অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় আবাসন বাজারে জুন মাসে মূল্য হ্রাস ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় মাসিক পতন হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে গবেষণা সংস্থা Cotality। জুন মাসে দেশজুড়ে গড় বাড়ির মূল্য ০.৪ শতাংশ কমেছে, যা ২০২২ সালের ডিসেম্বরের পর সর্বোচ্চ মাসিক পতন। সিডনি ও মেলবোর্ন এই পতনের নেতৃত্ব দিয়েছে, অন্যদিকে ব্রিসবেন, পার্থ এবং অ্যাডিলেডে আগের তুলনায় বৃদ্ধির গতি কমে গেছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সুদের হার, দুর্বল ভোক্তা আস্থা এবং করনীতির পরিবর্তনের কারণে আগামী মাসগুলোতেও আবাসন বাজারে দুর্বলতা অব্যাহত থাকতে পারে। গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় মাসিক পতন দেখা গেছে, কারণ সিডনি ও মেলবোর্ন থেকে শুরু হওয়া বাজারের ধীরগতি এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।
সম্পত্তি তথ্য সংস্থা Cotality-এর তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে জাতীয়ভাবে আবাসন মূল্য ০.৪ শতাংশ কমেছে। সিডনিতে সর্বোচ্চ পতন হয়েছে—১.২ শতাংশ, আর মেলবোর্নে কমেছে ১ শতাংশ। আগে দ্রুত বেড়ে ওঠা ব্রিসবেন ও পার্থের বাজার এখনও বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে সেই গতি অনেক কমে গেছে। অ্যাডিলেডে দাম প্রায় স্থবির ছিল, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে অধিকাংশ রাজধানী শহরে বাজারের গতি কমছে।
Cotality-এর গবেষণা প্রধান জেরার্ড বার্গ বলেন, এই জুনের পরিসংখ্যান বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা কয়েক মাসের ধীরগতির পর এসেছে। তিনি বলেন, একটি “perfect storm” বা একাধিক নেতিবাচক পরিস্থিতি একসঙ্গে বাজারের চাহিদাকে প্রভাবিত করছে—যা সুদের হার বৃদ্ধির আগেই শুরু হয়েছিল। “সুদের হার বাড়ার আগেই আমরা দেখেছি ক্রয়ক্ষমতা একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল,” তিনি বলেন।
“এরপর আমরা তিনটি সুদের হার বৃদ্ধি দেখেছি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে, ভোক্তা আস্থা কমেছে, পাশাপাশি কর পরিবর্তনের প্রভাবও এসেছে—সব মিলিয়ে এই পতন তৈরি হয়েছে।”
নতুন তথ্য অনুযায়ী, আগের তুলনায় বাজার আরও দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। Cotality এখন বলছে, জাতীয় আবাসন বাজারের সর্বোচ্চ মূল্য দেখা গিয়েছিল মার্চ মাসে। জুন প্রান্তিকে বাড়ির মূল্য মোট ০.৭ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে REA Group-এর PropTrack-এর একটি আলাদা সূচকে বলা হয়েছে, জুন মাসে জাতীয়ভাবে বাড়ির দাম ০.৩ শতাংশ কমেছে, যা টানা তৃতীয় মাসের পতন।
সিডনি ও পার্থে সবচেয়ে বেশি পতন দেখা গেছে—০.৫ শতাংশ, এরপর মেলবোর্ন ও ক্যানবেরা—প্রতিটিতে ০.৪ শতাংশ করে কমেছে। তবে আঞ্চলিক এলাকায় দাম মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। সব তথ্যই একই প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করছে—বাড়ির দাম কমছে। সিডনি ও মেলবোর্নে পতন সবচেয়ে বেশি হলেও অন্য শহরগুলোতে পরিস্থিতি ভিন্ন। ডারউইনে মাসিক ভিত্তিতে সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি হয়েছে—১.৪ শতাংশ, আর হোবার্টে বেড়েছে ০.৬ শতাংশ। বার্গ বলেন, এই পার্থক্যের মূল কারণ হলো প্রতিটি বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য। “কিছু শহরে বিক্রির জন্য বেশি বাড়ি রয়েছে, যেমন সিডনি—এ কারণে সেখানে দাম দ্রুত কমছে। অন্যদিকে ব্রিসবেন ও পার্থে সরবরাহ এখনও তুলনামূলকভাবে কম,” তিনি বলেন।
ওয়েস্টপ্যাকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ম্যাথিউ হাসানও একই মত দেন। তিনি বলেন, ব্রিসবেন, অ্যাডিলেড ও পার্থে বিক্রির জন্য বাড়ির সংখ্যা এখনও খুব কম। “কিছু ক্ষেত্রে আমরা বলছি বর্তমান তালিকার ভিত্তিতে মাত্র ১–২ মাসের বিক্রি রয়েছে, যেখানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজারে এটি ৪–৫ মাস হওয়া উচিত,” তিনি বলেন। কম ভাড়ার খালি থাকার হারও এই বাজারগুলোকে কিছুটা সমর্থন দিচ্ছে, যদিও সামগ্রিকভাবে বাজার ধীর হয়ে আসছে। অন্যদিকে সিডনি ও মেলবোর্ন আগে থেকেই বেশি দামে পৌঁছে গিয়েছিল, তাই সুদের হার বাড়ার প্রভাব সেখানে বেশি পড়ছে। তিনি বলেন, মাঝারি আকারের শহরগুলোতে দাম ধীর হবে, তবে বড় ধরনের পতন হওয়ার সম্ভাবনা কম। বার্গ বলেন, বাজারে একাধিক চাপ থাকলেও, করনীতির পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
হাসান বলেন, অনেক বিনিয়োগকারী এখন সিদ্ধান্ত নেওয়া স্থগিত রাখছেন, কারণ নতুন নিয়ম তাদের ভবিষ্যৎ আয়ের ওপর কী প্রভাব ফেলবে তা তারা বুঝতে চাইছেন।
ওয়েস্টপ্যাকে ইতিমধ্যে বিনিয়োগ ঋণের আবেদন প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। তিনি আরও বলেন, নতুন নিয়মে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের বিক্রি করার তাগিদ কম, তাই বড় ধরনের বাজার পতনের ঝুঁকিও সীমিত।
সরকারের বাজেটের উদ্দেশ্য ছিল বিনিয়োগকারীদেরকে পুরোনো বাড়ির বদলে নতুন নির্মাণে উৎসাহিত করা, যাতে আবাসন সরবরাহ বাড়ে। কিন্তু ওয়েস্টপ্যাকের তথ্য অনুযায়ী, এই পরিবর্তন এখনও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না। হাসান বলেন, বিনিয়োগ কমলেও নতুন নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়ার প্রমাণ এখনও নেই।
সিডনিভিত্তিক রোজওয়েল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী লুই বেনি বলেন, নির্মাণ খরচ, ঋণের সুদ এবং দাম কমে যাওয়া প্রকল্প বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলছে। “সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো—ডেভেলপাররা নির্মাণ করতে চায় না। আমরা অবশ্যই চাই,” তিনি বলেন। তিনি বলেন, নির্মাণ খরচ গত এক বছরে ২০–৩০ শতাংশ বেড়েছে, পাশাপাশি অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগছে। “বাজারে আস্থা নেই,” তিনি বলেন। “অনেক মানুষ, এমনকি বিনিয়োগকারীরাও পিছিয়ে গেছে।”
রোজওয়েলের ডেভেলপমেন্ট প্রধান বেঞ্জামিন ওং বলেন, সুদের হার বৃদ্ধির পর ক্রয়ক্ষমতা সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। “চাহিদা আছে, কিন্তু মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নেই,” তিনি বলেন।