বাংলাদেশে উদ্ধার হওয়া রেহানা পারভিনের মৃত্যুকে ঘিরে অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশে চলমান তদন্তের মধ্যে নতুন মোড় নিয়েছে তার সম্পত্তি–সংক্রান্ত আইনি লড়াই। স্ত্রী রেহানা পারভিনের মৃত্যু সনদ জাল করার অভিযোগে অভিযুক্ত আওলাদ হোসেনকে যৌথ মালিকানাধীন তিনটি সম্পত্তি বিক্রির অনুমতি দেয়নি অস্ট্রেলিয়ার একটি আদালত। বৃহস্পতিবার ব্রিসবেন ম্যাজিস্ট্রেটস কোর্টে জামিনের শর্ত পরিবর্তনের আবেদন করেছিলেন আওলাদ হোসেন। তিনি আদালতের কাছে অনুরোধ করেছিলেন, কুইন্সল্যান্ডে অবস্থিত তার ও রেহানা পারভিনের যৌথ মালিকানাধীন তিনটি সম্পত্তি বিক্রির অনুমতি দেওয়া হোক। তবে ম্যাজিস্ট্রেট রোজমেরি গিলবার্ট আবেদনটি নাকচ করে দেন। আদালতে উপস্থিত ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশের (এএফপি) প্রতিনিধিরাও। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি দেন, মামলার প্রকৃতি ও গুরুত্ব বিবেচনায় সম্পত্তি বিক্রির অনুমতি দেওয়া সমীচীন হবে না।
গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশের একটি ছোট গ্রামে রেহানা পারভিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মরদেহটি পাওয়া যায় আওলাদ হোসেনের বোনের বাড়ির আঙিনায় মাটিচাপা অবস্থায়। এ ঘটনার পর অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশও বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করে। গত এপ্রিল মাসে অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম এবিসি জানায়, রেহানা পারভিনের সন্দেহজনক মৃত্যুর বিষয়ে তদন্ত করছে এএফপি। তবে এবিসি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, রেহানা পারভিনের মৃত্যুর জন্য আওলাদ হোসেন দায়ী—এমন দাবি তারা করছে না। যদিও বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে বলে আদালতে জানানো হয়েছে।
মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রেহানা পারভিনের মৃত্যু সনদ। পুলিশের অভিযোগ, আওলাদ হোসেন একটি জাল মৃত্যু সনদ ব্যবহার করে দম্পতির তিনটি সম্পত্তি নিজের নামে স্থানান্তরের চেষ্টা করেছিলেন।
এ অভিযোগে গত মার্চ মাসে তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও জাল নথি ব্যবহারের মামলা করা হয়। পরে তিনি জামিন পান। আদালতে জানানো হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আওলাদ হোসেন এক সিভিল আইনজীবী নিয়োগ করেন এবং সম্পত্তি হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবহারের জন্য তাকে একটি মৃত্যু সনদ দেন। পরে কুইন্সল্যান্ডের টাইটেলস অফিস নথিটি সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করে এবং বিষয়টি পুলিশের নজরে আনে। এরপরই তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি বিমাল রাউত আদালতে বলেন, মামলাটি সরাসরি সম্পত্তির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং তদন্ত এখনও চলমান। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশেরও এ বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে, যার প্রমাণ তারা আজ আদালতে উপস্থিত।” রাউত আরও বলেন, “অভিযোগটি সম্পত্তি–সংক্রান্ত। অভিযোগ প্রত্যাহার বা খারিজ না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের আবেদন কোনোভাবেই বিবেচনা করা উচিত নয়।” রাষ্ট্রপক্ষের মতে, তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় সম্পত্তি বিক্রির অনুমতি দেওয়া হলে মামলার স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে আওলাদ হোসেনের আইনজীবী তোরিক দীব আদালতে বলেন, তার মক্কেল আর্থিক চাপে রয়েছেন। একটি সম্পত্তির বন্ধকী ঋণ পরিশোধ করতেও তিনি হিমশিম খাচ্ছেন। দীবের ভাষ্য, “আইনি লড়াইয়ের ব্যয় বহন করতে সম্পত্তি বিক্রি করা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় তিনি সেই সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।” তিনি আরও জানান, গার্হস্থ্য সহিংসতা–সংক্রান্ত আদেশ লঙ্ঘনের কয়েকটি ঘটনার বাইরে আওলাদ হোসেনের উল্লেখযোগ্য কোনো অপরাধমূলক ইতিহাস নেই। “তিনি প্রায় ২০ বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন। তার পাঁচ সন্তান রয়েছে এবং বর্তমানে তিনি আর্থিক কষ্টের মধ্যে আছেন,” আদালতে বলেন দীব।
আইনজীবীর দাবি, গত এক বছরে এএফপির তদন্তে আওলাদ হোসেন পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন। তদন্তকারীদের অনুরোধে তিনি নিজের গাড়ি থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের অনুমতিও দিয়েছেন।
প্রতিরক্ষা পক্ষ আদালতে দাবি করে, যে মৃত্যু সনদকে পুলিশ জাল বলছে, সেটি প্রকৃতপক্ষে বৈধ নথি।
তোরিক দীব বলেন, সে সময় বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অস্থিরতা চলছিল। এ কারণেই সংশ্লিষ্ট নথিতে বর্তমানে প্রচলিত কিউআর কোড ছিল না।
তিনি আদালতকে জানান, বাংলাদেশের আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের ভিত্তিতে এমন নথিও পাওয়া গেছে, যা থেকে বোঝা যায় যে ওই সময় সরকারি কর্তৃপক্ষের জারি করা মৃত্যু সনদের ধরন এমনই ছিল।
আদালত শেষ পর্যন্ত জামিনের শর্ত পরিবর্তনের আবেদন নাকচ করে দেয়। ফলে আপাতত ব্লেনহাইম, লেনফিল্ড ও চার্চেবল এলাকায় অবস্থিত সম্পত্তিগুলো বিক্রি করতে পারবেন না আওলাদ হোসেন।
এদিকে মামলাটি ব্রিসবেন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা হবে।