অ্যাডিলেডের র‌্যান্ডল মল উদযাপন করছে ৫০ বছর

পঞ্চাশ বছর আগে তৎকালীন দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার প্রিমিয়ার ডন ডানস্টান র‌্যান্ডল স্ট্রিটের একটি অংশ থেকে গাড়ি সরিয়ে সেখানে পথচারীদের জন্য একটি বিশেষ শপিং মল তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সে সময় এলাকাটিকে পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার এই উদ্যোগ ছিল বেশ বিতর্কিত। স্থানীয় ইতিহাসবিদ কিথ কনলন বলেন, “একদিকে ছিল গাড়ি, অন্যদিকে পথচারী। আবার একদিকে ছিল ছোট ব্যবসায়ীরা, অন্যদিকে বড় ব্যবসায়ীরা—যারা নিজেদের মতো করে এই জায়গাটিকে চেয়েছিল।” “এটি করা উচিত কি না, তা নিয়ে অনেক বিরোধ ও মতবিরোধ ছিল। এখনকার সময়ে বিষয়টি অদ্ভুত মনে হতে পারে। “মনে হচ্ছিল, গাওলার প্লেস ও র‌্যান্ডল মলের মাঝখানেই যেন একটি বক্সিং রিং বসানো হয়েছে।” ১৯৭৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রায় ১০ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে র‌্যান্ডল মল আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এমনকি একটি ঝরনাতেও শ্যাম্পেন ভরা হয়েছিল।

ডন ডানস্টান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এই জায়গাটি শুধু কেনাকাটার জন্য হবে না; এটি হবে মানুষের মিলন ও বিনোদনেরও একটি স্থান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, “এটি শুধু একটি শপিংয়ের জায়গা হবে না। মানুষ এখানে হাঁটবে, একে অপরের সঙ্গে দেখা করবে, খোলা আকাশের নিচে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড উপভোগ করবে এবং একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও কিনতে পারবে।”

পঞ্চাশ বছর পর র‌্যান্ডল মলের নির্বাহী ব্যবস্থাপক অ্যান্ড্রু হোয়াইট বলেছেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সেই ধারণাটিই উদযাপন করতে পেরে তিনি উচ্ছ্বসিত। তিনি বলেন, “এটি শুধু কেনাকাটা করার জায়গা নয়; এটি দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।”

র‌্যান্ডল মলের অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্য হলো এর পাবলিক আর্ট বা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত শিল্পকর্ম। অ্যান্ড্রু হোয়াইট র‌্যান্ডল মলকে একটি “খোলা আকাশের নিচে শিল্পকর্মের গ্যালারি” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ‘মল’স বলস’, যা ১৯৭৭ সালে স্থাপন করা হয়।

কিথ কনলন বলেন, “এটি এখন র‌্যান্ডল মলের পরিচয়েরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। র‌্যান্ডল মলের কথা ভাবলেই স্বাভাবিকভাবেই এটি মনে আসে।” তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মলের কিছু শিল্পকর্ম নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মল’স বলসের মূল নকশাকার ২০১৩ সালে ভাস্কর্য দুটিকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছিলেন। আর ১৯৯০-এর দশকে র‌্যান্ডল মলে স্থাপন করা চারটি শূকর—হোরেশিও, অলিভার, ট্রাফলস ও অগাস্ট—নিয়েও সে সময় কিছু প্রশ্ন উঠেছিল বলে জানান কনলন। তিনি বলেন, “অবশ্য এখন এগুলো সারা বিশ্বের ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।”

সবচেয়ে সাম্প্রতিক সংযোজনগুলোর একটি হলো ২০২০ সালে স্থাপন করা বিশালাকৃতির একটি পায়রার ভাস্কর্য। শিল্পী এটি “আমাদের অবসর ও খুচরা-বাণিজ্য এলাকার মধ্য দিয়ে ঘুরে বেড়ানো গর্বিত পথচারীদের” প্রতি শ্রদ্ধা হিসেবে তৈরি করেছিলেন।

অ্যান্ড্রু হোয়াইট বলেন, “প্রথমে মল’স বলস এসেছিল, এখন আমাদের রয়েছে সেই ‘পায়রা সম্রাট’, যা ইতোমধ্যেই বেশ আইকনিক হয়ে উঠেছে। “শুরুতে যেসব বিষয় নিয়ে মানুষ কিছুটা দ্বিধায় থাকে, সময়ের সঙ্গে সেগুলোই এই জায়গার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়।”

র‌্যান্ডল মল বিগত পাঁচ দশকে বহু বিখ্যাত ব্যক্তিরও সাক্ষী হয়েছে। ১৯৭৭ সালে, মলটি উদ্বোধনের খুব বেশি দিন পরই সেখানে এসেছিলেন ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। এর কয়েক বছর পর ব্রিটিশ পপ তারকা বয় জর্জকে দেখতে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ র‌্যান্ডল মলে জড়ো হয়েছিল। কিথ কনলন বলেন, “এখানে অস্ট্রেলিয়ার অনেক বিখ্যাত শিল্পীও এসেছেন। তবে শুধু শিল্পী বা তারকাদের জন্যই নয়, এটি বিভিন্ন উদযাপনেরও জায়গা। “এখানে বহুসাংস্কৃতিক উৎসব উদযাপন করা হয়। আমাদের নেটবল দল জিতলে মানুষ এখানে উদযাপন করতে আসে। থান্ডারবার্ডস জিতলে পুরো মল যেন গোলাপি হয়ে ওঠে। “এটি এমন একটি জায়গা যেখানে মানুষ শুধু কেনাকাটা করতে আসে না; দেখা করতে এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেও আসে।”

১৯৭০-এর দশকের তুলনায় র‌্যান্ডল মলে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তবে কিথ কনলনের মতে, পাঁচ দশক আগে যে সময়োপযোগী ও আধুনিক ধারণার মাধ্যমে মলটি তৈরি হয়েছিল, এটি এখনো সেই ভাবনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে। তিনি বলেন, “এটি সবসময়ই পরিবর্তিত ও বিকশিত হচ্ছে। তবে আমার মনে হয়, র‌্যান্ডল মলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিক বৈশিষ্ট্য হলো এটি একটি কমিউনিটি হাব, মানুষের মিলনকেন্দ্র। “আমার কাছে মলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এখানকার মানুষ এবং তারা এখানে কী দেখতে ও করতে আসে। তাই এটি সবসময়ই একটি সাধারণ শপিং মলের চেয়ে অনেক বেশি কিছু ছিল।”

পঞ্চাশ বছর পরও র‌্যান্ডল মল শুধু কেনাকাটার জায়গা নয় এটি অ্যাডিলেডের মানুষের মিলন, সংস্কৃতি, বিনোদন ও সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর র‌্যান্ডল মল পা রাখছে তার গৌরবময় ৫০ বছরে। আর এই বিশেষ মাইলফলক উদযাপনে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বড় ধরনের আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পাঁচ দশক ধরে র‌্যান্ডল মল দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম আইকনিক ও জনপ্রিয় গন্তব্য হিসেবে মানুষের কাছে পরিচিত। তাই ৫০ বছর পূর্তির এই বিশেষ মুহূর্তটি সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে উচ্ছ্বসিত র‌্যান্ডল মল কর্তৃপক্ষ। র‌্যান্ডল মল উদ্বোধনের ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টা থেকে শুরু হবে বিশেষ আয়োজন। এর মধ্য দিয়ে শুরু হবে র‌্যান্ডল মলের জন্মদিন উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী উদযাপনের আনুষ্ঠানিকতা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার প্রিমিয়ার দ্য অনারেবল পিটার মালিনাউস্কাস এমপি এবং অ্যাডিলেডের লর্ড মেয়র দ্য রাইট অনারেবল ড. জেন লোম্যাক্স-স্মিথ এএম। তারা এই ঐতিহাসিক ও আনন্দঘন উপলক্ষে বিশেষ বক্তব্য দেবেন। এ ছাড়া থাকবে লাইভ সংগীত ও অন্যান্য পরিবেশনা। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ হবে কনফেটিতে ভরা বিশেষ উদযাপন, যা র‌্যান্ডল মলের আগামী এক সপ্তাহের জন্মদিনের আয়োজনের সূচনা করবে।

Source: ABCNEWS