অস্ট্রেলিয়ায় ডেঙ্গুর টিকা, বাংলাদেশগামী প্রবাসীদের সতর্কতা

অস্ট্রেলিয়ায় ডেঙ্গু জ্বরের টিকা এখন সাধারণ চিকিৎসকের (জিপি) মাধ্যমে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে অস্ট্রেলীয়দের জনপ্রিয় কয়েকটি পর্যটন গন্তব্যে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায় ভ্রমণকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষ করে বালি, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারত, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছুটি কাটাতে যাওয়া অস্ট্রেলীয়দের জন্য ডেঙ্গুর ঝুঁকি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটির অনেক মানুষও প্রতিবছর এসব দেশে এবং নিজ নিজ দেশে ভ্রমণ করেন। ফলে ভ্রমণের আগে ডেঙ্গুর ঝুঁকি ও টিকার বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার গুরুত্ব বাড়ছে।

অস্ট্রেলিয়ায় ডেঙ্গুর জন্য ব্যবহৃত Qdenga নামের টিকা এখন পাওয়া যাচ্ছে। দেশটির Therapeutic Goods Administration (TGA) চার বছর বা তার বেশি বয়সী শিশু, কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য টিকাটি অনুমোদন করেছে।

টিকাটি সাধারণত দুই ডোজে দেওয়া হয়। প্রথম ডোজের প্রায় তিন মাস পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তবে বিদেশ ভ্রমণকারী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য টিকা নেওয়া প্রয়োজন—এমন নয়। ভ্রমণের গন্তব্য, কত দিন সেখানে থাকবেন, ডেঙ্গুতে আগে আক্রান্ত হয়েছেন কি না এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকায় দীর্ঘ সময় অবস্থানকারী বা নিয়মিত ওই সব দেশে যাতায়াতকারী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে টিকার বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

ডেঙ্গু বিশ্বের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপগ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের একটি পরিচিত মশাবাহিত রোগ। অস্ট্রেলীয়দের জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যগুলোর অনেকগুলোতেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারত, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ফিজির মতো দেশ।

ডেঙ্গুর ঝুঁকি শুধু প্রত্যন্ত গ্রাম বা জঙ্গল এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। শহর, পর্যটনকেন্দ্র এবং আবাসিক এলাকাতেও ডেঙ্গু ছড়ানো মশা থাকতে পারে। ফলে বিলাসবহুল রিসোর্ট বা শহরের হোটেলে অবস্থান করলেও ভ্রমণকারীরা পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত থাকেন না।

অস্ট্রেলিয়া থেকে বালি বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছুটিতে যাওয়া পরিবারগুলোর জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে বাংলাদেশে পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও ডেঙ্গুর ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।

ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়ায় মূলত Aedes প্রজাতির মশার মাধ্যমে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানোর পর ওই মশা অন্য ব্যক্তিকে কামড়ালে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই মশার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এটি দিনের বেলাতেও কামড়াতে পারে। ফলে শুধু রাতে মশারি ব্যবহার করলেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞরা ভ্রমণকারীদের দিনের বেলাতেও মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন।

শরীরের খোলা অংশে DEET, picaridin বা oil of lemon eucalyptus-যুক্ত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি লম্বা হাতার পোশাক ও লম্বা প্যান্ট পরা এবং মশার প্রবেশ ঠেকাতে জানালা-দরজায় সুরক্ষাব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তির অনেকের কোনো উপসর্গ নাও দেখা দিতে পারে। তবে সাধারণত আক্রান্ত হওয়ার কয়েক দিন পর জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং শরীরে র‍্যাশ দেখা দিতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে ডেঙ্গু গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। তখন রক্তপাত, প্রচণ্ড পেটব্যথা, বারবার বমি, দুর্বলতা বা শ্বাসকষ্টের মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে এবং হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

বিদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় ফেরার পর কারও জ্বর বা ডেঙ্গুর মতো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসককে সাম্প্রতিক ভ্রমণের তথ্য জানানো গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর টিকা সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করলেও মশার কামড় এড়িয়ে চলা এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ ভ্রমণকারীর গন্তব্যে ডেঙ্গুর সংক্রমণ কতটা সক্রিয়, ব্যক্তির পূর্ববর্তী ডেঙ্গু সংক্রমণের ইতিহাস এবং অন্যান্য বিষয় টিকার কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তার সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই বিদেশ ভ্রমণের আগে জিপি বা ট্রাভেল-হেলথ ক্লিনিকে পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাদের দীর্ঘমেয়াদি কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ভ্রমণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ।

অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেকেই প্রতিবছর দীর্ঘ ছুটিতে বাংলাদেশে যান। ঈদ, শীতের ছুটি কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাংলাদেশে যাওয়ার সময় অনেক পরিবার কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস অবস্থান করে।

এ কারণে বাংলাদেশগামী অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসীদেরও ডেঙ্গু নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

ভ্রমণের আগে টিকা প্রয়োজন কি না, তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করার পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থানের সময় মশার কামড় এড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। ঘরের ভেতরে ও বাইরে জমে থাকা পানি অপসারণ, মশারি ব্যবহার এবং নিয়মিত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।

ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। আক্রান্ত হলে সাধারণত বিশ্রাম ও পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়। জ্বর ও ব্যথার জন্য কোন ওষুধ নিরাপদ, সে বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ডেঙ্গু সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো কিছু ব্যথানাশক না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শ হলো—বিদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা করার সময় শুধু বিমান টিকিট ও থাকার ব্যবস্থা নয়, গন্তব্যের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

বিশেষ করে ডেঙ্গুপ্রবণ দেশে যাওয়ার আগে ভ্রমণকারীর বয়স, স্বাস্থ্য, পূর্ববর্তী ডেঙ্গু সংক্রমণের ইতিহাস এবং ভ্রমণের সময়কাল বিবেচনা করে টিকার প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা যেতে পারে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও বার্তাটি গুরুত্বপূর্ণ: ডেঙ্গুপ্রবণ দেশে যাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, প্রয়োজন হলে টিকা নিন এবং ভ্রমণের পুরো সময় মশার কামড় এড়িয়ে চলুন।

কারণ ছুটি কাটাতে গিয়ে কয়েক দিনের অসতর্কতাই কখনো কখনো দীর্ঘ চিকিৎসা ও হাসপাতালে ভর্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে।