রুপালী পর্দার নায়ক – নায়িকা এবং স্বপ্নের ভোকস ওয়াগন বিটল্

আশির দশকের মধ্যভাগে ঢাকা শহরে আসার পর পরিচিত সবার সঙ্গে ইনিয়ে বিনিয়ে জানতে চেষ্টা করি কিভাবে এফডিসিতে ঢুকে শুটিং দেখা যায়। ঢাকা আসার পূর্বেই এ পরযন্ত মুক্তি পাওয়া সব বাংলা সিনেমা দেখা একটাও বাকী ছিলো না। আর সেই সংগে সিনেমার প্রতিটি গানের শিল্পী ও সুরমেলানো নায়ক নায়িকার নাম সবই মুখস্থ। কেউ কেউ বললো নিউমার্কেট বা এলিফ্যান্ট রোডের শপিং মলগুলোতে নাকি কোন কোন সময় শুটিং হয়। তাই এফডিসিতে ঢোকার ব্যর্থ চেষ্টা না করে নিউমার্কেট, গাওসিয়া, নিউ এলিফ্যান্ট রোডে ঘুরতে শুরু করলাম এবং একদিন তা পেয়েও গেলাম। নিউ এলিফ্যান্ট রোডের পপি বা লোপা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে বিজ্ঞাপনের সুটিং চলছে। মুখে, ঘাড়ে, হাতে কয়েক মিলি পুরু মেক-আপ নেয়া মডেল মেয়েটির কোন শর্ট ই কাজী জহিরের মনপুত হচ্ছে না। ফিটিং রুমে গিয়ে মেকআপ ঠিক করে এসে আবার টেক কিন্তু কাজী জহিরের না। কাজী জহির কে আমি চিনতাম না কিন্তু কমেডিয়ান হাসমত জহির ভাই জহির ভাই বলাতে নিজেকে প্রশ্ন করলাম এত বড় ডিরেক্টর কেন বিজ্ঞাপনের শুটিং এ।

আমার গ্রামের বার বার ইন্টার ফেল এক বড় ভাই সৌদি যাওয়ার চেষ্টায় বাংলামটরে খালুর হোটেল সংলগ্ন মেসে থাকে এবং উনি আমাকে শাবানা- ববিতার শুটিং দেখার ১০০% নিশ্চিয়তা দিয়ে সাভারের নবীনগরে নিয়ে গেলেন। নবীনগর এমনকি ধামরাই এ নদীর পাড় ঘুরে ঘুরে শুটিং এর কোন হদিস করতে না পেয়ে বিকালের দিকে ঢাকা ফিরে আসলাম। ভাগগ্যিস সকালে খালুর হোটেলে তৈলাক্ত পরাটা, ডিম ভাজি আর গোলাপ জল মিশান সুজির হালুয়া দিয়ে পেট পুরে নিয়েছিলাম।

নিউ এলিফ্যান্ট রোডের একতলা শপিং মলগুলো ছিলো ইউ সেপ বা টি সেপ গলির মধ্যে আর প্রায় সব দোকানেই বিটিভি চলতে থাকতো। একদিন সন্ধায় ইউ সেপের এক গলির মধ্যে আশ্চর্য হলাম, এসব দিন রাএি এত তাড়াতাড়ি শুরু হলো কেমনে? মিস করলাম ভাবতে ভাবতে দেখি কপালে বিশাল টিপ পরিহিত নায়িকা লুৎফুননাহার লতা তার সঙ্গের ভদ্রলোককে উচ্চসরে নাটকীয় গলায় ঝাড়ি মারছে!

পাবলিক প্লেসে বউ বা পার্টনারের ঝাড়ি খাওয়া শুধুই বিড়ম্বনার নয় বরং আনন্দদায়কও বটে। এডিলেডে পদার্পণের প্রায় এক বছর পরে আমার মিসেস এক সন্ধায় TAFE সিটি ক্যাম্পাসের করিডোরে তার বেশ পরিচিত রোকেয়া হলের এক বান্ধবীর ঝাড়ির কন্ঠ শুনতে পেয়ে বিল্ডিংয়ের ভিতরের এ করিডোর ও করিডোর খুঁজতে খুঁজতে দুই বান্ধবী একে অপরের নাম ধরে চিৎকার আর গলা ধরে জড়াজড়ি। পত্নীর আচরণের বিড়ম্বনা উবে গিয়ে পিএইচডি রত বেচারা প্রফেসর স্বামী তখন কতটা নাই খুশি ছিলেন।

ফিরে আসি আমার সেই ঢাকা এসে নায়ক নায়িকা দর্শন চেষ্টার গল্পে। একদিন দুপুরে টিএসসির কান্টিনে নামমাত্র মুল্যের নামমাত্র মুরগী – পোলাও খেয়ে রাস্তার ধারে টং দোকানে দঁড়ির আগুনে সিগারেট ধরাচ্ছি এমন সময় আমার সামনে চারজনের আরোহী নিয়ে এক রিক্সা দাঁড়ালো। কেন জানি রিকশা আরোহীর চারজনকেই নেশায় বুদ হয়ে আছে মনে হলো যার মধ্যে একজন বিটিভর প্রথম দিকের সিরিয়ালের ” মাখনা” খ্যাত আর্টিসট। চারজনের দুজন টিএসসি তে নেমে যাওয়ার পরও রিকশা যাচ্ছে না দেখে মাখনা বললো ” আবে যা না”। সেই থেকে বাক্যটি আমার খুব প্রিয়। এখনও সিগন্যালে দাঁড়িয়ে সামনের গাড়ি দেরি করলে বলি “আবে যা না”। হলে উপগেষ্ট থাকাকালীন নাটোরের আবদুলপুরের সুমন ভাই এর সঙ্গে পরিচয় হলো যিনি আমার পাশের রুমে গেষ্ট হিসাবে থাকেন। জীবিকার অন্বেষনে ঢাকা এসে উনি এফডিসিতে সহকারী এডিটর হিসেবে কাজ করেন কিন্তু ছবি মুক্তি না পেলে উনার পেমেন্ট হয় না। হঠাৎ একদিন বিকালে সুমন ভাই বললো,’ সেন্সর বোর্ডে পাঠানোর আগে আজকে আমার দুলারী ছবির ট্রায়াল প্রদর্শনী হবে, তুমি আমার সঙ্গে যাবা’।এফডিসিতে ডুকতে পারবো ভেবে খুশি হলাম কিন্তু না, এটা হবে টিকাটুলির রোজ গার্ডেন খ্যাত হুমায়ুন মিয়ার বাড়িতে যা এখন এফডিসির কাছে বরাদ্দকৃৃত সরকারি সম্পত্তি। উপর তলায় বলরুম বা বাইজী রুমে প্রদর্শনীর আয়োজন। নিচে স্টুডিওর সামনে এক নতুন মডেলের গাড়ি এসে থামলো এবং গাড়ির কালারের সাথে ম্যাচ করা সাদা শার্ট, সাদা প্যান্ট, সাদা কেডস পরিহিত নায়ক মাহমুদ কলি গাড়ি থেকে নেমে সম্ভবত শিশিরের হাত থেকে গাড়ীকে রক্ষার জন্য ছাই রংগের কাভারস্ক্রিন দিয়ে গাড়ি ঢেকে স্টুডিওতে ঢুকে পড়লেন। সুমন ভাই বললো, ‘ কলি বিদেশ থেকে সাত লাখ টাকা দিয়ে গাড়ি কিনেছে’।এদিকে বলরুমের প্রদর্শনীতে অনেক দর্শক দেখে দুলারীর ডিরেক্টর বিরক্ত। সুমন ভাই চোখের ইশারায় বুঝালেন, নো ওরিজ। প্রদর্শনীর মাঝে ডিরেক্টর তার ভারিক্কি গলায়, সুমন কই, সাপের মাথা তো নায়িকার মুখে ঠিক মত বসে নাই। সুমন ভাই জি জি জি ভংগী তে সে এটা ঠিক করে দিবে। সুমন ভাইয়ের সাথে আড্ডায় সিনেমা পাড়ার গল্পের বেশির ভাগই নায়ক নায়িকাদের গাড়ির মডেল, গাড়ির প্রতি তাদের ভালোবাসা আর যত্নের গল্প শুনি। সিনেমার এক হ্যান্ডসাম হিরো খুব বেশি দামী গাড়ি কিনেছেন যা তিনি নিজেই ড্রাইভ করেন কিন্তু ১২/১৩ বছরের এক কাজের ছেলে সংগে রাখেন। হ্যান্ডসাম হিরো গাড়ি লক করে চলে যাওয়ার পর ছেলেটির দায়িত্ব গাড়ি পাহারা দেয়ার যাতে কেও গাড়ি টাচ পরযনত করতে না পারে। হিরো এক রাএে ডিনারের জমকালো পার্টিতে আর বাইরে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রামের এক অসহায় কিশোর হিরোর গাড়ির পাহারায়। দীর্ঘ বৃষ্টিতে ভিজে কিশোর ছেলেটি কাঁপতে শুরু করলো কিন্তু গাড়ির পাহারা ছেড়ে কোথাও আশ্রয় নিলো না।পরের দিন ছেলে টা এত অসুস্থ হয়ে পড়লো যে হিরো তাকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিলো।কিছুদিন পরের দুঃসংবাদ, কিশোরগঞ্জের কিশোর ছেলেটি আর নেই! এর প্রায় অনেক বছর পরে একুশে টিভির নিউজ, বাংলা সিনেমার এক নায়কের ১২/১৩ বছরের একমাত্র কিশোরী মেয়ে শিক্ষকের বিদ্রূপ সহ্য করতে না পেরে মানারাত স্কুলের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে মৃত্যুবরন করেছে।

আবার ফিরে আসি আমার সেই ঢাকা এসে নায়ক নায়িকা দর্শন চেষ্টার গল্পে। হলে উপগেষ্ট থাকাকালীন আমার স্কুল জীবনের এক দোস্ত হাজির এবং আমাকে দেখে সে মহাখুশি। তার বড় ভাই পাবনার বেড়া থানায় পোস্টিংরত একজন সাব ইন্সপেক্টর বা দারোগা। সে বেড়া থেকে এখানে এসেছে এবং তার দারোগা ভাই তার হাতে একটা গোপন চিঠি দিয়েছে যা তাকে রমনা থানায় কর্মরত তার ভাইয়ের এক ব্যাচমেট দারোগাকে পোঁছে দিতে হবে। দুই দোস্ত হলের গেইট থেকে রিকশা নিয়ে রমনা থানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম এবং পথিমধ্যে দোস্ত তার দারোগা ভাইয়ের বীরত্বের গল্প শোনাতে শুরু করলো। জানিষ মতি, নগরবাড়ি ঘাটে অপেক্ষমান উত্তর বংগের নাইট কোচের মহিলা যাএীরা হাঁটা হাঁটির জন্য কোচ থেকে নামলে পাবনার বখাটে ছেলেরা মেয়েদের গায়ে হাত দিতো। একদিন ডালু ভাই নগরবাড়ি ঘাটে গিয়ে বখাটেদের সেই রকম উরাধুরা পিটুনি। তারপর থেকে বখাটেরা নগরবাড়ি ঘাটের দিকে আর পা বাড়ায় না।৷ রমনা থানায় পোঁছে দেখা গেলো বাম হাতে ব্যান্ডেজ জড়ানো ডিউটি অফিসারই ডালু ভাইয়ের ব্যাচমেট। উনি আমাদের বসতে বলে চায়ের অর্ডার দিলেন। আমাদের পাশেই বসে আছে বাংলা সিনেমার এক নায়িকা যিনি ডিউটি অফিসারকে আজ রাতে ডিনারের ইনভাইট করতে এসেছেন। হাতে ব্যান্ডেজের অজুহাতে দারোগার না করতেই নায়িকা দাবি নিয়ে বললো, ‘ আপনি আজ রাতে ডিনারের জন্য না গেলে কাল এসে আপনার ডান হাতটাও ভেঙে দিবো। নায়িকা দারোগাকে আরো কিছু গল্প শোনালো, গত রাতের আগের রাতে সে আর নায়িকা অনজু ঘোষ সাভার সেনানিবাসে এক ব্রিগেডিয়ারের বাসার পার্টিতে গিয়েছিলো।ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের বউ বাচ্চা সব আমেরিকায় থাকে এবং ব্রিগেডিয়ার সেখান থেকে ফিরে এসেই এ পার্টির আয়োজন করেছেন। নায়িকা অনজু ও তাকে রিগেডিয়ার অনেক বিদেশি ব্র্যান্ডের গিফট করেছেন।

নায়িকা দর্শনের সাধ আর আমার রইলো না তাই নীলক্ষেত আর নিউমার্কেটের বইয়ের দোকানে ঘুরাঘুরি শুরু করলাম। হঠাৎ একদিন নিউমার্কেটের আলীগড় লাইব্রেরীতে আমাদের গ্রামের প্রথম বি এ পাস ইউনুস চাচাকে দেখে শক্ পেলাম। স্মৃতিতে ভেসে উঠলো সত্তর দশকে ভোকস ওয়াগন বিটল্ গাড়ি নিয়ে ইউনুস চাচার গ্রামে আগমন। চাচা মাসের অন্তত এক শুক্রবার তার আদরের ছোটবোন সুখিকে দেখতে গ্রামে আসতো আর গ্রামের মসজিদে জুমার নামাজ পড়তো। সুখি আন্টি গ্রামের সকল মা-চাচীদের খুব প্রিয় ছিলো এবং উনার বড় ছেলে আলম ছিলো আমার স্কুল সহপাঠী। সুতরাং স্কুল সহপাঠী আলমের সুবাদে আমি ভোকস ওয়াগন বিটল্ কার হাত দিয়ে দেখতে পারতাম যা অন্যরা পারতো না। ছুঁচা আকৃতির বিধায় আমরা ভোকস ওয়াগন বিটল্ কারকে ” ছুঁচা মটর” বলতাম।

বন্ধু ও সহপাঠী আলমের উক্তিমতে, সামরিক শাসন জারির প্রথম দিনই সকালে ব্যাংক খোলার সাথে সাথে আর্মির এক টীম তার মামার সাহেব বাজারের রাষ্ট্রায়ত বাংকে হাজির এবং গতদিনের শেষ ব্যালেন্স শিটের সঙ্গে ভোল্টের নগদ টাকার মিল না থাকায় যা হবার তাই হলো।আলমের মতে সাহেব বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছে তার ব্যাংকার মামা খুব প্রিয় ছিলো এবং ব্যবসায়ীরা দশ মিনিট সময় পেলেই ব্যাংকের ভোল্ট নগদে ভরে দিতে পারতো। অতি দ্রুত মার্শাল ল কোটের বিচারের পর ইউনুস চাচা রাজশাহী জেলে থাকাকালীন এখন বোন সুখি গ্রাম থেকে তার ভাইয়ের জন্য খাবার নিয়ে এসে জেল গেইটে হাজির হয়। ইউনুস চাচার বউ এখন ধানের হিসাব বুঝে নিতে লোকাল বাসে গ্রামে আসে। এমন একদিন গ্রামের রাস্তায় ইউনুস চাচী ও আমাদের গ্রামের বিবেক আনন্দের কথোপকথন শুনলাম, ” ইউনুস নাই তো কি হয়েছে দাদা? আমি আমার ছেলেদের কে ইউনুসের চেয়ে ভালো রাখছি। ছেলেদের ব্যবসা করবার ব্যবস্থা করে দিয়েছি।” পরে জানলাম রাজশাহী উপশহর নিউমার্কেটে তিনি তার ছেলেদের জন্য একটা দোকান বরাদ্দ করে দিয়েছেন যখন এই মার্কেটের কোন দোকানই চালু হয়নি। ছেলে রা কয়েক বস্তা সিমেন্ট নিয়ে এই দোকানে বসে থাকে। ইউনুস চাচা৷ সরকারি কোনো বেনিফিট পাইনি তাই হয়তো- “‘ জীবন তো আর থেমে থাকে না” সুএের ধারায় আলীগড় লাইব্রেরীতে চাকুরী নিয়েছেন। নিউমার্কেটের আশেপাশে পার্ক করা ভোকস ওয়াগন বিটল্ কার দেখলেই দাঁড়িয়ে কিচ্ছুখন দেখি কিন্তু ছোটো বলার মতো হাত আর দিয়না।

এখানে এডিলেডে বেশ কয়েক বার ভোকস ওয়াগন বিটল্ ভিনটেজ কারের খোঁজ নিয়েছি কিন্তু আর্থিক হিসাব নিকাশে কিনতে পারিনি। তাই মাঝে মাঝে আমার মেয়ে কে বলি, মা তুমি তো ছোটো বেলায় কর্ণফুলী নদীর ধারে বন বিভাগের কাপ্তাই রেস্ট হাউজ দেখে বলতে ” বাবা আমি বড় হয়ে চাকরি করে তোমাকে নদীর ধারে একটা বাড়ি বানিয়ে দিবো।” এখন আমার আর বাড়ি লাগবে না, তুমি আমাকে একাট আমার সপ্নের ভিনটেজ কার কিনে দিলই চলবে।

মানুষ সপ্ন নিয়েই বাঁচে আর আর্থিক কারণে সে সপ্ন পূরন না হলেও সপ্ন বুনোন শেষ হয়না। তাই তো স্বপ্ন দেখি শুক্রবারের দিন ইউনুস চাচাকে অনুসরণ করে ভোকস ওয়াগন বিটল্ কারে চড়ে – রসুনের খোঁসার মত কাপড়ের পাঞ্জাবি পরে – খাঁটি কাশ্মীরি শাল গায়ে চাপিয়ে – নর্থ এর ওয়ানদানা মসজিদে জুমার নামাজ পড়ে- কিলবার্নের বোন রুমানার বাসায় দুপুরের খাবার ছোট মাছ, সবজি আর ডাল।