রাবাতের ইতিহাস ও সভ্যতার জাদুঘর থেকে আস-সুন্নাহ মসজিদ হাঁটাপথে মিনিট পাঁচেকের দূরত্ব। ধীর, শান্ত পায়ে চারপাশ দেখতে দেখতে হাঁটছিলাম। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি চিরসবুজ গাছ, ঘন পাতায় ঢাকা ডালপালা। ঢাকা কিংবা কলকাতার মতো ধুলোর আস্তরণ নেই।
হঠাৎ কানে ভেসে এল ঘুঘুর ডাক। মুহূর্তেই মনটা ভরে গেল। স্মৃতির দরজা খুলে ফিরে গেলাম প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের শৈশবে।
১৯৭৬ সাল। আমার বয়স তখন পাঁচ/ছয় বছর। আমরা থাকি ঢাকার গুলবাগে। একদিন আব্বা টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা থেকে বাঁশের ছোট্ট একটি খাঁচায় করে একটি ঘুঘু নিয়ে এলেন। কী অপরূপ সুন্দর পাখি! নরম ধূসর-বাদামি পালক। গলার পেছনে কালোর ওপর সাদা সাদা ছোট্ট ফোঁটা। প্রকৃতি যেন নিজের হাতে মুক্তোর মালা পরিয়ে দিয়েছে।
আমার আনন্দ আর ধরে না! সারাক্ষণ ঘুঘুটির পাশে ঘুরঘুর করি। এমনকি গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলেও খাঁচার ফাঁক দিয়ে ছোট্ট আঙুল ঢুকিয়ে ওকে আদর করি।
কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। এক সকালে ঘুঘুটিকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেল। মৃত্যু কী, তা বোঝার বয়স তখনো হয়নি। জীবনে সেই প্রথমবার শোকের সঙ্গে পরিচয় হলো। ছোট্ট ঘুঘুটির মৃত্যু আমার শিশুমনে গভীর দাগ কেটেছিল। সেই থেকে ঘুঘু আমার প্রিয় পাখি।
ছোটবেলায় ঢাকায়, বরিশালে, সারা বাংলাদেশে প্রচুর ঘুঘু ছিল। কিছু নিষ্ঠুর মানুষ ফাঁদ পেতে মাংসের জন্য ঘুঘু ধরত। খুব রাগ হতো, কষ্ট পেতাম। ছোট মানুষ। প্রতিবাদ করার সামর্থ্য ছিল না। একসময় ঘুঘুরা হারিয়েই যেতে শুরু করল। সেই বহুল প্রচলিত বাগধারাটির মতো। ঘুঘুর ভিটাতেই ঘুঘু চরল!
বরিশালে আমার চাচাতো ভাই হেমায়েত মোল্লাকে ফোন করলে প্রায়ই একটি প্রশ্ন করি, ‘বড়দা, ঘুঘু দেখা যায়?’ বড়দার কথা শুনে মনে হয়, ঘুঘুর সংখ্যা ইদানীং কিছুটা বেড়েছে। ঘুঘুরা বেঁচে থাকুক, ওদের মধুর ডাকের সুর পৃথিবীকে মুগ্ধ করে চলুক, এই প্রার্থনা সব সময় করি।
এসব ভাবতে ভাবতেই পৌঁছে গেলাম আস-সুন্নাহ মসজিদের বাঁ পাশের প্রবেশদ্বারে। ছোট্ট একটি সাইনবোর্ডে লেখা “Non-Muslims are not allowed.”
ভারী কাঠের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই বেশ লম্বা-চওড়া, ভাবলেশহীন এক রক্ষী প্রশ্ন করলেন: ‘Muslim?’
মুখে কোনো জবাব না দিয়ে পকেট থেকে নামাজের টুপিটি বের করে মাথায় চাপালাম। তারপর ডান হাত কপালে তুলে লম্বা করে সালাম ঠুকলাম। “আসসালামু আলাইকুম!” ব্যস! ধর্মীয় পরিচয়ের পরীক্ষা শেষ। ভদ্রলোক আর কোনো প্রশ্ন করলেন না।
খুব রাগ হলো। উপাসনালয়ে প্রবেশ করতে ধর্মীয় পরিচয় দিতে হবে কেন? সৃষ্টিকর্তার ঘরে কি সবার প্রবেশাধিকার থাকা উচিত নয়? অবশ্য ভাগ্য ভালো এখানে কেবল একটি টুপি আর একটি সালামেই আমার ধর্মীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল! একাত্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়, পাকিস্তানি হানাদাররা মানুষের ধর্মীয় পরিচয় যাচাই করতে কী না ন্যক্কারজনক পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছিল! লুঙ্গি খুলে মানুষকে প্রমাণ দিতে হতো তার পরিচয়। ধর্মের নামে মানুষের প্রতি মানুষের কী ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা!
খুব রাগ হলো। উপাসনালয়ে প্রবেশ করতে ধর্মীয় পরিচয় দিতে হবে কেন? সৃষ্টিকর্তার ঘরে কি সবার প্রবেশাধিকার থাকা উচিত নয়? অবশ্য ভাগ্য ভালো এখানে কেবল একটি টুপি আর একটি সালামেই আমার ধর্মীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল! একাত্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়, পাকিস্তানি হানাদাররা মানুষের ধর্মীয় পরিচয় যাচাই করতে কী না ন্যক্কারজনক পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছিল! লুঙ্গি খুলে মানুষকে প্রমাণ দিতে হতো তার পরিচয়। ধর্মের নামে মানুষের প্রতি মানুষের কী ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা!

ঘড়িতে তখন বিকেল সোয়া পাঁচটা। মসজিদের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল এক অপূর্ব সপ্তভুজাকৃতির অজুখানা। সবুজ, সাদা আর কালো রঙের ছোট ছোট মোজাইক টাইলস দিয়ে সাজানো এর চারপাশ। স্বচ্ছ পানির জলাধারের মাঝখানে শ্বেতপাথরের একটি ছোট্ট ফোয়ারা। অপূর্ব কারুকার্যময় চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে সুদৃশ্য কাঠের ছাউনি। মাঝখানে ঝুলছে মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী নকশার একটি সাদা কাঁচের বাতি। ছাউনির প্রতিটি অংশে অসাধারণ সূক্ষ্ম খোদাই। ছাদের নিচের অংশে কাঠের ওপর আঁকা লতাপাতা, ফুল আর জ্যামিতিক নকশার এক নিখুঁত শিল্পকর্ম। কত ধৈর্য, দক্ষতা আর শিল্পবোধ থাকলে প্রায় আড়াইশ বছর আগে কাঠের ওপর এমন সূক্ষ্ম কারুকাজ ফুটিয়ে তোলা সম্ভব!
অজুখানা পেরিয়ে প্রশস্ত, নীরব এবং রাজসিক বিশাল খোলা চত্বর। চারদিকে সাদা রঙের ভবন, সবুজ টালির ছাদ আর সারি সারি খিলানাকৃতির দরজা-জানালা। চত্বরের মেঝেজুড়ে সাদা পাথরের ওপর সবুজ, কালো ও ধূসর মোজাইকের সূক্ষ্ম জ্যামিতিক নকশা; কোথাও চতুর্ভুজ, হীরকাকৃতি, কোথাও ফুলের নকশা।
এক কোণায় নীল আকাশ আর সাদা মেঘের পটভূমিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে হালকা বাদামি রঙের পাথরের চারকোনা সুউচ্চ রাজকীয় মিনার। বিভিন্ন উচ্চতায় ছোট ছোট জানালা, ওপরের অংশজুড়ে সূক্ষ্ম জ্যামিতিক ও ফুলেল কারুকাজ।
আস-সুন্নাহ মসজিদটি সুলতান সিদি মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ নির্মাণ করেন ১৭৮৫ সালে। পরবর্তী সময়ে মসজিদটি একাধিকবার সংস্কার করা হয়। মজার ব্যাপার হলো, ১৯৬৯ সালে রাজার নির্দেশে এর সুউচ্চ মিনারটির পাথর খুলে খুলে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে পুনর্নির্মাণ করা হয়।

মূল নামাজ ঘরের বিশাল প্রবেশদ্বার। কী অপূর্ব কারুকাজ! শিল্পীর হাতে গড়া আরেক বিশাল শিল্পকর্ম। সোনালি রঙের লতাপাতা, ফুল আর জ্যামিতিক নকশার অসাধারণ সমাহার। প্রবেশতোরণের কিনারাজুড়ে একের পর এক অর্ধবৃত্তাকার বাঁক, পাথরের গায়ে ফুটে ওঠা ফুলের পাপড়ি। গাঢ় বাদামি কাঠ ও কাঁচের বিশাল দরজায় মসজিদটির বয়সের ছাপ স্পষ্ট।
অজু করে ভেতরে বিশাল নামাজ ঘরে ঢুকতেই বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে গেল। চারদিকে গভীর নীরবতা। সারি সারি বিশাল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে অলংকৃত তোরণ। মাথার ওপরে সুউচ্চ গাঢ় বাদামি রঙের কাঠের ছাদ। যত দূর চোখ যায়, মেঝেজুড়ে বিছানো নকশা অঙ্কিত লাল গালিচা। দেয়ালের নিচের অংশে নীল-সাদা মোজাইক টাইলসের সূক্ষ্ম নকশা। ওপরের অংশে সাদা প্লাস্টারের অপূর্ব কারুকাজ। ছাদ থেকে ঝুলছে বিশাল গোলাকার সোনালি ঝাড়বাতি। ওপরের অংশে সারি সারি ছোট সাদা কাঁচের বাতি। এমনভাবে সাজানো যে ক্রমশ সরু হয়ে গম্বুজের মতো উঠে গেছে। নিচের দিকে ঝুলছে সোনালি অলংকরণ। যেন রাজপ্রাসাদের মূল্যবান মুকুট!
কিছুক্ষণ পর আসরের নামাজ শুরু হলো। এত বিশাল নামাজ ঘর, অথচ মুসল্লির সংখ্যা হাতে গোনা। মাত্র একটি সারিই পূর্ণ হলো। হাসান দ্বিতীয় মসজিদের মতো এখানেও ইমাম সাহেব একবারই সালাম ফেরালেন। শুধু ডান দিকে।
নামাজ শেষে বেরোতেই সামনে এগিয়ে এলো সেই দ্বাররক্ষী। একটু ভড়কে গেলাম। ছবি তুলছিলাম বলে বকাঝকা করবে নাকি! কিন্তু না, প্রস্তাব দিলো, আমার ছবি তুলে দিতে চায়। নিজের ওপর একটু অনুতাপ হলো। লোকটি সম্পর্কে আমি কী ভেবেছিলাম, অথচ মানুষটি আসলে তেমন নয়। দায়িত্ব পালনের স্বার্থেই হয়তো তাকে একটু কঠোর ভাব দেখাতে হয়।
আমাকে মসজিদের এমন কয়েকটি জায়গায় নিয়ে গেলো, যেখান থেকে সুন্দর ছবি উঠবে। মানুষটির আন্তরিকতায় মন ভরে গেল। বিদায়ের সময় কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তার হাতে বিশ দিরহামের একটি নোট গুঁজে দিলাম। কিছুতেই নিতে চাইলো না। নিজের ভাষায় বারবার বোঝানোর চেষ্টা করলো, টাকার জন্য সে আমার ছবি তুলে দেয়নি। অনেক অনুরোধের পর আরবিতে আমার জানা একটি বাক্য বললাম, ‘আন্তা আখি’, অর্থাৎ, ‘তুমি আমার ভাই।’ মুহূর্তেই তার মুখে ফুটে উঠল এক মিষ্টি হাসি। শেষ পর্যন্ত টাকাটা নিলো আমার সেই নাম না জানা ভাই। মধুরেণ সমাপয়েত!
ভাই! আহা, কী মধুর এক সম্পর্ক! কখনো কখনো আপন ভাইয়ের মধ্যেও আন্তরিকতা খুঁজে পাওয়া যায় না, অথচ পৃথিবীর পথে চলতে চলতে কত অচেনা মানুষকেই না ভাই হিসেবে পেয়ে যাই!

আস-সুন্নাহ মসজিদ থেকে কিছুটা হাঁটতেই চোখে পড়ল বিশাল এক প্রবেশদ্বার—‘বাব আস-সুফারা’। এর ওপারেই ‘দার আল-মাখজেন’, মরক্কোর রাজার সরকারি প্রাসাদ ও রাজকীয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। হালকা বাদামি রঙের পাথরে তৈরি বিশাল তোরণ। মাথার ওপর পতপত করে উড়ছে মরক্কোর লাল পতাকা। পাশাপাশি দুটি সুউচ্চ খিলানাকৃতির ফটক, মাঝখানে অপেক্ষাকৃত ছোট একটি প্রবেশপথ। দুই পাশে উঁচু প্রাচীর। সামনে খেজুরগাছ আর সবুজ ঘাসে সাজানো পরিচ্ছন্ন চত্বর। ফটকের ওপারে একটি দীর্ঘ, প্রশস্ত রাস্তা চলে গেছে অনেক ভেতরে। দুই পাশে সারি সারি ঘন সবুজ গাছ। প্রাসাদের মূল ভবনের কিছুই এখান থেকে দেখা যায় না।

ফটকের সামনে কড়া নিরাপত্তা। অস্ত্রধারী প্রহরীরা পায়চারি করছে। আরও কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী। সাধারণ মানুষের সেখানে প্রবেশাধিকার নেই। একটু পরপর দামি দামি গাড়ি এসে থামছে। তল্লাশি শেষে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। রাজা হওয়ার অসুবিধাও কম নয়। চারদিকে এত নিরাপত্তা, এত প্রহরা!
সাবধানতাবশত একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে ইশারায় জিজ্ঞেস করলাম, বাইরে থেকে ছবি তোলা যাবে কি না। মাথা নেড়ে সম্মতি দিলে, কয়েকটি ছবি তুলে সামনে পা বাড়ালাম।
আরেকটু এগোতেই চোখে পড়ল রাবাতের প্রাচীন নগরপ্রাচীরের বিশাল ও সুদৃশ্য প্রবেশদ্বার— ‘বাব রুয়াহ’। লালচে-বাদামি রঙের সুউচ্চ প্রাচীর। আলমোহাদ শাসক ইয়াকুব আল-মনসুরের আমলে ১১৯৭ সালে স্থাপনাটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। প্রায় বারো মিটার উঁচু এবং আটাশ মিটার চওড়া প্রবেশদ্বারটির দুই পাশে দুর্গের মতো বিশাল চতুষ্কোণ প্রাচীর। তোরণগুলোর নিচ দিয়ে চলে গেছে ব্যস্ত রাস্তা।
ডান পাশে প্রাচীন প্রহরীকক্ষগুলোর কারুকার্যময় বিশাল প্রবেশদ্বার। মাঝখানে গাঢ় কালচে রঙের দরজা। সামনে কয়েক ধাপ পাথরের সিঁড়ি। দুই পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দুটি খেজুরগাছ। প্রবেশ পথের পাশে লেখা ‘Galerie Bab Rouah’। একসময় শত্রুর আক্রমণ ঠেকাতে নির্মিত হয়েছিল এই বিশাল নগরপ্রাচীর। কালের বিবর্তনে প্রাচীন প্রহরীকক্ষগুলো এখন শিল্পকলা প্রদর্শনীর স্থান! ইতিহাসের কী বিচিত্র পরিক্রমা!

বিকেল প্রায় সাড়ে ছটা। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। ধীর পায়ে পুরোনো মদিনার দিকে ফিরতে শুরু করলাম। পথ সেই অভিজাত মোহাম্মদ পঞ্চম অ্যাভিনিউ ধরে। আবারও চোখে পড়ল কেন্দ্রীয় ডাকঘর ‘গ্রঁদ পোস্ট’-এর রাজকীয় ভবন, মরক্কোর পার্লামেন্ট এবং ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত সুদৃশ্য সব ভবন। রাস্তা তেমন ব্যস্ত নয়। বেশ শান্ত, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ।

মরক্কোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ব্যাংক আল-মাগরিব’-এর কাছাকাছি এসে জেদ্দা সড়কের বাঁ পাশে চোখে পড়ল সারি সারি অভিজাত ক্যাফে। সামনে খোলা জায়গায় সাজানো চেয়ার-টেবিল। ডান পাশে সবুজ গাছপালা ভরা পার্কের মতো সুন্দর একটি চত্বর। সুন্দর, নিরুদ্বেগ পরিবেশ! ছুটির দিনের মিষ্টি বিকেলে ক্যাফেগুলোতে জমে উঠেছে আড্ডা। কেউ পরিবারের সঙ্গে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে মশগুল। একেক জন কফির কাপে ঝড় তুলছে। আনন্দে সময় কাটাচ্ছে।
একবার ইচ্ছে হলো, কোনো একটি ক্যাফেতে বসে এক কাপ কফি খাই। সঙ্গে মরক্কোর কোনো মিষ্টান্ন। নাহ্, একা একা বসে ভালো লাগবে না!
সংগীবিহীন ভ্রমণের অনেক সুবিধা। নিজের ইচ্ছেমতো ঘোরা যায়। কারও জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। সময়েরও বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু এই স্বাধীনতার মধ্যে কখনো কখনো অসহনীয় একাকিত্ব এসে ভর করে। বিশেষ করে এমন সুন্দর বিকেলে। যখন চোখে পড়ে চারদিকে মানুষ আপনজনদের সঙ্গে আনন্দে মেতে আছে।
আমাদের আদরের বিড়াল ভুন্টুকে ঘরে আনার পর গত সাত বছরে আমি আর আমার সহধর্মিণী সোহাগ একসঙ্গে কোথাও যাইনি। ২০১৯ সালের এপ্রিলে শেষবার আমরা একসঙ্গে ক্যানবেরায় গিয়েছিলাম। অস্ট্রেলিয়ান ডিফেন্স ফোর্স একাডেমিতে আমাদের ছেলে আমানকে দেখতে।
সেবার তিন দিনের জন্য ভুন্টুকে রেখে গিয়েছিলাম অ্যাডিলেড বিমানবন্দরের কাছে পোষা প্রাণীদের জন্য একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল হোটেলে। প্রায় পাঁচতারা মানের ব্যবস্থা! ফিরে এসে প্লেন থেকে নেমেই ওকে আনতে গেলাম। রিসেপশনিস্ট বলল, ‘She is not suited to staying in a pet hostel.’ জানাল, ভুন্টু তিন দিন ধরে কিছুই খায়নি। ওর সব সময় একজন অভিভাবক প্রয়োজন।
ভুন্টু শুধু ভেজা খাবার খায়। আলাদা করে কখনো পানি পান করে না। যদিও প্রতিদিনই ওর জন্য এক বাটি পরিষ্কার পানি রাখা হয়। অথচ সেদিন বাড়িতে ফিরেই ভুন্টু সোজা পানির বাটির কাছে গেল। একনিশ্বাসে পুরো বাটির পানি খেয়ে ফেলল! ওই একদিনই আমরা ওকে পানি খেতে দেখেছিলাম।
সেদিনই সোহাগ সিদ্ধান্ত নিল, ভুন্টুকে আর কখনো বাড়ির বাইরে কোথাও রাখা হবে না। প্রয়োজনে আমরা যার যার মতো ভ্রমণ করব।
সেই থেকে আমি একাই ঘুরে বেড়াচ্ছি। কখনো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, কখনো অস্ট্রেলিয়ার বড় বড় শহরে। কতবার সোহাগকে বলেছি, ‘তুমিও চলো না!’ সোহাগের একটাই উত্তর, ‘প্রশ্নই ওঠে না। ভুন্টুকে রেখে কোথাও যাব না।’
ভাবা যায়! মাত্র সাড়ে পাঁচ কেজি ওজনের একটি ছোট্ট প্রাণীর জন্য কত বড় ত্যাগ! অথচ এই নিয়ে সোহাগের কোনো অভিযোগ নেই, কোনো আক্ষেপ নেই, গর্বও নেই। আছে শুধু গভীর মমতা, দায়িত্ববোধ আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
ভালোবাসা বোধ হয় এমনই। সব সময় বড় বড় কথায় কিংবা আবেগঘন প্রকাশে তার পরিচয় পাওয়া যায় না। কখনো কখনো নিজের অনেক ইচ্ছাকে বিসর্জন দিয়ে একজন সন্তানের, একজন প্রিয় মানুষের কিংবা একটি অসহায় প্রাণীর নিরাপত্তা আর স্বস্তিকে নিজের আনন্দের চেয়েও বড় করে দেখার মধ্যেই ভালোবাসার প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।
ভালোবাসা বোধ হয় এমনই। সব সময় বড় বড় কথায় কিংবা আবেগঘন প্রকাশে তার পরিচয় পাওয়া যায় না। কখনো কখনো নিজের অনেক ইচ্ছাকে বিসর্জন দিয়ে একজন সন্তানের, একজন প্রিয় মানুষের কিংবা একটি অসহায় প্রাণীর নিরাপত্তা আর স্বস্তিকে নিজের আনন্দের চেয়েও বড় করে দেখার মধ্যেই ভালোবাসার প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।
রাবাতের সেই সুন্দর বিকেলে একা হাঁটতে হাঁটতে উপলব্ধি করলাম, পৃথিবী দেখার আনন্দ যেমন অপরিসীম, তেমনি আপনজনের সঙ্গে সেই আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সুখও অতুলনীয়।
আহা, সোহাগ যদি আজ থাকত আমার পাশে!