আফ্রিকার রঙিন দুয়ার: মরক্কোর দিনগুলি- পর্ব ৩

বিমানের দরজা পেরিয়ে জেট ব্রিজে পা রাখতেই মনের ভেতরে এক ধরনের শিহরণ বয়ে গেল। সত্যিই আমি মরক্কোয়, আফ্রিকার মাটিতে। ইমিগ্রেশনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে চারপাশের মানুষের দিকে তাকাচ্ছিলাম। বেশির ভাগই মরক্কান, সঙ্গে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের এবং ইউরোপীয় চেহারার যাত্রী। আমার মতো দক্ষিণ এশীয় চেহারার মানুষ কাউকে চোখেই পড়ছিল না। দু-একজনকে দেখে পূর্ব বা মধ্য এশিয়ার বলে মনে হলো। রোমাঞ্চের সঙ্গে খুব দ্রুত আরেকটি অনুভূতিও এসে ভর করল। আমি এখানে সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষ। অস্ট্রেলিয়ার বহু সাংস্কৃতিক পরিবেশে অভ্যস্ত থাকায় নিজেকে হঠাৎ যেন খুব দৃশ্যমান এক সংখ্যালঘু মনে হলো।

মোহাম্মদ পঞ্চম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর মরক্কোর প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার গুলোর একটি। দোহার বিশাল ও ঝকঝকে বিমানবন্দরের পর এটি তুলনামূলক ভাবে কম আড়ম্বরপূর্ণ, তবে বেশ ব্যস্ত। ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে আমার পালা এলো। কাউন্টারের অফিসার মোটা গোঁফওয়ালা এক ভদ্রলোক। কোনো উষ্ণ অভ্যর্থনা নয়। পাসপোর্ট হাতে নিয়ে প্রথমে ছবির দিকে তাকালেন, তারপর আমার দিকে। আবার পাসপোর্ট, আবার আমি। মনে হলো, আমাকে যেন একটু বোঝার চেষ্টা করছেন। অস্ট্রেলিয়ান পাসপোর্ট। নাম Mamun Ul Ala। চেহারা দক্ষিণ এশীয়। এসেছি মরক্কোয়। তার চোখে সন্দেহ আর কৌতূহল দুটোরই ছাপ। এই অস্ট্রেলিয়ান ভদ্রলোকটি আসলে কোথাকার? কেন এসেছি, কোথায় থাকব, এমন কয়েকটি প্রশ্ন করলেন। আমি উত্তর দিলাম। তারপর পাসপোর্টে সিল পড়ল।

ইমিগ্রেশন পেরিয়ে ফোনটা বের করতেই হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা চোখে পড়ল। “Hello! Welcome to Morocco. I’m outside waiting with your name plaque.” Lahcen Souali

বুকিং ডট কমের মাধ্যমে আগেই বিমানবন্দর থেকে হোটেলে যাওয়ার জন্য গাড়ি বুক করে রেখেছিলাম। লাহসেনই আমার ড্রাইভার। বার্তাটা দেখে মনটা খানিকটা হালকা হয়ে গেল। এই বিশাল অপরিচিত দেশে অন্তত একজন মানুষ বাইরে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। এবার আর চিন্তা কী!

ইমিগ্রেশন ছেড়ে লাগেজ কনভেয়ার বেল্টের দিকে এগোলাম। বেল্ট চলছে, স্যুটকেস আসছে, মানুষ একে একে ব্যাগ নিয়ে চলে যাচ্ছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি। কিছুক্ষণ পর কয়েকটি স্যুটকেস জট পাকিয়ে যাওয়ায় বেল্ট থেমে গেল। লাল বাতি জ্বলতে শুরু করল, সঙ্গে অ্যালার্ম। প্রায় পাঁচ মিনিট পর একজন এসে আবার বেল্ট চালু করলেন। কয়েক মিনিট পর বেল্ট আবার থামল। আবার চালু হলো। প্রতিটি স্যুটকেসের দিকে তাকাতে তাকাতে চোখ ক্লান্ত হয়ে গেল। আমার স্যুটকেসের কোনো দেখা নেই!

শুরুতে খুব একটা চিন্তা করিনি। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে লাগেজ পেতে সময় লাগতেই পারে। কিন্তু মিনিট যত গড়াতে লাগল, চোখ তত ঘন ঘন চলে যেতে লাগল ঘড়ির দিকে। হঠাৎ গাড়ির বুকিংয়ের শর্তটার কথা মনে পড়ল। ফ্লাইট নামার পর ড্রাইভার ৪৫ মিনিট অপেক্ষা করবে। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সময় প্রায় শেষ, অথচ আমার স্যুটকেসের কোনো খবর নেই। মনে হচ্ছে এক ঘণ্টার আগে লাগেজ পাব না। লাহসেনকে হোয়াটসঅ্যাপে লিখলাম, “Brother, can you please wait for me until I get my suitcase? It’s not coming.” বার্তাটা সিন দেখাল, কিন্তু কোনো উত্তর নেই। অপেক্ষা করলাম। আরেকটু অপেক্ষা। তবুও কোনো উত্তর নেই। এবার সত্যিই চাপ অনুভব করতে শুরু করলাম। অ্যাডিলেড থেকে বের হওয়ার পর ইতিমধ্যে ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় প্রায় নির্ঘুম অবস্থায় কেটে গেছে। মাথা ক্লান্ত, শরীর ক্লান্ত। তার ওপর নতুন দেশ, নতুন বিমানবন্দর, সঙ্গে মরক্কান দিরহাম একটিও নেই।

ড্রাইভার যদি চলে যায়, তাহলে হোটেলে যাব কীভাবে? আগেই জেনেছিলাম, মরক্কোয় দৈনন্দিন লেনদেনে নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়। ইন্টারনেটে পড়েছিলাম—“In Morocco, cash is king.” অথচ আমার কাছে এক দিরহামও নেই। পকেটে অস্ট্রেলিয়ান ডলার আছে, ক্রেডিট কার্ড আছে, কিন্তু মরক্কোয় দাঁড়িয়ে কার্যত আমি তখন ফকির! লাগেজ পেলে আগে এটিএম খুঁজে টাকা তুলব, নাকি আগে গাড়ি খুঁজব? এটিএম খুঁজতে গেলে আরও সময় যাবে। আর লাহসেন কি ইতিমধ্যে চলে গেছে? একটার পর একটা চিন্তা মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে।

ঠিক তখনই আমার স্যুটকেসটি দেখা গেল। নিশ্চিত হওয়ার জন্য ব্যাগের ট্যাগটা একবার দেখে নিলাম। সেখানে আমার অর্ধাঙ্গিনীর সুন্দর হাতের লেখায় আমার নাম, ঠিকানা আর ফোন নম্বর। দ্রুত ট্রলি নিয়ে ব্যাগটা তুলে নিলাম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হিসাব করে দেখলাম, কাসাব্লাঙ্কায় নেমেছিলাম বেলা দেড়টার দিকে। বিমান নামার পর এক ঘণ্টা একুশ মিনিট কেটে গেছে। ৪৫ মিনিটের অপেক্ষার সময় অনেক আগেই শেষ। তবু মনের এক কোণে ক্ষীণ আশা, লাহসেন হয়তো এখনো আছে।

ঠিক তখনই আরেক বিপদ। এতক্ষণ উত্তেজনায় খেয়াল করিনি, এবার বুঝলাম বাথরুমে যাওয়া জরুরি। এমন অবস্থা যে উপেক্ষা করার উপায় নেই। এখন বাথরুমে গেলে আরও কয়েক মিনিট নষ্ট হবে। না গেলে? রাস্তায় যদি বিপদ হয়? আমার মরক্কো অভিযান যেন পরিণত হলো সময় আর প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার মধ্যে এক কঠিন প্রতিযোগিতায়! সত্যজিৎ রায় লিখেছিলেন, যত কাণ্ড কাঠমান্ডুতে, এখন দেখছি কাসাব্লাঙ্কাতেও কাণ্ডের অভাব নেই!

নিজেকে শান্ত করলাম। যা হওয়ার হবে! বাথরুমে গেলাম।তারপর ভাবলাম, অন্তত কিছু মরক্কান দিরহাম নিয়ে বের হওয়া দরকার। মানি এক্সচেঞ্জ কাউন্টারে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ডলার এগিয়ে দিতেই জানলাম, তারা অস্ট্রেলিয়ান মুদ্রা বদলায় না। কাছাকাছি চোখে পড়ার মতো কোনো এটিএমও পেলাম না। আর কিছু করার নেই। ট্রলিটা ঠেলে ধীরে ধীরে এক্সিটের দিকে এগোলাম। মনে মনে প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছি, আমার জন্য আর কেউ অপেক্ষা করছে না।

বিমানবন্দর থেকে বেরোতে বেরোতে স্থানীয় সময় প্রায় তিনটা বেজে গেল। চারদিকে মানুষের ভিড়। কেউ ফুল হাতে, কেউ নাম লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে, কেউ আত্মীয়কে জড়িয়ে ধরছেন। হঠাৎ দেখি, ওই তো! আমার নাম লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছে লাহসেন। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, রোগাটে গড়ন। পরনে টি-শার্ট, মুখে হালকা দাড়ি। এত আনন্দ হচ্ছিল যে ইচ্ছে হলো তাঁকে জড়িয়ে ধরি! কাছে গিয়ে বললাম, “আসসালামু আলাইকুম।” তার গম্ভীর কণ্ঠে নিরুত্তাপ ও সংক্ষিপ্ত উত্তর, “ওয়ালেকুম সালাম।” বুঝলাম, এই ভদ্রলোককে জড়িয়ে ধরার পরিকল্পনাটি বাদ দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

লাহসেন আমার কাছ থেকে ট্রলিটা নিয়ে মাথার হালকা ইশারায় বোঝাল তাঁকে অনুসরণ করতে। সে নির্বিকারভাবে ট্রলি ঠেলে সামনে এগিয়ে চলছে, আর আমি তার পেছনে হাঁটছি। ক্লান্ত, পকেটে একটিও মরক্কান দিরহাম নেই, কিন্তু অদ্ভুত একটা স্বস্তি। কারণ আমাকে নেওয়ার মানুষটি চলে যায়নি। আমি লাহসেনের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। এত দেরি হওয়ার জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে চাইলাম, এতক্ষণ অপেক্ষা করার জন্য ধন্যবাদ দিতে চাইলাম। কিন্তু আমার দেরি, আমার উদ্বেগ, আমার ধন্যবাদ, কোনোটিই যেন তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।

বেশ খানিকটা হেঁটে আমরা পার্কিং এলাকায় পৌঁছালাম। রোদ তখন বেশ তীব্র। তবে মিলিটারি একাডেমির ট্রেনিং থাকায় আমি গরম-ঠান্ডা নিয়ে কখনোই খুব একটা মাথা ঘামাই না। সঙ্গে আর কেউ থাকলে হয়তো এতক্ষণে বলে উঠত, “বাপরে, কী রোদ! কী গরম! এটাই তাহলে আফ্রিকা!” চারদিকে শত শত গাড়ি। লাহসেনের গাড়িটি কালো রঙের একটি পুরোনো মার্সিডিজ। অন্তত ত্রিশ বছরের পুরোনো হবে। তবু মার্সিডিজ বলে কথা! মুহূর্তের জন্য নিজেকে একটু ‘বড়লোক বড়লোক’ মনে হলো। স্যুটকেসটি পেছনের ডিকিতে তুলে লাহসেন ট্রলিটি রেখে আসতে গেল। সেই ফাঁকে পার্কিংয়ে দাঁড়ানো গাড়িগুলোর দিকে তাকাচ্ছিলাম। বেশির ভাগই ডাসিয়া আর রেনো, ফরাসি ব্র্যান্ড। কিছু কিয়াও চোখে পড়ল। তুলনায় জাপানি গাড়ি আমার চোখে কমই পড়ল। টয়োটা মাঝেমধ্যে দেখা গেলেও মিতসুবিশি বা নিসান প্রায় চোখেই পড়েনি।

লাহসেন ফিরে আসার পর আমি অভ্যাসবশত গাড়ির বাঁ পাশের সামনের দরজার দিকে এগোলাম। সে প্রায় চিৎকার করে উঠল—“লা, লা!” অর্থাৎ—“না, না!” খানিকটা ঘাবড়ে গিয়ে তার দিকে তাকাতেই প্রথমবারের মতো লাহসেনের মুখে হাসি দেখলাম। এমনকি দাঁতও দেখা গেল! তারপর এক শব্দের প্রশ্ন, “কান্ট্রি?”, বললাম, “অস্ট্রেলিয়া”। মাথা দুলিয়ে লম্বা টানে বলল, “আ-হা!” তারপর হাতের ইশারায় আমাকে গাড়ির অন্য পাশে গিয়ে বসতে বলল।

লাহসেন ফিরে আসার পর আমি অভ্যাসবশত গাড়ির বাঁ পাশের সামনের দরজার দিকে এগোলাম। সে প্রায় চিৎকার করে উঠল—“লা, লা!” অর্থাৎ—“না, না!” খানিকটা ঘাবড়ে গিয়ে তার দিকে তাকাতেই প্রথমবারের মতো লাহসেনের মুখে হাসি দেখলাম। এমনকি দাঁতও দেখা গেল! তারপর এক শব্দের প্রশ্ন, “কান্ট্রি?”, বললাম, “অস্ট্রেলিয়া”। মাথা দুলিয়ে লম্বা টানে বলল, “আ-হা!” তারপর হাতের ইশারায় আমাকে গাড়ির অন্য পাশে গিয়ে বসতে বলল।

একেবারেই ভুলে গিয়েছিলাম, মরক্কোয় গাড়ির স্টিয়ারিং বাম পাশে, আর গাড়ি চলে রাস্তার ডান দিকে। অস্ট্রেলিয়ার বাঁ দিকে চলা যানবাহন আর ডান পাশে স্টিয়ারিংয়ে অভ্যস্ত থাকার কারণে উল্টো ব্যবস্থার দেশে গেলে এই ভুল সহজেই হয়ে যায়। শুধু গাড়িতে ওঠার সময়ই নয়, হাঁটতে গিয়ে ভুল ফুটপাথ বা রাস্তায় চলা, কিংবা রাস্তা পার হওয়ার আগে অভ্যাসবশত ভুল দিকে তাকানোর ঘটনাও ঘটেছে অনেকবার।

গাড়ি ছাড়ার পর খুব দ্রুতই একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল। লাহসেনের ইংরেজির দৌড় খুব বেশি নয়। এবার বুঝতে পারলাম, বিমানবন্দরের ভেতর থেকে আমি যে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তাটি পাঠিয়েছিলাম, তার কোনো উত্তর সে কেন দেয়নি। বিমান ল্যান্ড করার পর যে সুন্দর ইংরেজি বার্তাটি পাঠিয়েছিল, সেটি সম্ভবত আগে থেকেই তৈরি করা কোনো কপি-পেস্ট বার্তা।

আফ্রিকা মহাদেশ বলে জায়গাটা অনেক বেশি রুক্ষ ও অনুর্বর হবে, এমন একটা ধারণা মনে কোথাও ছিল। কিন্তু প্রথম দেখায় তেমন মনে হলো না। বিমানবন্দর এলাকায় সাড়ি সাড়ি খেজুর গাছ, মাথা গুলো সুন্দর করে ছাঁটা। মহাসড়কের দুপাশে জলপাই সহ আরও নানা ধরনের গাছপালা।

আফ্রিকা মহাদেশ বলে জায়গাটা অনেক বেশি রুক্ষ ও অনুর্বর হবে, এমন একটা ধারণা মনে কোথাও ছিল। কিন্তু প্রথম দেখায় তেমন মনে হলো না। বিমানবন্দর এলাকায় সাড়ি সাড়ি খেজুর গাছ, মাথা গুলো সুন্দর করে ছাঁটা। মহাসড়কের দুপাশে জলপাই সহ আরও নানা ধরনের গাছপালা। তবে আবহাওয়া যে বেশ শুষ্ক, সেটা সহজেই বোঝা যাচ্ছিল। রাস্তাঘাট বেশ উন্নত। কোথাও কোথাও বড় ধরনের নির্মাণ কাজ চলছে। মহাসড়কের পাশে কয়েক জায়গায় পুলিশ স্পিড ক্যামেরা বন্দুকের মতো তাক করে দাঁড়িয়ে আছে।

বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে বই, পত্রিকা আর ইউটিউবের মরক্কোর সঙ্গে বাস্তবের মরক্কোকে মেলানোর চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ লাহসেন নীরবতা ভাঙল। “ইন্ডিয়া?” মাথা নাড়িয়ে বললাম, “লা!” ভাব দেখালাম, আমিও আরবি জানি! “পাকিস্তান?” “লা!” গর্বের সঙ্গে বললাম, “বাংলাদেশ।” লাহসেনের চোখেমুখে খুশির ঝিলিক। “মুসলিম? ” আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলতেই সে যেন পরম তৃপ্তিতে বলল, “আলহামদুলিল্লাহ।” আমি মজা করে তাকে আরও নিশ্চিত করার জন্য সুরা আল-ফাতিহা পড়া শুরু করলাম। লাহসেনও সঙ্গে যোগ দিল। বারবার বলল, “মাশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ।” ভাষা নয়, শুধু একটি অভিন্ন ধর্মীয় পরিচয় কী আশ্চর্যভাবে দুই অচেনা মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে কাছাকাছি এনে দিল!

মনে পড়ে গেল প্রায় বত্রিশ বছর আগের এক অম্ল-মধুর স্মৃতি। ১৯৯৪ সালের জুলাই মাস। দিল্লিতে পকেটমারের কবলে পড়ে আমি পথের ভিখারি হয়ে পড়লাম। কিরোরি মাল কলেজের এক বাংলাদেশি ছাত্র দয়া করে আমার ট্রেনের টিকিট কেটে দিয়েছিল। দিল্লি থেকে কলকাতা ফিরছিলাম জনতা এক্সপ্রেসের সাধারণ কামরায়। তখন প্রায় প্রতিটি এক্সপ্রেস ট্রেনে দু-একটি কামরা থাকত, যেখানে কোনো সংরক্ষিত আসন ছাড়াই যাত্রীরা উঠতেন। প্রচণ্ড ভিড়। বসার জায়গা তো দূরের কথা, দাঁড়ানোরও যেন ঠাঁই নেই। সেই গরমে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রায় আঠারো ঘণ্টার পথ। হাতে কোনো টাকা নেই, সঙ্গে কোনো খাবারও নেই। বাইরে থেকে গরম লু হাওয়া ঢুকছিল। প্রচণ্ড গরমে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছিল। একসময় অসহ্য কষ্টে আমার মুখ থেকে অনিচ্ছাকৃত ভাবে বেরিয়ে এলো, “ওহ্ আল্লাহ!” মুহূর্তের মধ্যেই ওপরের বাংকে বসে থাকা একজন যাত্রী আমার মাথায় আলতো করে টোকা দিল। উপরে তাকাতেই আনুমানিক সাতাশ-আঠাশ বছরের এক যুবক জিজ্ঞেস করল, “মোহামেডান?” আমি মাথা নাড়তেই সে সঙ্গে সঙ্গে একটি ঠান্ডা ফ্রুটি ম্যাংগো জুস এগিয়ে দিল। কী হচ্ছে কিছুই বুঝিনি। কোনো ইতস্তত না করে প্যাকেটটা নিয়ে প্রায় এক নিঃশ্বাসে শেষ করে ফেললাম।

চলন্ত ট্রেনের প্রচণ্ড কোলাহলের মধ্যে তার কথা ঠিকমতো শোনা যাচ্ছিল না। যতটুকু বুঝলাম, তার নাম ইয়াসিন। রাজস্থানি মুসলিম। চুড়ির পাইকারি ব্যবসা করে, সেই কাজেই কলকাতায় যাচ্ছে। আমি হিন্দি ভালো বুঝতাম না, আর তার রাজস্থানি ভাষা তো একেবারেই অপরিচিত। এর বেশি আমাদের কোনো কথোপকথনই হলো না। কিন্তু পুরো পথ জুড়ে ইয়াসিন ওপরের বাংক থেকে একটু পরপর আমার দিকে কিছু না কিছু এগিয়ে দিচ্ছিল। চিড়া, আম, পানি, জুস যা যা ছিল তার কাছে। শুধু তাই নয়, মাঝে মাঝে সে নিজে বাংক থেকে নেমে আমাকে কিছুক্ষণ বসার সুযোগও করে দিচ্ছিল। এত ভিড়ের মধ্যে সেটুকু বসার সুযোগও তখন বিরাট স্বস্তি, অনেক ভাগ্যের ব্যাপার।

তেইশ-চব্বিশ বছরের এক বাংলাদেশি বাঙালির সঙ্গে রাজস্থানের সেই যুবকের তেমন কিছুই মিল ছিল না। ভাষা, অঞ্চল, সংস্কৃতি – সব দিক থেকেই আমরা ছিলাম বেশ আলাদা; মিল ছিল মূলত একটি জায়গায়; ধর্মীয় পরিচয়ে। অথচ সেই একটি পরিচয়ই সেদিন আমার জন্য আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যাত্রার শেষে ছোট্ট এক টুকরো কাগজে ইয়াসিন রাজস্থানি ভাষায় তার ঠিকানা লিখে দিয়েছিল। ইশারায় বোঝাচ্ছিল, কখনো গেলে সে খুব খুশি হবে। বহু বছর সেই কাগজটি যত্ন করে রেখেছিলাম। পরে একসময় হারিয়ে যায়। মরক্কোয় এসে লাহসেন যেন আবার সেই স্মৃতি মনে করিয়ে দিল। ইয়াসিনকে ভুলিনি। মাঝেমধ্যে এখনো তার কথা মনে পড়ে। আর ভাবি, ধর্ম শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় নয়; অনেক সময় একই বিশ্বাসের পরিচয় সম্পূর্ণ অচেনা মানুষের মধ্যেও সামাজিক আস্থা, আপনত্ব আর মানবিক সংযোগের এক অদৃশ্য সেতু তৈরি করে দেয়।

ইয়াসিনকে ভুলিনি। মাঝেমধ্যে এখনো তার কথা মনে পড়ে। আর ভাবি, ধর্ম শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় নয়; অনেক সময় একই বিশ্বাসের পরিচয় সম্পূর্ণ অচেনা মানুষের মধ্যেও সামাজিক আস্থা, আপনত্ব আর মানবিক সংযোগের এক অদৃশ্য সেতু তৈরি করে দেয়।

ধীরে ধীরে রাস্তার দুপাশে লোকালয় ঘন হতে শুরু করল। খুব বেশি বহুতল ভবন চোখে পড়ছিল না। আকাশ ঝকঝকে পরিষ্কার, রাস্তাঘাটও বেশ পরিচ্ছন্ন। আর যেটা দ্রুত নজরে এলো, তা হলো অসংখ্য মসজিদ। প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই একটি করে মসজিদ। বেশির ভাগেরই মিনার লম্বা, চৌকো টাওয়ারের মতো। মরক্কান ইসলামি স্থাপত্যের খুব পরিচিত একটি বৈশিষ্ট্য।

একসময় আমরা কাসাব্লাঙ্কার মূল শহরে ঢুকে পড়লাম। শহরটি আকাশছোঁয়া ভবনে ঠাসা নয়; বরং মাঝারি উচ্চতার ভবনই বেশি। কোথাও আধুনিক অফিস ভবন, কোথাও পুরোনো সাদা বা হালকা রঙের বাড়ি, বারান্দা আর অলংকৃত সম্মুখভাগ। ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলের আর্ট ডেকো (Art Deco) ও নব্য-মুরিশ (Neo-Moorish) স্থাপত্যের প্রভাব শহরের বিভিন্ন অংশে স্পষ্ট। ইউরোপীয় নকশার সঙ্গে মরক্কান অলংকরণের মিশ্রণ। চওড়া বুলেভার্ড (প্রশস্ত সড়ক), পুরোনো ভবনের বাঁকানো বারান্দা, অলংকৃত সম্মুখভাগ, আর তার মাঝেই নতুন নির্মাণ। সব মিলিয়ে একই সঙ্গে ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকার ছাপ।

ততক্ষণে আমার মাথায় আবার নগদ টাকার কথা ঘুরছে। লাহসেনকে ব্যাংক কার্ড দেখিয়ে ইশারায় এটিএমের কথা জিজ্ঞেস করলাম। সে বুঝতে পারল। কিছু দূর গিয়ে একটি ব্যাংক অব আফ্রিকার এটিএম বুথের সামনে থামল। গাড়ি থেকে নামার সময় বুকের ভেতর একটু দুরুদুরু করছিল। নতুন দেশ, যদি অস্ট্রেলিয়ান কার্ড কাজ না করে? কার্ডটা যদি আটকে যায়?

খুব সাবধানে কার্ড ঢোকালাম। নির্দেশনা অনুসরণ করে ২০০০ মরক্কান দিরহাম তুলতে চাইলাম। কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা। তারপর পরিচিত সেই টাকা গোনার মধুর শব্দ! বেরিয়ে এলো ২০০০ দিরহাম! অস্ট্রেলিয়ান ডলারে তিনশ ডলারের কিছু বেশি। সে মুহূর্তের স্বস্তিটা ভাষায় বোঝানো কঠিন। কয়েক মিনিট আগেও এমন এক দেশে দাঁড়িয়ে ছিলাম যেখানে আমার কাছে একটিও স্থানীয় মুদ্রা নেই। এখন হাতে মোটা একগুচ্ছ দিরহাম। ২০০০ দিরহাম হাতে নিয়ে আমিও এখন king! অস্ট্রেলিয়ায় আমার অর্ধাঙ্গিনীকে হোয়াটসঅ্যাপে লিখলাম—“2000 MAD তুলেছি। আলহামদুলিল্লাহ।”

নতুন দেশে হাতে নগদ টাকা থাকার এক সুখকর নিরাপত্তা বোধে মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে গেল। লাহসেনের সঙ্গে আরেকটু গল্পসল্প করতে ইচ্ছে করল। এবার গুগল অনুবাদের সাহায্য নিলাম। আরবিতে জিজ্ঞেস করলাম, “মান ফি আইলাতিক?” তোমার পরিবারে কে কে আছে? সে জানাল, দুই ছেলে আর এক মেয়ে। তিনজনই পড়াশোনা করছে। একটু মজা করে এবার জিজ্ঞেস করলাম, “কাম যাওজাতান ইন্দাকা?” “তোমার বিবি কয়জন?” প্রশ্নটা শুনে লাহসেন হেসে কুটিকুটি। তর্জনী নেড়ে নেড়ে এমন ভঙ্গিতে উত্তর দিল যে ভাষা না বুঝলেও অর্থটা বুঝতে অসুবিধা হলো না, “একজন স্ত্রী সামলানোই যথেষ্ট কঠিন, একাধিক সামলাব কীভাবে!” লাহসেনকে যখন বললাম আমার একটিই “ওয়ালাদ” (পুত্র), সে খানিকটা অসন্তোষের সুরে বলল, “লা, লা!” অর্থাৎ, একটি সন্তান মোটেই যথেষ্ট নয়! তারপর কৌতুকের সুরে জিজ্ঞেস করল, “যাওজা” (স্ত্রী)? আমি ডান হাতটা আমার গলার কাছে নিয়ে জবাই করার ভঙ্গি করে বোঝালাম, আপাতত একজনই, আরেক জন হলে খুন হয়ে যাব! লাহসেন হো হো করে হেসে উঠল।

এভাবে আরবি এক-আধটা শব্দে, কখনো হাতের ইশারায়, কখনো মুখের ভঙ্গিতে আমাদের কথাবার্তা চলতে থাকল। এর মধ্যেই প্রবল কৌতূহল আর বিস্ময় নিয়ে জানালার বাইরে কাসাব্লাঙ্কার রাস্তা, মানুষ আর ভবন দেখছিলাম। জুমার নামাজের পরের সময় বলে হয়তো কোথাও কোথাও রাস্তাঘাট তুলনামূলক শান্ত মনে হচ্ছিল।

প্রায় ত্রিশ মিনিটের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম Hotel de Paris-এ। তখন স্থানীয় সময় প্রায় বিকেল সাড়ে তিনটা। বিদায়ের সময় মনে হলো, আমরা যেন অনেক কথাই বলে ফেলেছি। ওয়ালেট থেকে একশ দিরহামের একটি নোট বের করে লাহসেনের হাতে দিলাম। নোটটির মাঝখানে ভাগ করার ভঙ্গি করে বোঝালাম, আমাকে পঞ্চাশ দিরহাম ফেরত দিতে। তারপর যখন বললাম, বাকি পঞ্চাশও তোমার, তার মুখটা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ডান হাত বুকের ওপর রেখে কয়েকবার বলল, “শুকরান, শুকরান।” আমি বললাম, “মারহাবা, হাবিবি!” তুমি ভালো থেকো, লাহসেন!

চোখে পড়ল হোটেলের বেশ খাড়া সিঁড়ি। ভাবছিলাম, স্যুটকেসটা কীভাবে ওপরে তুলব! ঠিক তখনই ভেতর থেকে একজন দ্রুত বেরিয়ে এসে হাসিমুখে আমাকে অভ্যর্থনা জানাল, “মামুন?, ওয়েলকাম, ওয়েলকাম!” তার নাম ইউসুফ, হোটেলের একজন কর্মী। । আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আমার স্যুটকেস, এমনকি কাঁধের ব্যাগটিও নিয়ে এমনভাবে ধপধপ করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল, যেন ওগুলোর কোনো ওজনই নেই। ওপরে উঠতেই ম্যানেজার খালিদ উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাল। হোটেল দ্য প্যারিস বিলাসবহুল নয়, মধ্যম মানের সাশ্রয়ী একটি হোটেল। কর্মীরা ভীষণ আন্তরিক। রিসেপশনের সামনে কয়েকটি আরামদায়ক চেয়ার ও বসার জায়গা। দেয়ালে মরক্কোর বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মদের বড় একটি ছবি।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই সামনে রাখা হলো খোদাই করা রূপালি ট্রের ওপর চকচকে মরক্কান চায়ের পাত্র। পাশে কাঁচের গ্লাস। আর নীল-সাদা নকশার ছোট্ট একটি ঐতিহ্যবাহী তাজিন আকৃতির পাত্র। ঢাকনা তুলতেই ভেতরে ছোট ছোট বিস্কুট। বাংলাদেশের ড্রাই কেকের মতো। তারপর গ্লাসে বেশ ওপর থেকে রাজকীয় কায়দায় ঢেলে দেওয়া হলো গরম পুদিনা চা। মরক্কোর সিগনেচার মিন্ট টি। প্রথম চুমুকেই মনে হলো, আহা! এ যেন অমৃত। ধন্যবাদ জানাতেই খালিদ হাসিমুখে ইংরেজিতে যা বলল, তার অর্থ দাঁড়ায়—“এভাবেই আমরা তোমাদের স্বাগত জানাই। এটাই মরক্কান আতিথেয়তা।”

কিছুক্ষণ পর চেক-ইনের জন্য খালিদ আমার পাসপোর্ট চাইল। “অস্ট্রেলিয়ান?” আমি একটু গর্বের সঙ্গেই বললাম, “ইয়েস। বাংলাদেশি অস্ট্রেলিয়ান।” খালিদ সবজান্তার ভঙ্গিতে মুচকি হেসে বলল, “ওহ, বাংলাদেশ! গুড কান্ট্রি।” একজন মরক্কান বাংলাদেশকে চিনেছে, সুনাম করছে ভাবতেই মনটা ভীষণ আনন্দ ও গর্বে ভরে উঠল। অভিবাসী জীবনের বোধহয় এ এক সূক্ষ্ম পরিচয়-দ্বন্দ্ব। তৃতীয় কোনো দেশে গেলে কখনো কখনো নিজের পরিচয় দেওয়ার মুহূর্তেই প্রশ্নটা ভেতরে জেগে ওঠে। কোন দেশটির নাম আগে বলব? যে দেশে জন্মেছি, বড় হয়েছি, ভাষা-সংস্কৃতি আর শৈশব, যৌবনের হাজারো স্মৃতি, নাকি যে দেশ আমাকে উচ্চতর শিক্ষার সুযোগ দিয়েছে, কর্মজীবন গড়ার সুযোগ দিয়েছে, নাগরিকত্ব দিয়েছে, এবং এখন আমার ঘর? আমার ক্ষেত্রে এই দুই পরিচয়ের কোনোটিকেই আলাদা করে দেখতে পারি না। বাংলাদেশ আমার শিকড়, অস্ট্রেলিয়া আমার বর্তমান ঠিকানা। দুটিই মিলে আমার পরিচয়। তাই “বাংলাদেশি অস্ট্রেলিয়ান।” বলার মধ্যেই যেন নিজের সবচেয়ে পূর্ণ পরিচয়টি খুঁজে পাই।

অভিবাসী জীবনের বোধহয় এ এক সূক্ষ্ম পরিচয়-দ্বন্দ্ব। তৃতীয় কোনো দেশে গেলে কখনো কখনো নিজের পরিচয় দেওয়ার মুহূর্তেই প্রশ্নটা ভেতরে জেগে ওঠে। কোন দেশটির নাম আগে বলব? যে দেশে জন্মেছি, বড় হয়েছি, ভাষা-সংস্কৃতি আর শৈশব, যৌবনের হাজারো স্মৃতি, নাকি যে দেশ আমাকে উচ্চতর শিক্ষার সুযোগ দিয়েছে, কর্মজীবন গড়ার সুযোগ দিয়েছে, নাগরিকত্ব দিয়েছে, এবং এখন আমার ঘর? আমার ক্ষেত্রে এই দুই পরিচয়ের কোনোটিকেই আলাদা করে দেখতে পারি না। বাংলাদেশ আমার শিকড়, অস্ট্রেলিয়া আমার বর্তমান ঠিকানা। দুটিই মিলে আমার পরিচয়। তাই “বাংলাদেশি অস্ট্রেলিয়ান।” বলার মধ্যেই যেন নিজের সবচেয়ে পূর্ণ পরিচয়টি খুঁজে পাই।

চা-বিস্কুট শেষ করে চেক-ইনের আনুষ্ঠানিকতা সেরে ইউসুফ আমাকে চারতলায় আমার রুমে নিয়ে যাচ্ছিল। শরীর ভীষণ ক্লান্ত, কিন্তু মনে গভীর প্রশান্তি। লিফটে উঠতে উঠতে ভাবছিলাম, কিছুক্ষণ আগেও বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে কত আশঙ্কায় ছিলাম; হোটেলে ঠিকমতো পৌঁছাতে পারব কি না, ড্রাইভার থাকবে কি না, টাকা তুলতে পারব কি না। এখন মাথার ওপর একটি ছাদ, পকেটে মরক্কান দিরহাম, আর সামনে সম্পূর্ণ নতুন এক দেশ। আলহামদুলিল্লাহ। মরক্কোয় আমার প্রথম বিকেলটা এবার সত্যিই শুরু হতে যাচ্ছে!