নাজমীন মর্তুজা: “মানুষ তার নিজের সুখের চেয়ে অন্যের দুঃখে অনেক সময় বেশি তৃপ্তি পায়।”- আর্থার শোপেনহাওয়ার। অসাধারণ একটি কথা বলেছেন । আমরা নিজেদের শিক্ষিত বলি, সভ্য বলি, আধুনিক বলি। তবু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যঘর, পারিবারিক আড্ডা কিংবা প্রবাসী কমিউনিটির ক্ষুদ্র রাজনীতি আমাদের বারবার এক অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আমরা অনেকেই অন্যের সাফল্যে অস্বস্তি বোধ করি, আর অন্যের ব্যর্থতায় কোথাও যেন এক ধরনের গোপন আনন্দ পাই।
কিন্তু কেন এমনটা আমাদের ভেতরে পুষি? এই প্রশ্নটি শুধু নৈতিক নয় এটি মনস্তত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব এবং ইতিহাসেরও প্রশ্ন। অন্যের দুঃখে আনন্দ মনস্তত্ত্বের ভাষায় যদি বলি তবে জার্মান ভাষায় একটি শব্দ আছে Schadenfreude। অর্থাৎ, অন্যের দুর্ভাগ্যে গোপন আনন্দ লাভ করা। এটি কেবল বাঙালির সমস্যা নয় এটি মানুষের এক পুরোনো, প্রায় সার্বজনীন মানসিক প্রবণতা। তবে কোনো সমাজে যখন দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাহীনতা, প্রতিযোগিতা, সামাজিক বৈষম্য এবং স্বীকৃতির অভাব জমে থাকে, তখন এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। যে মানুষ নিজের জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট নয়, সে অন্যের সাফল্যকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নয়, নিজের ব্যর্থতার আয়না হিসেবে দেখে। তখন অন্যের পতন তাকে সাময়িক স্বস্তি দেয় যেন নিজের ক্ষতটা একটু কম জ্বালা করছে।
ফরাসি দার্শনিক রেনে জিরার একটা কথা মনে পড়লো এই প্রসঙ্গে । “ মানুষ অনেক সময় কোনো কিছু চায় না সে চায় অন্যের যা আছে, তা।” নিপাট সত্য । অর্থাৎ, আমাদের অনেক আকাঙ্ক্ষাই আসলে তুলনা থেকে জন্ম নেয়। বাঙালি সমাজে এই প্রবণতা কেন এত দৃশ্যমান? এখানে ইতিহাসের ভূমিকা আছে।
বাঙালি সমাজ দীর্ঘদিন ঔপনিবেশিক শাসন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সীমিত সামাজিক সুযোগের মধ্যে বেড়ে উঠেছে। ফলে সামাজিক স্বীকৃতি, শিক্ষা, চাকরি বা মর্যাদা সবকিছুই এক ধরনের সংকীর্ণ প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
সমাজতাত্ত্বিক পিয়েরে বুর্দিয়ুর একটা বই পড়ে জেনেছিলাম “মানুষ শুধু অর্থের জন্য লড়ে না সে সামাজিক পুঁজি এবং প্রতীকী মর্যাদা অর্জনের জন্যও লড়ে।” গভীর ভাবে ভেবে দেখলে বোঝা যায় তাই তো ! অনেক সময় অন্যের সাফল্য আমাদের কাছে নিজের অবস্থানের প্রতি হুমকি বলে মনে হয়। ফলে আমরা বলি—ও তো ভাগ্যবান। ওর পেছনে নিশ্চয়ই কেউ আছে। দেখি, কতদিন টেকে! এ যেন সাফল্যকে ছোট করে নিজের আত্মসম্মান বাঁচানোর এক অচেতন কৌশল।
আমরা শিক্ষিত, কিন্তু উদার নই কেন?
আমরা জেনে এসেছি শিক্ষা সবসময় মনকে প্রসারিত করে না। ডিগ্রি মানুষকে দক্ষ করতে পারে, কিন্তু উদার করে না। জ্ঞান তথ্য দিতে পারে, কিন্তু আত্মসমালোচনা শেখায় না। এই জন্যই বুঝি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।” কিন্তু আমরা অনেক সময় মানুষের প্রতি বিশ্বাসের চেয়ে সন্দেহকে বেশি লালন করি। আমরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করি, কিন্তু মানসিকভাবে অনেক ক্ষেত্রেই এখনও সামন্ততান্ত্রিক। আমরা স্বাধীনতা চাই, কিন্তু অন্যের স্বাধীনতা মেনে নিতে কষ্ট হয়। আমরা প্রশংসা চাই, কিন্তু অন্যকে প্রশংসা করতে কুণ্ঠিত হই। এটাই আমাদের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড।
পরশ্রীকাতরতা কি বাঙালির জাতিগত বৈশিষ্ট্য?
আমি বলবো না।
কোনো জাতি জন্মগতভাবে ঈর্ষাপরায়ণ নয়। তবে প্রতিটি সমাজের কিছু ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রবণতা থাকে। বাঙালি সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক অহং, সামাজিক তুলনা, পারিবারিক প্রতিযোগিতা এবং লোক কী বলবে সংস্কৃতি এক ধরনের স্থায়ী মানসিক চাপ তৈরি করেছে।
আমরা ছোটবেলা থেকেই শিখি
অমুকের ছেলে প্রথম হয়েছে।
তমুকের মেয়ে বিদেশে গেছে।
অর্থাৎ, আমাদের পরিচয় প্রায়ই নিজের অর্জনের মাধ্যমে নয়, অন্যের সঙ্গে তুলনার মাধ্যমে নির্মিত হয়।
এই তুলনার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে ঈর্ষা, ক্ষোভ এবং গোপন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নেয়।
আমরা অন্যের দুঃখে আনন্দ পাই কেন?
কারণ অন্যের পতন আমাদের নিজেদের অপূর্ণতাকে সাময়িকভাবে কম কষ্টদায়ক করে তোলে। যে মানুষটি সবার চেয়ে সফল ছিল, সে যদি হোঁচট খায়, তখন আমরা মনে করি দেখো, সেও আমাদের মতোই।
এটি নিষ্ঠুর, কিন্তু গভীরভাবে মানবিকও।
এ প্রসঙ্গে নিটশের এই কথাটা অনেক সত্য -যে নিজেকে অতিক্রম করতে পারে না, সে অন্যকে নিচে নামানোর চেষ্টা করে।
অন্যকে নিচে নামানো সহজ নিজেকে উন্নত করা কঠিন। এই বানী চিরন্তন শুনেই তো শৈশব থেকে বুড়ো হলেও আমাদের বোধদ্বয় হয় না ।
তাহলে মুক্তির পথ কী?
সম্ভবত উত্তরটি সহমর্মিতায়।
একটি পরিণত সমাজ অন্যের সাফল্যকে নিজের পরাজয় মনে করে না। বরং তাকে সম্ভাবনার প্রমাণ হিসেবে দেখে। কারণ অন্যের আলো আমার আলোকে নিভিয়ে দেয় না। একটি প্রদীপ থেকে হাজার প্রদীপ জ্বলে উঠলেও প্রথম প্রদীপের আলো কমে যায় না।
সমস্যা বাঙালির ভেতরে নয় সমস্যা আমাদের দীর্ঘদিনের অনিরাপত্তা, তুলনার সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের সংকটে।
আমরা শিক্ষিত হয়েছি, কিন্তু নিজেদের ভেতরের ক্ষতগুলোকে বুঝতে শিখিনি। তাই আজও অন্যের আনন্দে আমাদের মুখে হাসি থাকলেও, অন্তরে অনেক সময় অস্বস্তি জন্মায়; অন্যের দুঃখে আমরা সমবেদনা জানালেও, কোথাও কোথাও এক গোপন স্বস্তি কাজ করে। সভ্যতার প্রকৃত পরীক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিতে নয় বরং এই প্রশ্নে।
অন্যের সাফল্যে আমি কতটা আনন্দিত হতে পারি, এবং অন্যের পতনে আমি কতটা মানবিক থাকতে পারি।
কারণ যে সমাজ অন্যের দুঃখে আনন্দ খুঁজে পায়, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজেরই ক্ষত তৈরি করে। আর যে সমাজ অন্যের আলোকে উদযাপন করতে শেখে, সে সমাজই সত্যিকার অর্থে সভ্য হয়ে ওঠে। অন্যের পতনে হাসা সমাজ একদিন নিজেরই ভবিষ্যৎকে কাঁদায়।

*ব্যবহৃত ছবির উৎস: AI