আশির দশকের ছবির নেশায় AI অ্যাপ: বিনোদনের আড়ালে কতটা নিরাপদ?

নিজের ছবি কয়েক সেকেন্ডে বদলে যাচ্ছে আশি-নব্বইয়ের দশকের সাজে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়ছে AI-নির্ভর ‘রেট্রো ফটো’ ট্রেন্ড। তবে আনন্দের এই খেলায় ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে সচেতন থাকার আহ্বান বিশেষজ্ঞদের।

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্তমানে দেখা যাচ্ছে আশি ও নব্বইয়ের দশকের স্টাইলে তৈরি অসংখ্য ছবি। পুরোনো দিনের পোশাক, চুলের স্টাইল, ক্যামেরার রঙ, ব্যাকগ্রাউন্ড কিংবা সেই সময়ের সামাজিক পরিবেশ সবকিছুই যেন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ফিরে আসছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI (Artificial Intelligence) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এসব ছবি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

একটি সাধারণ ছবি AI অ্যাপে আপলোড করলেই অনেক ক্ষেত্রে সেটিকে পুরোনো দিনের ফ্যাশন বা পরিবেশের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন একটি ছবি তৈরি করা যায়। বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এমন ছবি শেয়ার করা নিঃসন্দেহে আনন্দের। বিশেষ করে প্রবাসী ও বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষের কাছে এটি নস্টালজিয়ার একটি নতুন মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো এই ছবিটি তৈরি করতে গিয়ে আমরা আসলে কী তথ্য একটি অপরিচিত অ্যাপের হাতে তুলে দিচ্ছি?

অনেক ব্যবহারকারী মনে করেন, একটি ছবি আপলোড করে সেটি পরিবর্তন করার পর বিষয়টি শেষ। বাস্তবে কোনো AI অ্যাপ কীভাবে ছবি সংরক্ষণ করে, কতদিন রাখে, ভবিষ্যতে ছবিটি কী কাজে ব্যবহার করতে পারে কিংবা তৃতীয় কোনো পক্ষের সঙ্গে তথ্য শেয়ার করে কি না এসব বিষয় অ্যাপের Privacy Policy বা গোপনীয়তা নীতির ওপর নির্ভর করে।

বিশেষ করে মানুষের মুখের ছবি সাধারণ সাধারণ ছবি নয়। এতে একজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। তাই যেকোনো অজানা বা কম পরিচিত অ্যাপে নিজের, সন্তানদের কিংবা পরিবারের সদস্যদের ছবি আপলোড করার আগে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

AI প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে ছবি সম্পাদনা এখন আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে। ফলে একটি সাধারণ ছবিকে পরিবর্তন করে এমনভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব, যা বাস্তব বলে মনে হতে পারে।

এ কারণে অনলাইনে নিজের ছবি প্রকাশের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া জরুরি। বিশেষ করে শিশুদের ছবি, পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, কর্মস্থলের পরিচয়পত্র বা অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্যসহ ছবি কোনো AI অ্যাপে আপলোড না করাই নিরাপদ।একইভাবে পরিবারের অন্য সদস্যের ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তাদের সম্মতি নেওয়া উচিত।

অ্যাপ ব্যবহারের আগে পাঁচটি বিষয় দেখুন

১. Privacy Policy পড়ুন: অ্যাপটি আপনার ছবি কতদিন সংরক্ষণ করে এবং কী কাজে ব্যবহার করতে পারে, তা দেখুন।

২. অপ্রয়োজনীয় Permission দেবেন না: ক্যামেরা, ছবি, মাইক্রোফোন, কনট্যাক্ট বা অন্য কোনো ডিভাইস সুবিধার অনুমতি কেন প্রয়োজন, তা বুঝে নিন।

৩. ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল ছবি এড়িয়ে চলুন: পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ব্যাংকসংক্রান্ত তথ্য বা পরিচয়পত্রসহ ছবি কখনোই বিনোদনের জন্য AI অ্যাপে আপলোড করা উচিত নয়।

৪. শিশুদের ছবি ব্যবহারে বিশেষ সতর্ক থাকুন: শিশুর ছবি অনলাইনে দেওয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদি গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করুন।

৫. AI-তৈরি ছবি যে বাস্তব ছবি নয়, তা মনে রাখুন: AI ছবি দেখতে বাস্তবের মতো হলেও সেটি বাস্তব ঘটনার প্রমাণ নয়। তাই এমন ছবি দেখে বিভ্রান্ত হওয়া বা অন্যের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

AI প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ নয় এর ব্যবহারই গুরুত্বপূর্ণ। রেট্রো ছবি তৈরি, সৃজনশীলতা কিংবা পুরোনো স্মৃতিকে নতুনভাবে উপস্থাপনের মতো ইতিবাচক কাজে AI ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে বিনোদনের মুহূর্তে যেন আমরা নিজের ডিজিটাল পরিচয়, গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা অজান্তে ঝুঁকির মধ্যে না ফেলি।

আজ যে ছবি শুধুই মজার একটি পোস্ট, ভবিষ্যতে সেটিই কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহৃত হবে তা সবসময় আমাদের নিয়ন্ত্রণে নাও থাকতে পারে। তাই আশি-নব্বইয়ের দশকের স্মৃতিকে AI-এর মাধ্যমে নতুন রূপ দেওয়ার আগে একটি প্রশ্ন করা ভালো “ছবিটি কত সুন্দর হবে?”-এর পাশাপাশি “ছবিটি কোথায় যাচ্ছে?”সেটিও কি আমরা ভেবে দেখছি?

প্রযুক্তির আনন্দ উপভোগ করুন, তবে ছবি আপলোডের আগে একবার Privacy Policy দেখুন, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তথ্য দেবেন না এবং নিজের ডিজিটাল নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন।