মামুন আলা: আমার আব্বা, আবুল আলা সিরাজুল হক, প্রথম জীবনে ছিলেন একজন টাইটেল পাশ মাওলানা; পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করিয়াছেন এবং আইনবিদ্যাও অধ্যয়ন করিয়াছেন। অতি সাধারণ পরিবারে জন্ম লইয়া ছাত্রাবস্থায় লজিং থাকিয়া বড় হইয়াছেন। ১৯৬৫ সনে, মাত্র ২৩ বৎসর বয়সে, বড়লোকের মেয়ে আমার মাকে বিবাহ করিলেও শ্বশুরবাড়ি হইতে বিশেষ কিছু গ্রহণ করেন নাই।

চাকুরি করিতেন ভূতাত্ত্বিক জরিপ দপ্তরে। চাকুরিটি খুব বড় ছিল না, কিন্তু অফিসের ডিজি হইতে পিয়ন পর্যন্ত সকলেই জানিতেন—“মৌলানা সাহেব” একজন পণ্ডিত ব্যক্তি।
এমন সুন্দর বাংলা, ইংরেজি ও আরবি হাতের লেখা আমি আর কাহারও দেখি নাই। আব্বা গর্ব করিয়া বলিতেন, তিনি সাতটি ভাষা জানিতেন। আমি গুনিয়া দেখিয়াছি, ছয়টি—বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি, উর্দু ও হিন্দি। সাত নম্বরটি কী, কোনো দিন বুঝিতে পারি নাই। একদিন জিজ্ঞাসা করিলে বলিলেন, “এই ছয়টা মিলাইয়া আমি আমার নিজের একটা ভাষা বানাইয়াছি—ওইটাই সাত নম্বর।”
১৯৭৫ সালের মধ্যেই, মাত্র ৩৩ বৎসর বয়সে, তিনি চার সন্তানের পিতা। নিজের বাবা ও সৎমাকে দেখভাল করিয়াছেন, সৎ ভাইবোনদেরও মানুষ করিয়াছেন। বিদ্যাবুদ্ধি থাকা সত্ত্বেও পরিবারের এত দায়িত্বের মধ্যে ছোট চাকুরি ছাড়িয়া বড় কোনো চাকুরির পেছনে ছুটিতে পারেন নাই। অথচ সেই যোগ্যতা তাঁহার ছিল।
আব্বার সংগ্রহে ছিল অসংখ্য বই—আরবি, ফারসি, বাংলা ও ইংরেজি। আমাদের বারবার বাসা বদলাইতে হইত। আসবাবপত্র বলিতে তেমন কিছুই ছিল না; কিন্তু ছিল দুইটি বড় ট্রাঙ্কভর্তি বই। আব্বার গর্ব ছিল ওই বইগুলি লইয়াই।
চার ভাইবোনের মধ্যে আমি ছিলাম আব্বার “ড্রিম চাইল্ড”। ফলে তাঁহার ভাষাপ্রীতি আমার শৈশবকে বেশ বিপদসংকুলও করিয়া তুলিয়াছিল।
আমি যখন ঢাকা রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলে পড়ি, আব্বা আমাকে রাজশেখর বসুর চলন্তিকা বাংলা-টু-বাংলা অভিধান কিনিয়া দিয়াছিলেন। একজন মাওলানা হইয়াও ছেলেকে রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলে পড়াইতে তাহার কোনো দ্বিধা ছিল না। আমার কাছে ইহা তাহার অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল মানসিকতার একটি সুন্দর পরিচয়। চতুর্থ শ্রেণির আর কয়জন ছাত্র বাংলা-টু-বাংলা অভিধানের সঙ্গে পরিচিত ছিল, তাহা জানি না।
আমার ইংরেজি শিক্ষার জন্য আবার কোথা হইতে ১৮৮৪ সালের, পৃষ্ঠা হলদে হইয়া যাওয়া, একটি ব্যাকরণের বই জোগাড় করিয়াছিলেন। অফিসে যাওয়ার সময় কয়েক পৃষ্ঠা দেখাইয়া বলিয়া যাইতেন, “এগুলি বাংলায় অনুবাদ করিস।” কখনো দৈনিক পত্রিকা হাতে ধরাইয়া বলিতেন, “এই খবরটা ইংরেজিতে অনুবাদ কর।” আরবি ব্যাকরণও শিখাইতেন। কোনো কোনো দিন হঠাৎ ঘোষণা দিতেন, “আজকে তুই আমার সঙ্গে শুধু আরবিতে কথা বলবি।” আমি তখন আমার “টারজান” মার্কা আরবি দিয়া কোনোমতে দিন পার করিতাম।
বাড়িতে কত রকমের পত্রিকা যে রাখা হইত, তাহার ইয়ত্তা নাই। দৈনিক ইত্তেফাক, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ইংরেজি ডেইলি অবজারভার, এনায়েতুল্লাহ খানের সম্পাদিত হলিডে। আমি যখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ি, তখন কবি আহসান হাবীব সম্পাদিত শিশু-কিশোরদের পত্রিকা কিশোর বাংলাও আসিত।
ইংরেজি পত্রিকা দেখিয়া আম্মা কখনো কখনো বিরক্ত হইতেন। বলিতেন, “ঠিকমতো বাজার করতে পারো না, ইংরেজি পত্রিকার পেছনে এত টাকা খরচ করো! তোমার পোলা কি এগুলি পড়ে?” আব্বা গর্বিত কণ্ঠে বলিতেন, “আরে, একটু একটু পড়ে এখন, এতেই যথেষ্ট। একদিন ও ভাষা বিক্রি করেই খাবে!”
চতুর্থ শ্রেণি হইতেই স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য আব্বা আমার বক্তৃতা লিখিয়া দিতেন। সেই বক্তৃতায় আরবি, ফারসি ও ইংরেজি উদ্ধৃতি থাকিত। মাঝে মাঝে মঞ্চে স্ক্রিপ্ট ভুলিয়া গেলে নিজের মতো করিয়া বলিতে হইত। এইভাবেই অষ্টম-নবম শ্রেণিতে উঠিতে উঠিতে বক্তৃতা ও বিতর্ক আমার সহজাত অভ্যাসে পরিণত হইয়াছিল। পরবর্তী জীবনে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে বক্তৃতার জন্য যে সামান্য সুনাম অর্জন করিয়াছি, তাহার বীজও আব্বাই বপন করিয়াছিলেন।

আয় অল্প ছিল, কিন্তু বাড়তি আয়ের জন্য কোনো শর্টকাট বা অসৎ পথ খুঁজিতে দেখি নাই। নিজের নিম্ন-মধ্যবিত্ত জীবনেই তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন। আমাদের নিজে পড়াইতেন। আমার পড়ার টেবিলের সামনে বড় কাগজে লিখিয়া টাঙাইয়া দিয়াছিলেন, “Simple Living, High Thinking.”
পড়ানোর সময় শাসন ছিল কঠোর। সেই শাসনের সঙ্গে চলিত কোরআন-হাদিস, বেদ, বাইবেল, রুমি, শেখ সাদি, ইকবাল ও গালিব হইতে অবিরাম উদ্ধৃতি। বিখ্যাত মনীষীদের উদ্ধৃতি ছিল আব্বার হাতে এক মারাত্মক অস্ত্র। কোনো ভুল করিলে শুধু বকুনি খাইয়াই রেহাই ছিল না; বিখ্যাত সব গ্রন্থ হইতে উদ্ধৃতি শুনাইয়া তাহার মর্মার্থ বুঝাইয়া এমনভাবে ভর্ৎসনা করিতেন যে লজ্জায় আমার দুই কান লাল হইয়া যাইত।
আর ভুল বানানের প্রতি আব্বার ছিল প্রবল অ্যালার্জি। একেবারেই সহ্য করিতে পারিতেন না। সেই কারণে সারা জীবন বানান ভুল করিতে আমার ভিতরে একধরনের আতঙ্ক কাজ করিয়াছে। একবার “Germany” লিখিতে গিয়া G-এর জায়গায় J লিখিয়াছিলাম; আরেকবার “দূরত্ব” বানানে ভুল করিয়াছিলাম। দুইবারই প্রচণ্ড পিটুনি খাইয়াছিলাম।
এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলা বানানের শ্রী দেখিলে প্রায়ই আব্বার কথা মনে পড়ে। ভাবি, আমি এইসব বানান লিখিলে তাহার হাত হইতে আমার রক্ষা ছিল না!
আব্বাকে লইয়া বলিবার মতো আরও অনেক কথা আছে। আমার আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস Rising from Ashes-এ তাহার অনেকটাই লিখিয়াছি। আজ বাবা দিবসে শুধু এইটুকুই বলি—আব্বার পাণ্ডিত্য হয়তো তাহার নিজের জীবনে প্রাপ্য মূল্য পায় নাই; কিন্তু আমার এবং আমার ছোট ভাই ড. মাহমুদ উল আলার জীবনে তাঁহার সেই বিদ্যার প্রভাব গভীর।
আব্বার ভাষাপ্রীতির কারণেই স্কুল-কলেজে বাংলা ও ইংরেজিতে প্রায় সবসময়ই ভালো ফল করিয়াছি। পরবর্তী সময়ে IELTS-এ উচ্চ স্কোর করা কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় NAATI পরীক্ষায় প্রথমবারেই উত্তীর্ণ হওয়া, এইসব অর্জনের ভিত বহু আগেই আব্বা তৈরি করিয়া দিয়াছিলেন।
আব্বার খুব শখ ছিল একদিন তাজমহল দেখিবেন। সেই সাধ আর পূরণ হয় নাই। ২০১৬ সালের ১২ জুলাই তাজমহল না দেখিয়াই তিনি পৃথিবী ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছেন।
আজ আমি যখন বিভিন্ন মহাদেশের নানা দেশে ঘুরিয়া বেড়াই, তখন আব্বার কথা মনে করিয়া একদিকে দুঃখ হয়, অন্যদিকে গর্বও হয়। মনে হয়, ভাষার যে ছোট ছোট বীজ তিনি বহু বছর আগে আমার ভিতরে বপন করিয়া দিয়াছিলেন, তাহার ফল নিয়াই আজ আমি পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘুরিয়া বেড়াইতেছি।
আব্বা, আপনি ভালো থাকুন।
রব্বির হামহুমা কামা রব্বাইয়ানি সাগিরা।
বাবা দিবসের বিশেষ সংখ্যাটি ডাউনলোড লিংক: Father_AK_small