অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি ১০ জনের একজনের মৃত্যুর কারণ ডিমেনশিয়া

অস্ট্রেলিয়ায় মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে ডিমেনশিয়া আবারও শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। দেশটিতে ২০২৫ সালে মোট মৃত্যুর ১০ শতাংশেরও বেশি ঘটেছে এই রোগের কারণে। অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের (এবিএস) সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ায় ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৯ হাজার ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ হিসাবের মধ্যে আলঝেইমার রোগে মৃত্যুও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় এই প্রথম ডিমেনশিয়ায় মৃত্যুর হার মোট মৃত্যুর ১০ শতাংশ অতিক্রম করল। এবিএসের মৃত্যুহার পরিসংখ্যান বিভাগের প্রধান লরেন মোরান জানান, ২০২৪ সালে মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে ওঠার পর ২০২৫ সালেও ডিমেনশিয়া শীর্ষস্থানে রয়েছে। ২০০৬ সালে দেশটির মোট মৃত্যুর প্রায় ৫ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল এই রোগ। সে সময় মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে এর অবস্থান ছিল চতুর্থ।

নারীদের মৃত্যুর প্রধান কারণ ডিমেনশিয়া: পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত এক দশক ধরে অস্ট্রেলিয়ায় নারীদের মৃত্যুর প্রধান কারণ ডিমেনশিয়া। ২০২৫ সালে এ রোগে মারা যাওয়া মানুষের ৬১ দশমিক ১ শতাংশই ছিলেন নারী। ওই বছর ডিমেনশিয়ায় ১১ হাজার ৬২৮ জন নারীর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, নারীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ ইস্কেমিক হৃদ্‌রোগে মারা গেছেন ৫ হাজার ৯৬৫ জন। ইস্কেমিক হৃদ্‌রোগ এমন একটি অবস্থা, যেখানে হৃৎপিণ্ডে পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছায় না।

অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ছে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা: জনসংখ্যার বয়স কাঠামোর পরিবর্তন ডিমেনশিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জনসংখ্যাবিদ লিজ অ্যালেনের মতে, অস্ট্রেলিয়া এমন একটি সমাজে পরিণত হয়েছে, যেখানে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ভবিষ্যতে দেশটিতে জন্মের সংখ্যাকে মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়িয়ে যাওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, মানুষ এখন আগের তুলনায় দীর্ঘজীবী হচ্ছে এবং তুলনামূলকভাবে সুস্থ জীবনযাপন করছে। ফলে মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমারের মতো রোগের গুরুত্ব বাড়ছে। ডিমেনশিয়া এমন একটি অবস্থা, যা মানুষের স্মৃতিশক্তি, চিন্তাভাবনা, বিচারবোধ ও দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতাকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

মৃত্যুর অন্য প্রধান কারণগুলো কী? ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ায় মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ ছিল ইস্কেমিক হৃদ্‌রোগ। মোট মৃত্যুর প্রায় ৮ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল এই রোগ। তবে এ রোগে মৃত্যুর সংখ্যা কমে ১৯৬৮ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। মৃত্যুর প্রধান পাঁচটি কারণের তালিকায় আরও রয়েছে— মস্তিষ্কের রক্তনালি সংক্রান্ত রোগ বা সেরিব্রোভাসকুলার ডিজিজ। ফুসফুসের ক্যানসার। দীর্ঘমেয়াদি নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের রোগ।ডিমেনশিয়াসহ এই পাঁচটি রোগের কারণে অস্ট্রেলিয়ায় ২০২৫ সালের মোট মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘটেছে।

করোনাকালের পর মৃত্যুহার ফিরছে আগের ধারায়: অস্ট্রেলিয়ায় ২০২৫ সালে সামগ্রিক মৃত্যুহার কমেছে। দেশটির মৃত্যুহার এখন কোভিড-১৯ মহামারির আগের দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার কাছাকাছি ফিরে এসেছে। এবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ায় মৃত্যুর মধ্যম বয়স ছিল ৮১ দশমিক ৯ বছর। মৃত ব্যক্তিদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি ছিলেন ৭৫ বছর বা তার বেশি বয়সী। বয়সের কাঠামোর পার্থক্য সমন্বয় করে হিসাব করা মৃত্যুহার পুরুষ ও নারী—উভয় ক্ষেত্রেই কমেছে।

এবিএসের লরেন মোরান জানান, বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার কারণে ভবিষ্যতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে পারে। তবে জনসংখ্যার আকার ও বয়সের কাঠামো বিবেচনায় নিলে মৃত্যুহার কমার প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারি সাময়িকভাবে এই দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতায় ব্যাঘাত ঘটিয়েছিল। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, অস্ট্রেলিয়ার মৃত্যুহার আবার আগের ধারায় ফিরছে। তবে আদিবাসী ও টরেস স্ট্রেইট আইল্যান্ডার জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল ইস্কেমিক হৃদ্‌রোগ। ২০২৫ সালে এই জনগোষ্ঠীর বয়স-সমন্বিত মৃত্যুহার আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে।

আত্মহত্যায় মৃত্যু কিছুটা কমলেও উদ্বেগ রয়ে গেছে: ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ায় আত্মহত্যায় ৩ হাজার ২৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এ সংখ্যা সামান্য কম। মৃত ব্যক্তিদের ৭৩ দশমিক ৯ শতাংশই ছিলেন পুরুষ। আত্মহত্যায় মৃত ব্যক্তিদের মধ্যম বয়স ছিল ৪৫ বছর। পুরুষ ও নারী—উভয়ের ক্ষেত্রেই অকালমৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে আত্মহত্যা রয়ে গেছে। তবে পুরুষদের আত্মহত্যার হার ২০১৬ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। অন্যদিকে, আদিবাসী ও টরেস স্ট্রেইট আইল্যান্ডার জনগোষ্ঠীর মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা বেড়েছে। ২০২৫ সালে এ জনগোষ্ঠীর ৩২০ জনের আত্মহত্যার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে, যা এবিএসের সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান সিরিজে সর্বোচ্চ। বিশেষ করে আদিবাসী নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে এসব পরিসংখ্যান প্রাথমিক পর্যায়ের; তদন্ত শেষ হলে সংখ্যায় পরিবর্তন আসতে পারে।সুইসাইড প্রিভেনশন অস্ট্রেলিয়ার ক্রিস স্টোন বলেন, পুরুষদের আত্মহত্যার হার কমার বিষয়টি আশাব্যঞ্জক হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতির আরও উন্নতি প্রয়োজন। আত্মহত্যার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে।

মাদকজনিত মৃত্যুও বেড়েছে: অস্ট্রেলিয়ায় ২০২৫ সালে মাদকজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ৬৩ হয়েছে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৭। মাদকজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে মধ্যম বয়স ছিল ৪৮ দশমিক ২ বছর। ১৯৯৯ সালে এ ধরনের মৃত্যুহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর সময় মৃত ব্যক্তিদের মধ্যম বয়স ছিল ৩৩ দশমিক ৮ বছর। ওপিওয়েড ও বেনজোডায়াজেপিন শ্রেণির ওষুধ মাদকজনিত মৃত্যুর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িত থাকলেও উত্তেজক মাদকের কারণে মৃত্যুও বেড়েছে। ২০২৫ সালে মেথামফেটামিনসহ বিভিন্ন উত্তেজক মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৭৭৯টি মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২১ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫০৪।

সূত্র: ABC News এবং অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (ABS), ২৭ অক্টোবর ২০২৬।

ছবি: ইন্টারনেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *