অঞ্জন দত্তের ফেসবুক থেকে : অস্ট্রেলিয়া সফরটিকে এত সুন্দর ও সফল করে তোলার জন্য কোয়াসার সোনোমাটোগ্রামকে আন্তরিক ধন্যবাদ। সফরটি ছিল নিঃসন্দেহে ব্যস্ত ও পরিশ্রমসাধ্য। কিন্তু এমন সব সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে কাজ করতে পেরে ভীষণ ভালো লেগেছে, যাঁরা তাঁদের কাজকে আমার মতোই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। আমরা হোটেলের পরিবর্তে এয়ারবিএনবি বা ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্টে থাকতে পছন্দ করি। অবসর সময় কাটে সংগীত, চলচ্চিত্র আর শিল্প নিয়ে আলোচনায়। এ বছর অমিত আমাদের সফরে অতিরিক্ত মহড়ার সময়ও যুক্ত করেছে। আমরা সাধারণত আয়োজক কিংবা দর্শকদের সঙ্গে খুব বেশি সময় কাটাই না। আমাদের কাছে মূল বিষয়টি হলো মঞ্চের পরিবেশনা, আর সেখানে আমরা আমাদের সেরাটুকু দেওয়ার চেষ্টা করি।
আমার কাজই আমার সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। চলচ্চিত্র নির্মাণ, অভিনয় এবং লাইভ কনসার্ট—এই তিন মাধ্যমেই আমি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিবেদন করেছি। আমার কাজের ক্ষেত্র অনেক, কিন্তু আমার পরিচয় একটাই—আমি একজন শিল্পী।
সব সময় যে ভালো কাজ করতে পেরেছি, তা নয়। কিন্তু নিম্নমানের রুচি এবং মাঝারিত্বকে আমি সবসময় ঘৃণা করেছি। তরুণ বয়সে নিজেকে শিক্ষিত করার জন্য রাজনৈতিক তাত্ত্বিকদের অনেক লেখা পড়েছি। কিন্তু রাজনীতি কিংবা সামাজিক আন্দোলন থেকে সচেতনভাবেই দূরে থেকেছি। যত দিন ‘অরাজনৈতিক’ শব্দটি অভিধানে থাকবে, তত দিন আমি নিজেকে অরাজনৈতিকই বলতে চাই।
আমার অনেক বন্ধু আছেন, যারা সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এবং রাজনৈতিকভাবে সরব। আমি তাঁদের শ্রদ্ধা করি, সম্মান করি। কিন্তু আমি নিজেকে প্রকাশ করার পথ হিসেবে সব সময় শিল্পকেই বেছে নিয়েছি। আমার জীবনে বাদল সরকার এবং পরে মৃণাল সেনের মতো রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও প্রভাবশালী মানুষের কাছ থেকে শেখার সুযোগ হয়েছে, তাঁদের সঙ্গে জীবন ভাগ করে নেওয়ার সৌভাগ্যও হয়েছে। তবু আমি আমার অস্তিত্ববাদী বিশ্বাসের প্রতি সৎ থেকেছি। আমি যা নই, তা হওয়ার চেষ্টা করিনি।
কঠিন সময়েও আমি আমার বক্তব্য প্রকাশ করেছি আমার কাজের মাধ্যমে, মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিয়ে নয়। আমি সবসময় চেষ্টা করেছি ভালো সিনেমা, ভালো থিয়েটার এবং ভালো সংগীতের সঙ্গে যুক্ত থাকতে। নিম্নমানের ও অতি বাণিজ্যিক কাজ থেকে নীরবে দূরে থেকেছি। সব সময় সফল হইনি, কিছু ব্যর্থতা আছে। তবু আমি গর্বিত যে সংবেদনশীল, অর্থবহ ও বুদ্ধিদীপ্ত কাজের অংশ হতে পেরেছি।
আমি যখন শুরু করি, তখন আমার বয়স ছিল ২২ বছর। এখন আমার বয়স ৭৩। পেছনে তাকিয়ে এক ধরনের স্বস্তি অনুভব করি—কারণ এত চাপ, ভণ্ডামি, প্রতারণা, কৃত্রিমতা, নিম্নরুচির গণসংস্কৃতি এবং সহজে অর্থ উপার্জনের প্রলোভনের মধ্যেও আমি একটি নির্দিষ্ট মান ধরে রাখতে পেরেছি।
আমি এখনও সেই কলকাতার মূল্যবোধ বয়ে বেড়াই, যেখানে একজন বুদ্ধিজীবী কখনো সেলিব্রিটি হওয়ার জন্য ছুটতেন না। আমার স্কুল আমাকে কিছু মূল্যবোধ শিখিয়েছিল, যা ছিল আমার নিজের জন্য। আমি বড় হয়েছি ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়, দেখেছি জরুরি অবস্থা, প্রত্যক্ষ করেছি তিনটি ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, মৌলবাদের উত্থান, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাস। আবার অ্যানালগ যুগ থেকে ডিজিটাল যুগে উত্তরণের আনন্দও দেখেছি। আমি চেষ্টা করব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (AI) সহজে মেনে না নিতে।
আমি দেখেছি ষাট, সত্তর, আশি, নব্বই দশক এবং নতুন শতাব্দীর সেরা সময়গুলো। আমার শহর ছিল স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের দিক থেকে অসাধারণ সুন্দর। সেই শহর আমাকে নিজের মতো করে বাঁচার জায়গা দিয়েছে। আমার ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য নিয়ে আমি গর্বিত। একই সঙ্গে আরও বেশি গর্বিত আমার বহুভাষিক, বহুসাংস্কৃতিক দেশকে নিয়ে। আমি বাঙালি বলে গর্ববোধ করি, কারণ বাংলা ভাষা সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলেছে, কিন্তু আধুনিকতা হারায়নি।
আমি বিশ্বাস করি ঈশ্বর আছেন। আবার যারা বিশ্বাস করেন না, তাঁদের প্রতিও আমার সমান শ্রদ্ধা রয়েছে।
এখন আমার ভুঁড়ি হয়েছে, মাথার সব চুলও প্রায় হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু আমি আমার রসবোধ কখনো হারাতে চাই না এবং বার্ধক্যের জড়তার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে চাই।
আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং সব সময় আশার আলো খুঁজে ফিরব। সামাজিক আন্দোলনের কর্মীদের আমি সবসময় সম্মান করেছি, ভবিষ্যতেও করব। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি কখনো একজন আন্দোলনকর্মী হতে পারব না।
তবে একটি ব্যাপারে আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—মঞ্চে কিংবা পর্দায় যখনই দাঁড়াব, আমার সেরাটুকুই দেওয়ার চেষ্টা করব।
পৃথিবীর যেখানেই থাকুন, আমার সকল দর্শক-শ্রোতার প্রতি রইল আন্তরিক ভালোবাসা।
ভালো থাকুন, হাসিখুশি থাকুন। একটি সুন্দর প্রেমের গান আমাদের চোখে সবসময়ই জল এনে দেবে।