দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়াজুড়ে বাড়ির দাম কমতে শুরু করেছে। নতুন পরিসংখ্যান বলছে, রাজ্যের দীর্ঘদিনের আবাসন মূল্যবৃদ্ধির ধারা এখন হঠাৎ করেই থেমে গেছে। প্রপট্র্যাক (PropTrack)-এর একচেটিয়া মূল্যায়ন তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার ১০০টিরও বেশি শহর ও উপশহরে বাড়ির দাম কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ফেডারেল বাজেটে ঘোষিত কর সংস্কারের প্রাথমিক প্রভাবের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জুন প্রান্তিকে অ্যাডিলেডের ৩৩০টি বাড়ির উপশহরের মধ্যে প্রায় ৯০টিতে এবং ১২৮টি ইউনিট-প্রধান উপশহরের মধ্যে ৩৬টিতে সম্পত্তির মূল্য কমেছে। অন্যদিকে, আঞ্চলিক দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। সেখানে ৬২টি এলাকার মধ্যে মাত্র ৬টিতে বাড়ির দাম এবং ৫টি ইউনিট বাজারের মধ্যে মাত্র একটিতে মূল্যহ্রাস দেখা গেছে।
সবচেয়ে বড় মূল্যপতন হয়েছে গিলবার্টন (Gilberton) এলাকায়। সেখানে মধ্যম বাড়ির দাম ৯ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭১ ডলারে। এরপর রয়েছে রোজওয়াটার (Rosewater), সোমারটন পার্ক (Somerton Park) এবং সেমাফোর পার্ক (Semaphore Park)—এসব এলাকায় বাড়ির দাম ৫ শতাংশ কমেছে। একইভাবে হোভ (Hove) এবং নর্থ হেভেন (North Haven) এলাকায় ইউনিটের দামও ৫ শতাংশ কমেছে।
প্রপট্র্যাকের স্বয়ংক্রিয় মূল্যায়ন মডেল (Automated Valuation Model) বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্পত্তির সম্ভাব্য বাজারমূল্য নির্ধারণ করে। এর মধ্যে পূর্ববর্তী বিক্রির ইতিহাসসহ নানা ধরনের তথ্য ব্যবহার করা হয়।
REA Group-এর জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ অ্যান ফ্ল্যাহার্টি (Anne Flaherty) বলেন, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় কয়েক বছর ধরে রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির পর এখন দাম কমতে শুরু করলেও তা অপ্রত্যাশিত নয়। তবে এটি অনেকের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তার মতে, বর্তমানে সম্পত্তির বাজারে একাধিক চাপ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে- মূলধনী মুনাফা কর (Capital Gains Tax) ও নেগেটিভ গিয়ারিং (Negative Gearing) সংক্রান্ত পরিবর্তন, যা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। সুদের হার বৃদ্ধির ফলে ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা কমে যাওয়া। সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। আবাসনের ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতিজনিত ক্রয়ক্ষমতার সংকট। তিনি বলেন, “মানুষের মনে এখন অনেক ধরনের অর্থনৈতিক উদ্বেগ কাজ করছে। ফলে বাড়ির দামের বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়ে গেছে, আর অ্যাডিলেডে সেটি বিশেষভাবে চোখে পড়ছে।”
ফ্ল্যাহার্টির মতে, তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী বা জীবনযাত্রার মান ভালো—এমন এলাকাগুলো এখন পর্যন্ত ভালো অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, “সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় মানুষ আগের মতো বড় ঋণ নিতে পারছে না। তাই অনেকেই তুলনামূলক সস্তা এলাকায় বাড়ি খুঁজছেন।” তার ধারণা, বাজার পুরোপুরি স্থিতিশীল হতে এখনও সময় লাগবে এবং ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধজুড়েই বাড়ির দাম আরও কিছুটা কমতে পারে।
অন্যদিকে, রিয়েল এস্টেট ইনস্টিটিউট অব সাউথ অস্ট্রেলিয়া (REISA)-এর প্রধান নির্বাহী অ্যান্ড্রিয়া হেডিং (Andrea Heading) বলেন, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় মূল্যহ্রাস হলেও তা অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় অনেক কম। পাশাপাশি ক্রেতাদের আগ্রহ এখনও যথেষ্ট রয়েছে। তিনি বলেন, “অনেক মানুষ এখনও তাদের সম্পত্তি বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং বাজারে ক্রেতার চাহিদাও বজায় রয়েছে।” তার মতে, বর্তমানে যে মূল্যহ্রাস দেখা যাচ্ছে, তার একটি অংশ মৌসুমি কারণেও হতে পারে। বসন্তকালে (Spring Selling Season) বিক্রয় মৌসুম শুরু হলে বাজার আবারও চাঙা হতে পারে।
যদিও মূল্যহ্রাস অনেক বাড়ির মালিকের জন্য হতাশাজনক, তবে কিছু এলাকার জন্য খবরটি ইতিবাচক। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার রিভারল্যান্ড অঞ্চলের ওয়াইকারি (Waikerie) শহরে গত তিন মাসে সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। সেখানে মধ্যম বাড়ির দাম ৯ শতাংশ বেড়ে ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৩৮৮ ডলারে পৌঁছেছে। এরপর রয়েছে পোর্ট পিরি সাউথ (Port Pirie South) এবং সেন্ট মরিস (St Morris)—দুই এলাকাতেই দাম বেড়েছে ৮ শতাংশ। এছাড়া মরফেট ভেল (Morphett Vale) এলাকায় বাড়ির দাম ৩ শতাংশ এবং পোর্ট নোয়ারলুঙ্গা সাউথ (Port Noarlunga South)-এ ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এটি স্বস্তির খবর এনে দিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত দম্পতি জেমস ও জেনি ম্যাককাহন-এর জন্য। তারা সম্প্রতি মরফেট ভেলের পারিবারিক বাড়ি বিক্রি করে পোর্ট নোয়ারলুঙ্গা সাউথের সানসেট (Sunset) আবাসন প্রকল্পে নতুন বাড়িতে উঠেছেন।
জেমস ম্যাককাহন বলেন, “আমরা নিজেদের সত্যিই ভাগ্যবান মনে করি। মরফেট ভেলের বাড়িটির জন্য খুব ভালো দাম পেয়েছি। যদি আরও এক বছর পরে বিক্রি করতাম, হয়তো এমন দাম পেতাম না।” জেনি ম্যাককাহন বলেন, “পোর্ট নোয়ারলুঙ্গা সাউথে গত তিন মাসে সম্পত্তির মূল্য বেড়েছে দেখে আমরা খুবই খুশি। সম্ভবত এখানে নতুন নতুন আবাসিক প্রকল্প গড়ে ওঠার কারণেই এই প্রবৃদ্ধি হয়েছে।” তারা ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য নতুন বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া সরকারের স্ট্যাম্প ডিউটি ছাড়ের সুবিধাও নিয়েছেন। ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত মূল্যের নতুন বাড়ির ক্ষেত্রে এই সুবিধার আওতায় তারা প্রায় ৫০ হাজার ডলার স্ট্যাম্প ডিউটি সাশ্রয় করেছেন এবং মাত্র ১০ হাজার ডলার অগ্রিম (ডিপোজিট) দিয়ে নতুন বাড়িটি কিনতে সক্ষম হয়েছেন।
বাংলাদেশি ও ক্যাল্ড (CALD) সম্প্রদায়ের জন্য এর অর্থ কী? যারা প্রথমবারের মতো দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ি কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য বাজারের এই শীতলতা নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, বর্তমান বাড়ির মালিকদের জন্য সম্পত্তির মূল্য স্বল্পমেয়াদে কিছুটা চাপের মুখে পড়লেও, বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘমেয়াদে বাজারের মৌলিক চাহিদা শক্তিশালী থাকবে বলে মনে করছেন।
তথ্যসূত্র: PropTrack Quarterly Home Values (June Quarter 2026) এবং The Advertiser (১৮ জুলাই ২০২৬)।