এআইটি জীবনের স্মৃতি: রান্না, অপ্রত্যাশিত ভুল ও বেঁচে যাওয়ার গল্প

মতিউর রহমান: এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ২০০২-এর জানুয়ারি সেশনে আমরা নতুন বাংলাদেশি ছাত্ররা তখন আবদুল ওহাবের তত্ত্বাবধানে থাইল্যান্ডে জীবনযাপনের সুবিধাজনক উপায় খুঁজতে ব্যস্ত। থাইল্যান্ডে পৌঁছে তিন দিন খেতে পারিনি। বিশাল ক্যান্টিনে ঢুকতেই অন্য রকম গন্ধ। একেক বার একেক রকম ডিশের অর্ডার আর প্লেটটা নিয়ে টেবিলে বসে শুধু চেষ্টা মাত্র। এর মধ্যে আমাদের তিনজন বাংলাদেশি ছাত্র তিন রুমের ফ্ল্যাট (ভিলেজ নামে পরিচিত) বরাদ্দ পেলাম। তৎক্ষণাৎ আবদুল ওহাবের নেতৃত্বে স্থানীয় তালাততাই মার্কেট থেকে হাঁড়ি-পাতিল, চাল-ডালসহ রান্নার তৈজসপত্র কিনে এনে জীবনে প্রথমবারের মতো রান্না। কোনো রকম মশলা ছাড়া শুধু পেঁয়াজ, রসুন, মরিচের গুঁড়া আর হলুদের গুঁড়া দিয়ে গরুর মাংস রান্না করলাম। খাওয়ার সময় মনে হচ্ছিল যেন কত যুগ পর ভাত খাচ্ছি। আবদুল ওহাবকে ধন্যবাদ; আর এটা তাঁর দায়িত্বও বটে, কারণ তিনি এআইটি, বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের প্রেসিডেন্ট। তিনি আমাদের সঙ্গে মেসে করে খেতে চাইলেন এবং মেসে রান্নার জন্য ‘কানচি’ নামের একজন থাই লেডি ঠিক করে দিলেন।

এবার আবদুল ওহাব আমাদেরকে নিয়ে ‘ফিউচার পার্ক’ নামক শপিং কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলেন। সেখানে নাকি অনেক কিছু বাল্ক (Bulk) হিসেবে সস্তায় পাওয়া যায়। অনেক কিছুর মধ্যে আবদুল ওহাব আমাদের জন্য এক বস্তা নুডুলস কিনলেন। ইনস্ট্যান্ট নুডুলস, তাই খিদে পেলে খুব সহজেই খিদে মেটানো যাবে। সেদিন ভিলেজে ফিরে এসে দেখি কাজের বুয়া কানচি তখনও রান্নার জন্য আসে নাই। এখন একমাত্র ভরসা সদ্য কেনা ইনস্ট্যান্ট নুডুলস। আমি পাত্রে পানি গরম করলাম আর আবদুল ওহাব বস্তা কেটে কয়েকটা প্যাকেট নিয়ে রান্নাঘরে হাজির। প্যাকেট কেটে ফুটন্ত পানিতে ঢালতেই আমার চোখ ছানাবড়া! হায় আল্লাহ, এতো চিপস! এতগুলো চিপসের এখন কী হবে! যাকগে!

এক শুক্রবারের দিনে ক্লাস শেষে ১টার দিকে ভিলেজে ফিরে বাইসাইকেলে তালা মারছি। এমন সময় পিছন ফিরে দেখি একজন বাঙালি ভাবি খুবই রাগান্বিত হয়ে আমাকে বলছেন, “শুক্রবার জুমার নামাজ পড়তে যান নাই? আপনাকে তো পিটানো দরকার!” ঈষৎ হেসে ব্যাপারটা হালকা করে নিলাম। আবাসিক এলাকায় হাঁটাহাঁটি করা দুই বাচ্চার সঙ্গে বাংলায় কথা বলে তাদের হাতে কয়েকটি সেই চিপসের প্যাকেট তুলে দিলাম।

পরের দিন দরজায় নক। দরজা খুলতেই দেখি আমাদের সেই ভাবি লাঠি হাতে দরজায় দাঁড়িয়ে! চিপসের প্যাকেট দেখিয়ে আমাকে বললেন, “এই হারাম খাবার আমার বাচ্চাকে দিয়েছেন কেন?”

আমি বললাম, “হারাম মানে!”

তিনি প্যাকেটের গায়ে কাঁকড়ার ছবি দেখিয়ে কড়া ভাষায় কিছু কথা শুনিয়ে দিলেন। আমি ক্ষমা প্রার্থনা করলাম এবং সতর্ক হয়ে গেলাম। এটা আমার দ্বিতীয় অপরাধ (Offense)। আর একবার হলেও লাঠির আঘাত আমার মাথায় পড়বে, কেউ ঠেকাতে পারবে না।

সুতরাং তৃতীয় কোনো ভুল না করে দুই সেমিস্টার শেষ করে তৃতীয় সেমিস্টার শুরু করলাম। এই সেমিস্টারে অতিরিক্ত চাপ হচ্ছে থিসিস প্রপোজাল (Thesis Proposal) জমা দেওয়া এবং ওকে করা। আমরা যারা দেশে সরকারি চাকরি করে ৩৫/৩৬ বছর বয়সে এখানে ডিগ্রির জন্য আসি, তাদের জন্য অসুবিধা হচ্ছে কম্পিউটারে দক্ষতার অভাব (Un-skilfulness in computer knowledge)। একদিন দেখি আমাদের সেই ভাবির গোবেচারা স্বামীর কপালে অনেকগুলো আঘাতের দাগ। কারণ জিজ্ঞেস করা উচিত নয়। পরে জানতে পারলাম, ভাবির স্বামী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তিনি আর ডিগ্রি কন্টিনিউ করবেন না এবং দেশে ফিরে যাবেন। তাই ভাবি পাগল হয়ে স্বামীর চুল ধরে মাথা দেওয়ালে বারবার চেপে ধরে উচ্চস্বরে চিৎকার করছেন, “তুই ডিগ্রি কমপ্লিট করবি, তারপর দেশে যাবি!”

আমি মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলাম— হে আল্লাহ, তুমি আমার ইজ্জত রক্ষা করেছ! আমি তৃতীয় কোনো ভুল করি নাই। আমিন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *