্স ভর্তি খেলনা, পুতুল নিয়ে আসতেন। আমরা কিছুক্ষণ আব্বার সাথে পুতুল নিয়ে খেলতাম। আব্বা আমাদের লেখাপড়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত খোঁজ-খবর নিতেন। আমাদের নখ কাটা, দাঁত মাজা, চুল বাঁধা, পোশাক ইত্যাদি সম্পর্কে পরামর্শ নির্দেশনা দিতেন।

রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলের কোয়ার্টারে আমাদের বাসা ছিল। ছুটিতে বাসায় আসলে আব্বা আমাদের তিন বোনকে কার্বলিক সাবান দিয়ে গোসল করিয়ে দিতেন। উল্লেখ্য, হোমসে প্রায়শই খুজলি-পাঁচড়া ও মাথার উকুন হতো। আব্বা এই-সব নিরাময়ের উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতেন। যেমন নারিকেল তেলের সাথে নীল মিশিয়ে খুজলিতে লাগিয়ে দিতেন যা খুব জ্বালাময় ছিল। উকুনের জন্য নেপথলিন গুঁড়ো করে নারিকেল তেলের সাথে গুঁড়ো মিশ্রিত করে আব্বা চুলে মাখিয়ে দিতেন।

মাছ খাওয়ার সময় আব্বা নিজে কাঁটা বেছে দিতেন। ভোরে ফজর নামাজের শেষে আমরা আব্বার সাথে মনিং ওয়াকে যেতাম। সংসদ ভবন ও রমনা পার্ক এলাকায় আমরা হাঁটতাম। ছুটির দিনে সকালে কায়দা পড়া ও গলা সাধা হতো। আব্বা নিজেও হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইতেন এবং আমাদেরকেও গান শেখাতেন। ছোট ভাই তবলা বাজাতো। আমি বা অন্য ভাই-বোনরা কেউ তানপুরা ধরতাম। আমার আব্বা একজন দয়াবান, সমাজসেবক ও উদার হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। আমার আব্বা প্রায়শই গ্রাম থেকে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনা করতে সাহায্য করতেন, এমনকি বাসায় থাকতে দিতেন ও আর্থিক সহযোগিতা করতেন।

স্বাধীনতার যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, ২৮শে এপ্রিল ১৯৭১ সনে আব্বা ছোট ভাই দুলালকে সাথে নিয়ে টাকা তোলার জন্য মোহাম্মদপুরের সোনালী ব্যাংকে যান। কিন্তু আর ফিরে আসেননি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর জানা যায় উনারা মোহাম্মদপুরের বিহারীদের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন। আল্লাহ তাআলা সবার কাছে আমাদের শ্রদ্ধেয় আব্বা ও স্নেহের ছোট ভাই দুলালকে বেহেস্ত নসীব করুন।

আব্বা, তোমাকে আমরা অনেক ভালবাসি। তুমিই আমাদের অভিভাবক, তুমিই আমাদের অহংকার। তোমার কাছে আমরা চির ঋণী। আল্লাহ তোমাকে ভালো রাখুন। আমিন।

বাবা দিবসের বিশেষ সংখ্যাটি ডাউনলোড লিংক : Father_AK_small