উৎসুক প্রবাসীদের চোখে তখন নস্টালজিয়ার জল, আর থিয়েটারজুড়ে এক অভূতপূর্ব শিহরণ। ১০ বছরের দীর্ঘ ও বর্ণিল পথচলা, প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে জমা হওয়া অগণিত স্মৃতি আর হৃদয়ের গহীন অনুভূতির রেশকে সুরের সুতোয় গেঁথে এক দশক পূর্ণ করল অ্যাডিলেডের প্রাণপ্রিয় বাংলা ব্যান্ড ‘রং’ (RONG)। এই অবিস্মরণীয় মাইলফলক উদযাপনে শনিবার (১ আগস্ট) অ্যাঙ্গেল পার্কের দ্য পার্কস থিয়েটারে (The Parks Theatre) অনুষ্ঠিত হলো তাদের আবেগঘন ও জমকালো কনসার্ট ‘দশে ১০’।
‘১০ ইয়ার্স, কাউন্টলেস মেমোরিজ, ওয়ান স্টেজ’—এই মূলভাবকে বুকের ভেতর নিয়ে লালন করা কনসার্টটি ঘিরে সকাল থেকেই শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল তীব্র উত্তেজনা। থিয়েটারের দরজা খোলার বহু আগেই প্রবাসীদের ঢল নামে মিলনায়তনের বাইরে। প্রবাসের কর্মমুখর জীবনের মানসিক ক্লান্তি আর যান্ত্রিকতা ঝেড়ে ফেলে মেলবোর্ন ও অ্যাডিলেডের শত শত বাঙালি ছুটে এসেছিলেন সুরের মায়াজালে ধরা দিতে। প্রবাসে কাটানো দীর্ঘ সময়ের ভিড়ে আড়ালে পড়ে যাওয়া শৈশব, কৈশোর আর ফেলে আসা দেশের মিষ্টি স্মৃতির গন্ধে তখন পুরো প্রাঙ্গণ থমথম করছিল। ১০ বছরের এই দীর্ঘ পথচলায় ‘রং’ কেবল নিজেদের মাঝেই সুরের গণ্ডি সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং অ্যাডিলেডের অন্যান্য স্থানীয় ব্যান্ড ও গুণী সংগীতশিল্পীদেরও পরম মমতায় যুক্ত করেছে নিজেদের এই পথচলায়। সেই সম্প্রীতির মেলবন্ধন ফুটে ওঠে কনসার্টের মঞ্চেও, যেখানে অতিথি শিল্পী হিসেবে মঞ্চ মাতান, রাহীল, অগ্নিবীণা (Agnibeena) ব্যান্ডের রায়হান এবং তাল (Taal Australia) ব্যান্ডের ইমন।

সন্ধ্যা ৬টায় যখন থিয়েটারের দরজা উন্মুক্ত হলো, দর্শকরা যেন এক টুকরো বাংলাদেশে প্রবেশ করলেন। মঞ্চে প্রথম আলোকসম্পাত হতেই থিয়েটারজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক বিদ্যুৎ তরঙ্গ। মাহিনের কণ্ঠে অর্থহীনের ‘অসমাপ্ত’ দিয়ে যখন প্রথম গিটারের তারে টান পড়ল, মুহূর্তেই দর্শকসারিতে আছড়ে পড়ে উন্মাদনা। এলআরবির ‘ঘুমন্ত শহরে’, ওয়ারফেজের ‘পূর্ণতা’ কিংবা অগ্নিবীনার রায়হানের কন্ঠে নগর বাউলের ‘তারায় তারায়’ ও মাহিনের কণ্ঠে ‘বিবাগী’ গানের পাওয়ারহাউজ ভোকালে পুরো থিয়েটার যেন হয়ে উঠেছিল ঢাকার কোনো উন্মুক্ত কনসার্ট গ্রাউন্ড।
ব্রায়ান এডামসের ‘Summer of 69’ এবং অর্থহীনের ‘অসমাপ্ত’ বা আর্টসেলের ‘ধূসর সময়’-এর শক্ত ড্রামস বিট ও হেভি রিফগুলোতে দর্শকদের হাত একসঙ্গে শূন্যে কেঁপে উঠেছে, থিয়েটারের চার দেয়াল কেঁপেছে গর্জনে। আবার অন্যদিকে যায়নাব এর পিয়ানো সোলো এবং ওয়াসিফ ও সাবাবের অনন্য একক পরিবেশনা এনে দিয়েছিল এক মায়াবী পরিবেশ। সাবাবের প্রাণবন্ত পরিবেশনার পরপরই মঞ্চে ওঠেন মাহিন। বিখ্যাত ব্যান্ড ‘সানতানা’র কালজয়ী গান ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক ওম্যান’ (Black Magic Woman) পরিবেশন করে পুরো মিলনায়তনকে সুরের মাতমে ভরিয়ে দেন তিনি।
জান্নাত ও রাশীদের কণ্ঠে লেডি গাগার ‘Always Remember Us This Way’ এবং ‘রং’-এর নিজস্ব গান ‘সুখের ভেলায়’-এর ম্যাশআপ শ্রোতাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায় গভীর অনুভূতির জগতে। আর মেহরীনের কণ্ঠে ‘ওরে নীল দরিয়া’র আবেগঘন পরিবেশনায় প্রবীণ অনেক প্রবাসীকেই নীরবে চোখের জল মুছতে দেখা গেছে। অন্জন আর ফাহাদ (Chorus) এবং ওয়াসিফের সোলো গীটার পরিবেশন ছিল আরেক বাড়তি পাওনা।
আর রাহিলের ‘তোমার নেশা’ সুরের কোনো সাধারণ মেলোডি নয়, বরং এটি আত্মাকে নাড়া দেওয়া এক গভীর অনুভূতি, যা প্রথম সুর থেকেই শ্রোতাকে নিয়ে যায় এক অলৌকিক মায়াজালের গহীনে। গানটির কথা, মেলোডি আর মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্টের অপূর্ব মিশ্রণ শ্রোতার হৃদয়ে তৈরি করে এক নির্জন, ব্যাকুল আবহ। আর রাহিলের দরদী কণ্ঠের অদ্ভুত এক টান মুহূর্তের মধ্যেই শ্রোতাকে চারপাশের বাস্তবতা থেকে ভুলিয়ে দেয়। সুরের এই মৃদু নেশা আপনাকে এমন এক ভাবাবেগে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, যেখানে প্রতিটি শব্দ অনুভূতির খুব গভীরে গিয়ে স্পর্শ করে এবং মনকে এক অদ্ভুত মিষ্টি বেদনায় ভরিয়ে তোলে।
‘রং’-এর নিজস্ব মৌলিক সৃষ্টি—পন্নি’র কণ্ঠে ‘প্রবাসে’ এবং মাহিনের কণ্ঠে ‘গানে গানে’ শোনানোর সময় পুরো মিলনায়তন এক অন্যরকম আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। প্রবাস জীবনের একাকীত্ব, সংগ্রাম আর দেশের প্রতি ব্যাকুলতা যেন প্রতিটি লাইনে ফুটে উঠছিল। পন্নি যখন মাইলসের ‘ফিরিয়ে দাও’ বা ফাহাদ এলআরবির ‘হাসতে দেখো’ গাইতে শুরু করেন, তখন থিয়েটারের শত শত কণ্ঠ একসঙ্গে গেয়ে ওঠে চেনা সুরগুলো। আর ইমন (তাল অষ্ট্রেলিয়ার)-এর কণ্ঠে নগর বাউলের ‘বাংলাদেশ’ গাওয়ার সময় তো পুরো মিলনায়তন যেন লাল-সবুজের আবেগে ফেটে পড়েছিল।
কনসার্টের শেষভাগে নেইমেসিসের ‘কবে’, ফিডব্যাকের ‘মৌসুমী’ কিংবা মাইলসের প্রকম্পিত ‘জ্বালা জ্বালা’ গানের মধ্য দিয়ে ২৫টি বৈচিত্র্যময় গানের সেটলিস্ট শেষ হয়। গান শেষে হলজুড়ে অনবরত করতালি আর ‘ওয়ান্স মোর’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠছিল চারপাশ।

প্রথম গান থেকেই দর্শকদের প্রতিক্রিয়া ছিল বাঁধভাঙা। প্রতিটি ড্রামসের বিট আর গিটারের লিডে মিলনায়তনের শত শত কণ্ঠ একসাথে গেয়ে উঠছিল পরিচিত গানগুলোর প্রতিটি লাইন। প্রিয় গানের তালে কখনো দর্শকদের হাত একসঙ্গে শূন্যে কেঁপে উঠেছে, কখনোবা আবার মৃদু আলোর নিচে নীরবে অশ্রু মুছেছেন প্রবীণ কোনো প্রবাসী। কোনো ভৌগোলিক সীমানা, কোনো পরবাসের একাকীত্ব কিংবা যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি আর সেদিন কাউকে ছুঁতে পারেনি। প্রতিটি নোটে শ্রোতারা খুঁজে পেয়েছিলেন হাজার মাইল দূরের জন্মভূমির চিরচেনা উষ্ণ স্পন্দন। ২৫টি গানের বৈচিত্র্যময় সেটলিস্টে ফুটে ওঠে বাংলা রকের সোনালী যুগের বৈচিত্র্যময় রূপ। গান শেষে হলজুড়ে করতালি আর ‘ওয়ান্স মোর’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠছিল বারবার।
এক দর্শক আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “প্রবাসে এতদিন ধরে থাকি, কিন্তু আজকের এই তিন ঘণ্টা যেন আমাকে মুহূর্তে ঢাকার রাজপথে, ক্যাম্পাসের দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। বুকের ভেতরে চেপে থাকা নস্টালজিয়া আর দেশপ্রেম এভাবে সুর হয়ে ঝরে পড়বে ভাবতেই পারিনি! রং শুধু গানগায়নি, আমাদের মনের ভেতরের জমে থাকা সব অনুভূতিকে আজ ডানা মেলে উড়ার সুযোগ করে দিয়েছে।”
সুদূর অস্ট্রেলিয়ার বুকে ‘রং’ আজ কেবল একটি মিউজিক্যাল ব্যান্ড নয়, হাজারো প্রবাসীর ব্যাকুল হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া ‘সাত সমুদ্র পারের এক টুকরো বাংলাদেশ’। ব্যান্ডটির গানের প্রতিটি লিরিকে যেন মিশে আছে ঢাকার বৃষ্টিভেজা দুপুর, শরতের মেঘলা আকাশ কিংবা প্রবাসের মাটিতে বেঁচে থাকার নিঃশব্দ লড়াই ও জয়ের গল্প। আবেগ ও সুরের এই অনন্য ডালি নিয়ে ‘রং’ আজ এক আত্মিক সাংস্কৃতিক সেতু—যা কোনো ভৌগোলিক দূরত্বকে তোয়াক্কা না করে ঐতিহ্য আর আধুনিকতাকে বেঁধেছে একই সুতোয়। তারা শুধু সংগীত পরিবেশন করেনি, প্রবাসের যান্ত্রিক জীবনকে সুরের ছোঁয়ায় রাঙিয়ে হৃদয়ের গহীনে বাংলা ও বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখার নতুন রসদ জুগিয়েছে।
পুরো আয়োজনজুড়ে যেন ছড়িয়ে ছিল এক অলৌকিক জাদু, আর সেই জাদুর প্রতিটি অবিনশ্বর মুহূর্ত, চোখের পলকে মিলিয়ে যাওয়া সূক্ষ্ম আবেগ এবং মেলোডির মাতাল করা উন্মাদনাকে নিজের ক্যামেরার ক্যানভাসে জীবন্ত করে তুলেছেন ‘purplebirdphoto.com.au’-এর পক্ষ থেকে আলোকচিত্রী সাজীদ। তাঁর নিপুণ ও নিখুঁত লেন্স যেন শুধু দৃশ্য নয়, ধারণ করেছে উপস্থিত মানুষগুলোর স্পন্দিত হৃদয়কে। সাজীদের ফ্রেমে বন্দি হয়েছে প্রিয় গানের সুরে দর্শক-শ্রোতাদের ঝাপসা হয়ে আসা অশ্রুসিক্ত চোখ, সুরের মূর্ছনায় ভেসে যাওয়া প্রতিটি মানুষের বিষাদ আর ভালোবাসার মেলবন্ধন। আলো-আঁধারির খেলায় কখনো হাজারো করতালির সেই মুখর ক্ষণ, কখনো বা একলা গায়কের তীব্র আবেগে কেঁপে ওঠা মঞ্চের সেই মহিমান্বিত আলোকোজ্জ্বল ফ্রেম, প্রতিটি শট যেন একেকটি না-বলা গল্পের জন্ম দিয়েছে। সাজীদের প্রতিটি ক্লিক এই সন্ধ্যার ঘোরলাগা অনুভূতিগুলোকে শুধু ফ্রেমবন্দিই করেনি, অমর করে রেখেছে সময়ের পাতায়।
উল্লেখ্য, আবেগ, মেলোডি ও উন্মাদনায় ভরপুর এই মিউজিক্যাল ইভেন্টটির অফিশিয়াল মিডিয়া পার্টনার হিসেবে যুক্ত ছিল অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় মাল্টিকালচারাল অনলাইন নিউজপোর্টাল ‘আমাদের কথা অস্ট্রেলিয়া’ (Amader Kotha Australia)।
Photo credit: Sazzid Ahmed (purplebirdphoto.com.au)