অভিজ্ঞতায় অভিবাসন: ভালোবাসা, কান্না আর বিচ্ছেদের ক্যানভাস

মতিউর রহমান: আমার মতে পৃথিবীর সবচাইতে বিচিত্র অভিজ্ঞতার জায়গা হলো বিমানবন্দরের অভিবাসন প্রস্থান অথবা অভিবাসন আগমন। প্রিয়জনকে বিদায় দিতে এসে শারীরিক ভাষায় যেমন নীরব আর্তনাদ আমরা দেখি, তেমনই প্রিয়জনকে কাছে পেয়ে কারো খুশিতে কেঁদে ফেলাও দেখি। তবে ব্যাংকক এয়ারপোর্টে হোয়াইট বয়ফ্রেন্ডকে বিদায় দিতে এসে থাই তরুণীর বুকফাটা আর্তনাদকে আমি অনেক চিন্তা করেও ব্যাখ্যা করতে পারিনি। আর সৌদিফেরত জামাইকে দুটি পৃথক মাইক্রোবাস নিয়ে নিতে আসা দুই সতীনের মারামারির ইউটিউব ভিডিও কে না দেখেছেন!

২০১২ সালের ২২শে জানুয়ারি, ৩/৪টা সুটকেস আর কয়েক হাজার ডলার পকেটে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসনের উদ্দেশ্যে রাত ৯টার দিকে শাহজালাল বিমানবন্দরে হাজির হলাম। বিদায় দিতে এসেছেন আমার এক ভাইরাভাই—যিনি একটি ব্যাংকের একজন সিনিয়র অফিসার এবং কিছুদিন আগে বিমানবন্দর শাখায় কর্মরত ছিলেন। হঠাৎ আমার ভাইরাভাই বর্তমান বিমানবন্দর শাখার ম্যানেজারের ডাকে প্রোটোকলের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন; কারণ ব্যাংকের ডিএমডি তার বোরখায় আবৃত স্ত্রীসহ কুয়ালালামপুর যাচ্ছেন।

ভোররাতের দিকে কুয়ালালামপুর নেমে ট্রানজিট ভিসার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। পাশের লাইনে জনতা ব্যাংকের ডিএমডি সাহেব এবং উনার বোরখাপরিহিতা স্ত্রী। হঠাৎ দেখি ডিএমডি সাহেবের স্ত্রী বোরখা খুলে ফেললেন, উনার পরনে স্লিভলেস নাইটি, বয়স আনুমানিক ২৫-২৬ বছর হবে। সঙ্গে সঙ্গে ডিএমডি মহোদয়ের মুখ কালো হয়ে গেল। এইরকম মুখ মলিন হওয়া দেখেছিলাম এআইটি (AIT), বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের প্রেসিডেন্ট আবদুল ওহাবের—২০০১ সালের ৬ই জানুয়ারি, ব্যাংকক এয়ারপোর্টে।

উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশযাত্রার গতিশীলতায় সকাল ৯/১০টার দিকে শাহজালাল বিমানবন্দরে হাজির হই। সঙ্গে ছিলেন টার্ম ব্রেক (Term break)-এ ছুটি কাটাতে দেশে আসা আবদুল ওহাব। আমার জীবনের প্রথম বিদেশযাত্রায় অভিজ্ঞ আবদুল ওহাবের সঙ্গী হওয়াটা ছিল ভাগ্যের ব্যাপার। ইমিগ্রেশনের পূর্বে আবদুল ওহাব এআইটি-তে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত এক সুন্দরী মেয়ের (ছদ্মনাম শিলা) সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। শিলাও টার্ম ব্রেকের ছুটি কাটাতে দেশে এসেছিলেন এবং দেশে এসে বাবা-মায়ের ইচ্ছায় বিয়ে করে ফেলেছেন। নতুন বিবাহিত স্ত্রীকে বিদায় দিতে আসা স্বামীর চেহারায় এক ধরনের অসহায়ত্বের ভাব লক্ষ্য করলাম। কিন্তু শিলাকে দেখে মনে হচ্ছিল উনি স্বামী ছাড়া হানিমুনে যাচ্ছেন!

ইমিগ্রেশন পার হয়ে বসে থাকা অবস্থায় আবদুল ওহাব শিলাকে বলল, “আমরা তিনজন লিমুজিন (হলুদ রঙের এয়ারকন্ডিশনড ট্যাক্সি) নিয়ে ব্যাংকক এয়ারপোর্ট থেকে ক্যাম্পাসে যাব।” কিন্তু শিলা হ্যাঁ বা না কিছুই বলল না। ব্যাংককে পৌঁছে ইমিগ্রেশনের পর আমি আর আবদুল ওহাব শিলাকে খুঁজছি। হায় আল্লাহ! এ মেয়ে দেখি দৌড়ে এক ছেলের বুকে আছড়ে পড়ল! তা দেখে আবদুল ওহাবের মুখ মলিন হয়ে গেল। কী আর করার, ২০০ বাথের সস্তা নন-এসি ট্যাক্সি নিয়ে রওনা হলাম।

এআইটিতে আমার খুব কাছের লোক ছিলেন সুবীরদা। তিনি অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনে চাকরি করার সময় কমিশনের এক প্রজেক্টে কর্ণফুলী পেপার মিলে এক মাসেরও বেশি সময় ছিলেন এবং আমার সঙ্গে কাজ করেছিলেন। এআইটি জীবনে বহুবার ব্যাংকক এয়ারপোর্টে গিয়েছি কাউকে সি-অফ (Sea-off) বা রিসিভ করার জন্য। কিন্তু সুবীরদার সঙ্গে উনার স্ত্রীকে সি-অফ করতে গিয়ে জটিল এক সমস্যায় পড়লাম। বৌদি একা দেশে যেতে চান না, কিন্তু উনার এক কাজিনের মৃত্যুসংবাদে যেতেই হচ্ছে। বৌদি এই ভেবে ভীত যে উনি ঠিকমতো উনার নির্ধারিত বিমানে উঠতে পারবেন না। আমি বাংলাদেশগামী কোনো মহিলা খোঁজার চেষ্টা করছি, যাকে অনুরোধ করে বৌদির সঙ্গী করা যায়। সুবীরদার কড়া কথা, “গায়ত্রী, তুমি একাই যাবে! প্লেনে উঠতে না পারলে ফিরে আসবে! আমি তোমাকে আবার টিকিট কেটে দেব!”

বৌদির কাঁদো কাঁদো অবস্থার মধ্যেই একজন বাঙালি ভদ্রমহিলাকে দেখে উনাকে বললাম, “আমার এক ভাবি একাকী দেশে যাচ্ছেন, কিন্তু উনি চিন্তিত এই ভেবে যে সঠিক প্লেনে উঠতে পারবেন না। আপনি যদি উনাকে সঙ্গে নেন…”

আশ্চর্যের ব্যাপার, ভদ্রমহিলা আমার কথার কোনো উত্তর দিলেন না এবং আমি আশাহত হলাম। কিছুক্ষণ পরে কানে আসলো, “এই কে, কোন ভাবি যাবে? আমাদের সঙ্গে আসুন।”

আমি উনার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে পরিচয় দিলাম, “মতিউর রহমান, অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার, কেপিএম।”
উনি হ্যান্ডশেক অবস্থায় বললেন, “অঞ্জন চৌধুরী, এমডি, স্কয়ার।” তারপর উনি বললেন, “শুধু বিমানে ওঠা নয়, বিমান থেকে নেমে উনার আত্মীয়ের হাতে উনাকে তুলে দেব।”

অঞ্জন চৌধুরীর উদারতায় মুগ্ধ হলাম। ব্যাপারটা উনি উনার সঙ্গে থাকা দুজন কর্মচারীর কাউকেও দিয়ে করাতে পারতেন। এ ঘটনার ৫ বছর পর একজন প্রাক্তন স্কয়ার কর্মকর্তার কাছে জানলাম, সে সময় অঞ্জন চৌধুরীর পরিবার তাদের এক সন্তানের ‘নো মোর কিউরেবল’ (আরোগ্য না হওয়ার) সংবাদ নিয়ে দেশে ফিরছিলেন।

সম্মানিত পাঠক, আর মাত্র একটা ৭০% হোপ ব্রেক (Hope break), ৩০% হার্ট ব্রেক (Heart break)-এর ঘটনা দিয়ে আমার অভিজ্ঞতার ইতি টানব। সবার উপকারী আবদুল ওহাব উনার শেষ টার্মে এআইটি, বিডি চ্যাপ্টারের প্রেসিডেন্ট ছিলেন না। সুতরাং এই টার্মে উনাকে এক বাংলাদেশি অবিবাহিত ছাত্রীর সহযোগিতায় বেশি ব্যস্ত দেখা গেল। দুজনের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ এই ক্যাম্পাসে অস্বাভাবিক কিছু নয়।

একদিন সেই নারী শিক্ষার্থীকে বিদায় দিতে আমি আর আবদুল ওহাব ব্যাংকক এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন ডিপার্চারে গেলাম। উনাদের দুজনের এআইটি ক্যাম্পাসে দেখার আর কোনো সুযোগ হবে না। যতদূর মনে পড়ে, ইমিগ্রেশন ডিপার্চারে একটা চওড়া পেইন্টেড মার্কার (Painted mark) ছিল এবং সেখানে উনারা দুজন দাঁড়িয়ে।

“ওহাব ভাই, কথা আছে।” —আবদুল ওহাবের উত্তেজনা টের পেলাম।

অপরপক্ষের এক পা সীমারেখার ভেতরে, “ভালো থাকেন।”