বাড়ি কেনা কঠিন, ভাড়াও চড়া: অস্ট্রেলিয়ার তরুণদের জীবনে বড় পরিবর্তন

২০০১ সালে এই হার ছিল ৩৯ শতাংশ। আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার সঙ্গে তরুণদের স্বাধীনভাবে বসবাসের পথ কঠিন হয়ে উঠছে। অস্ট্রেলিয়ার ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের প্রায় অর্ধেক এখনো বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাস করছেন। ২০২৪ সালে এই হার দাঁড়িয়েছে ৫০ শতাংশে, যেখানে ২০০১ সালে ছিল ৩৯ শতাংশ। অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘমেয়াদি Household, Income and Labour Dynamics in Australia (HILDA) জরিপের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেশের মানুষের জীবনযাত্রা, আবাসন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, আর্থিক চাপ ও পারিবারিক সম্পর্কের বিভিন্ন পরিবর্তনের এই চিত্র উঠে এসেছে। HILDA হলো অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক গবেষণাগুলোর একটি। ২০০১ সাল থেকে একই জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৭ হাজার মানুষকে অনুসরণ করে আসছে এই জরিপ। ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে ২০০১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

তরুণদের বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকার প্রবণতা বাড়ছে: প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী অস্ট্রেলীয়দের অর্ধেক বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাস করছিলেন। দুই দশকেরও বেশি আগে, ২০০১ সালে এই হার ছিল ৩৯ শতাংশ। যেসব তরুণ বাবা-মায়ের বাড়ি ছেড়েছেন, তাঁদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ব্যক্তিগত ভাড়া বাসায় থাকছেন। তবে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকা বা নিজের বাড়ির মালিক হওয়ার তুলনায় তরুণ ভাড়াটিয়াদের মধ্যে আবাসন নিয়ে অসন্তুষ্টি ও অপর্যাপ্ত আবাসনের অভিযোগ বেশি।

বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার বড় শহরগুলোর তরুণ ব্যক্তিগত ভাড়াটিয়াদের মধ্যে ২৫.৩ শতাংশ আবাসন-সংক্রান্ত আর্থিক চাপে রয়েছেন। ২০০১ সালে একই বয়সী গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই হার ছিল ১৭.৬ শতাংশ। অন্যদিকে, তরুণদের মধ্যে যারা বাড়ি কিনে ঋণ নিয়েছেন, তাঁদের আবাসন-সংক্রান্ত চাপ গত দুই দশকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। ২০০১ সালে এই হার ছিল ৮.৬ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৯.৯ শতাংশ।
প্রতিবেদনটির লেখকেরা মনে করছেন, এর একটি সম্ভাব্য কারণ হলো—তরুণদের মধ্যে বাড়ির ঋণ পাওয়ার সুযোগ ক্রমেই বেশি সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে তুলনামূলক বেশি আয়, বড় সঞ্চয় অথবা পারিবারিক সম্পদের সহায়তা পাওয়া তরুণদেরই বাড়ির মালিক হওয়ার সুযোগ বেশি হচ্ছে।

অর্ধেক কর্মী মনে করেন, তাঁরা চাকরির জন্য অতিরিক্ত শিক্ষিত: HILDA জরিপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, অস্ট্রেলিয়ার প্রায় অর্ধেক কর্মী মনে করেন তাঁদের বর্তমান চাকরির জন্য তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি। এ ছাড়া প্রায় এক-চতুর্থাংশ কর্মী মনে করেন, তাঁদের দক্ষতাও চাকরির প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। তরুণ কর্মীদের মধ্যে—বিশেষ করে ২৫ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে—এই প্রবণতা বেশি। বিক্রয়কর্মী ও শ্রমিকদের মতো কিছু পেশায় এবং আবাসন ও খাদ্যসেবা খাতে এই ধরনের ‘job mismatch’ বেশি দেখা যায়।

HILDA-এর প্রধান লেখক ড. ইঙ্গা লাস বলেন, অস্ট্রেলিয়ার কর্মীদের ৫০ শতাংশ নিজেদের চাকরির জন্য অতিরিক্ত শিক্ষিত মনে করছেন। তাঁর মতে, এর অর্থ হলো গত কয়েক দশকে মানুষের শিক্ষাগত যোগ্যতা বাড়লেও শ্রমবাজার মোটামুটি সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি প্রয়োজন এমন চাকরির সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে, অন্যদিকে Year 11 বা তার কম শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজন এমন চাকরির সংখ্যা কমেছে।

অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও যোগ্যতার সঙ্গে চাকরির মিল নেই: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইংরেজিভাষী নয় এমন দেশে জন্ম নেওয়া মানুষ এবং casual employment contract-এ কাজ করা ব্যক্তিদের মধ্যে নিজেদের চাকরির তুলনায় বেশি শিক্ষিত বা বেশি দক্ষ মনে করার সম্ভাবনা বেশি। চাকরির যোগ্যতা ও কাজের প্রয়োজনীয়তার মধ্যে এই অসামঞ্জস্য কম চাকরির সন্তুষ্টি ও জীবন সন্তুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত। পাশাপাশি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।

নারীদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা দ্রুত বেড়েছে: গত ২৫ বছরে অস্ট্রেলীয় নারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। ২৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী নারীদের অর্ধেকেরও বেশি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী। একই বয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৪০ শতাংশ। ৬৫ বছরের নিচের প্রায় সব বয়সী গোষ্ঠীতেই নারীদের গড় শিক্ষাগত যোগ্যতা পুরুষদের তুলনায় বেশি। তবে Year 12 শেষ না করা ২৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রে পূর্ণকালীন কর্মসংস্থান কমেছে। ২০০১ সালে তাঁদের পূর্ণকালীন চাকরির হার ছিল ৭০ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে কমে ৬৩ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে শ্রমবাজারের বাইরে থাকা মানুষের হার ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ শতাংশ হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক নিয়ে ভালো খবর: সব খবর অবশ্য নেতিবাচক নয়। HILDA জরিপে দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে থাকা অধিকাংশ অস্ট্রেলীয় তাঁদের সম্পর্ককে শক্তিশালী বলে মনে করেন। তবে বিভিন্ন সূচকে পুরুষরা নারীদের তুলনায় কিছুটা বেশি সম্পর্ক-সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। ভালোবাসা-সংক্রান্ত প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক উত্তর পাওয়া গেছে। তবে সঙ্গী তাঁদের প্রয়োজন কতটা পূরণ করছেন এবং সম্পর্কটি শুরুতে যে প্রত্যাশা ছিল তা কতটা পূরণ করেছে—এই প্রশ্নগুলোতে তুলনামূলক কম নম্বর পাওয়া গেছে। গৃহস্থালির কাজ, সন্তান দেখাশোনা এবং উপার্জন তুলনামূলক সমানভাবে ভাগ করে নেওয়া দম্পতিদের সম্পর্কের সন্তুষ্টির সঙ্গে ইতিবাচকভাবে সম্পর্কিত।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসন নিয়ে চাপ: ২০২৪ সালে HILDA জরিপের অধিকাংশ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল জুলাই থেকে অক্টোবরের মধ্যে। ওই সময় মূল্যস্ফীতি, ভাড়া এবং সুদের হার মানুষের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করেছিল। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভোক্তা মূল্যসূচক প্রায় ১৯.৫ শতাংশ বেড়েছিল। একই সময়ে ভাড়া মূল্যসূচক বেড়েছিল প্রায় ১৬.৮ শতাংশ।
HILDA-এর তথ্য বলছে, কর্মসংস্থান শক্তিশালী থাকলেও মজুরি বৃদ্ধির গতি জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসন ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারেনি। ফলে অনেক মানুষের আর্থিক চাপ বেড়েছে। ২০২৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার ঘণ্টাভিত্তিক নারী-পুরুষের মজুরি ব্যবধান ছিল ১০.২ শতাংশ, যা ২০০১ সালের পর দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। তবে পূর্ণকালীন চাকরিতে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো পুরুষদের তুলনায় অনেক কম—নারীদের ৪৩ শতাংশের বিপরীতে পুরুষদের ৭০ শতাংশ।

HILDA-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অস্ট্রেলিয়ার জীবনে একই সঙ্গে কিছু ইতিবাচক ও নেতিবাচক পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেছে। একদিকে কর্মসংস্থান উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, নারীদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় বড় অগ্রগতি হয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের সন্তুষ্টি বেশ শক্তিশালী।
অন্যদিকে তরুণদের বাবা-মায়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন থাকা, বাড়িভাড়া ও আবাসন ব্যয়, জীবনযাত্রার ব্যয়, আর্থিক চাপ এবং চাকরির সঙ্গে শিক্ষাগত যোগ্যতার অসামঞ্জস্য—এসব সমস্যা মানুষের জীবনে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

উৎস: ABC News, HILDA Survey 2026