অপেক্ষার অবসান। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয়ের ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। ডারউইনের মারারা ক্রিকেট গ্রাউন্ডে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল টাইগাররা। মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই তানজিদ হাসানকে হারালেও কোনো অঘটন ঘটতে দেয়নি বাংলাদেশ। শাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হকের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে সহজেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় সফরকারীরা।
এই জয় শুধু একটি ম্যাচের জয় নয় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এটি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ২০০৩ সালে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে এসে যে দলটি দুই টেস্টেই বড় ব্যবধানে হেরেছিল, ২৩ বছর পর সেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই বাংলাদেশ জয়ী।
ম্যাচের প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশের আধিপত্যের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট করে দেয় বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ। পেসার হাসান মাহমুদ ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ধসের মূল কারিগর। ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে তিনি তুলে নেন ৬ উইকেট মাত্র ৫৫ রান দিয়ে। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে একমাত্র উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ গড়েন স্টিভ স্মিথ, যিনি করেন ৭১ রান। কিন্তু স্মিথ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ কার্যত বাংলাদেশের বোলারদের সামনে অসহায় হয়ে পড়ে।
অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ে নামে আত্মবিশ্বাস নিয়ে। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৪২৬ রান অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বিশাল ২২৮ রানের লিড।
এই ইনিংসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় তানজিদ হাসানের ব্যাট। তরুণ ওপেনার করেন ১০১ রান। তাঁর এই সেঞ্চুরি ছিল ঐতিহাসিক—অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে সেঞ্চুরি করা প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার হিসেবে নিজের নাম ইতিহাসে লিখে ফেলেন তানজিদ।
তানজিদের সঙ্গে মুমিনুল হকের গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ রানের ইনিংস বাংলাদেশের বড় লিড গড়ে দেয়। পরে মেহেদী হাসান মিরাজের ৬৫ রানও দলের সংগ্রহকে আরও শক্তিশালী করে। বাংলাদেশের ৪২৬ রানের জবাব দিতে অস্ট্রেলিয়াকে দ্বিতীয় ইনিংসে নামতে হয় বিশাল চাপ নিয়ে।
দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। ক্যামেরন গ্রিন এক প্রান্ত আগলে রেখে করেন ১০৪ রান। ঘরের মাঠে এটি ছিল গ্রিনের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি।
কিন্তু একা গ্রিনের লড়াই অস্ট্রেলিয়াকে ম্যাচে ফেরানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। বাংলাদেশের বোলাররা নিয়মিত বিরতিতে উইকেট তুলে নিতে থাকে। শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস থামে ২৮৪ রানে। বাংলাদেশের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।
দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে মেহেদী হাসান মিরাজের হাত ধরে। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একের পর এক উইকেট তুলে নিয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ার লোয়ার অর্ডারকে ধ্বংস করে দেন।
মিরাজের বোলিং ফিগার—৫/৬৬। তাঁর সঙ্গে হাসান মাহমুদের ৩ উইকেট বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণকে করে তোলে অপ্রতিরোধ্য। হাসান মাহমুদ পুরো ম্যাচে নেন ৯ উইকেট।
শেষ ইনিংসে বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য ছিল মাত্র ৫৭। ছোট লক্ষ্য হলেও অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী পেস আক্রমণের কারণে ম্যাচের শেষ কয়েকটি রান নিয়েও কিছুটা উত্তেজনা ছিল।
তানজিদ হাসান দ্রুত ফিরে গেলেও শাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক কোনো চাপকে পাত্তা দেননি। ঠান্ডা মাথায় ব্যাট করে তাঁরা বাংলাদেশকে নিয়ে যান জয়ের বন্দরে। শেষ পর্যন্ত ৯ উইকেট হাতে রেখে লক্ষ্য পেরিয়ে যায় বাংলাদেশ।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয় বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে লেখা হয়ে যায় এক নতুন অধ্যায়। বাংলাদেশের এই জয়কে শুধু অস্ট্রেলিয়ার একটি ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। ম্যাচের প্রায় পুরোটা সময় বাংলাদেশই ছিল নিয়ন্ত্রণে।
প্রথম দিন হাসান মাহমুদের আগুনঝরা বোলিং, দ্বিতীয় দিনে তানজিদের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি, তৃতীয় দিনে অস্ট্রেলিয়ার টপ অর্ডার ধস এবং চতুর্থ দিনে মিরাজের ঘূর্ণি প্রতিটি পর্যায়েই বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছিল পরিকল্পিত ও পরিণত।
অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট হওয়ার পর বাংলাদেশ ৪২৬ করে ২২৮ রানের বিশাল লিড নেয়। দ্বিতীয় ইনিংসে গ্রিনের লড়াই সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়া ২৮৪-এর বেশি যেতে পারেনি।
বাংলাদেশ সর্বশেষ ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলেছিল। সেই সফরের দুই টেস্টেই অস্ট্রেলিয়ার কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। ২৩ বছর পর আবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ফিরে এসে এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প লিখল টাইগাররা। অস্ট্রেলিয়া বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শক্তিশালী দল এবং সিরিজ শুরুর আগে পয়েন্ট টেবিলেও শীর্ষে ছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশ এসেছিল অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘ বিরতির পর। সেই প্রেক্ষাপটে এই জয় বাংলাদেশের জন্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
হাসান মাহমুদ: প্রথম ইনিংসে ৬/৫৫, দ্বিতীয় ইনিংসে ৩ উইকেট পুরো ম্যাচে ৯ উইকেট।
মেহেদী হাসান মিরাজ: দ্বিতীয় ইনিংসে ৫/৬৬; অস্ট্রেলিয়ার লোয়ার অর্ডার ধসিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি প্রথম ইনিংসেও ৬৫ রান।
তানজিদ হাসান: ঐতিহাসিক ১০১ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি।
নাজমুল হোসেন শান্ত: অধিনায়ক হিসেবে ৮৪ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস এবং পুরো ম্যাচে দলের নেতৃত্বে দৃঢ়তা।
শাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক: শেষ ইনিংসে চাপমুক্ত ব্যাটিং করে জয় নিশ্চিত করেন।
এই জয় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটকে নতুন আত্মবিশ্বাস দেবে। ঘরের মাঠে সাফল্যের পাশাপাশি বিদেশের মাটিতে, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে, বাংলাদেশ যে টেস্ট জেতার ক্ষমতা রাখে ডারউইন টেস্ট তার বড় প্রমাণ।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই জয় কোনো একক খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করে আসেনি। বোলিং, ব্যাটিং, ফিল্ডিং এবং নেতৃত্ব চার বিভাগেই বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ভালো করেছে।
ডারউইনের আকাশে তাই আজ বাংলাদেশের পতাকা। ২৩ বছরের অপেক্ষার পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জয় এবার ইতিহাসের পাতায় সত্যিই লেখা হলো, “বাংলাদেশ জিতেছে।”