আফ্রিকার রঙিন দুয়ার: মরক্কোর দিনগুলি : পর্ব ৪

ঘরে ঢুকেই বোঝা গেল, হোটেল দে প্যারিসের বেশ বয়স হয়েছে। আসবাবপত্রে সেই পুরোনো দিনের ছাপ স্পষ্ট। সুন্দর আলমারি, ছোট্ট একটি টেবিল, দুটি খাট। সবকিছুই গাঢ় মেহগনি রঙের পালিশ করা কাঠের, কোথাও কোথাও সূক্ষ্ম অলংকরণ। জানালার পর্দাতেও পুরোনো ঢঙের নকশা ও কারুকাজ। বাথরুমের দেয়ালে মোজাইক টাইলস। পুরো ঘরটার মধ্যে এমন এক আবহ, যেন হঠাৎ চার-পাঁচ যুগ, হয়তো তারও বেশি সময় পেছনে চলে গেছি।

গোসল করা খুব জরুরি ছিল। প্রায় নির্ঘুম দীর্ঘ যাত্রার পর ঠান্ডা পানির স্পর্শে শরীরটা যেন একটু জেগে উঠল। সময় তখন বিকেল চারটার কাছাকাছি। ফোনে গুগল খুলে দেখলাম, সূর্যাস্ত রাত প্রায় ৮টা ৪০ মিনিটে। পরদিনই যেহেতু রওনা হতে হবে রাবাতের উদ্দেশে, কাসাব্লাঙ্কা দেখার জন্য হাতে সময় খুবই কম। ভাবলাম, বয়স তো প্রায় ছাপ্পান্ন; শরীরের কথাও একটু ভাবতে হবে। অতএব ঘণ্টা দুয়েক ঘুমিয়ে নেওয়াই ভালো। তারপর দু-এক ঘণ্টা নিজের পায়ে হেঁটে আশপাশটা দেখব, হাসান দ্বিতীয় মসজিদে গিয়ে মাগরিবের নামাজ পড়ব, তারপর আরও কিছুক্ষণ ঘুরে দেখব রাতের কাসাব্লাঙ্কা।

নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিলাম—যতটুকু পারি আজ দেখে নিই, বাকিটা না হয় ৪ জুলাই মারাকেশ থেকে কাসাব্লাঙ্কায় ফিরে এসে দেখব। মরক্কো থেকে আমার ফিরতি ফ্লাইটও কাসাব্লাঙ্কা থেকেই, ঠিক আট দিন পর। সবগুলো বাতি নিভিয়ে জানালার পাশের বিছানায় শুয়ে পড়লাম। পর্দার ফাঁক দিয়ে ঘরে তখনও নরম বিকেলের আলো ঢুকছে। কিন্তু শরীর যতই ক্লান্ত হোক, মন তখনও ঘুমানোর জন্য প্রস্তুত নয়। আহা, ঢাকার স্কলাস্টিকায় আমার এক সহকর্মী মফিজ স্যারের মতো যদি একটা পাওয়ার ন্যাপ নিতে পারতাম! স্কুল ছুটি হতো আড়াইটায়। তাঁর কোচিং ক্লাস শুরু হওয়ার আগে ঘণ্টা খানেক সময়ের মধ্যেই খাওয়া-দাওয়া সেরে বিশ-তিরিশ মিনিটের একটি গভীর ঘুম দিয়ে নিতে পারতেন। অতীতে বহুবার মফিজ স্যারের মতো হওয়ার চেষ্টা করেছি। কোনো দিন সফল হইনি।

আমি বরাবরই খুবই চঞ্চল প্রকৃতির। আমার ছেলেবেলায়, আমার আম্মার দিন শুরু হতো কাক ডাকা ভোরে। আমাদের চার ভাইবোনকে নাশতা খাইয়ে স্কুলে পাঠাতেন, তারপর শুরু হতো রান্নাবান্না আর সংসারের কাজ। স্কুল থেকে ফিরলে আমাদের গোসল করাতেন, খাওয়াতেন, তারপর নিজে খেয়ে বেলা আড়াইটার দিকে নিয়ম করে ঘণ্টা দুয়েক ঘুমিয়ে নিতেন। মাথার কাছে থাকত ছোট্ট একটা কালো রেডিও। কখনো ঢাকা বেতারের বিজ্ঞাপন তরঙ্গে বাংলা ছায়াছবির গান, কখনো আকাশবাণী কলকাতার নাটক বাজত। আমাদের ওপরও তখন কঠোর নির্দেশ—ঘুমাতে হবে।

আমার ভাইবোনেরা মোটামুটি বাধ্য ছিল। আমি ছিলাম ব্যতিক্রম। আম্মার হালকা নাকডাকার শব্দ শুরু হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতাম। তারপর বিছানা থেকে নেমে পা টিপে টিপে, খুব সন্তর্পণে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যেতাম। আমার জন্য অপেক্ষা করত সমবয়সী আরও কিছু দুরন্ত ছেলে। তারপর শুরু হতো খেলাধুলা। দুই ঘণ্টা পর বাড়ি ফিরলে নিশ্চিত ভাবেই আম্মার হাতপাখার দু-একটা বাড়ি কপালে জুটত, কিন্তু তাতে আমার স্বভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

কাসাব্লাঙ্কার পুরোনো হোটেল ঘরে শুয়ে মনে হলো, এত বছর পরও সেই দুরন্ত, অবাধ্য, ডানপিটে ছেলেটা আমার ভেতরে দিব্যি বেঁচে আছে। বারবার মনে হচ্ছিল, উঠে যাই। বেরিয়ে পড়ি। ঘুম আনার জন্য কল্পনা করলাম, আম্মা পাশের বিছানায় শুয়ে আছেন। বাঁ হাতটা বালিশের ওপর ভাঁজ করা, তার ওপর মাথা। ভেজা চুলগুলো বালিশের ওপাশে ছড়িয়ে আছে। ডান হাতে ধীরে ধীরে দুলছে তালপাতার পাখা। রেডিওতে ভেসে আসছে রুনা লায়লার গান। আধঘুম অবস্থায় জড়ানো গলায় আম্মা বলছেন— “আমি কিন্তু জাইগা আছি, এই বদমাশ—ঘুমাইয়া পড়!”

কাসাব্লাঙ্কার পুরোনো হোটেল ঘরে শুয়ে মনে হলো, এত বছর পরও সেই দুরন্ত, অবাধ্য, ডানপিটে ছেলেটা আমার ভেতরে দিব্যি বেঁচে আছে। বারবার মনে হচ্ছিল, উঠে যাই। বেরিয়ে পড়ি। ঘুম আনার জন্য কল্পনা করলাম, আম্মা পাশের বিছানায় শুয়ে আছেন। বাঁ হাতটা বালিশের ওপর ভাঁজ করা, তার ওপর মাথা। ভেজা চুলগুলো বালিশের ওপাশে ছড়িয়ে আছে। ডান হাতে ধীরে ধীরে দুলছে তালপাতার পাখা। রেডিওতে ভেসে আসছে রুনা লায়লার গান। আধঘুম অবস্থায় জড়ানো গলায় আম্মা বলছেন— “আমি কিন্তু জাইগা আছি, এই বদমাশ—ঘুমাইয়া পড়!”

বিকেল যত গড়াচ্ছিল, বাইরের রাস্তার কোলাহল তত বাড়ছিল। কল্পনাতে এও যেন দেখতে পাচ্ছিলাম, বাইরে তখন আমার খেলার সাথি ফারুক, শাহীন, খোকন আর লিটন লাটিম হাতে অপেক্ষা করছে। ধুর, আম্মাকে পাত্তা দেয় কে! এক ঝটকায় বিছানা থেকে উঠে পড়লাম। তড়িঘড়ি পোশাক পাল্টে, ছোট্ট একটা ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলাম।

হোটেলের বাইরে পা রাখতেই বোঝা গেল, এটি শহরের বেশ ব্যস্ত একটি এলাকা। রাস্তা খুব চওড়া নয়। দুই পাশে সারি সারি দোকান। কাপড়, জুতা, মোবাইল ফোন, সুগন্ধি, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। অনেক ভবনের ওপরে বাসা বা অফিস, নিচতলায় দোকান। পুরোনো বহুতল ভবনগুলোর বাঁকানো বারান্দা, লোহার রেলিং, উঁচু জানালা আর বিবর্ণ সাদা বা ক্রিম রঙের দেয়ালে ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলের স্পষ্ট ছাপ। দোকানের সাইনবোর্ডে আরবি আর ফরাসি পাশাপাশি। সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ল ক্যাফে। ছোট-বড় অসংখ্য ক্যাফে। কোথাও ফুটপাথের দিকে মুখ করে সারি সারি চেয়ার; বিভিন্ন বয়সের মানুষ চা বা কফি খাচ্ছেন, আর জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন।

হঠাৎ মনে একটা প্রশ্নের উদয় হলো। আচ্ছা, কাসাব্লাঙ্কা শহরের গন্ধটা কী?

১৯৯২ সালের জুন মাসে প্রথমবার যখন কলকাতায় গিয়েছিলাম, বেনাপোল সীমান্ত পেরিয়ে বনগাঁ থেকে ট্রেনে চেপে শিয়ালদহ স্টেশনে নামতেই নাকে এসেছিল রজনীগন্ধার তীব্র, মিষ্টি গন্ধ। স্টেশনের বাইরে ফুটপাতে ছোট ছোট ফুলের দোকান, পূজার ফুল বিক্রি করছেন মহিলারা। সামনে থরে থরে সাজানো রজনীগন্ধার লম্বা ডাঁটা। তারপর যেন শহরজুড়ে রজনীগন্ধা ফুলের গন্ধ পেতাম। বহু বছর কলকাতায় যাওয়া হয়নি। জানি না, আজকের কলকাতার বাতাসেও রজনীগন্ধার সেই স্নিগ্ধ সুবাস ভেসে বেড়ায় কি না।

আবার ২০১০ সালের ১৪ আগস্টে বাংলাদেশ থেকে তিনটি স্যুটকেস আর নয় বছরের ছেলেকে নিয়ে এক বৃষ্টি ভেজা সকালে আমরা যখন অ্যাডিলেডে এসে পৌঁছেছিলাম, বিমানবন্দরে যে গন্ধটা প্রথম নাকে এসেছিল, সেটা কফির। তারপর মনে হয়েছিল, পুরো অ্যাডিলেড শহরটাই যেন কফির গন্ধে ম-ম করছে। আজও কড়া করে ভাজা কফি বিনের গাঢ় সুবাস পেলে মন চলে যায় অ্যাডিলেডের সেই প্রথম সকালের কাছে।

কাসাব্লাঙ্কা শহরের গন্ধটা বোঝার জন্য কিছুক্ষণের জন্য আমাদের পোষা বেড়াল ভুন্টুর মতো হয়ে গেলাম। ভুন্টু সকালে প্রথমবার পেছনের উঠোনে বেরিয়েই কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়ায়। নাকটা আস্তে আস্তে নাড়িয়ে বাতাস শুঁকে বোঝার চেষ্টা করে, রাতে কোনো বিড়াল এসেছে কি না, গাছের আড়ালে কোনো পাখি আছে কি না। আমি হাঁটার গতি কমিয়ে কয়েকবার গভীরভাবে শ্বাস নিলাম। একবার মনে হলো, পুদিনার গন্ধ পাচ্ছি। আরেকটু এগোতেই কাবাবের ধোঁয়া। তারপর কোনো ক্যাফের পাশ দিয়ে যেতে যেতে কফির গন্ধ। কিছুদূর পর সদ্য ভাজা ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের গন্ধ। না, কাসাব্লাঙ্কার কোনো একটি নির্দিষ্ট গন্ধ ধরতে পারলাম না।

এত খাবারের দোকান দেখতে দেখতে খিদে পেয়ে গেল। আমার ধারণা ছিল, মরক্কোর শহর মানেই রাস্তার পর রাস্তা তাজিনের দোকান। বাস্তবে ব্যাপারটা তেমন নয়। তাজিন অবশ্যই পাওয়া যায়, তবে স্থানীয়দের কাছে পিৎজা, বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, শরমা, প্যানিনি আর স্যান্ডউইচও বেশ জনপ্রিয়। এমনকি টাকোর দোকানও চোখে পড়ল। ফরাসি ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কারণে ফরাসি খাবারের প্রভাব থাকাটা স্বাভাবিক মনে হলো। কিন্তু মেক্সিকান খাবারের উপস্থিতি দেখে বেশ অবাক হলাম। ভাবলাম, মরক্কোয় এসে স্বপ্নের তাজিনটা রাতে আরাম করে খাব। এখন হালকা কিছু খেয়ে নেওয়া যাক।

আমি সাধারণত ফাস্ট ফুডের খুব একটা ভক্ত নই। তবু কাছের একটি দোকানে ঢুকে মেনুর দিকে তাকালাম। কাবাব ছাড়া তেমন কোনো ঐতিহ্যবাহী মরক্কান খাবার নেই। প্রায় সবই পরিচিত পশ্চিমা ধরনের খাবার। আমি ভেড়ার মাংসের কিমা দিয়ে তৈরি একটি প্যাটির সঙ্গে ভাজা ডিম অর্ডার দিলাম। ইংরেজিতে অনুরোধ করলাম, আমার খাবারে যেন ক্যারামেলাইজড পেঁয়াজ আর টমেটো না দেওয়া হয়। কাউন্টারের লোকটি আমার দিকে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল — “ফ্রঁসে?” অর্থাৎ, ফরাসি জানি কি না। মাথা নেড়ে বললাম, না। আমাদের কথাবার্তার এই অচলাবস্থা দেখে একজন ক্রেতা উঠে এসে সাহায্য করলেন। আমার কথা কাউন্টারের লোকটিকে বুঝিয়ে দিলেন।

সাধারণত মেনুতে খাবারের যে ছবি থাকে, বাস্তবে প্লেটে এসে তার চেয়ে ছোট দেখায়। আমার অভিজ্ঞতা অন্তত তাই। এখানে হলো উল্টোটা। খাবার সামনে আসতেই একটু ভয় পেয়ে গেলাম। যেটুকু অর্ডার করেছি ভেবেছিলাম, তার সঙ্গে হাজির হলো দুটি বান, বিশাল পরিমাণ ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, সঙ্গে আরও কিছু। ইস্তাম্বুলেও আমার এমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল। রেস্তোরাঁয় যা-ই অর্ডার করা হোক না কেন, তার সঙ্গে বিনামূল্যে পরিবেশন করা হতো বিশাল এক টুকরো রুটি। আমি খাবার অপচয় করতে পছন্দ করি না। এত খাবার দেখে প্রথমেই মনে হলো, শেষ করব কীভাবে!

ভেতরে-বাইরে অনেক মানুষ বসে বেশ উপভোগ করে খাচ্ছেন। আমার পাশের টেবিলে বসে ছিলেন এক ভদ্রলোক। শরীরের গড়ন বেশ ভারী। তাঁর প্লেটের ওপর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ছোটখাটো পাহাড়ের মতো করে সাজানো। সরিষার পেস্ট মেশানো মেয়োনিজে ডুবিয়ে একটির পর একটি বেশ তৃপ্তির সঙ্গে খেয়ে যাচ্ছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই বিশাল প্লেট প্রায় পরিষ্কার হয়ে গেল। এরপর তিনি আরেক প্লেট ফ্রেঞ্চ ফ্রাই অর্ডার করলেন। অস্ট্রেলিয়ায় রেস্তোরাঁয় বসে একজন মানুষকে এতটা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেতে দেখার অভিজ্ঞতা আমার খুব একটা হয়নি। নিজের খাবারের যতটা পারলাম শেষ করে বাকিটা ব্যাগে ভরে আবার হাঁটা শুরু করলাম। সঙ্গে নিলাম দুই বোতল পানি।

তখন বিশ্বকাপ চলছিল, আর মরক্কোর জাতীয় দলও বেশ ভালো খেলছিল। ফলে সারা দেশেই ফুটবল নিয়ে বাড়তি উন্মাদনা। এখানে ফুটবল যে শুধু খেলা নয়, দৈনন্দিন জনপ্রিয় সংস্কৃতিরও অংশ, সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। আধুনিক পোশাকের দোকানের সামনে ফুটপাতে অসংখ্য ছোট ছোট দোকানে বিক্রি হচ্ছে মরক্কোর জাতীয় পতাকা, টুপি, ফুটবল আর জাতীয় দলের জার্সি। সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছিল “হাকিমি” লেখা জার্সি।

এমনই একটি দোকানের সামনে থামলাম। দোকানদারের গায়ে মরক্কোর জাতীয় দলের জার্সি। ইশারায় জিজ্ঞেস করলাম, একটা ছবি তোলা যাবে কি না।ভদ্রলোক সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বারণ করলেন। তারপর একটানা অনেক কিছু বললেন। ভাষা বুঝলাম না, তবে বক্তব্যের সারমর্ম ছিল পরিষ্কার। আগে কিছু কিনুন, তারপর ছবি।

আমার চোখ পড়ল ‘Morocco’ লেখা একটি টুপির ওপর। দাম জিজ্ঞেস করতেই দোকানি ক্যালকুলেটরে লিখে দেখালেন, 70 দিরহাম। টুপির মানের তুলনায় দামটা অনেক বেশি মনে হলো। মরক্কোয় আসার আগে পড়েছিলাম, বাজারে বা ছোট দোকানে অনেক ক্ষেত্রেই দরদাম করা স্বাভাবিক। দামাদামির খেলাটা আমার বহুদিনের চেনা! জীবনের বড় একটা সময় বাংলাদেশে কাটিয়েছি। সেখানে বাজারে, দোকানে, রিকশায়, সব কিছুর ক্ষেত্রেই দরদাম দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কখনো আপনি জিতবেন, কখনো দোকানদার; মাঝখানে কথার চালাচালি, মেকি রাগ করে চলে যাওয়ার ভান করা, আবার দোকানির দরদমাখা কণ্ঠে—“ভাইজান, রাগ করলেন?” বলে খদ্দেরকে ফিরিয়ে আনা। এর মধ্যেও একটা আলাদা মজা আছে। প্রায় সতেরো বছর অস্ট্রেলিয়ায় বাস করে দরদামের অভ্যাসটা প্রায় হারিয়েই গেছে। দোকানে যে দাম লেখা, সেটাই দাম। বাড়ি কেনা ছাড়া খুব বেশি জায়গায় দরদামের সুযোগ নেই। আমার কাছে বিষয়টা কখনো কখনো একটু একঘেয়ে লাগে। সুযোগ পেয়ে পুরোনো দক্ষতাটা একটু ঝালিয়ে নিলাম। আমি তাঁর হাত থেকে ক্যালকুলেটরটা নিয়ে লিখলাম, 20। দোকানি মাথা নাড়লেন। কিছুক্ষণ সংখ্যার ওঠানামার পর শেষ পর্যন্ত ৩০ দিরহামে রফা হলো।

পাওনা মিটিয়ে দেওয়ার পর দোকানদার এবার ইশারা করলেন—ছবি তোলা যাবে। তবে সঙ্গে সঙ্গে দুই আঙুল তুলে দেখালেন, দুটোর বেশি ছবি নয়! মনে মনে হাসলাম। বাংলাদেশে কিশোর বয়সে স্কুল পালিয়ে ‘এক টিকিটে দুই ছবি’ দেখতাম—মূলত প্রাপ্তবয়স্কদের ছবি। এখানে যেন তারই নতুন সংস্করণ—’এক টুপিতে দুই ছবি!’ একটা জার্সিও কিনলে হয়তো চারটা ছবি তোলার অনুমতি পাওয়া যেত!

পাওনা মিটিয়ে দেওয়ার পর দোকানদার এবার ইশারা করলেন—ছবি তোলা যাবে। তবে সঙ্গে সঙ্গে দুই আঙুল তুলে দেখালেন, দুটোর বেশি ছবি নয়! মনে মনে হাসলাম। বাংলাদেশে কিশোর বয়সে স্কুল পালিয়ে ‘এক টিকিটে দুই ছবি’ দেখতাম—মূলত প্রাপ্তবয়স্কদের ছবি। এখানে যেন তারই নতুন সংস্করণ—’এক টুপিতে দুই ছবি!’ একটা জার্সিও কিনলে হয়তো চারটা ছবি তোলার অনুমতি পাওয়া যেত!

‘Morocco’ লেখা টুপিটা মাথায় চাপিয়ে, অনুমোদিত দুটি ছবি তুলে আবার পা বাড়ালাম। এলোমেলো হাঁটাই বলা চলে। কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। যে রাস্তা ভালো লাগছে, সেদিকেই যাচ্ছি। কিছু দূর পর এসে হাজির হলাম ‘প্লাস দু সেজ নভঁব্র’ অর্থাৎ ‘১৬ নভেম্বর চত্বরে। চত্বরের মাঝখানে চোখে পড়ল গোলাপি আভা যুক্ত অদ্ভুত এক ভাস্কর্য, ‘সুর্স দ্য ভি’, মানে ‘জীবনের উৎস’। চারপাশে অসংখ্য কবুতর। কেউ মাটিতে খাবার কুড়োচ্ছে, কেউ ফোয়ারার ধার ঘেঁষে বসে আছে, আবার হঠাৎ একঝাঁক একসঙ্গে উড়ে গিয়ে অন্য পাশে নেমে পড়ছে।

গুগলে চত্বরটির নামের পেছনের ইতিহাস পড়লাম। ১৬ নভেম্বর ১৯৫৫ সালে প্রায় দুই বছরের নির্বাসন শেষে সুলতান মোহাম্মদ পঞ্চম মাদাগাস্কার থেকে মরক্কোয় ফিরে আসেন। তাঁর প্রত্যাবর্তন মরক্কোর স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়; কয়েক মাসের মধ্যেই, ১৯৫৬ সালে, দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে।

সেখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছালাম ‘প্লাস দে নাসিওঁ ইউনিঁ’, জাতিসংঘ চত্বরে। চারদিক থেকে বড় রাস্তা এসে মিলেছে, ট্রাম চলছে, গাড়ির ভিড়, পথচারী, দোকানপাট, ক্যাফে। সব মিলিয়ে কাসাব্লাঙ্কার শহুরে ব্যস্ততা যেন এখানে আরও ঘনীভূত।চত্বরের এক পাশে দাঁড়িয়ে রাস্তার ওপারে কাসাব্লাঙ্কার ঐতিহাসিক মদিনা বা নগরকেন্দ্রের প্রবেশমুখে সুন্দর ঘড়ির টাওয়ারের দিকে চোখ গেল। হালকা ক্রিম রঙের লম্বা টাওয়ার, চারদিকে চারটি ঘড়ির মুখ, তারও ওপরে সরু মিনারের মতো চূড়া। চারপাশের ভবনের মাঝেও আলাদা করে চোখে পড়ে। এমন সময় ইউরোপীয় ঢঙের টুপি আর সানগ্লাস পরা এক ভদ্রলোক কাছে এসে চোস্ত ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলেন, “ইউ আর ফ্রম?” বললাম, “অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশি অস্ট্রেলিয়ান।” দুই হাত সামনে তুলে আন্তরিকতার সঙ্গে বললেন, “ওয়েলকাম টু মরক্কো!” ভদ্রলোকের নাম কাশিম। কাসাব্লাঙ্কার একটি নামকরা স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক। ইতিহাস পড়াতেন। কী সৌভাগ্য, এই অচেনা শহরে এমন একজন মানুষের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, যিনি ইতিহাস জানেন, আবার ইংরেজিতেও সাবলীল। তার কাছ থেকে জানলাম মূল টাওয়ারটি নির্মিত হয়েছিল ফরাসি আমলে, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে।পরে সেটি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। বহু বছর পর ১৯৯০-এর দশকে পুরোনো নকশা অনুসরণ করে আবার তৈরি করা হয়।

সন্ধ্যা হতে তখন আর খুব বেশি দেরি নেই। মাগরিবের সময় ঘনিয়ে আসছে। মিস্টার কাশিমকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নেওয়ার আগে জিজ্ঞেস করলাম, কীভাবে হাসান দ্বিতীয় মসজিদে যাওয়া যায়। তিনি বললেন, ট্যাক্সি নিলে ভালো হবে। মিনিট দশেক লাগবে। কাসাব্লাঙ্কায় শহরের ভেতরে চলাচলকারী ছোট ট্যাক্সিগুলো লাল রঙের। স্থানীয়ভাবে বলা হয় ‘পেতি ট্যাক্সি’ বা ছোট ট্যাক্সি। ট্যাক্সিতে আগে থেকেই যাত্রী থাকলেও রাস্তা থেকে হাত তুলে সেটি থামানো যায়। গন্তব্য একই দিকে হলে চালক আরও একজন যাত্রী তুলে নিতে পারেন। প্রত্যেকের ভাড়াও আলাদাভাবে হিসাব করা হয়। বিষয়টি আমার কাছে নতুন হলেও ব্যবস্থাটা শুনে বেশ ভালো লাগল। যাত্রীর খরচ কমে, আবার একই গাড়ি একাধিক মানুষকে বহন করতে পারে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে ঢাকা বা ভারতের বড় শহরেও এমন ব্যবস্থা বেশ কাজে লাগতে পারে। সেদিন কাশিমের সঙ্গে কোনো ছবি তোলা হয়নি। কে জানত, পরদিন প্রায় একই জায়গায় তাঁর সঙ্গে আবার কাকতালীয় ভাবে দেখা হয়ে যাবে! ছবিটি সেই দ্বিতীয় সাক্ষাতের। সে গল্প অবশ্য পরের পর্বে।

আমি যে ট্যাক্সিটিতে উঠলাম, তাতে আগে থেকেই একজন যাত্রী ছিলেন। কিছু দূর গিয়ে তাঁকে নামিয়ে দিয়ে চালক আমাকে নিয়ে চললেন হাসান দ্বিতীয় মসজিদের দিকে। আটলান্টিক মহাসাগরের একেবারে ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এই বিশাল মসজিদটি নির্মিত হয় রাজা দ্বিতীয় হাসানের উদ্যোগে। ১৯৮৬ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ১৯৯৩ সালে এটি উদ্বোধন করা হয়। নির্মাণ ব্যয় ছিল ৭০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মিনারের উচ্চতা প্রায় ২০০ মিটার।

হঠাৎ চোখে পড়ল আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ, রাজকীয় মিনারটি। যতই কাছে যাচ্ছি, ততই মসজিদটির বিশালতা স্পষ্ট হচ্ছিল। মুখ থেকে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এলো-সুবহানাল্লাহ!”

ট্যাক্সি থেকে নেমে সামনে তাকিয়ে থমকে গেলাম। সামনের চত্বরটি কয়েকটি ফুটবল মাঠের সমান। অসংখ্য মানুষের মেলা। পুরুষ, নারী, শিশু, পরিবার, পর্যটক। কেউ এসেছে নামাজের জন্য, কেউ ইসলামি স্থাপত্যের এই অনন্য নিদর্শটি শুধু এক নজর দেখতে। মরক্কোর যে অল্প কয়েকটি মসজিদে অমুসলিমরা প্রবেশ করতে পারেন, হাসান দ্বিতীয় মসজিদ তার একটি—অবশ্য নামাজের সময় ছাড়া।

কিছুক্ষণ পরই মাগরিবের আজান শুরু হলো। মসজিদের বিশালতা আর সৌন্দর্যে ইতিমধ্যে মন-প্রাণ ভরে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই আজানের প্রতিও আমার প্রত্যাশা একটু বেশি ছিল। ২০০৬ সালে ইস্তাম্বুল ভ্রমণের সময় সুলতান আহমেদ চত্বরে দাঁড়িয়ে এক পাশে হাগিয়া সোফিয়া, অন্য পাশে ব্লু মস্ক, দুই দিক থেকে ভেসে আসা সুমধুর আজানের ধ্বনি পুরো চত্বরটাকে এক অসাধারণ আবহে ভরে দিয়েছিল। সেই স্মৃতির তুলনায় কাসাব্লাঙ্কার এই আজানে সুরের তেমন ওঠানামা ছিল না। খুবই সংক্ষিপ্ত মনে হলো। নিজেকে বললাম, এসব তুলনা না করে বরং সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই অসাধারণ স্থাপনাটাই উপভোগ করি। মসজিদটি এতটাই বিশাল যে মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় পুরোটা ধরা কঠিন। বিশেষ করে মূল ভবনের সঙ্গে সুউচ্চ মিনারটিকে একসঙ্গে ধরতে গেলেই কোনো না কোনো অংশ কেটে যাচ্ছিল।

মসজিদের নামাজের হলে ঢোকার সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশ কড়াকড়ি। প্রবেশের আগে জুতা কালো কাপড়ের ব্যাগে ভরে সঙ্গে রাখতে হলো। ভেতরে ঢুকেই যেন মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড়। বহু দেশ ঘুরেছি, অনেক বড় মসজিদ, গির্জা, মন্দির ও ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে; কিন্তু এত জটিল, সূক্ষ্ম, নিখুঁত এবং স্তরবহুল অলংকরণ একসঙ্গে খুব কমই দেখেছি। সামনে সুসজ্জিত মিহরাব, ওপরে বিশাল খোদাই করা সিডার কাঠের ছাদ, বিশালাকার দৃষ্টিনন্দন ঝাড়বাতি। চারদিকে খোদাই করা কাঠ, কোথাও ফুলের মোটিফ, কোথাও ছোট ছোট রঙিন টাইল জুড়ে তৈরি মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী জটিল জ্যামিতিক জেলিজ মোজাইক, মার্বেল, প্লাস্টারের সূক্ষ্ম কারুকাজ, নানা নকশা আর আরবি ক্যালিগ্রাফি।

এত সূক্ষ্ম কাজ কীভাবে সম্ভব! কোন দিকে তাকাব? কোনটা রেখে কোনটা দেখব, কিসেরই বা ছবি তুলব—ছাদের, দেয়ালের, নাকি মিহরাবের? অল্প সময়ের মধ্যেই ক্লান্ত হয়ে গেলাম। মোবাইলটা পকেটে রেখে দিলাম। আজ শুধু নয়ন ভরেই দেখি!

এত সূক্ষ্ম কাজ কীভাবে সম্ভব! কোন দিকে তাকাব? কোনটা রেখে কোনটা দেখব, কিসেরই বা ছবি তুলব—ছাদের, দেয়ালের, নাকি মিহরাবের? অল্প সময়ের মধ্যেই ক্লান্ত হয়ে গেলাম। মোবাইলটা পকেটে রেখে দিলাম। আজ শুধু নয়ন ভরেই দেখি!

আজানের পর প্রথম সারিটি পূর্ণ হতে বেশ খানিকক্ষণ লেগে গেল। প্রায় দশ মিনিট পর ধীরে ধীরে দ্বিতীয় সারি পূর্ণ হলে ইমাম সাহেব ডান দিকের একটা দরজা দিয়ে মিহরাবের দিকে এগিয়ে এলেন। হাঁটার মধ্যে এক ধরনের গাম্ভীর্য। পরনে দামী আলখেল্লা, মাথায় লাল রঙের ফেজ টুপি। এমন একটি মসজিদের ইমাম হওয়াও নিশ্চয়ই বিরাট সৌভাগ্যের ব্যাপার।

নামাজ শুরু হলো। ইমাম সাহেবের তিলাওয়াত অত্যন্ত সুন্দর। তিন রাকাত পূর্ণ হলে, তিনি ডান দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, “আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।” তারপরই নামাজ শেষ। বাঁ দিকে কোনো সালাম ফিরালেন না। আমি বেশ অবাক হলাম। এ আবার কেমন নিয়ম? চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম, মুসল্লিদের কেউ কেউ নিজের মতো করে বাঁ দিকে আরেকবার সালাম ফিরিয়ে নিচ্ছেন। পরে জানতে পারলাম, এটি মরক্কোয় প্রচলিত মালিকি মাজহাবের নামাজের রীতিরই অংশ। কিছুক্ষণ পর ইমাম সাহেব, তাঁর সহকারী এবং কয়েকজন মুসল্লি একসঙ্গে, একই সুরে কিছু দোয়া পড়লেন। আমাদের দেশে নামাজ শেষে এমন ভাবে সমস্বরে দোয়া পড়তে দেখেছি বলে মনে পড়ে না।

পৃথিবীর নানা দেশে নামাজ পড়তে গিয়ে ইসলামী আচার-অনুষ্ঠানের ছোটখাটো পার্থক্য আগেও দেখেছি। কোথাও হাত বাঁধার ধরন আলাদা, কোথাও ‘আমিন’ বলা হয় উচ্চস্বরে, কোথাও নীরবে; কোথাও নামাজ শেষে সমবেত ভাবে মোনাজাত করা হয়, কোথাও আবার হয় না।। ভারতীয় উপমহাদেশে আমরা দুই দিকে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করি। কিন্তু একবার সালাম ফিরিয়েই নামাজ শেষ করার রীতি এই প্রথম দেখলাম। মরক্কোর কোনো আলেম যদি কয়েকশ বছর আগে বাংলায় ইসলাম প্রচার করতেন, তাহলে হয়তো আমরাও একই নিয়ম অনুসরণ করতাম!

মনে মনে একটু মজাও লাগল। ভাবলাম, আমরা তো বাড়তি একটা সালাম দিই—সওয়াবের খাতায় যদি তারও একটু হিসাব থাকে, মন্দ কী! চতুর্দশ শতাব্দীতে ইবনে বতুতা ভারতবর্ষে এসে মরক্কোর পরিচিত ধর্মীয় রীতির সঙ্গে এখানকার রীতির পার্থক্য দেখে হয়তো আমার মতোই বিস্মিত হয়েছিলেন।

নামাজ শেষ করে আরও বেশ কিছুক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো মসজিদের কারুকাজের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কত মানুষের অক্লান্ত শ্রম, কত কারিগরের হাতের দক্ষতা, কত বছরের পরিকল্পনার ফসল এই বিশাল স্থাপনা। একসময় অন্য একটি ভাবনাও মাথায় এলো। একটি উন্নয়নশীল দেশে এত বিপুল অর্থ ব্যয় করে এমন একটি মসজিদ নির্মাণ কতটা প্রয়োজনীয় ছিল? একই অর্থ দিয়ে কতগুলো কারখানা, হাসপাতাল, স্কুল কিংবা অন্য কোনো জনকল্যাণমূলক বা উৎপাদনশীল অবকাঠামো তৈরি করা যেত?

উত্তর আফ্রিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত কয়েকটি মুসলিম রাজবংশ একসময় বর্তমান স্পেন ও পর্তুগালের বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করেছে। ১৪৯২ সালে গ্রানাডার পতনের মাধ্যমে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটার পর আন্দালুসের মুসলমানদের ওপর ক্রমে ধর্মান্তর ও দেশত্যাগের চাপ বাড়ে। তখন অনেকেই মরক্কোসহ উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এসে বসতি গড়েন। সঙ্গে নিয়ে আসেন তাঁদের শিল্প, স্থাপত্য, কারুশিল্প ও সংস্কৃতির নানা ধারা। স্পেনের গ্রানাডা আলহামরা, কর্দোবার গ্র্যান্ড মসজিদ, সেই আন্দালুসীয় ঐতিহ্যের স্মৃতি আজও যেন মরক্কোর শিল্প ও কারুকাজে বেঁচে আছে। হাসান দ্বিতীয় মসজিদের এই বিপুল আয়োজন হয়তো সেই হারিয়ে যাওয়া আন্দালুসের বেদনাকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা। ইতিহাসে যা হারিয়ে গেছে, স্থাপত্যের মহিমায় তার কিছুটা ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এক ধরনের পুরোনো ক্ষতকে সৌন্দর্য দিয়ে ভরাট করার চেষ্টা।

মসজিদ থেকে বেরোতে বেরোতে সন্ধ্যা পুরোপুরি নেমে এসেছে। চারদিকে বৈদ্যুতিক আলোর ঝলকানি। পাথুরে দেয়াল, খিলান, দরজা আর সুউচ্চ মিনার সেই আলোয় আরও গম্ভীর ও রাজকীয় হয়ে উঠেছে। এমন সময় এক তরুণ সালাম দিয়ে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল—“উড ইউ লাইক মি টু টেক সাম ফটোস?” একটু আলাপ হলো। নাম তার তালাত। কাসাব্লাঙ্কার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরাসি সাহিত্য পড়ে, আর প্রায়ই এখানে নামাজ পড়তে আসে। তার ছবি তুলে দেওয়ার প্রস্তাবে সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম। মসজিদের প্রবেশপথের সামনে দাঁড়িয়ে তালাত নানা দিক থেকে বেশ কয়েকটি ছবি তুলল। তারপর মোবাইলটা ফেরত দিয়ে বলল, “ইফ ইউ ডোন্ট লাইক দেম, আই ক্যান টেক সাম মোর।” অচেনা এক শহরে সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন তরুণের এমন আন্তরিকতা সত্যিই মন ছুঁয়ে গেল।

তালাতকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিয়ে মসজিদের বাঁ পাশ ধরে আটলান্টিক মহাসাগরের দিকে এগোলাম। সমুদ্রের ধারে বসার জন্য সারি করে রাখা কয়েকটি বেঞ্চ। বাতাস আর ঢেউ ভাঙার শব্দের মধ্যে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইলাম। সামনে আটলান্টিকের অন্ধকার জলরাশি, আর ডান দিকে মুখ ঘোরালেই আলোয় ভেসে থাকা হাসান দ্বিতীয় মসজিদ। সমুদ্রের দিক থেকে মসজিদটির চেহারা অন্য রকম। বিশাল ভবনটি যেন সমুদ্রের একেবারে কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে, আর তার মিনার অন্ধকার আসমান ভেদ করে অনেক ওপরে উঠে গেছে। চারপাশের আলো পানির ওপর পড়ে থিরথির করে কাঁপছে।

ধীরে ধীরে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। কয়েক কদম পরপরই পেছনে ফিরে তাকাচ্ছিলাম। আহা, এই শহরের বাসিন্দা হলে প্রতিদিন অন্তত এক ওয়াক্ত নামাজ পড়তে এখানে চলে আসতাম। শুধু ধর্মীয় কারণে নয়। এত বিশাল একটি স্থাপনার সামনে দাঁড়ালে মানুষের কল্পনাশক্তি, কারিগরি দক্ষতা আর হাজার হাজার কর্মীর সম্মিলিত শ্রমের কথা ভেবে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না। মানুষ তার মনে যা কল্পনা করতে পারে, কখনো কখনো পাথর, কাঠ, মোজাইক আর আলো দিয়ে তাকে বাস্তবে কত বিশাল করে তুলতে পারে!